ফুলশয্যা_সিজন(০৩) পর্ব- ০৬

ফুলশয্যা_সিজন(০৩)
পর্ব- ০৬
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

মোনাজাত শেষে নুহা কোরআন শরিফ নিয়ে। গুন গুন করে কুরআন তেলাওয়াত করা শুরু করে সে।পাশে বসা ছোট্ট আদনান মিনিট পাঁচেক চুপ করে ছিল। মুখ খুলে এবার। নুহার মতই গুন গুন করে কিছু একটা বলার চেষ্টা করছে সে। সে আওয়াজ শুনে চোখ তোলে তাকায় নুহা। আদনানকে দেখেই স্মিতহাস্য নুহা পবিত্র কোরআন বন্ধ করে দেয়। কোরআন শরিফের গায়ে চুমু খেয়ে সেটা যথা স্থানে রেখে আদনানের গালেও একটা চুমু খায়। জায়নামাজটা যথা স্থানে রেখে কোলে তুলে নেয় আদনানকে। দরজার দিকে এগুতেই থমকে যায় সে। দরজার পর্দাটা আংশিক ফাঁক করে একজোড়া চোখ ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। চক্ষু দুইটা কার সেটা চিনে নিতে খুব বেশী কষ্ট পেতে হয়নি নুহার। আর তাই দ্রুত চোখ সরিয়ে নেয় সে।

প্রচন্ড ভয়ে নুহা যখন ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে, কিচ্ছু না বলে শুভ তখন সে স্থান ত্যাগ করে।

দুপুরে খাওয়ার পর সবকিছু গুছিয়ে রান্নার দাদীমা যখন চলে যায় তখনই আদনান মারফত শুভ নুহাকে ডাক পাঠায়। আদনান নুহার কাছে খবরটা এভাবে পৌঁছায় – “আমু (আম্মু) বাবাই যাইতা। আমু (আম্মু) বাবাই যাইতা।”
হেসে দেয় নুহা। বাবা! আমার নাম নুহা। আমাকে তুমি আন্টি ডাকবা।
‘ ই- তুমি আন্নি না। তুমি আমু(আম্মু)। তুমি আমু(আম্মু)। তুমি আমু(আম্মু)। তুমি আমু(আম্মু)
গম্ভীর গলায় নুহা জানায়, না বাবা! আমি তোমার আন্টি হই। আমাকে তুমি আন্টি ডাকবা। আন্টি। শুনোনি, তোমার বাবাই কাল কি বলেছে? বলেছে আমায় আন্টি ডাকার জন্য। আমায় আন্টি না ডাকলে ওনি বকবে তোমায়….!
‘ তুমি আন্নি না। তুমি আমু। তুমি আন্নি না, আমু।’

উফ্….. ব্যর্থ নুহা একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। আদনানের একটা হাত ধরে সে। ‘ ঠিক আছে, ডেকো।’
এবার চলো তো। দেখে আসি কে ডাকে?

রুম থেকে বের হতেই শুভর মুখোমুখি হয়।
দাঁড়িয়ে পড়ে নুহা। রাগান্বিত দৃষ্টিতে শুভ তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ভয়ে ভয়ে নুহা শুভকে সালাম দেয়, আসসালামু আলাইকুম….
প্রতি উত্তরে শুভর জবাব ছিল, সমস্যা কোথায় তোমার? কি চাও তুমি?
কিছুটা অবাক হয় নুহা। উত্তরে জানায়, কই? আমার তো কোনো সমস্যা নেই…!
” ওহ, হ্যা! তাইতো… তোমার তো কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা তো আমার। আর সেই সমস্যা সমাধানের জন্যই তোমার কাছে আসা।”

জিজ্ঞাসো দৃষ্টিতে নুহা ফিরে তাকায় শুভর দিকে।
অনেকটা আক্রোশের সাথে শুভর জবাব, অনুগ্রহ করে আদনানকে কোল থেকে নামাও। ওর ঘুমের সময় হয়েছে, আমি এখন ওকে ঘুম পাড়াবো।
নুহা আদনানকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। ছুঁ মারার ন্যায় তখনি শুভ আদনানকে কোলে তুলে সে স্থান ত্যাগ করে।

এক রাতের ঘটনা_
খাইয়ে দাইয়ে আদনানকে ঘুম পাড়িয়েছিল শুভ। মাঝ রাত্রে ঘুম ভেঙ্গে যায় আদনানের। চিৎকার করে বিছানায় উঠে বসে। ঘুম ভেঙ্গে যায় শুভর। কোলে তুলে নেয় ছেলে আদনানকে। পুরো রুম জোড়ে ঘুরতে থাকে আর কান্না থামানোর বৃথা চেষ্টা করে সে। কান্না থামার পরিবর্তে দ্বিগুন বেড়ে যায় আদনানের। কোল থেকে নামিয়ে বিছানায় বসায় শুভ আদনানকে। বাজার থেকে কিনে আনা ডিম আর ফলমূল সামনে রাখে। এতেও কান্না থামানো যাচ্ছে না। কান্নার শব্দ আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে। পাশের রুম থেকে ছুটে আসে শুভর ফুপ্পি হিয়া। কোলে তুলে নেন ভাই পুত্রের ঘরের নাতি আদনানকে। জিজ্ঞেস করেন, ভাইয়া কি হয়েছে? কান্নায় নাক মুখের পানি একত্রিত হয়ে গেছে আদনানের। সেই অবস্থায়’ই বলতে থাকে সে, নু আমু যাম(নুহা আম্মুর কাছে যাব), নু আমু যাম, নু আমু যাম….
ছোট্ট আদনানের কথার আগা-গোড়া কিচ্ছু বুঝেনি হিয়া। ফিরে তাকায় শুভর দিকে।
শুভ পাল্টা প্রশ্ন করে ফুপ্পিকে, এটা কি কোন জায়গার নাম নাকি?
হেসে দেয় হিয়া। যা শুনাইলি না..! আঁখিকে ডাক।

ঘুম ঘুম চোখে আঁখি আসে। কোলে নেয় আদনানকে।
নাহ..! সেও পারছে না আদনানকে শান্ত করতে। শুভর কোলে দিয়ে ঢুলতে ঢুলতে রুমে চলে যায় আঁখি। যাওয়ার আগে বলে যায়- ভাইয়া, নু আমু আবার কোন দেশী খাবারের নাম? জীবনেও যা শুনিনি, সেই নাম গুলোই তোমার ছেলের মুখ থেকে শুনতেছি….

প্রচন্ড রাগে শুভ ছেলেকে বিছানায় ফেলে দেয়। বিছানায় পরে কান্নার মাত্রাটা আরো বেড়ে যায় আদনানের। পড়াশুনা+ডায়েরীতে লিখালিখি করে সদ্য ঘুমিয়েছিল নুহা। কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায় ওর। ছুটে আসে শুভর রুমে। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে কান্না করতেছে আদনান। তার পাশে শুভ এবং ওর ফুপ্পি বসা। কোনো কথা বার্তা ছাড়া’ই নুহা কোলে তুলে দেয় আদনানকে।
” কি হয়েছে বাবা…? কে মেরেছে তোমায়…?”

শান্ত হয়ে যায় আদনান। নুহা পিঠে হাত বুলাচ্ছে আর রুমের মধ্যে হাটাহাটি করছে। আদনান নুহার কাঁধে নাকের পানি, মুখের লালা ছেড়ে দিয়েছে। সেই মুহূর্তে কান্নাটা নেই ওর কিন্তু ফুপাচ্ছে।

নুহা আদনানকে খাটে বসায়। তারপর পরনের ওড়না দিয়েই আদনানের নাক মুখ ভালো করে পরিষ্কার করে দেয়। পাশে রাখা ডিমটা হাতে নেয়। খোসা ছাড়িয়ে সেটা আদনানের হাতে তুলে দেয়। আদনান কামড়ে কামড়ে ডিম খেতে থাকে। খাওয়া শেষে নুহার দিকে ফিরে তাকায়। বলতে থাকে-
‘আমু কোলো, আমু কোলো।
আবারো কোলে তুলে নেয় নুহা আদনানকে। কাঁধে মাথাটা শুইয়ে দিয়ে পিঠে হাত বুলাতে থাকে। ঘুমিয়ে পরে আদনান। শুইয়ে দিয়ে নিজ রুমে চলে যায় নুহা।

ফুফু-ভাই পুত্র দু’জনেই অবাক দৃষ্টিতে দু’জনের দিকে তাকিয়ে আছে। যেখানে ওরা কিছুতেই কান্না থামাতে পারেনি, সেখানে এতটুকু পুচকে মেয়ে কি না খাইয়ে দাইয়ে ঘুম পাড়িয়েও চলে গেল। ভাবা যায়…!

সেদিনও রাত্রি আড়াইটা নাগাদ একই ভঙ্গিতে চিৎকার দিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠে আদনান। সেদিনও কান্নার শব্দে নুহা ছুটে আসে, কান্না থামায়, ঘুম পাড়ায়। বিছানায় শুয়ানোর সময় সাথে সাথে কান্না করে উঠে। সজাগ হয়ে যায়। চোখ মেলে তাকায়। জাপটে ধরে নুহাকে। আদো আদো বুলিতে বারংবার বলতে থাকে, আমু তোমা থাকু(আম্মু তোমার সাথে থাকব), আমু তোমা থাকু, আমু তোমা থাকু।
পাশ থেকে হিয়ার স্বামীর জবাব, যাও আদিরা! আদনানকে আজকে তোমার রুমেই থাকতে দাও।
এমনিতে ও তোমার ভক্ত। রাত্রে খাইয়ে দাইয়ে তোমার রুমে ঘুম পাড়ালে মাঝ রাত্রে আর সকলকে এভাবে হয়রানি হতে হয় না।
বাবার সাথে তাল মিলিয়ে মেয়ের জবাব-
হ্যা, বাবা! আমিও সেটাই বলছিলাম। নুহা তুমি বরং ওকে সাথে নিয়েই ঘুমিও।
ভয়ে ভয়ে শুভর দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে নুহা।
‘ আচ্ছা, আমি তবে এখন ওকে রুমে নিয়ে যাই….’

কিচ্ছু বলেনি শুভ। সবাই চলে গেলে নুহার রুমের জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায় সে। নুহা একটা বাচ্চা ইঁদুরকে সুতায় বেধে টানছে আর বাচ্চাদের মতো দৌঁড়াচ্ছে। তার পিছু পিছু দু’হাতে তালি দিয়ে হেসে কুটিকুটি হয়ে যাচ্ছে আদনান।

দুঃখের মাঝেও হেসে দেয় শুভ। দ্রুত রুমে চলে যায়। ফিরে আসে তিনটা ইঁদুর মারার যন্ত্র আর তিনটা পাকা কলা হাতে করে। রুমে এনে তিনটা যন্ত্রের ভিতরই কায়দা করে তিনটা কলা গেঁথে দেয়। ইঁদুর যখনই কলা যাওয়ার জন্য ভিতরে ঢুকবে তখনি মরন ফাঁদে আটকা পরবে। রুমে ইঁদুরের উৎপাত বেড়ে গেছে। সেই জন্যই মূলত এই ব্যবস্থা। যন্ত্র তিনটা সাবধানে তিন স্থানে রেখে রুম ত্যাগ করে শুভ।

রাত্রি শেষের দিকে ওয়াশরুমে গিয়েছিল শুভ। নুহার রুমের সামনে দিয়েই ফিরে আসছিল। আসার সময় কিছু একটার আওয়াজ শুনতে পায় সে। কি চলছে ভিতরে সেটা দেখার জন্য উঁকি দেয় খোলা জানালা দিয়ে। ‘থ’ হয়ে যায় শুভ। চোখ দুটো গোল মার্বেলের মত হয়ে যায় ওর।

” ইঁদুর মারার যন্ত্রগুলো বিছানায় রাখা। আর তার পাশেই বসে ভিতর থেকে কলা বের করে কুটকুট করে নুহা কলা খাচ্ছে…..’

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here