ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব-০৩

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব-০৩
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

– আসলে পায়ের সাথে শাঁড়ি প্যাঁচ লাগছিল তো তাই বুঝতে পারিনি। মাফ করবেন।
আবির নীলিমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে মৃদু হেসে বলে উঠে, শাঁড়ির আর কি দোষ? মানুষের দেহের চেয়ে বড় তো দেখি শাঁড়ি।
ভীরু চোখে নীলিমা আবিরের দিকে তাকায়। আবিরের বুকের প্রশস্ত লোমগুলোর দিকে দৃষ্টি যায় নীলিমার।আবির কিছুটা লজ্জা পেয়ে সাথে সাথে অন্যদিকে ঘুরে যায়। ভ্যাবাচ্যাকা নীলিমা ভ্রু কুঁচকে বিষয়টা কি হয়েছে বুঝার চেষ্টা করছে।
“আমার তোয়ালে…..”
এতক্ষণে নীলিমা বুঝতে পারে আবিরের হঠাৎ এভাবে ঘুরে যাওয়ার কারন। কোনো কথা না বাড়িয়ে নীলিমা তোয়ালেটা রেখে চলে আসে ওখান থেকে।

শরীরটা মুছে শরীরে কোনো রকম তোয়ালে প্যাঁচিয়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে রুমে প্রবেশ করে আবির। দরজার ওপাশ থেকে ওহ মাগো করে বেরিয়ে আসে নীলিমা। নীলিমাকে কনুইয়ে হাত রেখে ফ্লোর থেকে উঠতে দেখে কিছুটা ভড়কে যায় আবির।
প্রশ্ন করে নীলিমাকে, আপনি? আপনি এখানে কি করে?
গাঁধা ফুলের মালা, দেয়ালের সাথে আটকানো। ঐটায় নামাতে গিয়েছিলাম। কাঁপা স্বরে কথাগুলো বলে নীলিমা আবিরের দিকে তাকায়। আবির দরজাটা ধাক্কা দিয়ে মিশিয়ে দেখে দরজার পাশে একটা বড় চেয়ার আর তার পাশে আদিবা আপুর বাচ্চার ছোট চেয়ার রাখা। সেগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করে আবির, তো এগুলো এখানে কেন? আদিত্যর চেয়ার এ রুমে কেন?
মাথা নিচু করে নখ চিমটাতে চিমটাতে নীলিমার জবাব, ২চেয়ার একসাথে করে উপরে উঠে মালাটা নামাতে চেয়েছিলাম।
আবির এতক্ষণে বুঝতে পারে নীলিমার ওমাগো করে ফ্লোর থেকে উঠার আসল কারন। স্মিতহাস্যে আবিরের জবাব, ঐটাতো উঁকি দিয়েই নাগাল পাওয়া যায়। তার জন্য এত চেয়ারের কি দরকার?
আমি তো আপনার মত বড় মানুষ না…!!! আপনি তো বড়, তাই আপনার উঁকি দিলেই চলবে।
গলা ছেড়ে হেসে দেয় আবির। মুখে হাসির রেখা নিয়েই প্রশ্ন করে, তাই বুঝি!
প্রশ্নোত্তরে “খেতে আসুন” বলেই নীলিমা রুম ছেড়ে পালায়।

রাত্রের ঘটনা_
বিকেলেই সব মেহমান বিদায় নিয়েছে। এই জন্য রাত্রে ঠিক কি পরিমাণ চালের ভাত রান্না করে তা জানার জন্য নীলিমা শাশুড়ির রুমে যায়। শাশুড়ি তখন স্টার জলসা, জি বাংলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। নীলিমাকে প্রবেশ করতে থেকে নাটকের সাউন্ডটা একটু কমিয়ে ফেলে। ধীর গলায় নীলিমা তার শাশুড়িকে ডাক দেয়। প্রশ্ন করে, মা! বলছি মেহমানরা সবাই তো চলে গেছে, বাসায় তো এখন কয়েকজন আছি, খুব বেশী ভাত লাগবে না মনে হয়। এখন কি পরিমাণ চালের ভাত রান্না করব? প্রশ্ন শুনে নীলিমার শাশুড়ি বন্ধ করে ফেলে টিভি। তারপর চিল্লানো শুরু করে। ওনার চিল্লানো শুনে কাজের মেয়েসহ ছুটে আসে আবিরের বাবা। এসে দেখে নীলিমাকে খুব তিক্ত কথা শুনাচ্ছে ওনার স্ত্রী। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য আবিরের বাবা নীলিমাকে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে’রে মা? উত্তরে নীলিমার শাশুড়ি যা বলে তা শুনে শ্বশুর, কাজের মেয়ে অবাক দৃষ্টিতে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। ওনার কথা বিশ্বাস করতে যেন ওদের কষ্ট হচ্ছে। হওয়ার’ই কথা। শাশুড়ির ভাষ্যমতে, নীলিমা ওর শাশুড়িকে নাকি বলেছে যে ওনার বাপের বাড়ির মানুষজন একটু বেশী খায়। এখন তো ওরা চলে গেছে, এখন কি পরিমাণ চালের ভাত রান্না করবে।
নীলিমার শ্বশুর কাজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, যা! তোর ভাবিরে নিয়ে যা। রান্না শুরু কর গিয়ে। আর কোনটায় কি পরিমাণ মসলা দিস সেটা ভালোভাবে দেখিয়ে তবেই রান্না করিস। মাথা নেড়ে নীলিমাকে নিয়ে রুম থেকে চলে যায় কাজের মেয়ে।
আদিবার মা এখনো সময় আছে চিন্তাধারা, মন-মানসিকতা পরিবর্তন করো। না হলে তোমায় পরে প্রস্তাতে হবে। ভুলে যেও না, তুমিও একজন মেয়ের মা। জবাবে কিচ্ছু বলেনি নীলিমার শাশুড়ি। শুধু মুখটা কালো করে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়।

রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষে সবাই সবার রুমে চলে গেলে ভয়ে ভয়ে নীলিমা আবিরের রুমের দিকে পা বাড়ায়। আবির বিছানায় চুপটি করে বসেছিল। নীলিমাকে দেখে কিছুটা নড়ে বসে।
” কি হলো? ঐখানে দাঁড়িয়ে কেন? আসেন।”
ধীর পায়ে নীলিমা রুমে প্রবেশ করে।
আবির বিছানায় আর নীলিমা সোফায় চুপটি করে বসে আছে। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। এভাবে মিনিট ত্রিশেক অতিবাহিত হওয়ার পর মুখ খুলে আবির বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলে, রাত তো অনেক হয়েছে। শুয়ে পরুন। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।
আবির বাইরে চলে গেলে নীলিমা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। খাট থেকে একটা বালিশ নিয়ে রুমের এককোণ ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে গুটিসুটি মেরে সেখানটায় শুয়ে পরে।
বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া শেষে রাত্রি সাড়ে এগারোটার দিকে বাসায় ফিরে আবির। দরজাটা ফাঁক করে রুমে ঢুকে আবির খাট ফাঁকা দেখতে পায়।
“ও কি তাহলে ঘুমায়নি এখনো?”
হয়তো বাথরুমে গেছে এটা ভেবেই আবির চুপটি করে বিছানার একপাশ খালি রেখে অন্যপাশে গিয়ে শুয়ে পরল। কিন্তু একি? আধ ঘন্টারও বেশী সময় হয়ে গেল, ও আসছে না কেন? বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আবির। বাথরুমে গিয়ে নীলিমাকে না পেয়ে চমকে যায়। এত রাত্রে কোথায় গেল তাহলে? বাসায় তো সবাই ঘুমিয়ে গেছে। নীলিমা, নীলিমা করে ডাকতে ডাকতে রুমে যায়। কোণায় কিছু একটা নড়ছে, কি ওখানে? আবিরের দৃষ্টি যায় রুমের এককোণে যেখানে নীলিমা গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। আবিরের ডাক শুনে শুয়া থেকে উঠে বসে নীলিমা। বাচ্চাদের মত চোখ কচলে আবিরের দিকে ফিরে তাকায় সে। ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে আবিরকে, কি হয়েছে?
আবির মাথা ঝাকিয়ে উত্তর দেয়- না, কিছু না! ওহ, বলে নীলিমা পূর্বের ন্যায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পরে।
আবির দাঁড়িয়ে থেকেই প্রশ্ন করে, ফ্লোরে শুয়ে আছেন কেন? প্রশ্ন শুনে, শুয়া থেকেই আবিরের দিকে তাকায় নীলিমা। ইতস্তত আবির বলে, না মানে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না তো ফ্লোরে ঘুমাতে?
তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে নীলিমার জবাব, আমার বাবার আপনাদের মত এত বড় বাড়ি নেই। আমাদের একটা ছোট্ট ঘর আছে। তার মাঝে বেড়া দেয়া। ঘরে একটাই মাত্র পুরনো চৌকি। বাবা, মা, আর ছোট্ট ভাইসহ আমরা ৫জন সেই চৌকিতেই ঘুমিয়েছি অনেক বছর। তার একটু বড় হতেই আমি আর লিমা ওনাদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। আমাদের জন্য ঘরের মাঝখানে বেড়া দিয়ে তার পাশে বিছানা করা হয়। সেই থেকে খেজুর পাতার চাটাই পেতে আমি আমার বোন মাটিতে ঘুমাতাম। সেই মেয়েকে আপনি অসুবিধের কথা বলছেন?
চুপ হয়ে যায় আবির। চোখের কোণে অশ্রুরা জড়ো হয়। লাইট’টা অফ করে চুপটি করে শুয়ে পরে আবির। কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে আবির। ওর কানের কাছে বার বার বন্ধুর বলা কথাগুলো প্রতিধ্বণিত হচ্ছে-
” বাবা-বোন-দুলাভাইয়ের সাথে রাগ, প্রথম রাতেই বউয়ের সাথে উঁচু গলায় কথা, ধমক, বালিশ ছুঁড়ে দেয়া এসবের কারন একটাই। আর সেটা হলো মেয়েটা কালো। তোর মনের মত নয়। আমরা বুঝে গেছিরে আবির, যতই মুখে বড় বড় কথা বলিস তুই ঠিক অন্য ৮,১০টা মানুষের মতই। ঘৃণা করিস কালোদের। বাঁকা দৃষ্টিতে দেখিস। শিক্ষিত হলেও তোর মন-মানসিকতা, চিন্তা-ধারা প্রাচীন কালের মানুষের মতই রয়ে গেছে আবির।”
আবির ভাবছে, সত্যি’ই কি আমার চিন্তাধারা এরকম? আমি কি সত্যি’ই ওর গায়ের রঙে অসন্তুষ্ট? না, না… এ হতে পারে না। যে আবির কলেজে শত, শত ছেলে মেয়েদের নৈতিকতার শিক্ষা দেয়, মানুষের মত মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়, সে আর যায় হোক অমানুষ হতে পারে না।
আচ্ছা, অমানুষ না হলে আমি ওকে কেন বউ হিসেবে মেনে নিতে পারছি না? ওর অপরাধ কোথায়? কি করেছে ও? কেন আমি ওকে দুরে সরিয়ে দিলাম? এর পিছনে কি কারণ? ওর বয়স নাকি গায়ের রঙ?
উত্তর খুঁজে না পেয়ে বিছানায় উঠে বসে আবির। লাইটটা জ্বালিয়ে ধীর পায়ে নীলিমার দিকে এগিয়ে যায়। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে গেছে। আর ঘুমোবে না? এটুকু মেয়ে হয়েও সারাটা দিন যেভাবে শুধু দৌঁড়িয়ে কাজ করছে, তাতে ক্লান্ত হওয়ার’ই কথা। মাথার বালিশ কনুইয়ের নিচে দিয়ে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে নীলিমা। বালিশ ঠিক করতে গিয়ে আবির দেখতে পায় নীলিমার কনুই কেমন কালো হয়ে আছে। মুহূর্তেই সকালের ঘটনার কথা মনে হয়ে যায়। একটা হাসি দিয়ে আবির নীলিমাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তারপর গায়ে চাঁদর টেনে দিয়ে, লাইটটা অফ করে চুপটি করে নীলিমার পাশে শুয়ে পরে।

সকালে ঘুম ভাঙলে নীলিমা নিজেকে খাটে আবিষ্কার করে। ভড়কে যায় আরো যখন পাশে শুয়ে থাকা আবিরের উপর ওর একটা পা আর একটা হাত উঠানো দেখে। আমি তাহলে ঘুমের ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে এখানে এসে পরলাম না তো? নিশ্চয় আমার পুরনো রোগ জেগে উঠেছে। ভয়ে নীলিমার বুক ধুকপুক করছে। দু’লাফে নীলিমা আবির জেগে উঠার আগে রুম ছেড়ে পালায়।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here