ভালোবাসার নীল ডায়েরী

1
269

একে তো কাউকে চিনি না তার উপর এত হৈচৈ! বিরক্তি লাগছে এখন। সব দোষ মাইশা আপুর। বললাম আসবো না তবুও শাড়ি পরিয়ে নিয়ে আসলো!!

মাইশা আমার কাজিন। আর আজ মাইশা আপুর বেস্ট ফ্রেন্ড তামান্না আপুর গায়ে হলুদ। আমাকে ধরে বেধে নিয়ে এসেছে। এখন বোকার মত বসে আছি। আধ ঘন্টা ধরে বসে থাকার পর আপুর দেখা পেলাম।

– আপু কই ছিলা তুমি? আমার একটুও ভাল্লাগছে না। আমি বাসায় যাব।
– আর একটু পর ই যাব। আর একটু থাক প্লিজ।
– আচ্ছা, তবে আমি এখানে থাকবো না। আমাকে কোন একটা রুমে দিয়ে আসো।
– রুমে তো আরো মানুষ। এক কাজ কর তামান্না দের ছাদ টা অনেক সুন্দর তুই ওখানে যা।
– আচ্ছা।

আসলেই ছাদটা খুব সুন্দর। অনেক গাছ ও আছে। এতক্ষণে একটু ভালো লাগছে। দারিয়ে দারিয়ে আকাশ দেখছিলাম। অনেক তারা উঠছে।

– তারা গুনছেন?

ছেলে কন্ঠের আওয়াজ টা পেয়ে রীতিমতো কেপে উঠলাম। পিছনে ঘুরতেই দেখি সবুজ রঙের পাঞ্জাবি পড়া একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে।

– আরে আরে, আমি ভুত নই। এত চমকানোর কি আছে!?
– না মানে, ভেবেছিলাম এখানে কেউ নেই তাই…
– জ্বী ছিলাম না এই মাত্র আসলাম। আপনার পিছু পিছু।
– মানে?
– মানে, আমারও নিচে ভালো লাগছিলো না। তাই ছাদে চলে এলাম। আর আপনি আগে থেকেই জায়গা দখল করে নিলেন।
– আচ্ছা আপনি থাকতে পারেন আমি চলে যাচ্ছি।
– কেন আমাকে ভয় করছে?

ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকালাম।

– এমনি বললাম এভাবে তাকানোর কি আছে?
– কিছু না।
– অথৈ! আপনার নাম টা খুব সুন্দর।

ওনার মুখে নাম শুনে খুব অবাক হলাম সাথে একটুখানি ভয় ও পেলাম।

– আমার নাম জানলেন কি করে?
– আপনার বোন আপনাকে এই নামেই ডাকছিল তাই জেনেছি।
– ওহহ।
– ঘাবড়ানোর কিছু নেই একা একা দাড়িয়ে থাকার চেয়ে ভাবলাম একটু আলাপ করি।

নিচ থেকে একটা ছোট পিচ্চি এসে বললো, “মাইশা আপু তোমায় ডাকছে”
সামনে থাকা লোকটিকে কিছু না বলেই হাটা শুরু করলাম। আসলে এত ফর্মালিটি আমি দেখাতে পারি না। তবে ছেলেটা আমায় পিছনে থেকে ডাক দিল। ফিরে তাকাতেই বললো,

– আবার দেখা হবে আশা করি।

আমি মৃদু হেসে চলে এলাম।

বাসায় এসেই ঘুম। সকালে সবার আগে আমার ঘুম ভাঙলো। ফ্রেশ হয়ে দেখি রোহান পড়তে যাবে বলে রেডি হচ্ছে। ভাবলাম ওর সাথে যাই সকাল সকাল হাটা ও হয়ে যাবে। হালকা শীত তাই একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে পরলাম। সকাল টা খুব সুন্দর সাথে হালকা বাতাস টাও।

রোহান কে পৌঁছে দিয়ে ফিরছিলাম। হঠাৎ দেখি একজন হাত ইশারা করলো। এদিক ওদিক ঘুরে তাকালাম না এখানে আর কেউ নেই। ছেলেটা আমার দিকে আসছে। চেনা চেনা লাগছে। ওহহ! এটা তো সেই ছেলেটা।

– এক রাতে ই ভুলে গেলেন?
– না আসলে দূরে ছিলেন তাই চিনতে পারছিলাম না।
– ওহহ, তা এখন চিনতে পেরেছেন?
– জ্বী
– একা একা কি হাটতে বের হয়েছেন? দেখে তো মনে হচ্ছে না।
– না আমি রোহানের সাথে এসেছি। ও একা পড়তে যাচ্ছিলো তাই আমি পৌছে দিলাম।
– হুম দেখলাম।
– আপনি কি আমায় ফলো করছেন?
– হা হা হা! করলে ক্ষতি কি?
– সত্যি করে বলেন।
– আরে আমি এখানে আগেই এসেছি তাই আপনি যখন রোহানের সাথে যাচ্ছিলেন আমি দেখেছি।
– আচ্ছা, বিশ্বাস করলাম।

সেদিন বেশ কথা হয়েছিল। ছেলেটা খুব সুন্দর করে কথা বলে। সাজিয়ে গুছিয়ে যেটা আমার খুব ভালো লাগে। তাই বেশ কথা হয়েছিল তার সাথে।

সেদিনের পর থেকে তার সাথে আমার আর দেখা হয় নি। হওয়ার কথাও না কারণ বিয়ের অনুষ্ঠানে মাইশা আপু আমাকে নিতেই পারে নি। তার পরের দিন আমি বাড়িতে চলে আসি।

বছর খানেক পর আবার বেড়াতে এলাম। এখানে আসার পর থেকে কেন যেন তার কথা খুব মনে পড়ছে। এত কম আলাপ তবু এই একটা বছরে অনেকবার ই মনে করেছি। ভাবলাম এবার যদি দেখা হয় নাম জিজ্ঞেস করবো কারণ আমি তার নাম জানিনা। কিন্তু তার সাথে কেন দেখা হবে? নিজেকে প্রশ্ন করলাম কিন্তু উত্তর আমার জানা নেই। আমি যাওয়ার দুদিন পর তামান্না আপু আমাকে আর মাইশা আপুকে দাওয়াত করেছে। বিশেষ করে আমাকে নিয়ে যেতে বলছে।

আজ বাড়ি ঢুকতেই একটু অন্যরকম লাগলো। তামান্না আপু আলাদা করে ছাদে ডেকে নিয়ে গেলো আমায়। আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু ছাদে যেতেই সেদিন রাতের কথা মনে পড়ে গেলো। কেমন যেন লাগছিলো আমার। কষ্ট না অস্থিরতা না অন্যকিছু বুঝতে পারি নি। হঠাৎ আপু আমার হাতে একটা ডায়েরি দিয়ে বলল

– এটা আমার চাচাতো ভাই মুইনের ডায়েরি। পড়ে দেখ।

আমি অবাক হয়ে ডায়েরি টা দেখলাম। একরাশ কৌতুহল নিয়ে ডায়েরিটা খুলতেই চোখদুটো ঝাপসা হয়ে এলো। শেষের পাতাটা পরেই আমি দৌড়ে তামান্না আপুর কাছে গেলাম। আমাকে দেখে আপু বললো

– সেদিন ই মুইনের একসিডেন্ট হয় আর হসপিটালে নিতে নিতে ও মারা যায়।

ডায়েরি টা সেই সবুজ পাঞ্জাবি পড়া ছেলেটার ছিল, যার নাম মুইন। আর ডায়েরির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শুধু আমি ছিলাম। আমি যখন চলে আসি সে অনেক খোজাখুজির পর আমার ঠিকানা পায় আর আমার কাছে যাওয়ার পথে একসিডেন্ট এ মারা যায়।

ডায়েরিটা বুকে জড়িয়ে ছাদের সেই কোণে দারিয়ে আছি তবে আজ আকাশে কোন তারা নেই।

.

লেখকঃ হিমাদ্রিতা

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here