স্যার যখন স্বামী পার্ট_৪

0
141

স্যার যখন স্বামী
পার্ট_৪
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

“অতিরিক্ত কান্নাকাটি করার কারণে ঠিকভাবে দাঁড়াতেও পারছি না।অনেকটা দুর্বল হয়ে গেছি। হাঁটতে গিয়ে যেই পড়ে যাব ওমনি স্যার আমাকে ধরে ফেললেন।তিনি আমার সমস্যাটা বুঝতে পেরেছেন।তাই আমাকে কোলে তুলে নিলেন।”
“স্যার একি করছেন?”
“দেখতেই তো পারছো কি করছি।”
“হ্যা… পারছি,, আমাকে কোলে নিতে হবে না।আমি হেঁটে যেতে পারবো।”
“হুম সেটা আমি দেখতে আর বুঝতে পেরেছি।তাই কোলে নিয়েছি।আর কোন কথা বল না।বোকা মেয়ের মতন কান্নাকাটি করে শরীরের কি হাল করেছ সেটা বুঝতে আমার বাকি নেই।চুপ করে থাক।যা করছি আমাকে করতে দাও।”
“আমিও আর বাড়াবাড়ি করলাম না।আসলেই কান্নাকাটি করে এমন অবস্থা হয়েছে আমাকে এখন কোল থেকে নামিয়ে দিলে বাকিপথটুকু হেঁটে যাওয়ার অবস্থা থাকবে না।সাথেসাথে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যাব। তাই চুপটি মেরে রইলাম।”
.
.
মেহমান ভর্তি বাড়িতে,,নিচে গিয়ে পৌঁছালে স্যার আমাকে তার কোল থেকে নামালেন। আমাকে দেখে মা পাগলের মতন কান্নাকাটি শুরু করে দিলেন।মেঘ এ কি হল রে?মা আমরা বুঝতে পারি নি সাগর এরকম হবে।বিয়ে যদি করবেই না সেটা আমাদের কালকে হলেও বলতে পারত।তাহলে আমাদের মানসম্মানটা বেঁচে যেত। আজ যখন বিয়ে করতে আসার কথা ছিল ঠিক তখনি বিয়ে করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে। কেন ঘরভর্তি আত্মীয় আর মেহমানদের সামনে ওই শয়তানটা আমাদের নাক কাটালো?
মায়ের এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতন ভাষা আমার কাছে নেই।কি করে বলবো এইসব কিছুর মূলে দায়ী আমি নিজেই।
বাবাকে দেখলাম চুপটি করে বসে আছে।এতক্ষণ ধরে যে কান্নাকাটি করছিল তা উনাকে দেখলে বুঝাই যাবে না।কি সান্তনা দিবো ওদের? এটাই বলব তোমরা টেনশন কর না।যা হওয়ার তাতো হয়ে গেছে।এখন আর কান্নাকাটি করে কি হবে? কিন্তু এইসব বললেই কি সব ঠিক হয়ে যাবে।আমাদের হারিয়ে যাওয়া মানসম্মানতো আর ফিরে আসবে না।ঘরে আর বাইরের বয়স্ক গুরুজনরা বলেই চলছে, বিয়ে না করে বর পালিয়ে গেল,, নিশ্চয় মেয়ের চরিত্রে কোন দোষ আছে। বর ভালো মানুষ তাই হয়ত মেয়ের সবদোষ জেনেই বিয়ে করতে রাজি হয়েছিল, পরে হয়ত ছেলে ভেবে দেখেছে মেয়ের দোষ মেনে নিয়ে বিয়ে করে নিজের জীবন নষ্ট করার মানেই হয় না।তাই হয়ত মেয়ের দোষ থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্য ছেলে বাধ্য হয়ে পালিয়ে গেছে। এই গ্রামের বয়স্ক লোকেরা কিছু একটা হলেই মেয়েদের চরিত্রের দোষ তুলে ধরে।ছেলে পালিয়ে গেল আর দোষ হল মেয়ের। মেয়ের চরিত্র দোষের কারণে ছেলে পালিয়ে গেছে, ছেলে পালিয়ে যাওয়ার কারণ এতক্ষণ পরে তারা নিজেরা নিজে গবেষণা করে উদ্ধার করল।আর সব দোষ আমার উপরে চাপাল।সাগর পালিয়ে যাওয়ায় একদিকে মার কান্নাকাটি, বাবার চুপচাপ হয়ে বসে থাকা আমাকে অস্থির করে তুলছে আর অন্যদিকে বয়স্ক লোকেরা আমার চরিত্র নিয়ে কথা বলছে। কোন দিশা পাচ্ছি না, কি করব? আমি হচ্ছি ঘরকোনো মেয়ে,, কোন ঝগড়া বিবাদ হলে আমি সেখান থেকে কেটে পড়ি,, তাদের সাথে তাল মিলিয়ে ঝগড়া বা প্রতিবাদ করার ক্ষমতা আমার কোনকালেই ছিল না।এই পরিস্থিতিতে আমার কিছু বলা উচিত, বলা উচিত আমার চরিত্রে কোন দোষ নেই,নিজেকে বেকসুর প্রমাণ করতে ইচ্ছে করছিল,মুখ খুলে কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল,কিন্তু আমার মুখের কথা মুখে আটকে রইল,কোন টুশব্দ ও বাইরে আসলো না। আশেপাশে সবাই যারা আমাকে চিনে তারা চুপ করে আছে কারণ গুরুজনদের মুখের উপর দিয়ে কথা বললে তাদের অপমান করা হয়।তাছাড়া যে প্রতিবাদ করতে যাবে বয়স্কলোকেরা তারও দোষত্রুটি তুলে ধরবে সাথেসাথে।তাই এই মূহুর্তে তাদের এই অপবাদ হজম করা ছাড়া উপায় নেই।আমি নির্বিকারভাবে দাঁড়িয়ে আছি আর তাদের কথা শুনছি,, না চাইতেও চোখের পানি ঝরে পড়ছে। অন্যদিকে ঘরে আমার মা পাগলের মতন প্রলাপ বকে যাচ্ছে এখন আমার মেয়েটার কি হবে?ওর জীবনটা শেষ হয়ে গেল।আমার মেয়েটাকে এখন কে বিয়ে করবে?
.
.
এতক্ষণ ধরে তন্ময় স্যার সবকিছু দেখছিল আর শুনছিল। কিন্তু এইবার তিনি আর চুপ করে থাকতে পারলেন না,তিনি বলে উঠলেন,মেয়ের চরিত্রে কোন দোষ নেই, চরিত্রে যদি কারো দোষ থেকে থাকে তাহলে সেটা ছেলের চরিত্রে ছিল। ছেলের অনেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল।কিন্তু বিয়ের আগে সেটা ছেলে বা ছেলেপক্ষের পরিবার মেয়েপক্ষকে জানায় নি।বিয়ের দিনে ছেলের মাথায় আক্কেল হয়েছে এখন বিয়ে করলে আগের মতন অন্য মেয়েদের সাথে প্রেমলীলায় মজে থাকতে পারবে না। তাই বিয়ের দিনে বর কনেকে বিয়ে না করে পালিয়েছে।এরপর তিনি প্রমাণস্বরুপ কয়েকটা ছবি দেখালেন।সাগরের সাথে অনেক মেয়ের ছবি ঘনিষ্ঠভাবে তুলা।আমি নিজেও অবাক।হ্যা আমি জানতাম সাগরের পিছনে মেয়েরা ঘুরত,,কিন্তু সেসইব মেয়েদের সাথে সাগরের এরকমভাবে তুলা ছবি!!তার মানে আমার অজান্তে আরও অনেক মেয়ের সাথে ওর রিলেশন ছিল।মাথাটা ব্যাথা করছে স্যারের কাছ থেকে এইসব কথা শুনে। আমি দাঁড়ানো থেকে সোজা মাটিতে বসে গেলাম। পুরোপুরো নিস্তব্ধ হয়ে গেলাম। একটা শকড কাটতে না কাটতে আরকটা!! কানে আর কোন কথা ঢুকছে না।
.
.
আপনারা পুরো ঘটনাটা না জেনে ছেলের দোষ না দিয়ে মেয়ের চরিত্র নিয়ে আঙ্গুল তুলেছেন।নিজের চোখে তো দেখলেন কার চরিত্রে দোষ। আর কিছু বলবেন আপনারা। কোনকিছু না বুঝে শুনে বিচার না করে কিছু একটা হলেই সব দোষ মেয়েদের উপর চাপিয়ে দেন।সবসময় আপনারা শুধু মেয়েদের চরিত্রে দোষেই দেখেন। আমি নিজে একজন ছেলে হয়ে বলছি, কেন ছেলেরা কি দোষ করে না? নাকি ওরা ধোয়া তুলসী পাতা যে ওরা কোন দোষ করতে পারে না বা জানে না। দেখেন ছেলে হোক বা মেয়ে, দোষ যে কারো হতে পারে।আমরা আল্লাহর সৃষ্টি সেরা জীব। দোষ যারই হোক না কেন আমরা নিজেরা তা ভালোভাবে না বুঝে নিজের বিবেকবুদ্ধি দিয়ে তা ভালভাবে বিচার বিবেচনা না করে শুধুশুধু মেয়ের চরিত্রে দোষ লাগিয়ে তাকে কথা শুনাবো সেটা কেমন বিচার?নিজের বিবেকবুদ্ধি কাজে না লাগিয়ে যদি শুধু মেয়ের চরিত্রে দোষারোপ করা হয় আর ছেলের দোষ থাকলে ও তাকে সে কটুক্তি কথা থেকে বিরত রাখা হয় তাহলে সেটা আল্লাহর সৃষ্টিকেসহ নিজেদেরকে অবমাননা করা হয়। আপনারা মেয়ের চরিত্র সম্পর্কে না জেনে কতকিছু বলে ফেললেন কয় মেয়েপক্ষতো একবার ও তো এখন ছেলের চরিত্র সম্পর্কে জানার পর তাকে নিয়ে কিছু বলে নি।বিয়ের দিন ছেলে পালিয়ে গেছে কেউ কিছু বলছে না কারণ সে ছেলে।ছেলে পালিয়ে গেল এতে ছেলের দোষ আছে কিনা তা যাচাই করলেন না কিন্তু বিয়ের দিন মেয়ে পালিয়ে গেলে পুরো সমাজ সে মেয়েকে নিয়ে কত কথা শুনায় আর রটাই।একবারও আপনাদের মনে হয় না এর সত্যতা যাচাই করে দেখি আসলে সমস্যাটি কার? এবার আর কেউ কথা বলছে না।চুপ হয়ে গেছে সবাই।
.
.
স্যার এবার আমার মা বাবাকে বলেলন, প্লিজ অযথা এভাবে আর চোখের পানি ঝরাবেন না।আপনারা যদি অনুমতি দেন তাহলে আমি কিছু বলতে চাই।আমার মা বাবা স্যারের দিকে নির্বিকারভাবে তাকিয়ে আছে।
“আমি মেঘকে বিয়ে করতে চাই যদি আপনাদের কোন আপত্তি না থাকে।”
“এই কথা শুনে আমার মা সাথেসাথে বলে উঠলেন, বাবা সত্যি বলছ।”
হ্যা আমি সত্যি বলছি আমি মেঘকে বিয়ে করতে চাই। বাবার চোখে এবার সুখের অশ্রু নেমে এল। স্যারের কথা শুনে মনে হল তারা দুইজনেই আকাশের চাঁদ হাতে পেয়েছেন।তারা আর কোন দ্বিমত করেন নি।স্যারের সাথে আমার বিয়ে দিতে রাজি হল। অবশেষে স্যারের সাথে আমার বিয়ে হয়ে গেল।কিন্তু বিয়েতে আমার শরীরটা উপস্থিত ছিল মাত্র কিন্তু মনটা আমার সাথে ছিল না।কি হল না হল কিছু বলতে পারবো না।একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম।বিদায়ের সময় আর কান্নাকাটি করলাম না।অনেক কেঁদেছি। বিদায়ের জন্য জমানো পানিও ফুরিয়ে গেছে।কাঁদতে কাঁদতে এখন চোখ দুইটা অসম্ভব জ্বালাপোড়া করছে।
.
.

ইতিমধ্যে স্যার এত কম সময়ে বিয়ের গাড়ি ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন।সবাইকে বিদায় দিয়ে গাড়িতে বসলাম। আমার বর্তমান আর ভবিষ্যত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বুঝতে পারছি না। স্যারের মুখের দিকে তাকালাম দেখি মুখটাই একটা বিষাদ নেমে পড়েছে। বেচারা!!আমার জন্য কত কি না করল। এসেছিলেন বিয়ে খেতে কিন্তু বিয়ে খেতে এসে তিনি নিজে ফেঁসে গেলেন। যে সম্পর্কে কোন ভালবাসা নেই সে সম্পর্কে এত সহজে টিকে না। ওনিতো আমাকে কখনো ভালবাসার চোখে দেখেননি,, সবসময় স্টুডেন্টের চোখে দেখতেন।
স্যার আমার কাঁধ ঝাকিয়ে বললেন,, মেঘ,,
“হ্যা,,”
“শুন আলতোফালতো চিন্তা মাথা থেকে বাদ দাও।আমাদের সম্পর্ক কোথায় দাঁড়াবে সেসব নিয়ে এতকিছু ভেবো না।সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।”
“উনি কেমন করে জানলেন আমি এইসব ভাবছি। উনার কথা শুনে থতমত খেয়ে গেলাম।”
“মেঘ শুন,,”
“জ্বী,, ”
“আরও ৩ ঘন্টার রাস্তা বাকি আছে।তুমি চাইলে গাড়িতে ঘুমাতে পারো।খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে তোমাকে।”
“না,, আমি ঠিক আছি।”
এরপর আর কেউ কোন কথা বলে নি গাড়িতে।চুপচাপ ছিলাম উভয়ে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here