বাস্তবতা পর্ব- ০১

বাস্তবতা
পর্ব- ০১

লেখা- অনামিকা ইসলাম।

আমি শিমুল। তাসনুভা তাবাসসুম ‘শিমুল’। তাসনুভা নামটা যে খুব বেশী খারাপ তা কিন্তু নয়। অথচ আশ্চর্য জনক হলেও এটাই সত্যি, শেষ কখন এই নামে কে বা কারা আমায় ডেকেছে সেটা আমার মনে নেই। আর ক’জন মানুষ’ই বা আমার নামটা জানে সেটা বলাও দুষ্কর। জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই শুনে এসেছি অসংখ্য ডাক। আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, আমার রিলেটিভ, ফ্রেন্ডস সার্কেল সর্বোপরি দূর দূরান্তের অসংখ্য মানুষ আমায় বিভিন্ন নামে ডাকে।
আমার আপন জ্যাঠাতো বোন যার যাদের সাথে আমাদের একই বাড়িতে বসবাস তিনি আমাকে ‘কালি’ বলে ডাকেন। আমার এলাকার মানুষ আমায় ‘কাইল্লাবি’ বলে ডাকে। এলাকার মানুষজনের কাছে আমি এই নামেই পরিচিত। আমার ফ্রেন্ডসরা আমায় ‘কালিতারা’ বলে ডাকে। ওদের সাথে কোথাও গেলে কিংবা কেউ যদি আমায় নাম জিজ্ঞেস করে তাহলে আমার বলার আগেই ওদের ডাক-
“এই কালিতারা, এদিকে আয়!”
আমি যখন স্কুল থেকে কোনো সাফল্যের সংবাদ নিয়ে বাসায় আসতাম তখন রাস্তা থেকেই উৎফুল্লের স্বরে চেঁচিয়ে আসতাম,
মা, মা! আমি প্রথম হয়েছি….
এলাকাবাসী খবরটা শুনত। শুনে তাচ্ছিল্যের স্বরে হেসে বলত, কালির আবার লেখাপড়া….
আমি ওদের প্রতিবাদের স্বরে বলতাম,
দেখুন! আমার নাম কালি নয়। আপনারা আমায় এ নামে ডাকবেন না। আমার একটা নাম আছে, সেই নামে ডাকবেন আমাকে।
আমার কথা শুনে ওদের হাসি হাসি দ্বিগুন পরিমাণে বেড়ে যেত।
সে হাসি অবজ্ঞার,
সে হাসি অবহেলার,
সে হাসি আমার কালো হয়ে জন্মানোর….
প্রচন্ড কষ্ট বুকে চেপে বাসায় এসে যখন মুখ থুবড়ে পরে ছিলাম, তখন’ই আমার বাবার ডাক। ” কাইল্লা’মা! কইরে তুই?”
বাবার ডাক শুনে মন আকাশে জমে থাকা মেঘগুলো বাষ্প হয়ে ঝরে পরে। চোখের’ই জল মুছে নিতাম আঁচলে। মনকে শান্ত্বনা দিতাম এই বলে, যেখানে নিজের বাবা এমন নামে ডাকে সেখানে ওরা তো ডাকবেই।
এভাবে অসংখ্য মানুষের অসংখ্য ডাকের ভীড়ে চাপা পড়ে যায় আমার সত্যিকারের নামটি। অন্তরালে চলে যায় আমার তাসনুভা তাবাসসুম ‘শিমুল’ নামটি।

নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে আমি তৃতীয়। আমার বড় আরো দুই ভাই আছে। আমি সবেমাত্র সেভেনে উঠেছি। অথচ এখনি আমার পরিবার বিয়ের জন্য উঠে পরে লেগেছে। একে তো গরিব ঘরে জন্ম, তারউপর গাঁয়ের রং কালো। বয়স হয়ে গেলে কে করবে বিয়ে? এই মনোভাব সামনে রেখে’ই ওরা আমার জন্য পাত্র দেখতে শুরু করে। নির্দিষ্ট দিনে ওরা আমায় দেখতে হাজির হয় আমাদের বাড়িতে। উঠোনে চেয়ার টেবিল গোল করে পেতে দেওয়া হয়। আমার এক ভাবি আমায় এনে দাঁড় করায় ওদের সামনে। সবসময় ক্লাসের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করা এই আমার দু’চোখ ভরা অনেক স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া করে অনেক বড় হওয়া। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু আমার সব স্বপ্ন, স্বপ্ন হয়েই রয়ে গেল। গায়ের রং কালো+ গরীব ঘরে জন্ম হওয়ায় আমি পারিনি কোনো প্রতিবাদ করতে। ওরা আমার মাথার ঘোমটা ফেলে, চুল খুলে, হেঁটে হাটিয়ে বিভিন্ন ভঙ্গিতে আমায় দেখতে লাগল। আমায় নামাজ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করল, তারপর হেঁটে রুমে যেতে বলল। রুমে গিয়ে চৌকির উপর উঠে জানালার ছিদ্র দিয়ে আমি ওদের দেখছিলাম আর কথাবার্তা শুনছিলাম। কথা শুনে মনে হলো এবারে বিয়েটা হয়ে যাবে। কারণ, আমার বাবা ভাইয়ের তখন এরকম হাসি ছিল যে হাসি মানুষ তখন’ই দেয় যখন তাদের কাঁধ থেকে বোজা নামে। সেদিন পুরোটা বিকেল পুকুরপাড়ের টঙের উপর উদাসীন দৃষ্টিতে বসে কাঁটিয়েছি।
মনটা ভিষণ খারাপ;
আমার জন্য পংখীরাজ ঘোড়ায় চড়ে কোনো রাজপুত্র আসেনি,
পড়ন্ত বিকেলে কারো হাতে হাত ধরে হাঁটতে পারিনি,
বৃষ্টিস্নাৎ সন্ধ্যায় প্রিয় কারো সাথে ভিঁজতে পারিনি,
কিংবা কোনো জোৎস্না রাতে কাছের মানুষটির কাঁধে মাথা রেখে পাশাপাশি বসে জোৎস্নাবিলাসও করতে পারিনি;
নাহ, এসব কোনো কারনেই আমার মন খারাপ না। আমার মন খারাপ কারন আমি কালো। সৃষ্টিকর্তা আমায় কালো করে এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছে।
সেদিন ঘটকের সাথে বাবা গিয়েছিল ঐ পাত্রের বাড়িতে। বাড়ি দেখে এসে খুশি খুশি ভাব নিয়ে জ্যাঠিমাকে বলতে লাগল_
” ভাবি! কইছিলাম যে বাড়ি তো দেইখ্যাইছি। বিরাট বড় বাড়ি। অনেক সম্পত্তি আছে। তয় ছেলে একটা বিয়ে করছিল, বউ গেছেগ্যা।”

ভ্রু কিঞ্চিৎ বাঁকা করে জ্যাঠিমার জবাব, ” পোলা মাইনষ্যের আবার খুইত আছে নাকি? বিয়া অইছে কি অইছে? দিয়া দেন বিয়া। এত ভালা ঘর আর পাইবেন না।”

আমার বাবা জেনেশুনে এক বিবাহিত পুরুষের সাথে তার অবিবাহিত, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মেয়ের বিয়ে দেয়। বিয়ের কয়দিন যেতে না যেতে’ই আমার উপর নেমে আসে অবর্ণনীয় নির্যাতন। শ্বশুর বাড়ির সবাই বিভিন্ন কৌশলে আমার উপর নির্যাতন করত। কখনো শারীরিক, কখনো বা মানসিক। আমি প্রতিবাদ করতে পারতাম না। প্রতিবাদ করতে গেলেই আমায় বলত, বাপের বাড়ি থেকে তিন লাখ টাকা আনতে। যা কিনা আমার পরিবারের পক্ষে অসম্ভব। আমি নিরবে সয়ে যেতে লাগলাম। আমার স্বামী (মিলন) দিনদুপুরে মদ খেয়ে এসে মাতলামি করত। আমায় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করত। কখনো বা আমার বাবা মা তুলে গালি দিত। আমি সয়ে যেতাম। সেসব কিছু মুখ বোজে সহ্য করে যেতাম।
কারণ- আমি কালো। সৃষ্টিকর্তা আমায় কালো করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। আর এটাই আমার সবচেয়ে বড় অপরাধ। কতদিন যে মেরে রক্তাক্ত করে টেনে হিঁচড়ে আমায় বাড়ির বাইরে ফেলে দিয়ে এসেছে তার কোনো হিসেব নেই। ঐ বাড়ির সবাই মনে প্রাণে চাইতো আমি যেন ঐ বাড়ি থেকে চিরবিদায় হয়ে যায়। কিন্তু আমি যেতাম না। আমার স্বামী আমায় বাড়ির পিছনে ফেলে আমায় অজস্র লাঠি, উষ্টা দিয়েছে। আমি চিৎকার করিনি। দাঁতে দাঁত চেঁপে কখনো গরুর খোয়ার, কখনো বা সামনে থাকা গাছকে জাপটে ধরে থাকতাম। ওরা আমায় মারতে মারতে ক্লান্ত হয়ে যখন বাড়িতে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিত, তখন আমি গরুর ঘরে গিয়ে আশ্রয় নিতাম। অজস্র রাত আমি আমার শ্বশুর বাড়ির গরুর ঘরে কাটিয়েছি।
চাইলেই পারতাম চলে যেতে। একেবারে বিদায় নিয়ে চলে যেতে। কিন্তু যায়নি। কারণ ছোট থেকে একটি কথা শুনেই বড় হয়েছি-
” বাঙ্গালি মেয়েদের বিয়ে নাকি জীবনে একবার’ই হয়…..”
তাই সবসময় মনকে এই বলে শান্ত্বনা দিতাম, দেখিনা আরেকটু সহ্য করে। সব ঠিকঠাক হয় কিনা….???
দিন অতিবাহিত হতে থাকে। কিন্তু ওরা কেউ আমাকে আমার অবস্থান থেকে নড়াতে পারিনি। তাই একদিন বাধ্য হয়ে আমার স্বামী আমায় নিয়ে আমার বাপের বাড়িতে যায়। বিয়ের পর প্রথম বাপের বাড়িতে যাওয়া। আমাকে দেখে খুশি হওয়ার পরিবর্তে সবার চোখে পানি ছিল সেদিন। জন্ম থেকে নাদুসনুদুস এই আমি মাত্র তিনমাসের ব্যবধানে শুকিয়ে কঙ্কাল প্রায়। সে রাত্রে কাউকে কিচ্ছু না বলে আমার স্বামী চুরের মত পালিয়ে যায়। তারপর একদিন, দু’দিন করে অতিবাহিত হয়ে যায় ১৫টি দিন। আমার স্বামী আর আমার খুঁজ নেয় না দেখে আমার বাবা কল করে। কল রিসিভ করে আমার শ্বশুর স্পষ্ট গলায় বলে-
” এমন কালো মেয়েকে নিয়ে আমরা চলতে পারব না।”

ওরা ডিভোর্স লেটার পাঠিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। কিন্তু তিনমাস অতিবাহিত হয়ে যাওয়ার পরও ওরা ডিভোর্স লেটার পাঠায় না। আমার পরিবারের লোকজন আমায় নিয়ে কোর্টে যায়। মামলা দায়ের করে আমার শ্বশুর বাড়ির বিরুদ্ধে। নারী নির্যাতনের মামলা করে ওদের নামে।
বাংলায় একটা প্রচলিত বাক্য আছে-
” টাকা কথা বলে।”
আইন বিক্রি হয়ে যায় টাকার কাছে। আমার শ্বশুর বাড়ির লোকজন ওদেরকে মোটা অঙ্কের টাকা দেয়। বন্ধ হয়ে যায় আইনের মুখ। ওরা উল্টো আমাদের শাসাতো। বাধ্য করল ডিভোর্স লেটার পাঠাতে। শুধুমাত্র গরীবের ঘরে জন্ম নেওয়ার কারনে আমি আমরা পাইনি সুষ্ঠু বিচার।

একে তো কালো মেয়ে তারউপর ডিভোর্সি। গার্মেন্টস, মিল, ফ্যাক্টরিতে যাওয়া ছাড়া কোনো জায়গা ছিল না। বাড়িতে ভাবিদের জ্বালাময়ী কথা আর সহ্য করতে পারছিলাম না। খালার সহযোগীতায় প্রাণ কোম্পানিতে চাকরী নিলাম। ভাড়া বাসায় থেকে আসা করতাম ওখানে।

পরিচয় হয় সোহেলের সাথে। আমার বিষণ্নতার সাথী হয় সে। অতীতের সমস্ত কিছু ও শুনে। আমার কষ্ট ওকে ভিষণ যন্ত্রণা দিত। আমার মন খারাপ, আমার বিষণ্নতা ও সহ্য করতে পারত না। আমায় বিভিন্ন ভাবে হাসানোর চেষ্টা করত। ও আমার খুব ভালো একজন বন্ধু হয়ে যায়।
২বছরের ব্যবধানে সে বন্ধুত্ব ভালোবাসায় রূপ নেয়। ভালোবেসে ফেলি সোহেলকে। প্রচন্ড রকম ভালোবেসে ফেলি।

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here