স্যারযখনস্বামী পার্ট_২৩

0
115

স্যারযখনস্বামী
পার্ট_২৩
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

বাবার বাসায় চলে আসলাম।মনটা ভালো নেই।
না জানি বাবা মার সাথে কি কথা বলে বেড়াচ্ছে। যদি ওদেরকে বলে দেয় উনার আর আমার ডির্ভোস হয়ে গেছে তাহলে……।আল্লাহ সত্যি সত্যি কি উনি ওদেরকে সব বলে দিয়েছেন।ভয়ে ঘাম ঝড়ছে আমার।
“কি ম্যাডাম এত কি ভাবছেন?”
“আপনি কি মা বাবাকে আমাদের ডির্ভোসের কথা…..”
“মেঘ just relaxed.এইসব নিয়ে তোমার না ভাবলেও চলবে। তোমার মা বাবাকে এখনি কিছু বলতে হবে না।যা বলার আমি বলবো। সেটা সময় আসলে।বুঝতে পারছ।”
উনার সব কথা আমার মাথার উপর দিয়ে গেল।কিছু বুঝলাম না।
.
.
১ মাস পর আমি নিজেই মা বাবাকে আমাদের ডির্ভোসের কথা বলে দিলাম।ওদেরকে বলেছি উনার সাথে সংসার করা আমার পক্ষে আর সম্ভব না।এই বিষয় নিয়ে উনারা আমাকে অনেক গালমন্দ করেছেন প্রথম প্রথম।আমি জানি এই কথা শুনে উনারা অনেক কষ্ট পেয়েছেন কিন্তু আমার কিছু করার নেই।আমি কারোর সুখে বাধা হয়ে দাঁড়াতে চাই না।আমার জন্য এতদিন যা করেছেন সে তুলনায় আমার ভালবাসার এই ত্যাগ খুবই তুচ্ছ। কিন্তু এর পরে আশ্চর্যজনক ভাবে আমাকে এই বিষয় নিয়ে তারা আর কিছু বলেন নি।তবে আমার সাথে রাগ করে যে কথা বলতো না সেটা ভালোই বুঝতাম।এর ২ মাস, ৩ মাসের শেষের দিকে আমার পরীক্ষার রেজাল্ট দিলো।এইরকম ভালো রেজাল্ট আমি করবো তা কখনো আশা করিনি।সব উনার কর্তৃত্ব।উনার জন্যই আজকে এত ভালো রেজাল্ট করলাম।আজকের দিনে উনাকে খুব মিস করছি।উনার দেওয়া লকেটটা খুলে উনার আর আমার ছবি দেখছি।আচ্ছা উনি কি আমার রেজাল্টের খবর নেওয়ার জন্য একবার হলেও এখানে আসবেন।নাকি আমার কথায় ভুলে গেছেন যে মেঘ নামে উনার জীবনে কেউ একজন ছিলো।কতদিন ধরে উনাকে দেখি না।উনাকেখুব দেখতে ইচ্ছে করছে।উনাকে ছাড়া ৩টা মাস থাকতে কি পরিমাণ কষ্ট হয়েছে সেটা শুধু আমি জানি।
রেজাল্ট দেওয়ার পরেরদিন সকালে আমার রুমে উনি আসলেন।উনি একা আসেননি প্রিয়া ম্যাডামকে সহ নিয়ে আসছেন।
.
.
“আপনি?”
“কেন আসতে পারিনা নাকি?”
“না এইভাবে হঠাৎ আসবেন ভাবতে পারেনি।ভিতরে আসুন।”
“মেঘ কেমন আছো “(প্রিয়া)
“(আর ভালো থাকা।আপনার জন্যইই এখন আমাকে তন্ময়কে ছাড়া থাকতে হচ্ছে।উনাকে ছাড়া আমি ভালো নেই।) হ্যা খুব ভালো আছি।”
“তাই নাকি এত ভালো আছো। সেটা তোমাকে দেখলেই বুঝা যায়। শরীরের যা হাল করেছো” (তন্ময় স্যার)
“তা কি খবর আপনাদের।”
“এইতো ভালো খবর।আমাদের ভালোর জন্য এতকিছু করলে ভালো না থেকে কি থাকতে পারি।”(তন্ময় স্যার)
“অনেক ভালো আছি আমরা।আমরা দুজন বিয়ে করতে চলেছি।আর এই আনন্দে তোমাকেও শরিক হতে হবে।”(প্রিয়া)
“বি…বি…বিয়ে….”
“হ্যা, বিয়ে। তোমাকে কিন্ত বিয়ের কয়েকদিন আগে উপস্থিত থাকতে হবে।তোমাকে ছাড়া আনন্দটা জমবে না।”(প্রিয়া)
“আমি থাকতে পারবোনা।”
“কেন?”(প্রিয়া)
“আমি একটু ব্যস্ত আছি।”
“কি ব্যস্ততা শুনি?”(তন্ময় স্যার)
…….
“দেখো আমি জানি তোমার কোন ব্যস্ততা নেই।মিথ্যা বলে লাভ নেই।আমি জানতাম তুমি এইরকম বাহানা করবে তাই আজকেই তোমাকে আমাদের সাথে যেতে হবে।”(তন্ময় স্যার)
.
.
“হায়রে কপাল,, এইদিনও কপালে ছিলো।”(মনে মনে)
“হুম এইদিনও তোমার কপালে লিখা ছিলো।”

উনি কেমনে জানেন আমি এই কথা ভাবছি।

এত ভেবে কাজ নেই।আমার বিয়েতে তোমার অনেক কাজ। কারণ তোমার জন্যই এই বিয়েটা হতে যাচ্ছে।আমাদের এই বিয়ের শুভ কাজে তোমাকে সব দায়িত্ব নিতে হবে।আমি তোমার মা বাবাকে বলে রেখেছি।তারা রাজী হয়েছে।
“আমাকে এইসব ঝামেলায় না জড়ালে হচ্ছে না।”
“না হচ্ছে না,মেঘ তোমার জন্য আমি তন্ময়কে পাচ্ছি তাই আমরাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি তোমাকে এই বিয়ের সব দায়িত্ব দিবো প্লিজ না করোনা।আমাদের জন্য এত কিছু করলে প্লিজ আরেকটু হেল্প করো।প্লিজ……”(প্রিয়া)
“কিন্তু আমাকে মা বাবা সেখানে যেতে দিবেন না।সব সম্পর্ক তো শেষ করে দিয়ে আসছি আমি।কিসের ভিত্তিতে সেখানে যাব।”
“আমার ফ্রেন্ড হিসেবে যাবে। তোমার মা বাবাকে বুঝিয়ে বলেছি আমরা।তারা রাজী হয়েছে।তাদের যদি কোন আপত্তি না থাকে তাহলে তোমার কেন এইসব আপত্তি।”(প্রিয়া)
“সেটা আপনি বুঝবেন না।বুঝলে কাটা গায়ে নুনের ছিটা দিতে এখানে আসতেন না।আচ্ছা, দেখি,”
“কোন দেখাদেখি নাই।না গেলে জোর করে সেখানে নিয়ে যাব। “(তন্ময় স্যার)
“………..এখনো দেখি উনি আগের মতনই আছেন।যেটা চান সেটা করেই দেখান।”
“ঠিক বলেছ তন্ময়। দরকার হলে তাই করব।ওকে ছাড়া আমি বিয়ের পিড়িতে বসবোই না।”(প্রিয়া)
“দেখছো মেঘ আমাদের জন্য তুমি এতকিছু করেছ বলে এখন প্রিয়া তোমাকে আমাদের বিয়ে উপলক্ষে নিয়ে যেতে চাইছে।ওর মতন ভালো মেয়ে হয়ই না।সব কিছু ঠিকভাবে চলছিলো এখন শুধু তোমার জন্য আমাদের এই বিয়ে করাটা ভেস্তে যাবে।শেষ মূহুর্তে এসে যদি কিছুই না হয় তাহলে এতকিছু করে কি লাভ হলো।প্রিয়া আর আমার আমাদের এত দিনের রিলেশনের কোন নামই দিতে পারলাম না।”
“প্লিজ আর কোন ব্যাখ্যা দিতে হবে না।আমি বুঝতে পেরেছি।ওকে আমি যাব।”
“ধন্যবাদ।”(প্রিয়া)

আমার তন্ময়কে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিয়েছে হয় নাই আবার আমাকে ওদের বিয়ের দায়িত্ব দিয়ে আমার কষ্টটাকে আরো বাড়াচ্ছে।আবার ধন্যবাদও বলে।(মনে মনে)
.
.
“প্রিয়া তুমি গাড়িতে গিয়ে বসো।আমরা এখনি আসছি।”
“প্লিজ তাড়াতাড়ি এসো।তোমাকে ছাড়া এখন একমূহুর্তও ভালো লাগে না।”(প্রিয়া)
“মুচকি হেসে,তাড়াতাড়িই আসছি।যাও”(তন্ময় স্যার)
হুহ, মুখ ভেঙ্গিয়ে এদের প্রেমের ঢং দেখলে গা জ্বলে যায়। তোম্মাকে ছাড়া আমার একমূহুলত ভালো লাগে না……আজাইরা ফালতো কথা বলতে আসে।কেন আগে ওরে ছাড়া ভালো ছিলি না। ন্যাকা…….(মনে মনে)
.
.
“কেউ মনে হয় ভিতরে ভিতরে জ্বলছে।”
“কি…..”
“জ্বী……”
“হুহ……”
“এই যে ম্যাডাম আমার প্রিয় কালো শার্টটা কোথায়?”
“মানে কি?আমি কি করে বলবো। আপনার শার্ট দিয়ে আমি কি করবো।”
“সেটা আমার থেকে ভালোতো তুমি জানো। জানো ওই শার্টটা আমার কত প্রিয় ছিলো।তুমি যেদিন বাসা থেকে চলে গেছো সেদিন থেকেই আমার প্রিয় শার্টটা গায়েব।নিশ্চয় চোর যাওয়ার আগে দিয়ে আমার প্রিয় শার্টটা চুরি করে নিয়ে গেছে।”
“কি বলতে চাইছেন আমি চোর।আপনার শার্ট আমি চুরি করছি।আমাকে আপনার চোর মনে হয়।”
“হুম……”
“কি…………। একটা সামান্য শার্টের জন্য তুমি আমাকে চোর বলছো।লাগবে না তোমার শার্ট।দাঁড়াও এখনি তোমার শার্টটা আমি বের করে তোমাকে দিয়ে দিচ্ছি।একটা সামান্য শার্টের জন্য তুমি আমাকে এত্তবড় কথা বলছো।”(কেঁদে)
“আরে…. আরে…..লাগবে না আমার শার্ট।ওইটা তোমার কাছে রেখে দাও।কারণ পরে দিয়ে সেটা তোমার কাজে লাগবে।আর হ্যা ম্যাডাম এবার চলুন।”
“কোথায়,”
“এখনি ভুলে গেলেন।আমাদের সাথে যাবেন। আমার বাসায় থাকবে।ভয় নেই আমার মাও আছে বাসায়।তোমাকে দেখতে চাইছিলো।”
“আপনার মা কি সব জানেন?”
“হ্যা সব জানেন।মাকে সব খুলে বলেছি।আমার সাথে তুমি থাকতে চাও না আমিই আর কি করতে পারি।জোর করেতো আর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না।”
“আপনি……”
“ওয়েট বলা শেষ করেনি আমি।”
“এরপর মাকে আমার আর প্রিয়ার ব্যাপারে সব খুলে বলেছি আর তাতে তিনি রাজী হয়ে গেছেন।”
“ও…..ভালোই বুঝিয়েছেন আপনার মাকে।”
“হ্যা তুমিও তোমার মা বাবাকে আমাদের ডির্ভোসের কথাটা ভালোভাবে বুঝিয়েছ।আমি আরো ভাবলাম তোমার মা বাবাকে কিভাবে এই কথাগুলো বলবো।আমার আর প্রিয়ার সম্পর্কের কথা না বলে আমার মান সম্মান তুমি বাঁচিয়েছ।সব কিছু এতসুন্দর ভাবে সমাধান করবে আমি ভাবতেই পারিনি।কি বলে যে তোমাকে ধন্যবাদ দিবো। ”
“ধন্যবাদ দেওয়ার দরকার নেই।এটা আমার কর্তব্য ছিলো।”
“আসলেই তোমার এই কর্তব্য দেখে আমি মুগ্ধ সিরিয়াসলি।কয়জনেই বা এইরকম কর্তব্য পালন করে।প্লিজ নেক্সট টাইম এইভাবে আমার জন্য কোন কর্তব্য পালন করবে না।তোমার এই দায়িত্ব আর কর্তব্যের গুণে আমাকে আর ঋণী করিও না।”
“……..”
.
.
“কি ব্যাপার তন্ময় এত দেরি লাগল যে?”(প্রিয়া)
“সরি প্রিয়া।মুচকি হেসে।”(তন্ময়)
“আমাকে তো জীবনেও সরি বলে না।আর উনাকে….. ”
“আচ্ছা বিয়ের তারিখ কবে?”
“কার্ডটা তো দিয়েছি। নিজের চোখে দেখে নিও।”(তন্ময়)
“আর দেখা!দেখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই।পাশের সিটে কার্ডটা রেখে দিলাম।”
“মেঘ ৫ তারিখে বিয়ে।” (প্রিয়া)
“উনি এমন কাজটা করতে পারলো!? যে তারিখে আমাদের বিয়ের একবছর পূর্ণ হতে চলেছে সেই একি তারিখে উনি আর প্রিয়া ম্যাডাম বিয়ে করতে চলেছেন?আর কত কষ্ট সহ্য করলে এই কষ্টের জ্বালা থেকে আমি রেহাই পাবো।”

অবশেষে বাসায় আসলাম।আমার পরিচিত বাসাটা যেখানে ৮টা মাস উনার সাথে থেকেছি। অনেক সুন্দর মুহূর্তগুলো আমি কাটিয়েছি।রাতে শাশুড়ি মায়ের সাথে ঘুমালাম।আমাকে দেখে অনেক কান্নাকাটি করলেন।আমি কেন এইরকম সিদ্ধান্ত নিলাম তা বারবার জানতে চেয়েছিলেন।কিন্তু এর উত্তর দিতে পারেনি।রাগে উনি আমার সাথে কথায় বলেননি।আর তন্ময় উনিতো আমার সাথে কথায় বলেন না।যখনি কোন বাহানায় উনার রুমে যায় উনি আমাকে ইগ্নোর করেন।

আর ৩দিন পর উনার বিয়ে।খুব কষ্ট লাগছে।জানিনা কিভাবে আমি এই দায়িত্ব নিবো।তারপরও আমাকে পারতে হবে।প্রিয় মানুষের খুশির জন্য যদি আরেকটু কষ্ট করা লাগে তাহলে আমি তা করবো।
.
.
গায়ের হলুদের দিনে উনাকে দেখলাম খুবি হাসিখুশি।যাক মানুষটা তাহলে প্রিয়া ম্যাডামকে সারাজীবনের জন্য নিজের করে পেতে চলেছেন বলে অনেক খুশি।উনার গালে সবার প্রথমে আমিই হলুদ লাগিয়ে দিলাম।আর উনিও আমার গালে হলুদ লাগিয়ে দিলেন।কাউকে আর সে গালে হলুদ লাগাতে দেয় নি।

রাতে,,
“হ্যালো মেঘ,”
“জ্বী,”
“আমার রুমে একটু আসবে।কাজ আছে।”
“জ্বী আসছি।”
“বসো মেঘ একটা জিনিস দেখাবো।”
একটা পেনড্রাইভ বের করে সেটা ল্যাপটপে দিলেন।এটা কি দেখছি আমি।
“কি ব্যাপার মেঘ,এত ঘামছো কেন? “

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here