ভুল এবং ভালোবাসা পর্ব- ০৪

ভুল এবং ভালোবাসা
পর্ব- ০৪
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

৩দিন পর_
যেহেতু লাবণ্য এখন কিছুটা সুস্থ্য তাই লাবণ্যর শ্বশুর শাশুড়ি বাসায় ফেরার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। ওরা বাসায় চলে যাবেন তবে লাবণ্যকে একা রেখে নন। যদিও শুভ্র বাসায় আসে তবুও ওরা কেন জানি ভরসা পাচ্ছে না। রেডি হওয়ার আগ মুহূর্ত লাবণ্যর শাশুড়ি আবারো লাবণ্যর কাছে যায়- কিরে? এখনো রেডি হসনি? তোকে না সেই কখন বললাম রেডি হতে? তাড়াতাড়ি রেডি হো! আমি শাড়িটা চেঞ্জ করে আসি। এসে যাতে দেখি তুই রেডি। লাবণ্যর শাশুড়ি রেডি হয়ে এসে দেখে লাবণ্য তখনো চুপটি করে বারান্দার গ্রিল ধরে আনমনে দাঁড়িয়ে আছে। দেখো তো মেয়ের কান্ড! এখনো দাঁড়িয়ে আছে। আয়, তোকে আমি নিজেই রেডি করিয়ে করিয়ে দিচ্ছি। লাবণ্যর হাত ধরে টানতে টানতে ওর শাশুড়ি যখন ওকে বেডরুমে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন লাবণ্য বলে উঠে, “আমি যাব না মা….”
লাবণ্যর শাশুড়ি লাবণ্যর হাতটা ছেড়ে দেয়। লাবণ্যর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, যাবি না মানে? লাবণ্য মাথা নিচু করে বলে,
” আমি আমার সংসার ছেড়ে কোথাও যাব না মা।” কিন্তু লাবণ্য ও তো তোকে…(….)….???
পুরো কথা বলতে পারে নি রোকসানা বেগম, তার আগেই লাবণ্য ওনার মুখ থেকে কথা ছিনিয়ে নেয়। লাবণ্য অকপটে বলে উঠে, দিক কষ্ট। তুমি দেখো মা, কষ্ট দিতে দিতে ও যেদিন ক্লান্ত হয়ে যাবে, সেদিন ও আমার কাছে ফিরে আসবে। ওর সব ভুলের পরিসমাপ্তি সেদিন ঘটবে। সেদিন ও আমায় ঠিক বুঝবে! আমি না হয় একটু কষ্ট করে সেদিনটির অপেক্ষায় থাকব।
লাবণ্যর মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, তোর যা ভালো মনে হয়। তবে হ্যাঁ, জীবনের সাথে লড়াই করতে করতে কখনো যদি ক্লান্ত হয়ে পরিস, তাহলে চলে আসিস! চলে আসিস এই মায়ের কাছে। পৃথিবীর আর কোথাও তোর জায়গা না হলেও এই মায়ের আঁচলের ছায়াতলে ঠিক তোর জায়গা হবে। ভালো থাকিস। আমরা আসি।

লাবণ্যর শ্বশুর শাশুড়ি চলে যায়। যাওয়ার আগে লাবণ্য ওর শ্বশুর শাশুড়ির পা ছুঁয়ে সালাম করে। লাবণ্যর শ্বশুর লাবণ্যর মাথায় হাত রেখে বলে, দোয়া করি! জয়ী বেশে ফিরে আসুক আমার মা’টা….
লাবণ্যর শ্বশুর শাশুড়ি চলে যায়। সেদিন লাবণ্যর সাথে ওর বাবা মায়ের কথোপকথনের সবটা আড়াল থেকে শুনে নেয় শুভ্র। সব শুনে একটা বিকট হাসি দেয় শুভ্র। জয়ের মুকুট তোর জন্য নয়রে মেয়ে। এ খেলায় তোর পরাজয়। তুই হেরে যাবি এ খেলায়। শোচনীয়ভাবে তোর পরাজয় ঘটবে। এমন পরাজয় যে লজ্জায় মুখ লুকানোর স্থান পাবি না। আমি তোর মুখ ও মুখোশ তুলে ধরব সবার সামনে। সেদিন কোথাও মুখ লুকানোর স্থান পাবি না তুই। কোথাও না।

সেদিন শুভ্রর মন খারাপ ছিল। কেন জানি ভালো লাগছিল না কিছুই।
তাই হসপিটালে যায়নি। শুভ্র ওর রুমে শুয়ে আছে চুপটি করে। অজানা কারনে ওর মনটা খারাপ ছিল। বেডে শুয়ে গভীরভাবে শুভ্র যখন ওর মন খারাপের রহস্য বের করতে ব্যস্ত তখন লাবণ্য চুপটি করে এসে শুভ্রর পাশে বসে। কপালের উপর হাত দিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন শুভ্রর চোখ মুখ দেখে লাবণ্য বুঝতে পারে শুভ্রর মনটা বোধ হয় খুব খারাপ। লাবণ্যর মনে পড়ে যায় শুভ্রর বলা সেই কথাগুলো, লাবণ্য জানো? আমার যখন মন খারাপের সময় তুমি যখন আমার মাথায় হাত রাখ, তখন আমার সব চিন্তা দুর হয়ে যায়। বছর পাঁচেক আগের কথা লাবণ্যর আজ হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আর তাই কোনো সংকোচ না করে লাবণ্য শুভ্রর মাথায় হাত রাখে। আস্তে আস্তে ওর মাথায় হাত বুলাতে থাকে। কিছুক্ষণের জন্য শুভ্র ওর মনের সব যন্ত্রণা ভুলে গিয়েছিল। পরক্ষণে যখন মনে হলো এ তো তারই ছোঁয়া, যাকে আমি মনে প্রাণে ঘৃণা করি। এ তো সেই ছলনাময়ীর ছোঁয়া, যে ছলনাময়ী একদিন অন্য একটা ছেলের জন্য আমায় ভুলে গিয়েছিল। শুভ্র লাফিয়ে উঠে বিছানা থেকে। অগ্নিচোখে লাবণ্যর দিকে তাকাই। লাবণ্য রীতিমত কাঁপছিল শুভ্রর ঐরকম লাল আগুনের মত চোখ দেখে। আচমকা লাবণ্যর কিছু বুঝে উঠার আগেই শুভ্র লাবণ্যর হাতটা ধরে ফেলে। লাবণ্য স্থির দৃষ্টিতে শুভ্রর মুঠোর দিকে তাকিয়ে আছে। কেননা, বিয়ের পর এই প্রথম শুভ্র লাবণ্যর হাত স্পর্শ করল।

” সমস্যা কি তোমার? এভাবে কেন আমার পিছু লেগে আছ? কেন আমাকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছ না? কেন একমুহূর্তও তোমার জন্য আমি শান্তিতে থাকতে থাকতে পাচ্ছি না? কেন? কেন? কেন?”

একনিশ্বাসে করা একরাশ প্রশ্ন শুভ্রর। ভীরু কন্ঠে লাবণ্যর জবাব, আপনি খুব চিন্তিত ছিলেন মনে হয়। তাই আপনার…(….)…????
পুরো কথা বলার আগেই শুভ্র চেঁচিয়ে বলে উঠে, আমি তোমাকে ঘৃণা করি লাবণ্য, ঘৃণা করি। সেখানে তুমি ভাবলে কিভাবে তোমার ছোঁয়াতে আমি শান্তি খুঁজে পাবো?
লাবণ্য শুভ্রর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, আমি জানি এসব আপনার অভিমান থেকে বলছেন। আপনি কখনো আমাকে ঘৃণা করতে পারেন না। আর সবচেয়ে বড় কথা হলো আসল সত্যিটা শুনলে আপনার সব ভুল ভেঙ্গে যাবে। আমি আপনাকে আজ সব বলব। আপনি আমায় একটু সহ্য করেন। ধৈর্য্য নিয়ে আমার কথাগুলো শুনেন….

শুভ্র একলাফে খাট থেকে উঠে পরে। তারপর শার্ট গায়ে দিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে। লাবণ্য শুভ্রর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। শুভ্র রাগী গলায় বলে, আমার ধৈর্য্যের বাধ ভেঙে দিও না লাবণ্য। তাতে কিন্তু তোমার’ই খারাপ হবে। আমি একটু শান্তিতে থাকতে চাই। আর তার জন্য আমি একটু একা থাকতে চাচ্ছি। দয়া করে আমায় একটু শান্তিতে থাকতে দাও।
লাবণ্য শুভ্রর পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। শুভ্র বাসা থেকে বের হয়ে যায়। বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে অশ্রুভেঁজা দৃষ্টিতে লাবণ্য শুভ্রর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here