স্যার যখন স্বামী পার্ট_১৪

0
127

স্যার যখন স্বামী
পার্ট_১৪
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস
খুব খারাপ লাগছে আমার।উনি আমাকে বিয়ে করলেন অথচ কাউকে বলেননি উনি বিবাহিত। এখনো সবাই জানে উনি অবিবাহিত।আর তাসপিয়া সে এখন জানে সাগরের সাথে আমার বিয়ে হয়েছে।তাসপিয়ার সাথেতো উনার অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।উনি তাসপিয়াকেও এই কথাটা বলেননি যে উনার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে।আমি সাগরের স্ত্রী না আমি উনার স্ত্রী।তাছাড়া প্রিয়া ম্যাডামের সাথে এত হেসেহেসে কথা বললেন কয় আমার সাথেতো কখনো হেসেহেসে কথা বলেননা।
আর সাগর এই অমানুষটার কথাতো আমি ভুলেই গেছি।বিয়ের পর থেকে স্যার আমাকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখত।প্রথম প্রথম উনার বকা খেয়ে আমার দিন যেত।উনার বকা আর আমার কান্নাকাটির কারণে সাগরের কথা ভাববার সময় পাইনি।এরপর উনার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক হতে থাকে।তাই এখন সাগরের কথা আমার মাথায় আসে না।আজকে ম্যাডামের সাথে উনাকে দেখে খুব খারাপ লাগছে।উনার পাশে অন্য কোন মেয়েকে দেখে কেন জানি আমার সহ্য হচ্ছে না।উনাকে ভালবাসি বলে অন্য কোন মেয়ে উনার পাশে থাকলে আমার সহ্য হয়না তা কিন্তু নয়।উনার প্রতি আমার ভালবাসা না মায়া কাজ করে।আসলে এতদিন হল মানুষটার সাথে আছি তাই একটুখানি মায়া,না একটুখানি না অনেকখানি মায়া জন্মে গেছে।এই মায়া ভালবাসা কিনা জানি না আর বুঝতে পারছিনা।ধূর কি আবোলতাবোল বলছি উনাকে কেন আমি ভালবাসতে যাব। একবার ভালবেসে কি তোর শিক্ষা হয়নি মেঘ আবার ভালবাসার ফাঁদে নিজেকে জড়াচ্ছিস তুই।আচ্ছা উনি কি আমাকে ভালবাসেন।না তা কেমন করে হয়!কেউ তোকে দয়া করে বিয়ে করলে,তোর দেখাশুনা,তোর পড়াশুনোয় সাহায্য করছে তারমানে এই নয় যে সেও তোকে ভালবাসে।
.
.
বিকালে,
উনি বাসায় এসে আমাকে দেখামাত্র একটা থাপ্পড় দিয়ে দিলেন।এখানে এসেছি অনেকদিন হয়, অনেক ভুল করেছি আমি কিন্তু সেজন্য উনি কখনো আমাকে থাপ্পড় দেননি।কিন্তু আজ!

তোমাকে আমি বলেছিলাম না ভার্সিটির গেইটে দাঁড়িয়ে থাকতে।তুমি সেখানে না দাঁড়িয়ে চলে আসছ কেন?এই মেয়ে তোমার কি মনে হয় তোমার পিছনে আমি সারাদিন পাগলের মতন ঘুরে বেড়াবো।তোমাকে বিয়ে করে আমি তোমার দায়িত্ব নিয়েছি বলে আমাকে চরকার মতন ঘুরাবে?আমাকে তোমার মানুষ মনে হয়না।তুমি জানো কতক্ষণ ধরে তোমার জন্য আমি সেখানে অপেক্ষা করেছিলাম।তোমাকে সেখানে না পেয়ে আমার মনে কত দুশ্চিন্তা কত আজেবাজে ভাবনা এসে ঘুরপাক খাচ্ছিল।আমার সাথে যদি আসার ইচ্ছা না হয় অন্তত আমাকে একটা মেসেজ দিয়ে দিতে বা আমাকে বলে আসতে পারতে।তাহলে আমাকে এত দুশ্চিন্তায়ও থাকতে হতনা।
.
.
দেখো কথায় কথায় একদম কাঁদবেনা।দোষ করবে অথচ বকা দিতে পারবনা তাই না!এত ফ্যাসালিটি আমার কাছে পাবেনা।তোমার কারণে আজকে আমার নিশ্চিত হার্ট এ্যাটাক এসে যেত।আর এই ন্যাকা কান্না বন্ধ কর।একতো আমাকে না বলে বাসায় এসে আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলো আর এখন আমি যখন বাসায় আসছি তোমার অপরাধের জন্য তোমাকে কয়েকটা কথা শুনালাম শুরু হয়ে গেল ন্যাকা কান্না।তোমার জ্বালাই না বাইরে না বাসায় শান্তি পাবো,অসহ্য।
.
.
কত কিনা বলে ফেললেন অথচ আমাকে কিছু বলতে দিলেন না।আমারও যে কিছু বলার থাকতে পারে তা বুঝতে চাইলেন না।আসলে উনাকে অনেক জ্বালাচ্ছি।কত কিনা করলেন আমার জন্য।অথচ আমি উনাকে শুধু কষ্ট আর দুশ্চিন্তায় ফেলছি।উনার জন্যও কিছু করা উচিত আমার।উনাকে মুক্তি দিয়ে দিলে হয়ত উনি শান্তি পাবেন।কিছুদিন আগে তাই করতে চেয়েছিলাম।কিন্ত উনার এখানে থেকে আমার শাশুড়িমা, সানজামণি,আর উনার বকা,না বকা না এগুলো উনার শাসন ছিলো সেগুলোকে ভালবেসে ফেলেছি।উনাকে যদি মুক্ত করে দেই তাহলে সবকিছু আমি হারিয়ে ফেলবো।আমি এইসব হারাতে চাইনা।আরও কয়েকটাদিন দেখি যদি মনে হয় সত্যিই উনার আমার সাথে থাকতে কষ্ট হচ্ছে তাহলে উনাকে মুক্ত করে দিবো।জোর করে তো আর সবকিছু হয় না।
.
.
রাতে উনাকে ডাক দিলাম।কিন্তু খেলেন না।আমিও আর রাগ করে খায়নি।উনার এইরকম রেগে যাওয়া,বকা দেওয়াতো আজকে নতুন নয়।এর আগে অনেকবার এরকম হয়েছে।প্রথমে রেগে আমাকে বকা দিবেন এরপর খাবারের সময় হলে বলবেন খাবো না।কিন্তু পরে নিজে খাবারের প্লেট এনে আমাকে খাওয়াবেন আর নিজেও খাবেন।কিন্তু আজকে কি এমনটা হবে।আজকে যা হল তাতে মনে হচ্ছে উনি খুব রেগে আছেন।নিজের থেকেও খুব কষ্ট হচ্ছে।আগে রেগে গেলে বকা দিতেন কিন্তু আমার গায়ে কোনদিনও হাত তুলেননি।আর আজকে!কাঁদলে উনি নিজ হাতে আমার চোখের জল মুছে দিতেন কিন্তু আজকে তা করেননি।সবকিছু অস্বাভাবিক লাগছে।
.
.
অনেকক্ষণ হয়ে গেল কিন্তু মনে হচ্ছে উনার রাগ ভাঙ্গেনি।চুপচাপ করে শুয়ে আছেন।ঘড়ির সময় আস্তে আস্তে বাড়ছে কিন্তু উনি…।এত্ত রাগ আমার উপর।ঘুমও আজকে আসছে না।শুধু এইপাশ ওইপাশ করছি।প্রতিদিন উনি আমাকে তার বুকে টেনে নিয়ে ঘুমাতেন কিন্তু আজকে…।কত সহজে আমার উল্টোপাশ ঘুরে ঘুমাচ্ছে।অনেকক্ষণ ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদলাম।কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে গেলাম।
.
.
সকালে ঘুম ভেঙ্গে গেল।মনে হচ্ছে শক্ত কিছুর উপর ঘুমিয়ে আছি আমি।চোখ খুলে দেখি উনার বুকে শুয়ে আছি।কি করে সম্ভব এটা।আমি জানি আমি যেভাবে ঘুমায় ঠিক সেইভাবে ঘুমিয়ে থাকি।এদিক ওদিক এত নড়চড় করিনা।তাহলে কি করে উনার বুকে চলে আসলাম।তাহলে কি উনি!না তা কি করে হয় উনিতো আমার উপরে অনেক রাগ করে আছেন।হিসাব মিলাতে পারছি না।কি সুন্দর করে ঘুমাচ্ছেন উনি।আগে কখনো উনাকে এইভাবে লুকিয়ে দেখি নি।কেন জানি আজ তার এই ঘুমমাখা মুখটা দেখতে খুব ভালো লাগছে।আচ্ছা ঘুম থেকে উঠে যদি উনি আমার নাম ধরে ডাক না দেন।প্রতিদিনতো সবার প্রথমে উনি আমার নাম ধরে ডেকে কথা বলা শুরু করেন।আজ যদি তা না হয়।কিছু একটা করতে হবে যাতে উনি আমার নাম ধরে ডাকেন।উনার রাগ যে করেই হোক ভাঙ্গাতে হবে।
.
.
কিছুক্ষণ পর,
“মেঘ,এই মেঘ”
এইতো আমার প্ল্যান কাজ দিয়েছে।দৌঁড়ে উনার কাছে গেলাম
“জ্বী,আমাকে ডাকছেন”
“মেঘ আমার চশমাটা কই?”
“কেন আপনার বালিশের পাশে নাই চশমা।আপনি সবসময়তো ম্যাথ বই পড়া শেষ করে ঘুমানোর সময় বালিশের পাশে চশমা রাখেন”
“হ্যা রাখি।অনেকক্ষণ ধরে খুঁজছি পাচ্ছি না।একটু দেখতো কোথায়”
“এই যে আপনার চশমা,টেবিলে রেখে এখন আপনি বালিশের পাশে চশমা খুঁজে বেড়াচ্ছেন।আপনি পারেনও বটে”
“কিন্তু আমিতো টেবিলে চশমা রাখিনা,সবসময় বালিশের পাশে রাখি।তাহলে কেমন করে সেখানে গেল এই বলে আমার দিকে রাগি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন”
“আপনি এইভাবে কেন আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।আপনার কি মনে হয় আমি চশমাটা টেবিলে রেখেছি”
“এই বাসায় আমি আর তুমি ছাড়া আর কে আছে শুনি।আমার স্পষ্ট মনে আছে আমি কালকে চশমাটা কোথায় রাখছি।চশমা কি হাঁটতে পারে যে বালিশ ছেড়ে টেবিলে চলে গেছে।নিশ্চয় তুমি এই…”
“আপনি কি এখন এই বিষয় নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করবেন(শান্ত কণ্ঠে)”
“আমার খেয়ে দেয়ে কাজ নেই না তোমার সাথে ঝগড়া করব।আমি শুধু এইটুকু বলতে চাই আমার পারসোনাল জিনিসে আমাকে না বলে হাত দিবে না আর যেখানে সেখানে রাখবে না।আমি এইসব পছন্দ করিনা।”
“আচ্ছা,সরি”
.
.
উনার রাগ এখনো যায় নি।আমি জানি উনি চশমা ছাড়া বইয়ের লেখা ভালো করে দেখতে পারেন না তাই ম্যাথ বই পড়ার সময় চশমা ব্যবহার করেন।আর ঘুমানোর সময় তা বালিশের পাশে রেখে ঘুমান।সকালে ম্যাথ বই পড়ার সময় উনার চশমা লাগবে জানতাম আর সে সুযোগটা আমি কাজে লাগিয়েছি।আর কিইবা এমন করলাম চশমাটার জায়গা না শুধু বদল করছি।ইচ্ছে করে তো আর এইসব করিনি।এই চশমার অযুহাতে সকালে উনার মুখ থেকে যেন আমার নামটা শুনি সেইজন্যই না এই কাজটা করলাম।আচ্ছা এক কাজ করি উনাকে একটা চিরকুট দেই।
.
.
চিরকুটে সরি লিখে সেখানে সরির ইমুজি দিয়ে চিরকুটটা টেবিলে রেখে আসলাম।যদিও জানি আমি কোন দোষ করিনি কিন্তু তারপরও এই কাজ করলাম।আসলে মাঝেমাঝে এমন কিছু পরিস্থিতি আসে তখন যদি নিজের দোষ নাও থাকে তবুও সরি কথাটা বলতে হয়।নিজের আর আপনজনের মঙ্গলের জন্য মাঝেমাঝে এই কাজটা করতে হয়। দেখি উনি কি করেন।উঁকি দিয়ে দেখছি উনার রিয়েকশন কি হয়।উনি চিরকুট হাতে পেলেন কিন্তু উনার ভিতরে কি চলছে তা বুঝতে পারছি না।নাস্তা করার পর আমাকে নিয়ে পড়তেও বসলেন না।এখনো রাগ পুষে রেখেছেন।ঠিকাছে দেখি কতক্ষণ পর্যন্ত উনার এই রাগ থাকে।
.
.
কেউ যদি আমার সাথে ভার্সিটি যেতে চায় তাহলে সে যেতে পারে।আমি ১০মিনিট পর রওনা দিবো। ১০মিনিটের বেশি দেরি হলে আর কারোর জন্য অপেক্ষা করবো না।এই আমি বলে দিলাম।

কথাটা যে আমাকে বললেন তা বুঝতে পেরেছি।গেইটের বাইরে এসে দেখি উনি গাড়িতে বসে আছেন।সকালে যে শার্টটা পছন্দ করে রেখে দিয়েছিলাম সেটাই পড়লেন।এটা দেখে খুশি লাগছে।এখন ইচ্ছে করেই ৫মিনিটের মত বাইরে দাঁড়িয়ে আছি।চাইছিলাম আমার সাথে কথা বলুক।কিন্তু কথাতো বললোই না উল্টো জোরে জোরে গাড়ির হর্ণ বাজিয়ে আমার কান ঝালাফালা করে ফেলছে।মনে হচ্ছে গাড়িতে না উঠে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় উনি ক্ষেপে উঠেছেন।আমি আর উনার এক্সট্রা রাগ বাড়াতে চাই না তাই গাড়ির পিছনের সিটে বসে গেলাম।
আমি এই গাড়ির ড্রাইভার না,আমার গাড়ির পিছনের সিটে বসে কেউ যদি ভার্সিটিতে যায় আর তা আমার স্টুডেন্টরা দেখে ফেললে আমাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে,আমার মান-সম্মান যাবে। যদি আমার সাথে ভার্সিটি যেতেই হয় তাকে আমার সামনের সিটে এসে বসতে হবে।
চুপচাপ সামনের সিটে এসে পড়লাম।একবার উনার মুখের দিকে তাকালাম।কিন্তু উনার কোন পাত্তাই নেই।
.
.
আজকে ১ম ক্লাসটা তন্ময় স্যারের।সেটা আমার মনে ছিল না।ক্লাসে এসে বসামাত্র উনি ক্লাসে এসে উপস্থিত।হায় আল্লাহ আমিতো পড়া নোট করে নেয় নি।আমি জানি ক্লাসে এসে সবার প্রথমে আমাকেই দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞাস করবে।
“মেঘ,stand up”
…..
“অন্তরক সমীকরণ কি?”
“স্যার,….”
“পড়া শিখো নি”
“মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি”
“তুমি এমন কেন?কতদিন হয়ে যাচ্ছে এই চ্যাপ্টার ক্লাসে পড়াচ্ছি,এতদিন সবাইকে সময় দিয়েছি যাতে ভালোভাবে এই চ্যাপ্টার বুঝতে আর শিখতে পারে।কালকে তো ক্লাসে এসেছিলে কারোর কাছ থেকে পড়া নোট করে নিতে পারোনি।অবশ্য পারবে কেমন করে এক নাম্বারের ফাঁকিবাজ একটা।বাসায় তো মনে হয় বই খুলে একটু দেখোও না বইয়ে কি আছে না আছে।বই খুললে না পড়া পারবে”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here