ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ২০

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ২০
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

একি করছ?!!!
দৌঁড়ে গিয়ে নীলিমার পাশে বসে আবির। ঠোঁট থেকে কাঁচগুলো সরিয়ে নিতেই আরো জোরে চেঁচিয়ে উঠে নীলিমা। “ওমাগো, জ্বাল।
মরে গেলাম গো, জ্বলে যাচ্ছে গো…..”
আবির ওর ময়লা হাতের দিকে তাকায়। হাতে তখনো হলুদ, মরিচের গোঁড়া লেগে আছে। দিগ্বিদিক শূন্য আবির তখনি নীলিমার ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। শুষে নেয় নীলিমার ঠোঁটের সবটুকু জ্বাল। কিছুক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিল নীলিমা। হুশ ফিরে যখন তখন আবির ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে উঠে দাঁড়ায়।

তোমার ঠোঁটের কাটাস্থানে অসাবধানতাবশত মরিচের গোড়া লেগে গিয়েছিল তাই, পুরো কথা বলতে পারে নি আবির। নীলিমা হাত উঁচু করে আবিরকে থামতে বলে। আবির থেমে যায়। রাগে হনহনিয়ে স্টাডিরুমে ঢুকে দরজা আটকে দেয় নীলিমা।

রান্না শেষে ভিঁজানো চাদর এবং কম্বল ধুয়ে ছাদে নিয়ে যায় আবির। এরই মাঝে নীলিমা ভাত নিয়ে খেতে বসে পরে। ছাদ থেকে ফিরে আবির আলমারি থেকে একটা নতুন চাদর বের করে বিছানা করে নেয়। বারান্দা থেকে বালিশ দুটো এনে ময়লা পরিষ্কার করে খাটে রাখে। খাটের নিচ থেকে কোলবালিশটা এনে খাটের একপাশে রাখে। সবশেষে ফ্রেশ হওয়ার জন্য ওয়াশরুমে ঢুকে।

আবির ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে আসে। ততক্ষণে নীলিমার খাওয়া শেষ। পরনে তোয়ালে চেঞ্জ করে নীলিমার দিকে তাকায়। ” ভালো’ই হলো খাওয়া দাওয়া সেরে নিয়েছেন। এবার রেডি হন। আমি আপনাকে নরসিংদী দিয়ে আসি।”

চলে যাচ্ছিল নীলিমা, আবিরের কথা শুনে থমকে দাঁড়ায়। চোখ বড় বড় করে তাকায়।
” এভাবে তাকিয়ে কেন আছেন? আমি কি বলছি বুঝতে পারেন নি? নাকি বাংলা বুঝেন না? আপনাকে আমি নরসিংদী আপনার গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যেতে চাচ্ছি, তাই দয়া করে রেডি হোন। কোনো কথা না বলে স্টাডিরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয় নীলিমা। অভিমানে গুমড়ে কেঁদে উঠে। লাঞ্চ সেরে আবির স্টাডিরুমের দরজায় নক করে। আবিরের শব্দ শুনেই হো, হো শব্দে অভিনয় করে কেঁদে উঠে নীলিমা।
” ওহ,মাগো। মরে গেলাম গো। ব্যথা।”
ভড়কে যায় আবির। নীলিমার কান্নায় ভেতরটা মুচড় দিয়ে উঠে। নীলিমাকে দরজা খুলার জন্য একের পর এক দরজায় কড়াঘাত করছে আবির। কিন্তু ভুলে দরজা খুলছে না নীলিমা। যদি নরসিংদী নিয়ে রেখে আসে সেই ভয়ে দরজা খুলার সাহস পাচ্ছে না।

অনেকক্ষণ পর দরজা খুলে নীলিমা। আবির তখনো দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। নীলিমা হন্যে হয়ে রুমে ঢুকে আবির।
” কি হয়েছে নীলিমা? কোথায় ব্যথা করছে? খুব ব্যথা করছে? এটা সেটা আরো কত কি।” আবিরের কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি নীলিমা। শুধু গাল থেকে আবিরের দু’হাত ছাড়িয়ে দিয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পরে। আবির বিছানার পাশে বসে কিছুক্ষণ নীলিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, তারপর ঘুমানোর কথা বলে চলে আসে।

রাত্রের খাবার শেষে স্টাডিরুমে চলে যায়।
স্টাডিরুমের দরজা আংশিক মিশিয়ে শুয়ে পরে নীলিমা।
একি?! ওনি আজকে আমাকে এ রুম থেকে নিচ্ছেন না কেন? তবে কি ওনি সকালের ঘটনায় সত্যি সত্যি রেগে গেছেন? ওনি কি সত্যি সত্যি আমায় নরসিংদী রেখে আসবেন? না, না। এ হতে পারে না। শুয়া থেকে উঠে বসে নীলিমা।
আস্তে আস্তে দরজা ফাঁকা করে আবিরের রুমের দিকে উঁকি দেয়। কপালে হাত দিয়ে আনমনে কি যেন ভাবছে আবির।

যাই,
কাছে গিয়ে শুই,
আমার কারণেই তো এরকম করছেন আজকে। আমি’ই গিয়ে রাগটা ভাঙায়।
নীলিমা স্টাডিরুমের দরজা মিশিয়ে আবিরের রুমে ঢুকে। আবির তখনো আনমনে ভেবেই চলছে। দরজাটা লক করে আবিরের গা ঘেষে শুইলে হুশ ফিরে আবিরের। ক্ষাণিকটা সরে আসে আবির। কিছুক্ষণ চুপ থাকে নীলিমা। তারপর আবারো আবিরের কাছে গিয়ে ওর উপরে একটা হাত উঠিয়ে দেয়। হাত সরিয়ে দেয় আবির। আবারো হাত রাখে নীলিমা, হাত সরিয়ে দেয় আবির। এবার একহাতে ভর দিয়ে মাথা উঁচু করে তাকায়। আবির তখন বিপরীতমুখী হয়ে শুয়ে। পিছন থেকে আবিরকে জড়িয়ে ধরে আবিরের গালে হাত রাখে নীলিমা। এবার অনেকটা ভ্রু কুঁচকে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে আবির নীলিমার হাতটা ছাড়িয়ে নীলিমার দিকে ফিরে তাকায়। মুখটা অমাবস্যার কালো অন্ধকারের ন্যায় কালো করে নীলিমা দুরে সরে যায়। আবিরের থেকে অনেকটা দুরত্ব রেখে মাঝখানে কোলবালিশ রেখে শুয়ে পরে নীলিমা। বাকি রাতের মধ্যে একবারও আবিরের কাছে ঘেষার চেষ্টা করেনি। তবে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজটা শুনেছে আবির। ভোরে টুংটাং আওয়াজে ঘুম ভাঙ্গে আবিরের। আবিরের জন্য রান্নাবান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে নীলিমা। খাওয়া দাওয়া মিস করেনি আবির, তবে নীলিমার সাথে কথাটা বলেনি। সারাদিনে একটা কথাও বলেনি। খাওয়া দাওয়া করেই বাইরে চলে যায় আবির। নামাজের টাইমে ফিরে আসে। ওজু করে আবার বাইরে চলে যায়।

কতভাবে নীলিমা আবিরের কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়েছে, কিন্তু নীলিমাকে পাত্তাই দেয়নি আবির। রাত্রে খাওয়া দাওয়া করে নিজ রুমে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল আবির। তখনি দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে নীলিমা। পরনে গোলাপী কালার শাঁড়ি, তার মিলিয়ে হাতে একগোছা চুড়ি, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক আর চোখে গাঢ় কালো কাজল।
ব্যস এটুকুই…..
চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে আবির শুধু একবার দরজার দিকে তাকিয়েছে, নীলিমাকে একনজর দেখে সাথে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে আবির। লাইটটা অফ করে কম্বলে মুখ ঢেকে শুয়ে পড়ে আবির। ভিতরটা ফেটে চৌচির হয়ে যায় নীলিমার। সবকিছু সহ্য করা গেলেও প্রিয় কারো অবহেলা সহ্য করা যায় না। নীলিমাও পারে নি। বাইরে প্রচন্ড বেগে ঝড় বইছে ঠিক তেমনি ভেতরটাও অজানা ঝড়ে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাচ্ছে। দৌঁড়ে স্টাডিরুমে চলে যায়। বিছানার মাঝখানে গিয়ে বসে নীলিমা। হাতের চুড়িগুলো একটা একটা করে খুলে ফেলে। খুলে ফেলে শাঁড়ির সাথে মিলিয়ে পরা কানের লম্বা লম্বা দুল আর গলার মালা। শাঁড়িটাও চেঞ্জ করতে হবে। আর শাঁড়িটা চেঞ্জ করার জন্য আঁচলটা সরিয়ে রাখে। ঠিক তখনি রুমে প্রবেশ করে আবির। পায়ের শব্দ পেয়ে আঁচল দিয়ে দ্রুত শরীর ঢেকে নিল নীলিমা। কিন্তু ততক্ষণে যা দেখার দেখে ফেলেছে আবির।

আবির টের পেল ওর সমস্ত রক্ত মাথায় উঠে যাচ্ছে। সে আস্তে করে গিয়ে বসল নীলিমার পাশে।
নীলিমা বলল, ‘ আমি বড্ড বেশী করে ফেলেছি, না?”
অবাক হলো আবির। হঠাৎ এ প্রশ্ন কেন?
নীলিমা তাকিয়ে রইল আবিরের দিকে। আপনি খুব ভালো মানুষ মি. আবির। আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। কাল আমি চলে যাব। তবে আপনাকে কোনোদিন ভুলতে পারব বলে মনে হয় না। দরজার দিকে পা বাড়াল নীলিমা, ঘুরে দাঁড়ালো আবার। গুড নাইট মি. আবির। দরজা বন্ধ করে চলে গেল নীলিমা।

আবির তাকালো নীলিমার দিকে।
” ও কি বলে গেল- কোন দিন ভুলতে পারবে না। মানে কি এ কথার?” নীলিমাকে ম্লান আর বিষণ্ন লাগল। উত্তর দিল,
‘জানি না আমি।’
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল দু’জনে। বাতাসের আর্তনাদ ছাড়া অন্য কোনো শব্দ নেই। আবির চেষ্টাকৃত হাসি দিল। বৃষ্টিতে ভিঁজবে? মাথা নাড়ল নীলিমা। ভিঁজবে না। চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াচ্ছে, ওর হাত ধরে ফেলল আবির।
” যেয়ো না। তুমি জানো এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করেছিলাম আমি। তোমার সাথে কথা বলতে চাই। তোমার মিষ্টি কন্ঠটা শুনতে চাই।”
আবির উঠে বাতি নিভিয়ে দিল। শুধু ড্রিম লাইটের মৃদু আলোয় আলোকিত হয়ে থাকল ঘর। আবির বসল নীলিমার গা ঘেঁষে।
” এখন আরো রোমান্টিক লাগছে না?”
আবির দু’হাত দিয়ে নীলিমার গাল স্পর্শ করে কথাটা বলল। হাতটা সরিয়ে দিল নীলিমা। ‘আমি ঘুমাবো।’ জবাব আসে, রাত তেমন বেশি হয়নি। বাহির ভিতর একসাথেই মাতাল হাওয়া বইছে। পরস্পরকে জেনে নেয়ার এই সুযোগটা হারাতে চাচ্ছি না।

এবারও আবিরের হাত দুটো সরিয়ে দিল নীলিমা। ‘ আমি যাই। সত্যি মি. আবির, আপনার সঙ্গে আমার থাকা সম্ভব নয়। এটা- এটা ঠিক না।’

মিস্টার বাদ দাও। আমাকে স্রেফ আবির বলে ডাকতে পারো না? আমি তো তোমার’ই বুড়ো। আর তাছাড়া বাহিরে ঝড় বইছে, ভিতরে আমরা দু’জন অন্ধকারে বসে আসি। ব্যাপারটা রোমাঞ্চকর লাগছে না তোমার কাছে? আমার কাছে তো রূপকথার মত মনে হচ্ছে।

আমি বুঝতে পারছি আবির। কিন্তু আমি আর এখানে থাকতে চাচ্ছি না। আমার ঘুম পাচ্ছে। নীলিমার মাথার পিছনে হাত চালিয়ে দিল আবির, ঝুঁকে এল ওর দিকে। ঘুম গোল্লায় যাক। একটা ঘন্টা অন্তত সময়টাকে স্থির করে দিতে পারো না? তোমাকে ভালোবাসি এই কথাটা আমাকে বলতে দাও। বলতে দাও এই কুৎসিত পৃথিবীতে তুমি’ই একমাত্র সুন্দর মানবী। তোমার সৌন্দর্যের কাছে ম্লান হয়ে গেছে ঝড়ের শক্তি। আমার দিকে তাকাও, নীলিমা। একটা ঘন্টার জন্য কি আমরা রূপকথার রাজ্য থেকে ঘুরে আসতে পারি না? সব ভুলে আমরা কি এক হতে পারি না? নীলিমাকে নিজের কাছে টেনে আনল আবির। রাগে কাঁপছে নীলিমা। কাঁপতে কাঁপতেই নিজেকে সমর্পণ করল আবিরের কাছে।

আবির নীলিমার নরম অধরে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। সেই মুহূর্তে নীলিমাকে একান্তভাবে পাবার ইচ্ছে জেগে উঠল মনে…..

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here