স্যারযখনস্বামীসিজন২ পার্ট_২৫

0
319

স্যারযখনস্বামীসিজন২
পার্ট_২৫
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

তমা- তাড়াতাড়ি করে বাবার রুমে ঢুকে গেলাম।রুমে গিয়ে দেখি বাবাকে ঘিরে সবাই কান্না করছে।দরজার নিচে হেলান দিয়ে বসে গেলাম।কি হয়ে গেল এটা!

বাবাকে আমার মনের কথা বলতে পারলাম না।আমার মামণির কি হবে?বাবা যে আর আমাদের মাঝে এই খবর জানার পর আমার মামণির কি হবে?এইসব কথা ভাবতেই বুকটা কেঁপে উঠছিল।

.
.

ফারিদ- কয়েকঘন্টার জার্নিতে তমার বাবার বাসায় আসলাম।আর বাসায় আসা মাত্র কান্নাকাটির আওয়াজ শুনলাম।এখানে আসার আগে যে ভয়ের আশঙ্কা করছিলাম সেটাই শেষ পর্যন্ত সত্য হয়ে দাঁড়াল।যে রুম থেকে কান্নার আওয়াজ আসছিল সেখানে দৌড়িয়ে গেলাম।আর দেখালাম তমা দরজার নিচে হেলান দিয়ে বসে আছে আর নিরবে অশ্রু ফেলছে।মেয়েটার কি কষ্ট হচ্ছে তা বুঝতে পারছি। ওকে মনের দিক দিয়ে স্বান্তনা দেওয়ার জন্য ওর কাছে কাছে গেলাম।ওকে অনেক কিছু বুঝাচ্ছি আমি কিন্তু ও আমার কথা না শুনে ওর বাবার মৃত লাশটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।ওর হুশ আনার জন্য ওকে কাঁধ ঝাকিয়ে কয়েকবার নাড়ালাম।এরপর ও আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেল।

.
.
ফারিদ- এখন কেমন লাগছে তোমার?

তমা- বাবা……!

ফারিদ- তমা প্লিজ শান্ত হও। এই অবস্থায় তোমার উত্তেজিত হওয়া চলবে না।প্লিজ লক্ষ্মীটা বুঝার চেষ্টা কর।

তমা- আপনি কথা কেন ঘুরাচ্ছেন?আগে বলুন আমার বাবা কোথায়?

ফারিদ- তোমার বাবাকে মাটি দিয়ে আসছি।

তমা- ……..

ফারিদ- আমি জানি তোমাকে না জানিয়ে কাজটা করা মোটেও উচিত হয় নাই।কিন্তু এতক্ষণ ধরে একটা মৃত লাশকে এইভাবে রাখা সম্ভবও না।তাই তাড়াতাড়ি করে কাজটা শেষ করতে হল।সেই ৭ ঘন্টা ধরে তুমি অজ্ঞান অবস্থায় ছিল।এমনিতেই তোমার এই অবস্থা, তার উপর আবার সারাদিন না খেয়ে অনেক টেনশন আর কষ্টের মধ্যে ছিলে তাই তোমার শরীরটা দুর্বল হয়ে যায়।দেখো তোমার হাতে স্যালাইন। ডাক্তার এসে স্যালাইন লাগিয়ে গেছে।প্লিজ আর কোন কিছু ভেবে নিজেকে কষ্ট দিও না।নাহলে তোমার বাবাও যে সেখানে শান্তি পাবে না।
.
.

তমা- ফারিদের বুকে মাথা রেখে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আমার আর কোন উপায় নেই।নিজের মনের কষ্টগুলো ফারিদকে বলতে পারছি না।বাকি সবাই যেমন কষ্ট পেলে নিজের ভিতরের অনুভূতিগুলো খোলা বইয়ের মত মেলে ধরে তার আপন মানুষকে বুঝায় যে তার কত কষ্ট হচ্ছে ঠিক তেমন ভাবে আমি নিজের মনের অনুভূতি, কথাগুলো বলতে পারছি না।মনের কথাগুলো মুখের মধ্যে আটকে আছে।এটাও আরেক কষ্ট আর জ্বালা।এই জীবনে হয়ত আর শান্তি নামক জিনিসটার আমার দেখা মিলবে না।হায়রে জীবন! এই ছোট জীবনে কত কি না দেখে আসলাম।আর এখনও হয়ত অনেক কিছু দেখার বাকি আছে।এখানেই কষ্ট দেখার শেষ হয়ত আমার কপালে নেই।না জানি আরো কত কি দেখে জীবনটা পাড়ি করতে হবে।

.
.
তমা- আপনি মামণিকে বাবার মৃত্যুর কথা জানিয়েছন?

ফারিদ- না এখনো জানায়নি।কিভাবে কথাটা বলব বুঝতে পারছি না।

তমা- ভালোই করেছন কিছু না বলে।আপনাকে কিছু বলতে হবে না।মামণিকে যা বলার আমি বলব।

ফারিদ- হুম।এটাই ঠিক হবে।



বাসায় এসে মামণিকে বাবার মৃত্যুর খবর জানালাম।কিন্ত এ খবর শুনার পর মামণিকে কাঁদতে দেখলাম না।

তমা- মামণি বাবা এই ডাইরিটা তোমাকে পড়তে বলেছে আর এইও বলেছে তুমি যাতে তাকে ক্ষমা করে দাও।

মেঘ- ……..

তমা- মামণি আমি বাবাকে তার ভুলের জন্য ক্ষমা করে দিয়েছি।তুমি কি পার না বাবার ভুলগুলো ক্ষমা করে দিতে?জানি তোমার খুব কষ্ট হবে কিন্তু তারপরও যে এখন এই দুনিয়ায় নেই তাকে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।

মেঘ- তোর বাবাকে আমি সেদিনি মাফ করে দিয়েছি যেদিন জানতে পেরেছি সে অসুস্থ।অসুস্থ শরীর নিয়ে সে আমার কাছে মাফ চেয়েছে তাই তাকে মাফ করে দিয়েছি।তমা জানিস,, তোর বাবা খুব ভালো মানুষ। তার কাছ থেকে আমি যে ভালোবাসা,যে শিক্ষা পেয়েছি তা আমার কাছে অনেক মূল্যবান।আমার জানামতে সে কখনো কোন ভুল কাজ করেনি।কিন্তু সংসার জীবনে চলমান অবস্থায় সে অনেক বড় একটা ভুল করে বসে।সেটা আসলে ভুল বললে ভুল হবে সে আমার সাথে অন্যায় আর অপরাধ করেছে। যার ক্ষমা কখনো হয় না।কিন্তু তার জন্য সে অনেকবছর ধরে কষ্ট পেয়েছে তার প্রায়শ্চিত্তও করেছে।আর এই প্রায়শ্চিত্তের আগুনে পুড়ে সে অসুস্থ হয়ে পড়েছে।মন থেকে বাঁচার ইচ্ছা হারিয়ে ফেলার কারণে সে অসুস্থতার দুহায় দিয়ে আমার আগেই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে।

তমা- ………

মেঘ- ওকে আমি মন থেকেই মাফ করে দিয়েছি।শুধু একটাই আফসোস আর কষ্ট রয়ে গেল ওকে শেষ দেখাটা দেখতে পারিনি।আজ কতটা বছর হয়ে গেল ওর মুখটা দেখি না।এতটাবছর পর এসে সেই প্রিয় মুখটা না দেখার যন্ত্রণাটা না আমি নিতে পারছি না।

তমা- মামণি প্লিজ তুমি কষ্ট পেয় না।জানই তো কেন বাবা তোমাকে দেখতে চাইনি।

মেঘ- হ্যা জানি।কিন্তু মনটা যে বড় অবুঝ।তমা সারাদিন তোর উপর দিয়ে অনেক ধখল গেছে যা রুমে গিয়ে বিশ্রাম নে।আর আমার এখন এই সময়ে একা থাকতে ইচ্ছা করছে কারো সাথে কথা বলতে ভালো লাগছে না।

তমা- মামণিকে এখন একা ছেড়ে দেওয়া উচিত এই কথাটা মনে করে সেখান থেকে আমি চলে আসলাম।
.
.

বাবার মৃত্যুর পর মামণিকে খুশি রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।কিন্তু মামণির মনের দিক দিয়ে কোন শান্তি আর সুখ ছিল না তাই বাবার মৃত্যুর কয়েকদিন পরই মামণি আমাদের ফেলে চলে যায় আরেক দুনিয়ায়।

একটার পর একটা কষ্ট পাওয়ার পর আমি অনেক ডিপ্রেশনে পড়ে যায়। দিন দিন শরীরের অবস্থা আমার খারাপ হতে থাকে।আমাকে নিয়ে ফারিদ অনেক দুশিন্তায় থাকে।ওকে এই দুশ্চিন্তায় আর রাখতে ইচ্ছা করছিল না।কিন্তু এই অবস্থা থেকে আমি বেরিয়েও আসতে পারছিলাম না। সংসার করার ইচ্ছাটাও আস্তে আস্তে দমে যাচ্ছে। ঘরের বউ হিসেবে যে কাজগুলো আমার করার কথা সেগুলো ফারিদ করে যাচ্ছে।
.
.
ফারিদ- এই মেয়ে শরীরের কি অবস্থা করেছ একটাবার দেখেছ?কেন তুমি বারবার ভুলে যাও তোমার এই অবস্থায় টেনশন নেওয়া একদম চলবে না।তুমি এখন একা না তোমার সাথে আমাদের সন্তানও আছে।তুমি নিজে কষ্ট পাচ্ছ আর আমাদের বাবুটাকে কষ্ট দিচ্ছ।প্লিজ নিজেকে সামলাতে শিখ তিলোত্তমা।এই দুনিয়ায় কেউ অমর নয়।

তমা- ……….

ফারিদ- একদিন না একদিন এই দুনিয়া ছেড়ে আমাদের সবাইকে যেতে হবে।আমরা আমাদের প্রিয় মানুষদের যত ভালোবাসি না কেন তাদের আটকে রাখার শক্তি বা ক্ষমতা আমাদের কারোর নেই।আমাদের মর্জিতে কোন কিছুই হয় না।

তমা- ………

ফারিদ- প্রত্যেকটাদিন এইরকম মুখ ভার করা চেহেরা দেখতে আমার মোটেও ভালো লাগে না।ভার্সিটি থেকে এসে তোমার যত্ন নেওয়া,ছোটবাচ্চাদের মতন বুঝিয়ে শুনিয়ে তোমাকে খাওয়ানো, ঘর গুছগাছ রাখা এইসব করা কত কষ্ট লাগে সেটা কি তুমি বুঝ না।এক কথা তোমাকে বুঝাতে আমি ক্লান্ত।আর পারছি না আমি এই অসহ্য প্যারা নিতে।প্রত্যেকটাদিন তোমার এই খামখেয়ালিপনা,একই বিষয় বুঝাতে বুঝাতে আমি সত্যিই অতিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। ধুত্তুরি আর ভালো লাগে না।এটা সংসার না ছাই……..।
.
.

ফারিদ- তমা ওর বাবাকে দেখার পর যেদিন ঢাকায় যায় সেদিনি আমি জানতে পারি আমার বউটা প্রেগন্যান্ট। একদিকে বাবা হওয়ার খুশি আর আরেকদিকে তমার বাবার অসুস্থতার কথা শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল।আর এইও বুঝে গিয়েছিলাম তমার বাবার দিনটা আজকে শেষ দিন।আমার বউটা এই অবস্থায় নিজেকে কিভাবে সামলাবে তা ভাবতেই মাথায় চিন্তা ভর করছিল। তাই দেরি না করেই ঢাকায় রওনা দিই।এরপর তমার বাবার মৃত্যু, কয়েকদিন পর তমার মার মৃত্যুতে মেয়েটা পুরো ভেঙ্গে পড়ে।ওকে সামলানো খুব কষ্টকর হয়ে দাঁড়ালো আমার জন্য।এত কিছু হওয়ার কারণে ওকে আমাদের বাবু আসার খুশির খবরটা দিতে পারিনি।তাই সময় করে একদিন এই খবরটা ওকে জানাই যে ও মা আর আমি বাবা হতে যাচ্ছি। এই খবরটা শুনে প্রথমদিকে ও খুশিতে আমাকে জড়িয়ে ধরে এরপর হঠাৎ জানি না কি কারণে ওর মনটা নিমিষেই খারাপ হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতিদিন ওকে খুশি রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু প্রতিবারই আমি ব্যর্থ হচ্ছি।দিনদিন ওর শরীরটাও খারাপ হয়ে যাচ্ছে। ওর সাথে ও আমাদের বাবুটাকেও কষ্ট দিচ্ছে যেটা সহ্য করার মতন না।আর আজকে ভার্সিটি থেকে এসে ঘরের সব কাজ শেষ করে দেখি ও মুখভার করে বসে আছে।ওকে আজকেও এত বুঝানোর পরে যখন দেখি ও মনমরা হয়ে আছে রাগটা তখন মাথায় উঠে যায়। ওর এই কষ্টটা দেখতে পারছিলাম না সাথে আমার বাবুরও তাই রাগে ওকে অনেক কিছু বলে ফেলেছি।যেটা করা সত্যিই অন্যায় হয়ে গেছে।এই অবস্থায় ওকে খুশি রাখা আমার কর্তব্য।কিন্তু সেটা না করে ওকে অনেক কথা শুনিয়ে ফেলেছি।তাই ওর কাছে মাফ চেয়ে নিব।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here