ভুল এবং ভালোবাসা পর্ব:- ০৯

ভুল এবং ভালোবাসা
পর্ব:- ০৯
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয় শুভ্রর বাবা ও মা। শুভ্র তখনো লাবণ্যর দিকে পলকহীনভাবে তাকিয়ে ছিল। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য লাবণ্যর শাশুড়ি লাবণ্যকে বলে উঠে—
” কাল তোর পরীক্ষা! সে খেয়াল আছে?” শাশুড়ির কথা শুনে মাথা তুলে লাবণ্য।
— কি হলো? এখনো দাঁড়িয়ে আছিস যে? পড়তে হবে না?
” যাচ্ছি মা……..”
লাবণ্য ওর রুমে চলে যায়। শুভ্র তখনো প্লেট হাতে দাঁড়িয়ে।
—- তুই আবার এখানে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? যা নিচে টেবিলে গিয়ে খা।
মায়ের কথায় শুভ্র নিচে চলে গেল। সাথে শুভ্রর বাবা এবং বোন। খাবার টেবিলে খাবারে হাত দিয়ে চুপসে বসে আছে শুভ্র। এখন পর্যন্ত একমুঠো খাবারও পেটে যায়নি ওর। যাওয়ার কথাও নয়। মন যেখানে ভরপুর, খাবারের সেখানে পেটে না যাওয়ারই কথা। বাবা, বোন খাওয়া শেষে চলে যাওয়ার পর, ভরা প্লেটে পানি ঢেলে শুভ্রও রুমে চলে যায়। রুমে গিয়ে একবার বিছানায় তো আরেক বার সোফায়, একবার দাঁড়িয়ে তো আরেকবার বসে লাবণ্যর কথা ভাবছে। শুভ্রর কোনো কিছুতেই শান্তি লাগছে না। ছন্নছাড়ার মত এখান থেকে সেখানে যাচ্ছে। কোনো কিছুতেই ওর ভালো লাগছে না। এদিকে লাবণ্য?!!!
বই হাতে একের পর এক পৃষ্টা উল্টাচ্ছে। পৃষ্টা উল্টিয়ে যখনই পড়বে বলে স্থির করে তখনই শুভ্রর মুখখানা হৃদয়ের ক্যানভাসে ভেসে উঠে। লাবণ্য বইয়ের পাতায় কোনো লেখা দেখতে পাচ্ছে না। সব পাতা জোড়েই শুধু শুভ্র, শুভ্র, শুভ্র_____
উফফ! এসব কি হচ্ছে আজকে?
ভ্রু কুচকে পড়ার টেবিল থেকে উঠে পরে লাবণ্য। লাইট নিভিয়ে শুয়ে পরে।
কিন্তু একি?!!!
শুয়ে থেকেও লাবণ্যর ভালো লাগছে না। কেমন যেন অস্থির অস্থির লাগছে। ছটফট করছে ভিতরটা। ঘুমানোর অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ লাবণ্য। কিছুক্ষণ বিছানার এপাশ ওপাশ করে শুয়া থেকে উঠে বসে। অন্ধকারে হাঁটুতে ভর দিয়ে চুপটি করে মাথা নিচু করে বসে থাকে। এমন সময় রুমে আগমন ঘটে ওর শাশুড়ির। আলোটা জ্বেলে ওনি লাবণ্যর মাথায় হাত রাখেন। লাবণ্য মাথা তুলল তাকায়।
” অনেক রাত হয়েছে, ঘুমিয়ে পর।”
শাশুড়ির কথায় হুম বলে শুয়ে পরে লাবণ্য।
ডিমলাইট’টা জ্বালিয়ে আলো নিভিয়ে রুম ত্যাগ করেন লাবণ্যর শাশুড়ি।
নির্ঘুম শুভ্র ধীরপায়ে লাবণ্যর দোয়ারে এসে দাঁড়ায়। জানালার পর্দাটা আংশিক ফাঁক করে ভেতরের দিকে তাকায় শুভ্র। ডিমলাইটের মৃদু আলোয় শুভ্র দেখতে পায় ওর লাবণ্য পরম নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে। ঘুমন্ত লাবণ্যর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে নিজ রুমের দিকে পা বাড়ায় শুভ্র।

পরদিন পরীক্ষা শেষে বাসায় ফিরছিল লাবণ্য। কলেজ গেইটের কাছাকাছি আসতেই দেখতে পায় শুভ্র দাঁড়িয়ে। শুভ্রকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পিছু হটে লাবণ্য। শুভ্র অবাক বিস্ময়ে লাবণ্যের দিকে তাকিয়ে ভাবছে-
” এভাবে চলে গেল কেন ও?”
ক্ষাণিক বাদেই ফিরে আসে লাবণ্য। কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায় শুভ্র। কারণ, এই মুহূর্তে ওর পিছনে ওর মা স্বয়ং দাঁড়িয়ে। লাবণ্যর পিছু হটার কারণ বুঝতে পারে শুভ্র। বুঝতে পারে ওকে দেখে লাবণ্যই ফোন করে মাকে এনেছে। লাবণ্যকে নিয়ে বাসায় যাওয়ার আগমুহূর্তে অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে রোকসানা বেগম ছেলে শুভ্রকে__
” তুই? তুই এখানে কি করছিস?”
আমতা আমতা করে শুভ্রর জবাব, কাজ! একটু কাজ ছিল মা……………

লাবণ্যর পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে প্রতিদিন শুভ্র কলেজ গেইটে দাঁড়িয়ে থাকত। অধির আগ্রহে অপেক্ষা করত লাবণ্যর ফিরে আসার, লাবণ্যর সাথে কথা বলার জন্য। কিন্তু লাবণ্য?!!!
যতবারই শুভ্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখত, ততবারই শাশুড়িকে ফোন করে আনত। ব্যর্থ মনোরথ নিয়ে প্রতিদিন’ই শুভ্র বাসায় ফিরে যেত। সেদিন ছিল লাবণ্যর পরীক্ষার শেষ দিন। প্রতিদিনকার মত শুভ্রও সেদিন গিয়েছিল লাবণ্যর সাথে কথা বলার প্রত্যাশায়। তবে সেদিন আর শুভ্র কলেজ গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল না। শুভ্র লুকিয়ে ছিল কলেজ গেইট থেকে ক্ষাণিকটা দুরে, আড়ালে। লাবণ্য যখন দেখল শুভ্র নেই, তখন নিশ্চিন্তে সামনের দিকে এগুচ্ছিল। গেইট পেরিয়ে একটু সামনে আসতেই চলার সেই গতি থেমে যায় ওর। মাথা নিচু করে একজায়গায় চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে লাবণ্য। আর শুভ্র?!!!
শুভ্র দাঁড়িয়ে আছে লাবণ্যর ঠিক সামনেই পথ আটকে।

— লাবণ্য!
তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। প্লিজ এখান থেকে একটু চলো। লাবণ্য পূর্বের ন্যায় মাথা নিচু করে আছে।

— লাবণ্য! এটা পাব্লিক প্লেস। আর পাবলিক প্লেসে আমি কোনো বাড়াবাড়ি করতে চাচ্ছি না। তাই প্লিজ, লাবণ্য! তুমি আমার সাথে চলো।
লাবণ্য মাথা নিচু করে আছে, তবে ওর মুখ থেমে নেয় আর। মাথা নিচু করে লাবণ্য অনর্গল বলা শুরু করে-
” আমার পরীক্ষা শেষ হয়েছে। আমার এখন বাসায় যেতে হবে। না হলে মা টেনশন করবে।”

– লাবণ্য প্লিজ তুমি আমার সাথে চলো। আমাকে তোমার বেশীক্ষণ সময় দিতে হবে না। শুধু ৩০মিনিট। ৩০মিনিট সময় দান করো তুমি আমায়।
” Impossible….
৩০মিনিট কেন? ৩০সেকেন্ড সময়ও আমি কাউকে দিতে পারব না। প্লিজ, রাস্তা ছাড়ুন।”

— লাবণ্য! প্লিজ এমন করে না। আমার কথাটা শুনো একটু….(….)….???
” রাস্তা ছাড়ুন বলছি….”

—- না, আমি এখন রাস্তা ছাড়ব না।
” আমি কিন্তু এবার চিল্লিয়ে মানুষ জড়ো করব। ”

— যদি পারো, তবে তাই করো। আমিও শুনতে চাই তোমার গলার জোর কতটুকু?
লাবণ্য কিছু বলতে যাবে তার আগেই হাজির শুভ্রর মা। দুর থেকে শাশুড়ি দেখেই হেসে উঠে লাবণ্য। বলে উঠে— ” মা তুমি?”

হ্যাঁ, আমি। তোর আর মানুষ জড়ো করতে হবে না। চল, সামনে রিক্সা দাঁড়িয়ে আছে।
কথাটা পিছন থেকে শুভ্রর মা বলে উঠে। শুভ্র লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। লাবণ্যর মা সেদিকে তাকিয়ে বলে-
” আর আপনি? আপনি কি ডাক্তারি পেশা ছেড়ে অন্য কোনো পেশা গ্রহন করেছেন?”

মাথা তুলে তাকায় শুভ্র।
– মা! তুমি আমাকে বলছো???
শুভ্রর মা গম্ভীর কন্ঠে বলেন, জি! আমি আপনাকেই বলছি। এই পেশা গ্রহন করেছেন কবে?
শুভ্র অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করে মাকে, কিসের পেশা?!!!

এই যে প্রতিদিন মহিলা কলেজের গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে মেয়েদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকিস সেই পেশা।

অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায় শুভ্র। অবাক বিস্ময়ে বলে উঠে-
” মানে???”
শুভ্রর মা শান্ত গলায় বলেন-
মানে ডাক্তারি পেশা ছেড়ে বখাটে পেশায় কবে থেকে নাম লিখিয়েছিস???

শুভ্র:- কি???
মা:- জি…………

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here