হৃদস্পর্শ  পর্ব ২৪ 

হৃদস্পর্শ  পর্ব ২৪
লেখিকা : জামিয়া পারভীন তানি

এক মাস পর,
সাইমার যত্নে, ডক্টরের চেষ্টায়, নার্সের সহযোগিতায় আলিফ এখন অনেকটাই সুস্থ। সাইমার জন্য আলিফের এই অবস্থা ভেবে নিজেকে খুব দোষী মনে করে, মন দিয়ে আলিফের সেবা করে। কিন্তু ফিলিংস আগের মতো নেই, সময়ের সাথে সাথে ভালোবাসা বদলে যায়। না চাইলেও মানুষ অতীত কে ভুলে বর্তমান নিয়ে সুখী হতে চায়। সাইমাই তাই, আলিফকে মৃত ভেবে সন্তানের জন্য নিজ স্বামী কে ভালোবেসে ফেলেছে। এখন চাইলেও নতুন করে আলিফের সাথে সংসার করা যায় না, পিছুটান হিসেবে একটা মেয়ে আছে সাইমার। মাতৃত্বকে অস্বীকার করা কোন নারীর পক্ষেই সম্ভব নয়।

আফিয়া সাইমাকে মাথায় করে রেখেছে, সাইমার জন্যই ভাই এভাবে সুস্থ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু আফিয়ার মনে ভয় আসে, সাইমাকে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললো,
• “ যা হবার হয়ে গেছে, আমার ভাই এখন অনেক সুস্থ, তাও তোমার ভালোবাসা পেয়ে। কিন্তু তুমি ভুলেও বলবেনা যে তুমি বিয়ে করেছিলে বা তোমার মেয়ে আছে। ডক্টর বলেছেন, ও যদি শকড নিউজ শোনে তাহলে ওর জন্য ক্ষতি হতে পারে। ”
• “ জ্বী ”

সাইমা আলিফের পাশে বসে আছে, দীর্ঘদিন পরে একসাথে খোলা বাতাসে বসেছে। আলিফ একসময় বলে উঠলো,

• “ জানিনা ঠিক কতোদিন পর, কিন্তু এভাবে খোলা বাতাসে বসে থাকতে ভালো লাগছে সাইমা। ”
• “ হুম ”
• “ তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছি, তুমি চেঞ্জ হয়ে গিয়েছো। আগে আমার উপস্থিতি যে সাইমাকে আনন্দ দিতো! এখন সেই সাইমা আমার উপস্থিতি তে বিরক্ত হয়। যে আমাকে দেখলে সারাক্ষণ বকবক করতো! সে এখন কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছেনা ! ”
• “ আসলে তা নয়!… ”
• “ আসলে তুমি আর আমায় ভালোবাসোনা! ”

সাইমা কি বলবে বুঝতে পারছেনা, চুপ হয়ে গিয়েছে আলিফের কথা শুনে। আলিফ তখন আবার বললো,

• “ সাইমা প্লিজ, আগের মতো সব কিছু খুলে বলো। মনের যত যন্ত্রণা আছে সব আমাকে বলে নিজেকে হালকা করো। ”
সাইমা হুট করে আলিফকে জড়িয়ে ধরে, হু হু করে কেঁদে উঠে। সাইমা কিছুক্ষণ পর নিজেকে শান্ত করে বললো,

• “ আলিফ… আমি বিয়ে করতে চাইনি! জোর করে বিয়ে দিয়েছিলো, পরে অবশ্য জেনেছি ওটা বিয়ের নামে আমার সম্পত্তি লিখিয়ে নেওয়ার কাগজ। ওটা বিয়ে ছিলো না আলিফ… ”
• “ জানি আমি পাগলী… ”
• “ আলিফ তুমি জানোনা, আমি পালিয়ে আসার পর তোমাকে হন্য হয়ে খুঁজেছি। কোথাও পাইনি আমি। একটা বছর তোমাকে লক্ষবার ফোন দিয়েছিলাম এই আশায়, তুমি ফিরে আসবে। কিন্তু তুমি আসোনি! শেষ বর্ষ অনেক কষ্ট করে পড়া শেষ করে চাকুরী তে যাই। ”
• “ আমার পিচ্চি তো বড় হয়ে গেছে, চাকুরী ও করেছে সে… ”

এরপর একে একে সজীবের সাথে পরিচয় থেকে সব ঘটনা খুলে বলে। আলিফের দুই চোখ বেয়ে অঝোর ধারায় পানি ঝরছে।

°°°

স্নেহা সারাক্ষণ মাম্মা মাম্মা বলে কাঁদতে থাকে , মা কে সবসময় খোঁজে । দুই দিন থেকে খুব জ্বর, জ্বরের ঘোরে শুধু মাম্মা মাম্মা বলে। সুপ্তি যথেষ্ট আদর করে, যত্ন নেয়। কিন্তু মায়ের ভালোবাসা তো আর পায়না, ছোট বাচ্চা সবার আগে তার মা কে চায়।

রেহান সজীব কে এসে বললো,

• “ আপু যে এতো পাষাণ আগে বুঝতে পারিনি, নইলে উনার কথা শুনতাম না। নিজের ভাইয়ের জন্য একটা নিষ্পাপ বাচ্চার কাছ থেকে তার মা কে কেড়ে নিলো।
• “ বাদ দাও, সাইমা ভালো থাকুক এটাই চাই। আমার মেয়েটা কে সুস্থ করে তুলতে হবে এখন।
• “ হুমম ”

সজীব ডক্টর দেখালে ডক্টর বললেন, মা কে পেলেই সুস্থ হয়ে যাবে । জ্বরের ওষুধ দিয়েও যখন জ্বর কমছে না, তখন মা কে আনিয়েই দেখুন কি হয়৷

সজীব খুব চিন্তায় পড়ে যায়, সাইমা কে কিভাবে আনবে সে? সাইমা তো আসতে পারবেনা। তাহলে কি তার মেয়ে কখনো ও সুস্থ হবেনা?

°°°

আলিফ চোখ বন্ধ করে ঘরে শুয়ে আছে, সাইমার কথা ভেবে খুব কষ্ট পাচ্ছে সে। আফিয়া তখন ঘরে আসে, আলিফকে এভাবে দেখে জিজ্ঞেস করলো,

• “ কিরে ভাই, এখন কেমন আছিস?

আলিফ একটু নড়েচড়ে বসে, এরপর বললো,

• “ আমি মায়ের কাছে যেতে চাই। ”
• “ কি যে বলিস, মা কে কয়েকদিনের মধ্যেই আনিয়ে নিবো। ”
• “ আসলে আমি দেশে ফিরতে চাই। দেশের বাতাস, প্রকৃতি আমাকে খুব ডাকছে। ”
• “ বাংলাদেশ এর চেয়ে এই ই তো সুন্দর অনেক। তুই কি যে বলিস না! ”
• “ আপু আমি তোমার উপর অনেক কৃতজ্ঞ, তুমি আমার জন্য অনেক করেছো। প্লিজ আমি আমার দেশে ফিরতে চাই। আমার আর সাইমার ফেরার ব্যবস্থা করে দাও প্লিজ। এখানে থাকলে আমি হয়তো বাঁচবোনা আর। ”
• “ কেনো চলে যেতে চাইছিস বলতো? আমাকে বুঝি তোর আর ভালো লাগছেনা?
• “ ভুল বুঝোনা আপু, আমি সত্যিই বলছি এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে।”
• “ ওকে তাই হবে, তুই চলে যা, আমার কেউ নেই, আমি একা , একাই থাকবো। ”
আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে রুম থেকে বেরিয়ে আসে, সাইমার সামনে পড়ে।

• “ আপু আপনি কাঁদছেন কেনো? ”
• “ তুমি আলিফকে সব বলে দিয়েছো তাইনা!”

সাইমা চুপ করে আছে, কিছুই বলছেনা।
• “ কি হলো, চুপ করে আছো কেনো?
• “ আলিফ আমার মুখ দেখে সব বুঝে নিয়েছিলো, তাই বলতে বাধ্য হয়েছি। ”
• “ খুব ভালো প্লান করেছিলে, ভাই কে কেড়ে নেওয়ার। যাও তোমরা মুক্ত এখন। ”
• “ মানে? ”

আফিয়া চলে যায় সাইমার সামনে থেকে।

সাইমা আলিফের সামনে গিয়ে বসে, আলিফ সাইমার গালে হাত দেয়। কিছুক্ষণ পর সরিয়ে নেয়, এরপর বললো,

• “ নাই বা হলে তুমি আমার এই পৃথিবী তে,
চাইবোনা আর অধিকার তোমার কাছে।
মনের মাঝে রাখবোনা আর কোনো আফসোস,
তোমার সুখের মাঝেই খুঁজবো নিজের সুখ। ”

সাইমা কেঁদে দেয়, এরপর বললো,

• “ তুমি চাইলে আমি সব ভুলে তোমার সাথে থাকতে চাইবো, শুধু আমার মেয়েটা কে এনে দিও তাহলেই হবে। ”
• “ তুমি চাওনা! তাইতো? ”
• “ আলিফ ”
• “ আমি জানি, আমাকে মৃত ভেবে তোমার হাজবেন্ড কে ভালোবেসে ফেলেছো!”
• “ এভাবে বলোনা! খুব কষ্ট হয় আমার। ”
• “ সরি, অনেক কষ্ট পেয়েছো জীবনে। আর কষ্ট দিবোনা তোমায়। ”
• “ তুমিও তো কম কষ্ট পাওনি জীবনে। আমার জন্য তোমার সব স্বপ্ন ভেঙে গেছে, তিন টা বছর মৃত্যুর সাথে লড়াই করেছো ! অথচ আমি, তোমায় ভুলে নতুন জীবন সাজিয়েছি। আমি তোমার কাছে অপরাধী আলিফ। ”
• “ তাহলে থেকে যাও আমার কাছে…. ”

চলবে…

( আমার মা রোজার আগের দিন থেকে অসুস্থ, এছাড়া ৩০ এপ্রিল আমার রেজাল্ট হয়েছে। ইন্টার্নি কোন হাসপাতালে নিবো সেটা নিয়ে কলেজে অনেক দৌড়াদৌড়ি করতে হচ্ছে। বাসায় মা অসুখ, রান্নায় সাহায্য করা লাগছে। এ কদিন ঠিক মতো ঘুমাতেও পারিনি। এতোটা ব্যস্ততা, তিন দিন একটু একটু করে লিখে আজ দিলাম। নেক্সট কবে দিবো জানিনা, কারণ রোজার মাস, এতো ব্যস্ততা, সাথে আমার অসুস্থতা। ডক্টর বলেছে অপারেশন লাগবে আমার। রোজার জন্য করাচ্ছি না। ঈদের পর হয়তো করাতে হবে অপারেশন। আমার টিউমার হয়েছে, আর টিউমার যত দিন যাচ্ছে বড় হচ্ছে। অপারেশন এর পর হয়তো সুস্থ হবো আর না হলে নয়। এই গল্প শেষ করে ঈদের আগে আর নতুন কিছু সম্ভব না। যারা মেসেজ দেন, আমি মেসেজের রিপ্লে দিতে পারিনা সেইজন্য দুঃখিত। )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here