ভুল এবং ভালোবাসা পর্ব- ০১

ভুল এবং ভালোবাসা
পর্ব- ০১
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

অসহ্য! তোমাকে আর কতবার বলব? এভাবে আমার অনুমতি ছাড়া হুটহাট আমার রুমে প্রবেশ করবে না। আমার ভালো লাগে না। সহ্য করতে পারি না তোমাকে। তোমার কাজকে। তবুও কেন এমন কর? কেন শান্তিতে থাকতে দিচ্ছ না আমাকে? একরাশ বিরক্তির স্বরে লাবণ্যর দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলে শুভ্র। লাবণ্য কোনো কথা না বাড়িয়ে নিশ্চুপ হয়ে শুভ্রর রুম ত্যাগ করে।
শুভ্র এবং লাবণ্য স্বামী স্ত্রী। ১বছর হলো ওদের বিয়ে হয়েছে। অথচ তাদের মধ্যে স্বামী স্ত্রীর যে সম্পর্ক সেটা এখনো গড়ে উঠেনি। আর উঠবেই বা কি করে? শুভ্র যে লাবণ্যকে মনে প্রাণে ঘৃণা করে। বিয়েটা অবশ্য করেছে কিন্তু সেটা নিজ ইচ্ছের বিরুদ্ধে, বাবা-মার ইচ্ছের প্রাধান্য দিতে। কিন্তু মন থেকে শুভ্র লাবণ্যকে মেনে নিতে পারে নি। লাবণ্য এবং শুভ্রর বৈবাহিক জীবন ১বছরের হলেও ওদের পরিচয়টা হয় তারও অধিক সময় আগে। আজ থেকে ৫বছর আগে ওয়ার্ডে রোগী দেখতে গিয়ে লাবণ্যর সাথে দেখা হয় শুভ্রর। শুভ্র ছিল মেডিকেলের স্টুডেন্ট আর লাবণ্য ছিল এইচএসসি পরীক্ষার্থী। ওয়ার্ডে সেদিন লাবণ্যও উপস্থিত ছিল ওর অসুস্থ্য মাকে নিয়ে। লাবণ্য এবং শুভ্রর পরিচয়টা সেদিন’ই হয়। প্রথমেই পরিচয়, তারপর ঘনিষ্ঠতা।
ঘনিষ্ঠতা থেকে সেটা আন্তরিকতায় রূপ নেয় ১বছরের ব্যবধানে। ভালোবেসে ফেলে একে অপরকে। অসহায় লাবণ্যের মুখে হাসি ফুটে উঠে শুভ্রর মত ছেলের ভালোবাসা পেয়ে। লাবণ্য এখন আর মন খারাপ করে থাকে না। শুভ্রর আদর-যত্ন-শাসন-ভালোবাসায় লাবণ্যর জীবন যেন কানায় কানায় পূর্ণ। লাবণ্যকে দেখে মনে হতো, ওর মত সুখী এখন পৃথিবীতে কেউ নেই। কিন্তু সেই সুখ লাবণ্যর কপালে বেশীদিন সইনি। রিলেশনের দু’বছরের মাথায় লাবণ্যর মা, বাবা ও একমাত্র ছোট্ট ভাইটি রোড এক্সিডেন্টে পরপারে পাড়ি জমায়। চোখের সামনে পরিবারের এতগুলো প্রিয়জনের মৃত্যু মেনে নিতে পারেনি সে। ব্যাপারটা লাবণ্যর ব্রেনে আঘাত করে। লাবণ্য মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে যায়। সামনে থাকা জিনিসপত্র একে একে ভাঙ্গতে থাকে। সামনে যাই পেত, লাবণ্য সেটাই ভাঙ্গত। কাঁচের প্লেট, গ্লাস, ফুলের টব সব, সব ভাঙতে থাকে লাবণ্য। চোখের সামনে পরিবারের সবার মৃত্যু তে লাবণ্য যে উন্মাদ হয়ে গেছে সেটা বুঝতে পারে বাড়ির মালিক ও আশেপাশের ভাড়াটিয়ারা। তারা লাবণ্যকে শিকল দিয়ে বেঁধে লাবণ্যর গ্রামে খবর দেয়। খবর শুনে ছুটে আসে লাবণ্যর মায়ের বান্ধবী এবং ওনার হাজবেন্ড।
ওনারা ওনাদের হেফাজতে রাখার জন্য লাবণ্যকে নিয়ে যায়। ভর্তি করে মানসিক হসপিটালে। ১বছর চিকিৎসাধীন থাকার পর কোনো উন্নতি হয়নি লাবণ্যর। এটা দেখে ওরা লাবণ্যকে বিদেশে নিয়ে যায়। সেখান থেকে চিকিৎসা নিয়ে ২বছর পর দেশে ফিরেন ওনারা। লাবণ্য তখনো পুরোপুরিভাবে সুস্থ হয়নি। সেদিন লাবণ্যকে নিয়ে ওর কাজিন হসপিটাল থেকে ফিরছিল। লাবণ্যর গায়ে প্রচন্ড জ্বর থাকার কারনে হাঁটতে পারছিল না। ওর কাজিন তাই ওকে পিছন থেকে ধরে বাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। দূর থেকে লাবণ্যকে দেখে শুভ্র। থমকে যায় ওর গতিপথ। হঠাৎ করে যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া, আজ একটা অচেনা ছেলের সঙ্গে জড়াজড়ি অবস্থায় হেঁটে যাওয়া দেখে শুভ্রর মধ্যে বিরূপ ধারণার জন্ম নেয়। মনে মনে বলে উঠে, ওহ! তাহলে নতুন নাগর পেয়ে আমার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছিল? আর আমি গাঁধা কত বাজে দুশ্চিন্তা’ই না করছি!
একরাশ ঘৃণা বুকে, মনের মধ্যে একটা বৃহৎ ভুল ধারনা পুষে সে স্থান ত্যাগ করে শুভ্র।
সুপ্রিয় পাঠক/পাঠিকবৃন্দ চলুন তাহলে শুনে আসি কিভাবে সেই বিশাল ভুলের পরিসমাপ্তি এবং ভালোবাসার শুভ সূচনা হয়।

রাত্রে লাবণ্য চা হাতে শুভ্রর রুমে প্রবেশ করে। শুভ্র তখন সবেমাত্র চেম্বার থেকে ফিরছিল। লাবণ্যকে রুমে দেখা মাত্র’ই রাগ উঠে যায় শুভ্রর। কোনো কথা না বলে চুপচাপ লাবণ্য চা’য়ের কাঁপটা রেখে দাঁড়িয়ে ছিল, আচমকা শুভ্র চা’য়ের কাপটা হাত দিয়ে ঠেলে লাবণ্যর পায়ের নিচে ফেলে দেয়।
” তোমাকে বলছি না তুমি আমার সামনে আসবা না? আমি তোমার ছায়া পর্যন্ত সহ্য করতে পারি না। তারপরও কেন তুমি আমার সামনে আসো? কেন? কেন? কেন?”

শুভ্রর রাগী গলার কথা মোটেও ভয় পায়নি লাবণ্য। আর তাই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পায়ের নিচ থেকে ভাঙা কাপের টুকরোগুলো একজায়গায় জড়ো করে বাইরে চলে যায় সে। শুভ্রর রাগী গলার কথা, ধমক, চোখ রাঙ্গানো দেখেও একটুও ভয় পাই না লাবণ্য। সে এতে ভালোই এনজয় করে। কারণ, লাবণ্য জানে শুভ্র ওর সাথে এমন ব্যবহার কখনো মন থেকে করতে পারে না। ওর বিশ্বাস ওর শুভ্র ওর জন্য সব, সব করতে পারে। আর এটাও জানে, শুভ্র যেদিন জানতে পারবে আমি আসলে ইচ্ছে করে নয়, মানসিক ভাবে পাগল হয়ে ওর থেকে দুরে ছিলাম সেদিন সে আর আমায় ভুল বুঝে দুরে সরিয়ে দিতে পারবে না, ও ঠিক সেদিন আমায় কাছে টেনে নিবে। আমায় ভালোবাসবে। আমি না হয় সেদিনের জন্য’ই অপেক্ষায় থাকি।
প্রচন্ড জ্বর গায়ে, কাঁপা কাঁপা শরীরে বিছানা থেকে উঠে লাবণ্য। ওযু করে কাঁপা কাঁপা শরীরে রান্না করে সে। যদিও জানে এ রান্না শুভ্র খাবে না। তবুও রান্না করল। রান্না শেষে কাঁপা কাঁপা শরীরে শুভ্রকে ডাকে। তাড়াহুড়ো করে ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে চায় শুভ্র। পিছন থেকে ডাক দেয় লাবণ্য।
পিছু ফিরে তাকায় শুভ্র। ব্রেকফাস্ট রেডি, ব্রেকফাস্ট’টা করে যান প্লিজ।
ভ্রু জোড়া কিঞ্চিৎ বাঁকা করে শুভ্রর জবাব, তোমাকে আর কতবার বলব? আমার জন্য রান্না করো না। আমি বাইরে থেকে খেয়ে নিব। লাবণ্য আর একটা কথাও বলেনি। চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। শুভ্র হনহনিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে। রাত্রে চেম্বার থেকে বাসায় ফেরার সাথে সাথে প্রতিদিনের মত সেদিনও চা নিয়ে রুমে ঢুকে লাবণ্য। প্রতিদিনের মত সেদিনও শুভ্রর চোখে মুখে একরাশ বিরক্তির ছাপ ছিল। নিশ্চুপ লাবণ্য চা’য়ের কাঁপটা শুভ্রর সামনে রাখতে রাখতে বলে, ” টেবিলে খাবার দিচ্ছি, খেতে আসেন।”
মিনিট পাঁচেক পর চা’য়ের কাপ হাতে নিয়ে কিচেনে হাজির হয় শুভ্র। লাবণ্য তখন তরকারি গরম করছিল। লাবণ্য, তোমাকে আমি আগেও বলেছিলাম,এখনও বলছি। দয়া করে তুমি আমার জন্য এত ব্যস্ততা দেখিও না। আমি প্রতিদিন বাইরে থেকে খেয়ে আসি, খেয়ে আসব। আমার চা-টা দরকার পরলে আমি নিজেই করে খেতে পারব। দয়া করে, আমার কথাগুলো কানে ঢুকাও। এই কথাগুলো যাতে সেকেন্ড টাইম আর বলতে না হয়। কথাগুলো বলেই চা’য়ের কাঁপটা রেখে রুমে চলে যায় শুভ্র।
আর লাবণ্য?!!!
আঁচল দিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা জলগুলো মুছে নেয়।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here