ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ২১

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ২১
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

আবির নীলিমার নরম অধরে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সেই মুহূর্তে নীলিমাকে একান্তভাবে পাবার ইচ্ছে জেগে উঠল মনে। বাতাসের শোঁ, শোঁ, বজ্রপাতের গুড়ুম গুড়ুম কোনো কিছুই এখন তার কানে যাচ্ছে না। এত তীব্র আকর্ষণ এর আগে আবির কোনোদিন অনুভব করে নি। কাঁধ থেকে খসে পড়ল আঁচলটা….

সকালে ব্রেকফাস্ট রেডি করছিল নীলিমা। এদিকে আবির ফ্রেশ হয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ডাক দেয় নীলিমাকে। “কোথায় গেলে? তাড়াতাড়ি রেডি হও। সকালের খাবার আর দুপুরের খাবার একসাথে না হয় নরসিংদী গিয়েই করো।”
ব্রেকফাস্ট রেডি করে আঁচলে হাত মুছতে মুছতে এগিয়ে আসে নীলিমা। মুখটা অমাবস্যার কালো অন্ধকারের ন্যায় করে রেখেছে। সেটা দেখে মৃদু হাসল আবির। ডায়াল করে শাশুড়ি মায়ের নাম। রিসিভ করে শ্যালিকা লিমা। আপনাদের বুঝার সুবিধার্থে ওদের কথোপকথনগুলো নিন্মে তুলে ধরা হলো-

আবির- আসসালামু আলাইকুম, মা…
লিমা- ওয়ালাইকুম আসসালাম ভাইয়া।
আবির- ওহ, লিমা? কেমন আছ?
লিমা- ভালো আর থাকলাম কোথায়?
আবির- মা কেমন আছে?
লিমা- কিছুটা ভালো। আপুকে নিয়ে কখন আসছেন?
আবির- আঁকাশ ঘোর কালো অন্ধকারে ঢেকে গেছে লিমা। যেকোনো মুহূর্তে বৃষ্টি শুরু হতে পারে। তাই বলছিলাম কি তোমরা চলে আসো লিমা।
লিমা- মানে কি ভাইয়া? আপু কি…..

পুরো কথা বলতে পারেনি লিমা। তার আগেই আবির রুম থেকে সরে বারান্দায় গিয়ে ফোনটা মুখের কাছে নিয়ে ফিসফিসিয়ে জবাব দেয়, বোন আমার। বেশী কথা বলো না। তাড়াতাড়ি রওয়ানা দিয়ে দাও তোমরা। আমি রাস্তা থেকে তোমাদের গিয়ে এগিয়ে নিয়ে আসব। এখন বেশী কথা বলা যাবে না। তোমরা আগে আসো, তারপর মজার ঘটনা বলব।
রাখলাম, বাই।

কল কেটে রুমে ফিরে আসে আবির। নীলিমা তখন কোমড়ে হাত দিয়ে রাগান্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। সেটা দেখেও না দেখার ভাব করে বিছানায় ফোনটা রাখতে রাখতে আবির বলে, খিদে পেয়েছে। খাবার দাও।
নিঃশব্দে নীলিমা খাবার দিয়ে রুমে চলে আসে। খাওয়া শেষে স্টাডিরুমে তাকাতেই আবির নীলিমাকে রেডি দেখতে পায়। চোখ কপালে তুলে প্রশ্ন করে আবির-
” সে কি? কোথায় যাচ্ছ তুমি?”
জবাব আসে, বাপের বাড়ি।
—- যেতে হবে না। আম্মাকে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে তো? লিমা, আম্মাকে নিয়ে রওয়ানা দিয়ে দিয়েছে মনে হয়। নীলিমা আর কথা বাড়ায়নি। চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে কিচেনে চলে যায়।

রাত্রি ৮টায় বাসায় পৌঁছে নীলিমার বোন ও মা। যদিও দুপুর ২টায় রওয়ানা দিয়েছিল কিন্তু রাস্তায় অত্যাধিক মাত্রায় জ্যামের কারনে আসতে এত দেরী হলো। মায়ের প্রতি অভিমান কিংবা রাগ যতই থাকুক না কেন মা আসবে এ খবর পাওয়ার পর থেকে বাহারি নানা ধরনের খাবার রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে নীলিমা। মা বোন বাসায় ঢুকতেই কি খাওয়াবে না খাওয়াবে সেসব কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ওরা ফ্রেশ হয়ে রুমে ঢুকতেই সামনে এনে দেয় ঠান্ডা পানিয় জাতীয় কিছু। বোনের এককথা,
” আপু! এখন শীতকাল। এ শরবত টরবত কেন আনছিস?”
নীলিমার পাল্টা জবাব, সারাদিন জার্নি করে এসেছিস। খেয়ে নে। ভালো লাগবে। নীলিমা যেন নাছোড়বান্দা। বাধ্য মা মেয়ে পানিয় জলটা পান করেই নেয়। তার কিছুক্ষণ পর সামনে আনে পায়েস। পায়েস খাওয়া শেষ হতে না হতেই ঝালমুখ করানোর জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ব্যস্ত হয়ে পড়ে সারাদিন ধরে রান্না করা সকল আইটেম পরিবেশনের। নীলিমা কিচেন থেকে খাবার বেড়ে দিচ্ছে আর আবির দৌঁড়ে দৌঁড়ে সেগুলো নিয়ে বিছানায় শ্যালিকা এবং শাশুড়ির সামনে রাখছে। ওদের এ হেন ব্যস্ততা দেখে হেসে দেয় নীলিমার বোন লিমা। টিপ্পনী কেটে বলে,
এমন ভাবে খাবার দিচ্ছেন, মনে হচ্ছে আমাদের চেয়ে বড় খাদক পৃথিবীতে আরেকটাও নেই। ক্ষাণিক হাসে আবির।
“তোমরা শুরু করো। আমরা দুজন পরে একসাথে খাবো।”

নীলিমার মায়ের মন খারাপ।
‘এতদিন পর মেয়ের জামাইয়ের বাড়ি আসলাম আর এখনো কি না মেয়ের মুখটা’ই দেখতে পেলাম না।’
অনেকটা আক্ষেপের সাথে অভিমান মিশ্রিত করে নীলিমার মায়ের কথাটা ছিল। আবির কিচেনে গিয়ে অনেকটা রাগান্বিত স্বরে বলে, এই তোমার আদব? মেহমান বাসায় আসছে ওদেরকে সালাম দিয়ে কুশল বিনিময় করবে না? নিশ্চুপ নীলিমা মাথা নিচু করে বলে, আমি তো ভাবছিলাম পরে বলব।
“পরে নয়, এখনি বলবা। ওরা বসে আছে খাবার মুখে না দিয়ে। এখনি মাকে সালাম করে কুশল বিনিময় করবা।”
আবির একহাতে কিচেন থেকে দুইটা প্লেট নিয়ে আরেক হাতে নীলিমাকে টানতে টানতে শাশুড়ি মায়ের সামনে উপস্থিত হয়। নীলিমা মাথা নিচু করে মাকে সালাম দেয়,
” আসসালামু আলাইকুম, মা।”
ফিরে তাকায় নীলিমার মা। মেয়েটা কিরকম শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সবই হয়েছে আমার বুঝার ভুলের জন্য। চোখে জল এসে যায় নীলিমার মায়ের। বহুকষ্টে সে জল আটকে মুখে হাসি এনে মেয়ের সালামের জবাব সরূপ বলে,
” ওয়ালাইকুম আসসালাম….”
তারপর মা মেয়ে দুজনেই চুপচাপ। আবির পাশ থেকে ধাক্কা দেয় নীলিমাকে।
“মাকে জিজ্ঞেস করো, কেমন আছে?” নীলিমা কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে,
মা আপনার শরীর ভালো তো?
নীলিমার মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে,
“আলহামদুলিল্লাহ, এখন ভালোই আছি। তো দাঁড়িয়ে আসিস কেন? জামাইকে নিয়ে বসে পর। রাত তো আর কম হয়নি।”
” জ্বি, আম্মা। আমরা বসছি বলেই আবির দুইটা চেয়ার টেনে একটাতে নীলিমাকে বসিয়ে তার পাশেরটাই বসে পরে।

সবাই খাওয়া শুরু করছে। নীলিমার মা ফ্যালফ্যাল করে নীলিমার হাতের আঙুলের দিকে তাকিয়ে আছেন। নীলিমাও যেন একটা বিব্রতিকর অবস্থায় পড়ে গেল। মায়ের সামনে না বসে থাকতে পারছে না বাম হাতে খাবার মুখে দিতে পারছে। ব্যাপারটা আবির লক্ষ করে। বিষয়টা ধামাচাপা দেয়ার জন্য নীলিমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে, তোমার না গতকাল হাত কেটে গেছে। এখন ভাত মাখবে কিভাবে? প্লেট রাখো। আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
………………………………..
কি হলো? হা, করো…!!!
নীলিমা কোনো কথা বাড়ায়নি। আবিরের কথা মতই হা করে। আবির নীলিমাকে খাইয়ে দিচ্ছে ফাঁকে ফাঁকে নিজেও মুখে দিচ্ছে। ওদের দিকে ঢ্যাবঢ্যাব করে তাকিয়েছিল নীলিমার মা। মুচকি হেসে পাশ থেকে ধাক্কা দেয় লিমা। ফিসফিসিয়ে বলে, কি হলো মা? ঐদিকে তাকিয়ে আছ কেন? খাও…..
চোখের জল মুছে নীলিমার মা খাওয়া শুরু করে।

কয়েকদিন পর সকালে__
সকালের খাবার রেডি করে সবাইকে খাইয়ে নিজেও খেতে বসছিল নীলিমা। তখনি গড়গড় করে বমি করে দেয়। পেটে এতক্ষণ ধরে যা ভাত দিয়েছিল সব বেরিয়ে আসে বমির সাথে। নীলিমা দৌঁড়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। ওয়াশরুমে আবির কলেজে যাবে বলে ফ্রেশ হচ্ছিল, নীলিমা আবিরের পায়ের উপর গড়গড় করে বমি ছেড়ে দেয়। বিরক্তিকর ভঙ্গিতে ভ্রু-কুঁচকে আবির পিছনের দিকে তাকায়। নীলিমাকে এ অবস্থায় দেখে সব বিরক্তি নিমিষেই উদাও হয়ে যায়। তাড়াতাড়ি নীলিমার কাছে গিয়ে নীলিমার মাথায় চেপে ধরে। নীলিমা বমি করতে করতে একসময় হাপিয়ে উঠে, ক্লান্ত হয়ে যায়। আবির নিজ হাত দিয়ে নীলিমার মুখ পরিষ্কার করে ডাক দেয় শ্যালিকা লিমাকে। দৌঁড়ে আসে নীলিমার ছোট বোন লিমা। আবিরের কথামতো একগ্লাস পানি এনে দেয়। নীলিমা গড় গড় করে কুলি করলে ওকে ধরে রুমে নিয়ে যায়।

” কলেজে যেতে হবে আমার। লিমা, তুমি একটু নীলিমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাও। আর হ্যাঁ, তোমরা আজকে যেতে পারবে না। নীলিমা তোমারও আজকে চেম্বারে যাওয়ার দরকার নেই। আর তোমরা কিন্তু যাচ্ছো না। নীলিমার কি হয় না হয়। তাই তোমরা কিছুদিন থাকবে।”
আবির লিমার হাতে একহাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে কলেজে চলে যায়।
” আপা চলো তো!
ডাক্তারের কাছে যেতে হবে।”
নীলিমা ওর বোনের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কিচেনে চলে যায়। সবকিছু গুছিয়ে রেডি হয়ে নেয় চেম্বারে যাওয়ার জন্য। ছুটে আসে লিমা।
” আপা, তোমায় যে ভাইয়া বলে গেছে আজকে চেম্বারে যেতে হবে না! তারপরও কেন যাচ্ছ?”

দ্যাখ, লিমা। বাঁধা দিস না। আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে। বমি আমার কয়েকদিন ধরেই হচ্ছে। আজকে হসপিটাল থেকে চেকআপ করে আসব নে। তুই একদম চিন্তা করিস না। মা নিচতলা থেকে ফিরলে মাকে পিঠা পায়েস দিস। আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে, আমি গেলাম। কথাগুলো বলেই নীলিমা চেম্বারে চলে যায়। বিকেলে ফেরার পথে দোকান থেকে টিউব কিনে আনে প্রেগন্যান্সি পরীক্ষা করার জন্য। পরদিন ঘুম থেকে উঠেই আগে পরীক্ষা করে নেয়। তার পরদিন বিকেলে চা তৈরি করার সময় টিউবটা কিচেনের জানালা দিয়ে ফেলে দিতে গেলে পেছন থেকে হাতটা ধরে ফেলে কেউ।
” কি হলো? পজিটিভ না নেগেটিভ?”
নীলিমা ফিরে তাকায়। স্মিতহাস্যে আবির দাঁড়িয়ে পিছনে।
” কি হলো? চুপ কেন?রিপোর্ট কি বলছে?”

লজ্জায় নীল হয়ে গেছে নীলিমা। মাথা নিচু করে বলে, জানি না। স্মিতহাস্যে জবাব দেয় আবির, কিন্তু আমি জানি। চমকে উঠে আবিরের মুখের দিকে তাকায় নীলিমা। “মানে?”
একটু কাশি দিয়ে নেয় আবির। তারপর সুরে সুরে বলে, আমি টিউবটা চুরি করে নিয়ে……. ফার্মেসীতে……গিয়ে……ছিলাম। বাদল ভাই বলল……..(…….)……???

পিছন থেকে লিমা বলে উঠে, কি বলল?
আবির চোখ বড় বড় করে পিছনে তাকায়। লিমা, তোমার কি কমন সেঞ্চ বলতে কিচ্ছু নেই। এমন সময়’ই আসতে হলো তোমার?
” স্যরি, ভাইয়া। আমি সত্যিই স্যরি।”
কথাটা বলে মাথা চুলকাতে চুলকাতে সে স্থান ত্যাগ করে লিমা। নীলিমা তখনো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। আবির আবারো সুরে সুরে বলা শুরু করে, বাদল ভাই…. বলে….ছে……. আমার…..বউ….টা……(……)…..???

“আপনার বউটা মা হতে চলেছে।”

নীলিমার মুখ থেকে কথাটা শুনে আবির চোখ বড় বড় নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমা অন্য দিকে তাকিয়ে বলে কথাটা এভাবে ঘুরিয়ে বলে লজ্জা না দিলেই কি নয়? চলে যাচ্ছিল নীলিমা, হাতটা ধরে ফেলে আবির।
” আমি যে কত্ত খুশি হয়েছি সেটা তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না নীলিমা। উফফ! আমার অনেকদিনের শখ ট্রিপল বেবির। এবার বুঝি ইচ্ছেটা পূরণ হতে চলেছে।”

কিহ?!!!
ট্রিপল বেবি মানে?
নীলিমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আবির। মানে আমার তিনটা বেবি হবে।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here