স্যার যখন স্বামী সিজন২ পার্ট_২৩

0
275

স্যার যখন স্বামী সিজন২
পার্ট_২৩
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

এরপরের দিন আমি আমার এই জঘন্যতম কাজের জন্য ওর কাছে গিয়ে একটাবারও সরি বলে নি।আসলে ওর কাছে কোন ভুল করলে আমি কখনোই ওকে সরি বলতাম না।আর সেদিনের এত বড় ভুলের পরও যদিউ সরি বলাটা আমার উচিত ছিল কিন্তু আমি তা পারিনি।

পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমি মেঘের কাছে সরি বলে মাফ না চেয়ে পুষ্পের কাছে চলে যাই। কারণ আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না এখন আমার কি করা উচিত।

পুষ্প- আচ্ছা তন্ময় আমি দেখতে কি বেশি খারাপ?

তন্ময়- না।

পুষ্প- আচ্ছা তুমি মেঘকে কেন বিয়ে করেছ বলতে পার?ওর গায়ের রঙয়ের সাথে আমার গায়ের রংয়ের তুলনা করলে দেখা যাবে আমিই ওর থেকে বেশি সুন্দর।শ্যামলা বর্ণের মেয়েকে পেলে শেষ পর্যন্ত বিয়ে করার জন্য।ইশ ওর আগে যদি তোমার সাথে আমার দেখা হত তাহলে ওর জায়গায় হয়ত আমিই তোমার বউ হতাম। তাছাড়া তোমাদের বিয়ের এতবছর হয়ে গেছে মেঘ এখনো কোন বাচ্চা তোমাকে দিতে পারেনি আর ভবিষ্যতে পারবেও না মনে হয়।বাচ্চা হলে অনেক আগেই হয়ে যেত।এর চেয়ে বরং আমাকে বিয়ে করে নিতে।সুন্দরী বউ সাথে বাচ্চা তুমি পেয়ে যেতে ।

.
.

পুষ্পের এই কথাগুলো কোন নতুন কথা নয়।সবসময় ঘুরিয়ে পেচিয়ে এই কথাগুলো বলে ও আমাকে বুঝাতে চাইত যে আমাকে ভালোবাসে।মেঘের চাইতে ও আমার জন্য বেশি উপযুক্ত।প্রথমদিকে ওর কথাগুলো সহ্য হত না কিন্তু অনেক কষ্টে সেগুলো সহ্য করে নিতাম।একদিন এই কথাগুলো শুনে অনেক রেগে ওকে অনেক কিছু বলি যার ফলে ও সুইসাইড করার চেষ্টা করে।তাই এরপর থেকে ভয়েও ওর সাথে আর রাগ করে কথা বলিনি।ওর প্রতি দুর্বলতাকে এড়ানোর জন্য ওর সাথে আমি চলাফেরা বন্ধ করে দিলেই ও আবার আগের মতন পাগলামি শুরু করে দেয়।এদিকে ওর মা বাবাও ওদের একমাত্র মেয়ে পুষ্পের পাগলামি দেখে আমার কাছে এসে কান্নাকাটি করে।কিন্তু ওদের মেয়ের কারণে পুষ্পের প্রতি আমার দুর্বলতা বাড়ার সাথেসাথে আমার সংসারটা ভাঙ্গুক তা আমি চাইনি।আবার পুষ্পের মা বাবাকেও না করতে পারছিলাম না তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই ওর সাথে আমাকে থাকতে হত ওকে সময় দিতে হত।

.
.

মেঘকে নিয়ে পুষ্পের প্রতিদিনের এই কথাগুলো শুনার পর এই বিষয় নিয়ে আমি অনেক টেনশনে পড়ে যাই। সত্যিইই কি মেঘ কোনদিন মা হতে পারবে না। তাহলে আমার বাবা হওয়ার ইচ্ছাটাও সারাজীবন অপূর্ণ থাকবে।পুষ্পের সাথে এতদিন চলাফেরা করাতে এতদিনে ও আমার মাথার ব্রেইন ভালোই ভাবে ওয়াশ করে ফেলেছে।আমি তন্ময় যে কিনা সবসময় কারো থেকে উপদেশ না নিয়ে বরং অন্যকে উপদেশ দিতাম আজ সে কিনাই অন্য কারোর উপদেশ মন দিয়ে শুনত।কারণ একটা বাচ্চার জন্য মেঘের সাথে সাথে আমিও অনেক ডিপ্রেশনে পড়ে যাই। আর ডিপ্রেশনের রোগীরা যাদের সাথে বেশি মিশে তাদের কথা অনুয়ায়ী চলে।কারণ তাদের কথা ডিপ্রেশন রোগীদের মগজে ভালোভাবে ঢুকে যায় যে এই কাজটা করলে তার জন্য ভালো হবে।
.
.

পুষ্পের সৌন্দর্য,ওর সাথে চলাফেরা করার কারণে আমার দুর্বলতা,আমার প্রতি ওর নির্ভরশীলতা আর ওর প্রতিদিনের একি রকম কথায় জানি না আমার কি হয়ে গিয়েছিল।আমি পাল্টে যেতে থাকি।আর এর ফলেই হঠাৎ করে পুষ্পের সাথে আমার অবৈধ সম্পর্ক গড়ে উঠে।এর কয়েকমাস পর পুষ্পের মা বাবা বাস এক্সিডেন্টে মারা যায়।এই দুঃসংবাদের কিছুদিন পরেই আমি পুষ্পের কাছ থেকে ভালো খবর পাই।আমি জানতে পারি পুষ্প প্রেগন্যান্ট।এই অবস্থায় ওকে একা ফেলে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। একদিকে ও আমার বাচ্চার মা হতে যাচ্ছে সেই আনন্দের কথা আরেকদিকে আমাদের এই অবৈধ সম্পর্কের কথা মেঘকে কিভাবে বলব তা ভাবতে পারছিলাম না।পরে দিয়ে পুষ্পের জোরাজুরিতে মেঘকে সবকিছু বলতে আমি বাধ্য হই।আর এইও বলে দিই ও যাতে আমার আর পুষ্পের জীবন থেকে একেবারে চলে যায়।সেদিন শুধু নিজের সুখের কথা ভেবে আমি এই নির্দয় কথাগুলো মেঘকে কিভাবে বলেছিলাম আমি নিজেও জানি না।সেদিন মেঘের মনের ভিতর দিয়ে কি ঝড় যাচ্ছিল তা বুঝার বিন্দুমাত্র চেষ্টাও আমি করেনি। খুব স্বার্থপর হয়ে গিয়েছিলাম সেদিন।আমার এই কথা শুনার পর মেঘ শুধু শেষ একটাই কথা বলেছিল তন্ময় তুমি এখন কাকে ভালোবাস?সেদিনের উত্তরে আমি এটাই বলেছিলাম আমি আমার বাচ্চার মা পুষ্পকে ভালোবাসি।এই কথা শুনার পর ও নিজের রুমে চলে যায়।

.
.

এরকিছুক্ষণ পর ও আমার কাছে এসে বলে, পারলে সময় করে এই চিঠিটা পরে নিও।জানি না তুমি বর্তমান সুখের মোহে পড়ার কারণে আমার এই চিঠি পড়ার সময় তোমার হয়ে উঠবে কিনা কিন্তু তাও যদি কখনো সময় হয়ে উঠে পড়ে নিও। ভেবেছিলাম আজকে তোমাকে আমি অনেক বড় একটা সারপ্রাইজ দিব।কিন্তু আমি সারপ্রাইজ দেওয়ার আগেই তুমিই আমাকে জীবনের সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ দিলে।সেদিনের সেই ঝগড়ার পর ভেবেছিলাম তোমার সাথে আর থাকব না।কিন্তু মেয়েরা বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে একবার পা রাখলে সেই বাড়ি তার জন্য আসল ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায়।অন্য কোথাও মেয়েদের যাওয়ার জায়গা থাকেনা।বলতে গেলে তাদের আশ্রিতের মতন জীবন কাটাতে হয়।তাই তোমার দেওয়া সব অপমান সহ্য করেও আমি এখানে পড়ে ছিলাম।কিন্তু আজ যখন শুনতে পারলাম তুমি আমার ভালোবাসাকে তুচ্ছ করে অন্য আরেকটা মেয়েকে আমার জায়গা দিয়ে দিয়েছ আর সেই মেয়েই তোমার বাচ্চার মা হতে চলেছে তখন তোমার সাথে একবাড়িতে থাকার কোন প্রশ্নই উঠে না।আমাকে যেতে না বললেও আমি নিজ থেকেই এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতাম। কারণ আজকের পর থেকে আমি জেনে গেছি আমার জন্য তোমার হৃদয়ে কিছুই নেই।এই মেয়ের মোহে পড়ে তুমি আমার ভালোবাসাকে আজকে যে পরিমাণ অপমান করেছে তার ফল তুমি পাবেই তন্ময় ।আর পুষ্প….. তোমার নজর অনেক আগে থেকেই খারাপ ছিল সেটা আমি পরে বুঝতে পেরেছি।আমার দামি জিনিসটার উপর তুমি বদনজর দিয়েছিলে।আমার প্রতি তন্ময়ের ভালোবাসা,কেয়ারিং আর আমাদের ভালোবাসার গল্প শুনে মনে মনে তুমি ঠিক করে নিয়েছিলে তন্ময় যদি তোমার হয়ে যায় তাহলে তুমিও ঠিক একিরকম ভালোবাসা আমার স্বামীর কাছ থেকে পাবে তাইতো জেনেশুনে সারাদিন নির্লজ্জের মতন আমার বাসায় এসে আমার স্বামীর সাথে বেশি সময় কাটাতে।আমার স্বামীর আজকের এই অবনতি হওয়ার পিছনে শুধু ওর একার হাত নেই তোমারও অনেক বড় হাত ছিল।কারণ এক হাতে কখনো তালি বাজে না সেটা তুমি ভালো করেই জানো।

.
.

তুমি তোমার রুপ,কথার ছলচাতুরী, আর আমার নামে অনেক নেগেটিভ কথা ওর মনে ঢুকিয়ে তুমি তন্ময়কে নিজের বশীভূত করেছ।তুমি একটা মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়ের সংসার ভাঙ্গার জন্য এমনভাবে উঠে পড়ে লেগেছিলে যে তন্ময়কে আমি এত বুঝানোর পরেও আমার ভালো কথা আমার স্বামীর মগজে ঢুকত না কিন্তু তোমার কুবুদ্ধিগুলো ওর মন আর মগজে বেশ ভালো করেই তা ঢুকেছে।তুমি শুধু আমার ভালোবাসাকে কেড়ে নাও নি তুমি আমার সাজানো সংসারটাও কেড়ে নিয়েছ।তোমরা দুইজনেই আমার কষ্টের অপরাধী। শাস্তিতো তোমরা পাবেই সেটা আজ কিংবা কাল।আমিও দেখতে চাই এই মোহ,সৌন্দর্য আর অবৈধ সম্পর্কের বাচ্চাটাকে নিয়ে তোমরা কতদিন সুখে থাকতে পার।

.
.

আমার সংসার থেকে মেঘ চলে যাওয়ার পর আমি বুঝলাম ও আমার কি ছিল।আমার সবসময়ের সব প্রয়োজনে ওকে আমি কাছে পেয়েছি, আমি কিছু বলার আগেই ও আমার সব প্রয়োজনের অভাব মিটিয়েছে। ওর এই অধিক ভালোবাসাটা আমাকে কখনো কোন কিছুর অভাব বুঝতে দেয়নি।কিন্তু ও যাওয়ার পর সেটা আমি পাইপাই করে বুঝতে পারলাম যে ও আমার কি ছিল।আমার থেকে দূরে চলে যাওয়ার পর থেকে ওকে খুব মনে পড়ত।ওর রেখে যাওয়া চিঠিটার কথা মনে পড়ল।পুরো বাড়ির সব জিনিস ঘেটেও আমি সেই চিঠি পাইনি।পরে ময়লার ঝুড়িতে গিয়ে দেখি সেখানে কিছু কাগজের টুকরা পড়ে আছে।এক এক করে সব কাগজের টুকরা একত্র করে দেখি এটা মেঘের সেই চিঠি। আমার রুম থেকে চিঠিটা এখানে কিভাবে এল তা বুঝতে পারলাম না।কাগজের টুকরাগুলো অনেক কষ্টে এক এক করে জোড়া লাগিয়ে চিঠিটা পড়লাম।

.
.

চিঠিটা পড়ে জানতে পারলাম মেঘ সাড়ে তিন মাসের প্রেগন্যান্ট ছিল।নিজের হাত দিয়ে আমি এই পর্যন্ত কি কি করে ফেললাম সেটা ভাবতেই পুরো পাগল পাগল লাগছিল।একটা বাচ্চার ডিপ্রেশনে ওর থেকে আমার দূরত্ব বাড়লেও ওর প্রতি আমার ভালোবাসাটা কখনো কমেনি সেটা ও এখান থেকে যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম।আসলে ওই সময় আমার শক্ত হাতে সবকিছু সামাল দেওয়ার দরকার ছিল।সব কিছু লিমিটের ভিতরে রাখা দরকার ছিল।পুষ্পের কারণে আমার সংসারটা যে ভাঙ্গবে সেটা মাথায় রেখে ওর অসুস্থতার চিন্তাটা বাদ দিয়ে আমাদের সংসারের ভালোটা সবার আগে আমার বুঝা উচিত ছিল ।যার কোনটাই আমি করতে পারিনি।পুষ্পকে অধিক প্রশয় দেয়াতে ও আমার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সঠিক সময়ে সঠিক কোঁপটা মেরে আমাকে ওর ফাঁদে ফেলল।আর আমিও ওর রুপের মোহে পড়ে, একটা বাচ্চার জন্য ওর সব কথা মেনে চলার কারণে আজ এই অবস্থায় আমাকে আর মেঘকে এসে দাঁড়াতে হল।

.
.

মেঘের ভালোবাসা পাওয়ার জন্য কি না কি করেছিলাম আমি। ৫টা বছর অপেক্ষার পর ওকে আমি পেয়েছিলাম এরপর ওকে বিয়ে করে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ওকে আপন করে নিয়েছি। আর সেই আমি সংসারের কয়েকটা বছরে বাচ্চা না হওয়ার কারণে এতটাই অধৈর্য হয়ে পড়েছিলাম কোনটা ভুল কোনটা সঠিক তা বুঝার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছি।এর সব কিছুর মূলে পুষ্প ছিল।ওর মতন মানুষিক রোগীর খারাপ সঙ্গে পড়ে আমি কোথা থেকে কি করে ফেললাম তা বুঝে উঠতে পারিনি।আমার প্রতিটা কাজই বলে দিচ্ছে পুষ্পের সাথে থেকে থেকে আমি নিজেও মানুষিক রোগী হয়ে পড়েছি।এরপর ওর প্রতি আমার প্রচন্ড রাগ হল।ওকে ঘুম থেকে উঠিয়ে ওর সাথে ঝগড়া শুরু করে দিই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here