ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ০৭

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ০৭
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

যায় হোক!
পরদিনও আবির নীলিমাকে নিজ হাতে শাঁড়ি, চুড়ি পরিয়ে দিয়ে খোঁপায় বেলীর মালা গুজে দেয়। সকাল ১০টা নাগাদ আবির নীলিমাকে নিয়ে নীলিমাদের বাসায় পৌঁছে। কোনো রকম কুশল বিনিময় করেই আবিরকে আবারো রওয়ানা দিতে হয়। নীলিমাদের বাসা থেকে স্কুল খুব কাছেই। ৭মিনিটের পায়ে হাটা রাস্তা। গাঁড়ি নিয়ে যাওয়াতে দু’মিনিটও লাগেনি।

নীলিমার আসার পূর্বেই ওর বান্ধবীরা জমায়েত হয়ে গেছে স্কুলে। নীলিমাকে দেখে দুর থেকে একটা হাসি দেয় “তামান্না”। ও’ই প্রথম নীলিমা আসার খবরটা সবাইকে দেয়। খবর শুনে দৌঁড়ে আসে সবাই। এসেই জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয় একটা মেয়ে। আসলে অনেকগুলো দিন পর বান্ধবীকে পেয়েছে তো তাই হয়তো চোখে জল এসে গেছে। ইতোমধ্যে গাড়ির চারিপাশে ভিড় জমে গেছে। স্কুলের সবচেয়ে সেরা ছাত্রী, সবার প্রাণের “নীলি” এসেছে, সেই সংবাদ শুনে ক্লাস সেভেন, এইটের বাচ্চারাও ছুটে আসে। কেউ কেউ তো দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে আর বলছে- নীলি আপা আইছে, আমাগো নীলি আপা আইছে….. মুহূর্তেই পুরো স্কুল কোলাহলে ছেয়ে যায়। ভিড় ঠেলে কাছে আসেন গ্রন্থাকারের শামীমা মেম। সালাম দিয়ে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে পারেনি নীলিমা। তার আগেই মাথায় হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে গল্প জুড়ে দেন ওনি। আজ অনেকগুলো দিন পর স্নেহের “নীলিমা”কে পেয়ে কথার বলার মাঝখানে চোখের জল ছেড়ে দেন ওনি। নীলিমাকে ওর সহপাঠী বন্ধুরা একরকম টেনে মঞ্চের কাছে নিয়ে যায়। নীলিমা বান্ধবীদের সাথে হাসি, আনন্দ, গল্পে মত্ত হয়ে যায়। অদূরে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আবির ওর ছোট্ট ডানাকাটা পরীটার প্রাণখোলা হাসি দেখছে।

কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। প্রধান শিক্ষকের চোখ যায় মাঠের শেষ প্রান্তে পলাশ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি ও তার পাশের ভদ্রলোকটির দিকে।
প্রশ্ন করেন ওনি-
” কে ওনি?”
ছেলে- মেয়েরা নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমা উঠে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে প্রশ্নোত্তরে বলে, স্যার! ওনি আমার সাথে এসেছেন। প্রধান শিক্ষক এতক্ষণে বুঝতে পারেন আসল ঘটনা। দপ্তরীকে ডেকে কিছুটা ধমকের স্বরে বলেন, “স্কুলের অতিথিকে যদি এভাবে দাঁড়িয়েই থাকতে হয় তাহলে আপনারা কিসের জন্য?”
মাথা নিচু করে দপ্তরী হাফিজ উদ্দিন জনাব আবির সাহেবকে সসম্মানে অফিসে নিয়ে আসে। অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমে পবিত্র কুরআন থেকে তেলওয়াত করবে অত্র বিদ্যালয়ে গর্ভ, বিদায়ী ছাত্রী “নীলিমা”। ইংরেজী স্যারের মাইকে ঘোষনা শুনে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় নীলিমা। যদিও সবসময় ও’ই শুরু করে কুরআন তেলওয়াত থেকে, তবে আজকে কেমন জানি লাগছে। ইতোমধ্যে মাইকে আরো একবার নীলিমাকে ডাকা হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে নীলিমা ও,প্রান্তে অতিথি আসনে বসে থাকা আবিরের দিকে তাকায়। আবির মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে নীলিমাকে তেলওয়াত করতে বলে। নীলিমা মঞ্চে উঠে তেলওয়াত শুরু করে। তেলওয়াত শেষ করে সোজা মাথা নিচু করে নিচে নেমে আসে সে। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর আবিরের আসনের দিকে তাকায় নীলিমা। মুগ্ধ দৃষ্টিতে আবির তখনো নীলিমার দিকে তাকিয়ে। মানপত্র পাঠ শুরুর আগে শহীদদের স্মরণে এবার একটা দেশাত্মবোধ গান নিয়ে আসছেন আমাদের অত্র স্কুলের বিদায়ী ছাত্রী “নিলীমা”। নীলিমা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এমনিতে এখনো হার্টভিট দ্রুত উঠানামা করছে, এখন আবার গানও গাইতে হবে ওনার সামনে। না, না! পারব না। নীলিমা হাত দিয়ে স্যার’কে ওর নাম না বলার বিনীত অনুরোধ করে। স্যার আবারো ঘোষনা করেন, নীলিমাকে অনুরোধ করা হচ্ছে মঞ্চে আসার। বাধ্য নীলিমা মঞ্চে যায়। মাইক হাতে নিয়ে বামে আবিরের দিকে তাকায়। আবির হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে। নীলিমা গায়-
” যে মাটির বুকে
ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তি সেনা,
দেনা, তোরা দে….না…..
সে মাটি আমার অঙ্গে মাখিয়ে দেনা….”

সবাই করজোড়ে হাততালি দিয়ে নীলিমাকে অভিনন্দন জানায়। তারপর একে একে সকল কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়। সবাইকে মিষ্টি বিতরণ শেষে আলাদা করে পরীক্ষার্থীদের হাতে সুন্দর করে মিষ্টি প্যাক করে দেয়া হয়। অফিস কক্ষে আবিরকেও যথাসাধ্য অতিথীর মর্যাদা দেয়া হয়। সবাইকে সালাম দিয়ে এডমিট কার্ড নিয়ে বিদায় হয় আবির ও নীলিমা।

দেখতে দেখতে পরীক্ষা সন্নিকটে এসে যায়। আবির ওর কলেজ থেকে ৩দিনের ছুটি নিয়ে নীলিমাকে ওদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে পরীক্ষার যাবতীয় নিয়মকানুন সম্পর্কে বুঝিয়ে দিয়ে আসে। আসার আগে নীলিমার হাতে একটা ফোন দিয়ে আসে, যাতে করে জানতে পারে নীলিমা কখন কি করছে, কিভাবে পড়ছে? রাত্রিতে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে এবং শেষ রাত্রিতে কল দিয়ে ঘুম থেকে তুলে আবির নীলিমাকে পড়তে বসাতো।

পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট দেয়। আবিরের দেখাশুনা এবং নীলিমার মেধার জোড় ও আল্লাহর অশেষ রহমতে নীলিমা ভালো রেজাল্ট করে। পুরো বাংলাদেশ থেকে মেধাক্রমে নীলিমা প্রথম হয়।

নীলিমাকে আবির ওর কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়। নীলিমাও এ নিয়ে আর কোনো বাকবিতণ্ডায় যায় নি। কারণ, ও শুনেছে আবিরের কলেজটা খুব নামকরা। অনেক বছরের সুনাম ও গৌরব রয়েছে কলেজটির। কলেজের প্রথম দিন’ই মিশুক নীলিমা ফ্রেন্ডস জুটিয়ে ফেলে। হিয়া নীলিমার বেস্ট ফ্রেন্ড সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। হিয়া ছাড়াও নীলিমার আছে আরো ৪,৫জন বান্ধবী। এরা একেকজন একেক গ্রুপের হলেও এদের সাথে নীলিমার রয়েছে আন্তরিকতা। নীলিমা সাইন্সের স্টুডেন্ট। তাই শুধুমাত্র বাংলা এবং ইংরেজী ক্লাসের সময় নীলিমা ওদের সাথে একত্রে বসতে পারত, আড্ডা দিতে পারত।

সেদিন ছিল বোধবার…..
আবিরের বাংলা ক্লাস। নীলিমা ও তার কমার্সের কিছু বন্ধুরা কর্ণারে দুটো বেঞ্চে বসে। সেদিন হিয়া আসেনি বিধায় নীলিমা ওদের সাথেই আড্ডা জুড়ে দেয়। আড্ডা দেয়ার একপর্যায়ে নীলিমাকে একটা বান্ধবী প্রশ্ন করে, কিরে! তোর না বাচ্চা হবে? তো পরীক্ষা করেছিস? নীলিমা শুকনো মুখে উত্তর দেয়, স্যারকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। রিপোর্ট নেগেটিভ আসল। নীলিমার বান্ধবীরা জেনে গিয়েছিল নীলিমা সহজ-সরল, বোকা-সোকা একটা মেয়ে। তাই ওরা ওকে নিয়ে একটা মজা করতে চাইল। আর এক্ষেত্রে নীলিমার বড় দুর্বলতা “বাচ্চা”। সেদিন নীলিমার হাতে ওরা একটা ঔষধ ধরিয়ে দেয়। বলে দেয়-
“নীলি তোর বাচ্চা হবে যদি তুই স্যারের অজান্তে এই ঔষধটা স্যারের জন্য তৈরিকৃত স্যুপ কিংবা অন্য কিছুর সাথে মিশিয়ে খাইয়ে দিতে পারিস।” বান্ধবীদের কথা শুনে নীলিমার চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠল। লাফিয়ে উঠে বলল, সত্যি বলছিস তোরা? এটা খাইয়ে দিলেই হয়ে যাবে? ওরা হাসি আটকিয়ে বলল, হুম! হয়ে যাবে….. তুই গোপনে খাইয়ে দিস। আর হ্যাঁ, রাত্রে ঔষধ খাওয়ার পর স্যারের রিয়েকশনটা কিন্তু আমাদের বলতে হবে…! না বললে কিন্তু বাচ্চা হবে না বলে দিলাম… নীলিমা হেসে বলে, আরে! এ নিয়ে চিন্তা করিস না। আমি রাতেই ফোন করে জানাবো।

স্কুল ছুটি শেষে আবিরের সাথে বাসায় চলে যায় নীলিমা। নীলিমার খুশি আর দেখে কে? বাসায় আসার পর থেকে একা একা শুয়ে হাসছে নীলিমা। আবির কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে না। সন্ধ্যায় নামাজের বিছানায় বসে হাসি, কুরআন তেলওয়াত করা থেকে উঠে হাসি, পরতে বসে হাসি, টিভি দেখতে বসে হাসি, রুমে আবিরের সামনে বসে রাতের খাবার খেতে গিয়ে ভাত মুখে নিয়ে হাসি। হাসতে হাসতে নীলিমার নাক দিয়ে ভাত বেরিয়ে আসে। ওমাগো, ঝাল লাগছে, পানি, পানি বলে চিৎকার করতে থাকে নীলিমা। পরীক্ষার খাতা দেখছিল আবির। বসা থেকে উঠে পানি আনার জন্য খাবার টেবিলে রাখা পানির জগটা আনার জন্য জগে হাত দিতেই থমকে যায় আবির। জগের ঠিক পাশেই আবির পাউডার জাতীয় কিছু দেখতে পায়। ঐটা হাতে নিয়েই আবির রুমে যায়। আবিরের হাতে বান্ধবীদের দেয়া ঔষধটা দেখে ভয়ে চুপসে যায় নীলিমা। আবিরের বলার আগেই বসা থেকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পরে। ধমকের স্বরে প্রশ্ন করে আবির-
” কি এটা? কে দিয়েছে তোমাকে?”
নীলিমা কাঁপা গলায় জবাব দেয়,
স্যা স্যা স্যাস্যার….
আমার কোনো দোষ নেই। ওরা আমায় দিয়েছে।
ওরা কে? আর কি কারনে দিয়েছে? দ্বিগুন রেগে প্রশ্ন করে আবির। উত্তর দেয় নীলিমা- পপি, জোনাকি, ফাতেমা, ঝুমা… ওরা বলেছে আপনাকে এটা গোপনে স্যুপের সাথে খাইয়ে দিতে। তাহলে আপনি আমায় আদর করবেন। তবেই আমার বাচ্চা হবে।

রাগে কাঁপতে থাকে আবির। ভেবেছিল, বয়স বাড়ার সাথে সাথে ম্যাচিওরিটি’টা চলে আসবে, বুঝতে শিখবে নীলিমা। কিন্তু তার আর হলো কই? কলেজে উঠেও একের পর এক যা ঘটিয়ে চলছে আবিরের তাতে তো মাথা নষ্ট হওয়ার উপক্রম। অন্যদিন মাথা ঠান্ডা করলেও আজ আবির পারেনি নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে। তাইতো ঔষধ বাইরে ফেলে দিয়ে এসে নীলিমাকে ঝাঁঝালো গলায় কড়া কথা শুনিয়ে দেয়, সেই সাথে বলে দেই ওদের সাথে যেন আর কখনো না দেখি তোমাকে। নিশ্চুপ নীলিমা ভয়ে ভয়ে মাথা ঝাঁকায়।

পরদিন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেছে নীলিমা ওর ফ্রেন্ডদের। কিন্তু বাংলা ক্লাসের সময় ওরা ঝেঁকে বসে নীলিমার পাশে। কিরে রাতটা কেমন কাটলো? কিংবা কি হয়েছিলরে রাত্রে? একেকজনের একেক প্রশ্ন আর সেটা নিয়ে হাসাহাসি। নীলিমা উত্তরে কিছু বলার জন্য পিছনে ফিরতেই ক্লাসে আসে আবির। ক্লাসে ঢুকেই আবির নীলিমাকে পিছনে তাকানো অবস্থায় দেখতে পায়। রাগে ফুসতে থাকে আবির। এটা দেখে নীলিমার ভিতরটা কেঁপে উঠে। শুকিয়ে যায় গলা। আবির পড়া জিজ্ঞেস করলে সব গুলিয়ে ফেলে আবিরের লাল চোখ দেখে। বেঞ্চের উপর এক ঠ্যাংয়ে আবির নীলিমা ও তার পড়া না পারা বান্ধবীদের দাঁড় করিয়ে রাখে। প্রায় ১০মিনিট এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখছে, তবুও রাগ কমছিল না দেখে আবির সবগুলারে সামনে আনে। অতঃপর কান ধরে ১০০বার উঠাবসা করতে বসে। একবার কম হলে পরবর্তীতে দ্বিগুন শাস্তি এটা শুনে নীলিমা মনে মনে একদুই গুনতে থাকে আর উঠবস করতে থাকে।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here