কৃষ্ণকলি পর্ব:- ১১

কৃষ্ণকলি
পর্ব:- ১১
লেখা- অনামিকা ইসলাম।.

এয়ারপোর্টে জনাব শফিক সাহেবকে রিসিভ করার জন্য একদিকে দাঁড়িয়ে আছেন বাঁধন ও তার পরিবার অন্যদিকে মায়ার বন্ধু শফিককে রিসিভ করার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন ডাক্তার নুসরাত। নুসরাত বাঁধন ও তার পরিবারের সাথে এয়ারপোর্টে এসেছে ঠিক’ই কিন্তু সেটা বাঁধনের বাবা শফিক সাহেবের জন্য নয়। নুসরাত এসেছে মায়ার ফেসবুক বন্ধু শফিককে রিসিভ করতে। ওনার জন্য অধির আগ্রহে এই কারণে অপেক্ষা করছেন যে, ওনি যেহেতু এই এলাকারই সেহেতু বিয়েটা ওনি ভাঙ্গতে পারবেন। নুসরাত জানত, শফিক সাহেব মায়ার খুব ভালো একজন বন্ধু। আর এও জানত, শফিক মায়া-বাঁধনের মিলনের সেতুবন্ধন হতে পারে।

দূরে দেখা যাচ্ছে একজন ভদ্রলোক কোর্ট কাঁধে হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে হাসোজ্জ্বল মুখে এদিকেই এগিয়ে আসছেন। দূর থেকে লোকটাকে কেমন চেনা চেনা লাগছে। মনে হচ্ছে এই মায়ার বন্ধু শফিক, তবে শিউর নয়। একটু কাছে আসতেই নুসরাতের সব কনফিউশন দুর হয়ে যায়। হ্যাঁ, ওর অনুমান’ই ঠিক। ইনিই শফিক সাহেব, মায়ার বন্ধু। অবশেষে তাহলে সব অপেক্ষার অবসান ঘটল। জনাব শফিক হাসোজ্জ্বল মুখে ওনার বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু নুসরাত সেটা না বুঝেই ওর হাতটা বাড়িয়ে দেয়_
Hi! I am Nusrat.
শফিক সাহেব নুসরাতের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেন-
Hlw! Nice too meet you…
প্রথম দিনেই হবু শ্বশুরের সাথে নুসরাতের এমন ব্যবহারে অবাক বাঁধন ও তার পরিবার। শফিক সাহেব সবার মুখের অবস্থা খেয়াল করে বলেন-
Oh, sorry…..
নুসরাত আসো তোমাকে আমার ফ্যামিলির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। কথাটা বলেই শফিক সাহেব ওনার বাবা, ভাই ও স্ত্রী ছেলে মেয়ের দিকে তাকালেন। নুসরাত এ হচ্ছে আমার ভাই রফিক, এ হচ্ছে আমার ছোট ভাই কফিল, এ আমার বাবা, এ আমার স্ত্রী শাহনাজ, এ আমার ছেলে বাঁধন, আর এ আমার ছোট্ট মেয়ে সুইটি।
নুসরাতের হাসোজ্জ্বল মুখ নিমিষেই কালো অন্ধকারের ন্যায় হয়ে গেল। নুসরাত মনে মনে ভাবছে, ওনার ছেলের বিয়ে আর আমি কি না ওনাকেই আনলাম বিয়ে ভাঙ্গাতে?
হায় আল্লাহ!
এ তুমি আমায় কোন পরিস্থিতির সম্মুখীন করলে? আমি এখন কি করব? শফিক সাহেব যদি এখন’ই সব বলে দেয়? এ মুখ আমি কোথায় লুকাবো???
এদিকে বাঁধন ও তার পরিবারের অবাক হওয়ার মাত্রাটা উত্তরোত্তর বেড়েই চলছে। বাঁধনের দাদা প্রশ্ন করেন বাঁধনের বাবাকে।
“শফিক! তুই কি নুসরাতকে আগে থেকেই চিনিস?”
নুসরাত না করতে যাবে আর আগেই হাসোজ্জ্বল মুখে গড়গড় করে বলা শুরু করে শফিক_
” বাবা! এ হচ্ছে নুসরাত। এর সাথে পরিচয় আমার ফেসবুকে ৬/৭বছর আগে। এর বিয়ে ঠিক হয়ছে। কিন্তু এ কিছুতেই বিয়েটা করবে না। এখন নুসরাত চাচ্ছে বিয়েটা যেকোনো মতে ভেঙ্গে দিতে। আর সেই বিয়ে ভাঙ্গার জন্য’ই আমার এখানে ছুটে আসা।”
উপস্থিত সকলে বাঁধনের বাবার কথায় চমকে উঠে। বাঁধনের বড় কাকা বলে উঠে, ভাই! তোর মাথা’টা যায়নি তো?!
বাঁধনের ছোট কাকা বলে উঠে, ভাইজান! কি বলছো তুমি? ভেবে বলছ তো?
সুইটি বলে উঠে, আব্বু! তুমি নুসরাত আপুর বিয়ে ভাঙ্গতে এসেছ?
সবশেষে বাঁধন প্রশ্ন করে, বাবা! তুমি আমার বিয়ে ভাঙ্গতে এসেছ?
বাঁধনের প্রশ্ন শুনে চমকে উঠে বাঁধনের বাবা। তোর বিয়ে মানে?
বাঁধনের মা প্রতিউত্তরে বলেন- তুমি যে মেয়ের বিয়ে ভাঙ্গতে এসেছ, সেই মেয়ের সাথেই বাঁধনের বিয়ের কথা বার্তা চলছে।
– কি?!!!
নুসরাত এই বাঁধনের সাথেই তোমার বিয়ে হচ্ছে?
বাঁধনের বাবার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহস এবং ক্ষমতা কোনোটাই নুসরাতের নেই।
নুসরাত শুধু মাথা নিচু করে নির্বাক দৃষ্টিতে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। নুসরাতের থেকে কোনো প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে প্রশ্ন করেন, বাঁধনের মাকে। জিজ্ঞেস করেন, শাহনাজ! এই মেয়ে কি তোমাদের সাথে একই বাসায় থাকে? বাঁধনের মাথা অস্ফুট স্বরে মাথা নাড়িয়ে বলে হ্যাঁ…..
বাঁধনের বাবা আবারো প্রশ্ন করেন- এই মেয়ের বান্ধবীও কি তোমাদের সাথেই থাকে? এবারো বাঁধনের মা হ্যাঁ সূচক জবাব দেন। কিছুক্ষণের জন্য বাঁধনের বাবা চুপসে যান। তারপর নিরবতা ভেঙ্গে বলেন-
Okey, fine.
এটা পাব্লিক প্লেস। এখানে বেশী কথা না বলাই Better. চলো, বাসায় চলো…..
বাঁধন এবং ওর পরিবারের সবাই নিঃশব্দে গাড়িতে উঠে বসে। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। নিরবতা ভাঙ্গে বাঁধনের দাদা। প্রশ্ন করে নুসরাতকে।
” বিয়েতে মত ছিল না বললেই পারতে। এভাবে অপমানের কোনো মানে ছিল কি?”
বাঁধনের দাদার প্রশ্নের পর পরই প্রশ্ন করে বাঁধনের মা_
” তোমাকে আমি মেয়ে মানতাম। সেই তুমি যে আমাকে এভাবে হেয় করবে কখনো কল্পনাতেও ভাবিনি।”
এবার মুখ খুলে বাঁধনের ছোট বোন সুইটি।
” আপু! এতগুলো মানুষের ভালোবাসার প্রতিদান যে তুমি এভাবে দিবে, কখনো সেটা বুঝতেই পারিনি।”
নুসরাত চুপ হয়ে আছে। কারো প্রশ্নের কোনো উত্তরই ও দিতে পারছে না। এদিকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে যাচ্ছে সবাই নুসরাতকে। শফিক সাহেব আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। গাড়িটা রাস্তার পাশে থামাতে বলে, মুখ খুলেন ওনি। মায়ার বাঁধনের ব্যাপারে একে সব ঘটনা খুলে বলেন ওনি। সেই প্রথম পরিচয় থেকে আজকের এ দিন পর্যন্ত সব। সব বলে অকপটে বলে দিলেন শফিক সাহেব ওনার পরিবারের সবার সামনে। সবার উৎসুক দৃষ্টি তখন বাঁধনের দিকে। বাঁধনের বাবা বললেন, কথা পরে হবে। আগে বাসায় চলো।
এই মুহূর্তে বাঁধনের পরিবারের সবার অবস্থান ড্রয়িংরুমে। ড্রয়িংরুমে একেকজন একেকরকম মোড করে বসে আছেন। সবাই নিরব। নিরবতা ভাঙ্গে বাঁধনের মা। বাঁধনের বাবার দিকে তাকিয়ে বলে-
” তার মানে বাঁধন কখনো মায়াকে দেখেনি?”
___ নাহ্! দেখেনি। কারণ- মায়া ছিল কালো। খুউব কালো। আর তাই সবসময় একটা ভয় ওকে তাড়িয়ে বেড়াত। আর সেটা হলো এমন কালো চেহারা নিয়ে বাঁধনের সামনে গেলে যদি বাঁধন ফিরিয়ে দেয় ওকে। হারিয়ে যায় যদি ভালোবাসার এই তীব্রতা’টুকু? তাই বোকা মেয়েটি বাঁধনের সামনে যেতে পারেনি। সিদ্ধান্ত নেয়, বাঁধনকে ও দুর থেকেই ভালোবেসে যাবে।
এটুকু বলেই চোখের জল ছেড়ে দেয় বাঁধনের বাবা।
বাঁধনের মা বাঁধনের কাছে ছুটে যায়। জিজ্ঞেস করে, বাঁধন! ওরা যা বলছে তা কি….. (……)….????
অশ্রুভেঁজা চোখে মাথাটা আংশিক নেড়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দেয় বাঁধন।
অশ্রুভেঁজা চোখ নিয়ে বসা থেকে উঠে পরে বাঁধনের মা। ছুটে যায় উপরে মায়ার রুমে। রুমে গিয়ে মুচড় দিয়ে উঠে বাঁধনের মায়ের ভেতরটা। পুরো রুম শূন্য। কোথাও মায়া নেই। এ রুম থেকে ও রুম, তারপর বাথরুম, কিচেন। সবশেষে ছাদ। কোথাও নেই মায়া। একটা বিকট চিৎকার দিয়ে ফ্লোরে বসে পরে বাঁধনের মা। বিলাপ করে বলে উঠে-
” এ তুই কি করলিরে মা? এভাবে আমাকে স্বার্থপর বানিয়ে চলে গেলি? আমি কি তোর একটুও আপন ছিলাম না?”

নিচ থেকে চিৎকার শুনে ছুটে আসে বাঁধনের পরিবারের সবাই। পুরো বাড়ি জুড়ে মায়ার কোনো অস্তিত্ব না থাকা, আর বাঁধনের মায়ের এমনভাবে কান্না করাতে সবাই বুঝে যায় মায়া আর এ বাড়িতে নেই। মায়া চলে গেছে। দুর- বহুদূর চলে গেছে। বাঁধন অকস্মাৎ দাঁড়ানো থেকে হাটুগেড়ে ফ্লোরে বসে পরে। জমিয়ে রাখা অশ্রুকণাগুলো বৃষ্টির ফোঁটা হয়ে ঝরঝর করে ঝরে পরে বাঁধনের চোখ থেকে। হায় আল্লাহ!
এতটা কাছে থাকা সত্ত্বেও আমি আমার ভালোবাসার মায়াপরীটাকে চিনে নিতে পারলাম না! এতটা অভাগা আমি….
যে গল্পের একটা সুন্দর পরিসমাপ্তি ঘটতে পারত, সেটা এভাবে শেষ হয়ে গেল???
আমার জীবন গল্পের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দিয়ে গেল ও….
এখানেই তবে শেষ হয়ে গেল আমার জীবন গল্পের?

নাহ! গল্প শেষ হয়নি।
যেখানে গল্পের শেষ হয়, কাহিনীর পরিসমাপ্তি ঘটে ঠিক সেখান থেকেই শুরু হয়েছে বাঁধনের জীবন। বাঁধন হৃদয়ের সমস্তটুকু আবেগ দিয়ে ভালোবাসত অচেনা মায়াকে। সেই ভালোবাসা এত সহজেই শেষ হয়ে যেতে পারে না। যদিও মুখে মায়ার প্রতি চরম আক্রোশ প্রকাশ করত, কিন্তু ভিতরে ভিতরে ঠিক’ই কাঁদত বাঁধন ওর হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা মায়ার জন্য। সেদিন রাত্রে বাঁধনের পরিবার নুসরাতের সহযোগীতায় বাঁধনকে সাথে নিয়ে উপস্থিত হয় মায়াদের বাসায়। মায়ার একমাত্র সৎ ভাই এবং ভাবি’ই ছিল তখন মায়ার একমাত্র অভিভাবক। তারা মায়ার ভাই-ভাবিদের কাছ থেকে এটা জেনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল যে মায়া এই বাড়িতেই আছে। সম্পর্কে মায়ার সৎ ভাই-ভাবি হলেও এদের আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ বাঁধনের পরিবার। ভদ্রতা, মার্জিত ও শালিনভাবে কথা বার্তা, আতিথিপেয়তা সবগুনেই অনন্যের দাবিদার এরা। বাঁধনের পরিবার সেদিন সবটা খুলে বলে মায়ার ভাই-ভাবিদের। আর এটাও বলে মায়ার- বাঁধনের মিলনে ওদের সাহায্যটাও খুব দরকার। মায়ার ভাই ভাবি আশ্বাস দেয় যে, আল্লাহ চাহেতো এদের দুজনের মিল হবেই…..

সদ্য নির্মিত বিশাল বড় এই বাড়িটিতে মায়ার ভাই ভাবি একা একাই থাকত। আজ এতগুলো মানুষকে একসাথে পেয়ে আনন্দে চোখে জল এসে গেল মায়ার ভাই-ভাবির। সবাই যখন হাসি আনন্দে মাতোয়ারা তখন চোখ কচলাতে কচলাতে উপর তলা থেকে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে মায়া। চোখ বোজেই প্রশ্ন করে- কি হয়েছে ভাবি? বাসায় এত হৈহুল্লুর কিসের? সবাই চুপসে গিয়ে মায়ার দিকে তাকালো। মায়া তখনো ঘুমে ঢুলুঢুলু। চোখ নিয়ে তাকাতেই পারছে না।
বাঁধনের বাবা সোফা থেকে উঠে এসে বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়ে আচমকা বলে উঠল-
” হৈহুল্লুর, নাচ-গান, আরো কত কি হবে।
মায়া বন্ধুর বিয়ে বলে কথা….!”

বন্ধু?!!!!
চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো মায়া…..

চলবে………

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here