ফুলশয্যা_সিজন(০৩) পর্ব-০৯

ফুলশয্যা_সিজন(০৩)
পর্ব-০৯
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ভারাক্রান্ত মন নিয়ে মামুন নুহার পথ থেকে সরে দাঁড়ায়। বাসায় ফিরে যায় নুহা। বাগানের ভেতরের ঐ ঝুপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে শুভ। পিছন থেকে ডাক দেয় মামুনকে। থমকে দাঁড়ায় মামুন। শুভ গিয়ে মামুনের ঠিক সামনে দাঁড়ায়। মেলে ধরে নিজের পরিচয়। লজ্জায়, ভয়ে শুভর দিকে তাকাতে পারছে না মামুন। ধীর গলায় শুভ জানায়,
” ভয় নেই মামুন! নেই কোন লজ্জা। এ ব্যাপারে আমি তোমাকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করব না। তবে তোমার প্রতি আমার একটা রিকোয়েস্ট! তোমার জীবনে ওর আগমনটাকে একটা দূর্ঘটনা ভেবে ভুলে যাও। সম্মুখে রঙ্গীন ভবিষ্যৎ তোমায় হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তুমি বরং সেদিকেই এগিয়ে যাও। কারো পিছনে ছুটে জীবনের মূল্যবান সবাইটাকে নষ্ট করো না। বরং জীবনটাকে সুন্দরভাবে গঠন করো। দেখবে একদিন হাজারো তরুণী তোমাকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখবে। ভালো থেকো। শুভ কামনা রইল।”

” ঠিক আছে ভাইয়া। আমি আসি। আসসালামু আলাইকুম।”
শুভর থেকে বিদায় নিয়ে মামুন চলে যায়। শুভও বাসায় ফিরে যায়।

দুপুরের খাবার খাওয়ার সময় নুহা মুখোমুখি হয় শুভর। প্রশ্ন করে শুভকে-
” এভাবে কারণে অকারণে আদনানের গায়ে হাত তুলেন কেন আপনি? কি সমস্যা আপনার?”
শুভর পাল্টা প্রশ্ন-
” তুমি বাসা থেকে বের হয়ে কোথায় দাঁড়িয়ে? কার সাথে? কিভাবে কথা বলো? সে সম্পর্কে আমি কি কখনো তোমাকে প্রশ্ন করেছি?”

দুপুরের কথা মনে হতেই পুরো মুখ ফ্যাকাসে হয়ে যায় নুহার। ঘাবড়ে যায় সে। ভয়ে ঢোক গিলে নুহা। নিচের দিকে তাকিয়ে আঙ্গুল মুচড়াতে মুচড়াতে বলে, আমি আবার কাকাকার সাথে দাদাদাঁড়িয়ে কথা বললাম আজকে?
হাসি আটকে জবাব দেয় শুভ, সেটা তো তুমিই ভালো জানো।
আর কোন কথা বলে না নুহা। নিশ্চুপ হয়ে অপরাধীর ন্যায় মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সে।শুভ রুমে চলে যায়।

রাত্রে সবাই একত্রে খাবার টেবিলে খেতে বসেছে কিন্তু নুহার আসার নাম নেই। শুভর ফুপ্পি হিয়া আদনানকে জিজ্ঞেস করে, কিরে ভাই? আজকে পিরিতের মা’রে ছাড়াই যে খেতে বসলি? পাশ থেকে শুভর প্রশ্ন, হ্যাঁ, তাইতো। নুহা কোথায়? ও আজকে আসলো না যে….!
বিজ্ঞদের মতো উত্তর দেয় আদনান।
” আম্মুর আজকে মন ভালো না। তাই খাবে না…!”
বড়সড় নিশ্বাস ফেলে শুভ। ফিরে তাকায় আদনানের দিকে। আদনান তখন গম্ভীর হয়ে ভাতের উপর আঙুলের রেখা টেনে যাচ্ছে। পিছন দিয়ে ছেলের পিঠে হাত রাখে শুভ। আদনান ফিরে তাকায় বাবার দিকে। একটা মলিন হাসি হেসে শুভ ছেলেকে বলে- “মানচিত্র তো অনেক’ই আঁকলে। এবার খেয়ে নাও বাবা….”
আদনান হাতের প্লেটটা শুভর দিকে ধাক্কা দিয়ে খাবার টেবিল ছেড়ে রুমে চলে যায়। যাওয়ার আগে শুভকে বলে যায়, “তুমি খাও! আমার খিদে নেই….!

কাঁথা গায়ে চুপটি করে শুয়েছিল নুহা। কাঁথা ধরে টানতে থাকে আদনান। “আম্মু! ভাত খাবো।”
কাঁথার ভেতর থেকে মুখ বের করে নুহা। দৃষ্টি যায় আদনানের দিকে। অতঃপর ভেঁজা গলায় জবাব দেয়, ‘যাও, বাবা! খেয়ে নাও তুমি। আমার ভালো লাগতেছে না….
চোখ টিপে কাঁদতে কাঁদতে দরজাটা মিশিয়ে নুহার পাশে এসে শুয়ে পড়ে আদনান। কান্না চলে আসে নুহার। জাপটে ধরে আদনানকে। অনেকক্ষণ এভাবে জড়িয়ে রেখে দু’জনেই খাবার টেবিলের দিকে চলে যায়। খেয়ে নেয় রাতের খাবার।

খাওয়া শেষে শুভ আদনানকে ওর রুমে নিয়ে গেলে নুহা একা শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

মাঝরাত্রিতে আদনানের চিৎকারের শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় নুহার। দ্রুত দরজা খুলে। আদনানকে কোলে নিয়ে শুভ তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। হাত বাড়িয়ে দেয় নুহা। শুভ আদনানকে নুহার দিকে এগিয়ে দিয়ে রুমে চলে যায়। আদনানকে খাটে বসানো হয়। তখনো সে বাচ্চাদের মতো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। কি দিয়ে কান্না থামাবে সেটাই ভেবে পাচ্ছে না নুহা।

” বাবা! শিমের বিচি খাইবা?”
আদনান মাথা ঝাকিয়ে হ্যাঁ-বোধক জানান দিলে নুহা রুমে থাকা ভাঁজা শিমের বিচি থেকে কিছু বিচি এগিয়ে দেয় আদনানের দিকে।

ঘুমে ঢুলুঢুলু নুহা আদনানকে শিমের বিচি দিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে আদনানের পাশেই কাঁথা জড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। এদিকে ছোট্ট আদনান ছোট ছোট ইঁদুরের মতো দাত দিয়ে কুটকুট করে শিমের বিচি খাওয়া শুরু করে। প্রায় ৩০মিনিটের মতো আদনান শিমের বিচি খায়। মিনিট ত্রিশেক পর শিমের বিচি খাওয়া শেষে আরো বিচি বিছানায় পড়েছে কি না সেটা দেখার জন্য হাতড়াতে থাকে। ঘুম ভেঙ্গে যায় নুহার। ফিরে তাকায় আদনানের দিকে।
‘ বাবা! খাওয়া হয়েছে?’ আদনানের ছোট্ট জবাব, হু…

নুহা আদনানকে টেনে ওর পাশে শুয়ে দিয়ে গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দেয়। মিনিট পাঁচেক পরের ঘটনা। নুহার চোখটা মাত্র লেগে এসেছিল। তখনি আবারো সেই কুটকুট আওয়াজ…!
চোখ থেকে ঘুম চলে যায় নুহার। প্রশ্ন করে আদনানকে, ‘আদনান! তুমি না বলছ বিচি খাওয়া শেষ?’
প্রতিউত্তরে কিচ্ছু বলেনি আদনান। চুপচাপ শুধু শিমের বিচি খেয়েই যাচ্ছে….!
তখন বিছানা হাতড়িয়ে কি তাহলে এই বিচিগুলোই পেয়েছিল….!
শব্দ করে হেসে উঠে নুহা….

পরদিন ছিল শুক্রবার। শুক্রবার ছুটির দিন। নুহাকে কলেজে যেতে হবে না। আর সেজন্যই বোধ হয় কোন রকম ব্রেকফাস্টটা সেরে নুহা বেরিয়ে পড়ে আদনানকে কোলে নিয়ে। বোরকা গায়ে নুহা আদনানকে নিয়ে পুরো এলাকা চষে ফেলেছে। ফেরার পথে এক মহিলার হাতে লিচুর প্যাকেজ দেখে আদনান কান্না করা শুরু করে-
” আম্মু! লিচু খাবো। আম্মু লিচু খাবো…..!”

নুহা আদনানকে সান্ত্বনা দেয়ার বৃথা চেষ্টা করছে-
” বাবা! বাসায় চলে আসছি। লিচু পাবো কোথায় এখন? তারচেয়ে বরং ভিতরে চলো। আঁখি আন্টিকে বলি গিয়ে। ওনি তোমাকে লিচু এনে দেবে।”
আদনান কিছুতেই সান্ত্বনা মানতে রাজি নয়। লিচু,লিচু করতে করতে নেমে যায় কোল থেকে। দৌঁড়ে চলে যায় রাস্তার ওপাশে হুইলচেয়ালে বসে থাকা মহিলাটির কাছে। আবদার করে-
“আমারে একটা লিচু দিবা….?”
মহিলাটি চোখ থেকে চশমাটা নামিয়ে ঝাপসা চোখে ফিরে তাকায় আদনানের দিকে। অতঃপর হাতের থাকা লিচুর প্যাঁকটা বাড়িয়ে দেয় আদনানের দিকে। রাস্তার এপাশ থেকে কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল নুহা। তার আগেই কোথায় থেকে যেন উদয় হয় শুভ। আদনানকে একটা বিকট ধমক দিয়ে মহিলাটির দিকে ছুড়ে মারে লিচুর প্যাকেজ। প্যাকেজটি মহিলাটির পায়ের নিচে গিয়ে পরে। আদনান আবারো লিচুর জন্য কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। শুভ আদনানকে জোর করে কোলে নিয়ে বাসার দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এদিকে প্রচন্ড লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে নুহা। প্রশ্ন করে শুভকে, আপনি ভদ্রমহিলার সাথে এমন না করলেও পারতেন….!

ভয়ানক দৃষ্টি নিয়ে শুভ নুহার দিকে ফিরে তাকায়। ভয়ে ঢোক গিলে নুহার জবাব, না মানে ওনি তো যেচে এসে লিচু সাধেননি কাউকে….!
শুভর কঠোর জবাব, ওনার সাধার ধরণটা অন্য রকম। আর কি যেন বলছিলে? ভদ্রমহিলা? আজকাল ছেলেধরা’রা এরকমই ভদ্রতার মুখোশ পরে আসে। আর একটাও কথা হবে না। রুমে চলো…!
পিছন থেকে ভেসে আসে ভদ্রমহিলার কন্ঠে শুভ নামের প্রতিধ্বণি।
থমকে যায় নুহা। ডাক দেয় শুভকে। এই শুনোন না। ওনি তো আপনার নাম ধরেও ডাকছে…
প্রচন্ড রাগে গর্জে উঠে শুভ। দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করে নুহাকে, আমি ঐ বাজে মহিলার সম্পর্কে কোন কথায় শুনতে চাচ্ছি না নুহা। তুমি বাসায় ঢুকবে কি না….!
আর কোন কথা বাড়ায়নি নুহা। শুভর পিছুপিছু বাসায় ঢুকে পরে।

বিকেলে ড্রয়িংরুমে বসেছিল নুহা। ভদ্রমহিলার প্রতি সকালে শুভর আচরণটা কেন জানি অদ্ভুত ঠেকছিল নুহার কাছে। আর তাই ডায়েরী হাতে ভদ্র মহিলার সম্পর্কে দু’কলম লিখার চেষ্টা করছে-
” আটসাট গড়ন। লম্বা টিকালো নাক। কথা বলত কাটা কাটা। খুব চটপটে। বয়স হয়েছিল ঢের। কিন্তু বয়সের ছাপ ছিল না…!”

পুরো ঘটনা লিখতে পারেনি নুহা। তার আগেই দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হয়। কিচেন থেকে হিয়া আন্টির গলার স্বর ভেসে আসে।
” আদিরা! দেখতো মা কে এসেছে….?”

নুহা দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খুলে। স্তব্ধ নুহা দরজার ওপাশের মানুষটাকে দেখে যেন কথা বলার শক্তি হারিয়েছে। কোন কথায় ওর মুখ থেকে বের হচ্ছে না। ড্রয়িংরুম থেকে ভেসে আসে আঁখির গলা-
” কিরে? কে এসেছে….?”
ভয়ার্ত গলায় নুহার জবাব, ছেছেছেলে ধরা….

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here