হৃদস্পর্শ পর্ব ১৮

হৃদস্পর্শ পর্ব ১৮
লিখা : জামিয়া পারভীন তানি

 

১৫ দিন পার হয়ে গেছে সাইমার জীবনের ভয়াবহ ঘটনার। সাইমা অনেকটা মানষিক ডিপ্রেশন এর মধ্যে আছে। যে বাবা মায়ের উপর রাগ করে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলো, তাদের কোন দোষ ছিলো না। অথচ তাদেরকে কতো অভিশাপ দিয়েছিলো মনে মনে। যখন তারা দুনিয়া থেকে বিদায় নিলো তখন তাদের সম্পর্কে ভুল ভাঙে। ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ টাই পেলোনা সে। ভাগ্যিস শ্বশুর বেঁচে ছিলো না, নইলে হয়তো বাবা মা, শ্বশুর শাশুড়ি সবাই তার দোষে মারা যেতো।

সজলের রিসিপশনের অনুষ্ঠান পরেরদিন, যেহুতু আগেই দাওয়াত দেওয়া হয়ে গিয়েছিলো তাই আর অনুষ্ঠান ক্যান্সিল করতে পারেনি। সজীব ও চাচ্ছিলো বাসায় একটা অনুষ্ঠান হোক, অন্ততঃ সাইমার মুখে যেনো হাসি ফিরে আসে সেই জন্য। অনেক আত্মীয়রা আসবে, তাদের সাথে কথা হলে সাইমার দুঃখ টা একটু হলেও কমবে। তাছাড়া ফুপিকে তো সাইমা খুব পছন্দ করে।

স্নেহা এখন অনেকটা সুস্থ, শুধু হাতের এক্সেরসাইজ রোজ করাতে হচ্ছে। নইলে হাত শক্ত হয়ে যেতে পারে। সাইমা স্নেহাকে খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়, তখন দেখে সজীব দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। সাইমা শুকনো হাসি দেয়। সজীব এগিয়ে আসে, সাইমার হাত ধরে। সাইমার হাতে ঠোঁটের আলতো পরশ দিয়ে বললো,

• “ আর কতো কাল এভাবে থাকবে? একটু হাসো, সব বিপদ থেকে তো আমরা এখন মুক্তি পেয়েছি। ”
• “ আমার নিজেকে খুব অপরাধী লাগছে! মনে হচ্ছে আমি পাপী।”
• “ ধৈর্য ধরো সাইমা! কারণ মহান আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং ধৈর্য ধারনের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কর” (সূরা আল ইমরানঃ ২০০ আয়াত)।
জামিয়া পারভীন তানি
আল্লাহ হয়তো আমাদের মেয়ের বিপদ দিয়েই আমাদের পরীক্ষা করছেন!
“আমি অবশ্যই তোমাদেরকে ভয় ক্ষুধা এবং তোমাদের জান, মাল ও শস্যের ক্ষতি সাধন করে পরীক্ষা করব।(এ পরীক্ষায়) ধৈর্যশীলদেরকে সুখবর দাও”(সূরা বাকারাঃ ১৫৫ আয়াত)।
আমরা আমাদের পুরষ্কার পাবোই দেখো একদিন!
“ধৈর্যশীলদেরকে অগণিত পুরস্কার পূর্ণভাবে দেয়া হবে” (সূরা যুমারঃ ১০আয়াত)।

তুমি আমাকে ক্ষমা করো আমিও তোমাকে ক্ষমা করে দিই, চলোনা নতুন ভাবে আবার আমরা শুরু করি সব কিছু!
“যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয়, সেটা দৃঢ় মনোভাবেরই অন্তর্ভুক্ত” (সূরা শূরাঃ৪৩)।

তুমি তো আমার ভালো বউ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো, বাচ্চা সামলিয়ে কোরআন শরীফ পড়ো, তুমি তো আমার থেকে ভালো জানো সাইমা। তাছাড়া তুমি যথেষ্ট পর্দানশীল মেয়ে, তোমাকে পরীক্ষা করে আল্লাহ খাঁটি মানুষ বানিয়ে নিচ্ছেন।
“ধৈর্য ও নামাযের মাধ্যমে তোমরা সাহায্য প্রার্থনা কর। আল্লাহ নিশ্চয় ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন” (সূরা বাকারাঃ ১৫৩ আয়াত)।
“আমি তোমাদেরকে পরীক্ষা করব, যাতে তোমাদের মধ্যকার মুজাহিদ ও ধৈর্যশীলদেরকে চিনে নিতে পারি” (সূরা মুহাম্মাদঃ ৩১ আয়াত)।

• সজীব কিছুক্ষণ থেমে আবার বলে, “এখনো কি মুখ গোমড়া করে থাকবে? ”
জামিয়া পারভীন তানি
সাইমা সজীব কে জড়িয়ে ধরে, এরপর বলে,

• “ জানো! আমি খুব পাপবোধ ফিল করতাম। কারণ আমি ভাবতাম আমি কাউকে ডিভোর্স দিয়েছি, যেখানে ইসলামে ডিভোর্স কে খুব ঘৃণার চোখে দেখা হয়। যখন রেহানের কাছে জানতে পারলাম ওটা কোনো বিয়ে ছিলো না, টাকার খেলা ছিলো মাত্র। তখন আমি বাসায় এসেই নফল নামাজ পড়েছি। আর এখন কি মনে হচ্ছে জানো! আমার জীবনে এতো বিপদ না আসলে তোমার মতো ভালো স্বামী পেতাম না। খুব খুব খুব ভালোবাসি তোমাকে। তোমার হৃদয়ের স্পর্শে আমি নতুন একটা জীবন পেয়েছি, ভালোবাসা পেয়েছি, সাথে আমার রাজকুমারী কেও পেয়েছি। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া যে আমি এতো কিছু পেয়েছি, তারপর ও আমার মন খারাপ করা আসলেই উচিৎ না। ”

সজীব সাইমাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে নেয়, শক্ত করে! যেনো এই বাঁধন ছিড়ে না যায়। সজীব একটু দুষ্টুমি করে বললো,

• “ আচ্ছা সাইমা বুড়ি! তুমি তো আগে আলিফকে ভালোবাসতে, তাহলে এখন আমার প্রেমে কেনো পড়লে? আর আমি মরে গেলে আবার যদি তুমি অন্য কারোর প্রেমে পড়ে যাও তার ভয় হয়। ”
• “ আলিফ কে আল্লাহ আমার করে পাঠাননি! তাই ওকে ভুলে গেছি। আর তুমি আমার বৈধ হাজবেন্ড, তোমাকে আমার জোড়া করে আল্লাহ পাঠিয়েছেন। তাই আমি তোমাকে এখন খুব ভালোবাসি। আর যদি! মরে যাও তখন যার সাথে আমার বিয়ে হবে তাকে ভালোবাসবো। ”

সজীব সাইমার দিকে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকায়, এরপর বললো

• “ কিহহহহ!”
• “ যেমন প্রশ্ন তেমন উত্তর। হিহি”
জামিয়া পারভীন তানি
সাইমার মুচকি হাসি তে সজীব পাগল হয়ে যায়। যার ঠোঁটের এক চিলতে হাসি দেখার জন্য এতো দিন পাগল হয়ে ছিলো তাকে আজ হাসাতে পেরেছে। এটাই সজীবের কাছে রাজ্য জয় করার সমান। সাইমার হাসি মাখা ঠোঁট দুটো নিজের দখলে নিয়ে নেয়। সাইমা সজীবের স্পর্শে বারবার শিহরিত হয় , নতুন করে ভালোবাসার ইচ্ছে হয়। দুজনের হৃদয়ের টান ভালোবাসার অসীম সীমানায় পৌঁছে যায়।

°°°

পার্লার থেকে একজন কে আনা হয়েছে মেহেদী পড়িয়ে দেওয়ার জন্য। প্রথমে সুপ্তি কে মেহেদী পড়িয়ে দেয়, এরপর সাইমার ইচ্ছেতে স্নেহাকেও মেহেদী দেয় অল্প একটু। স্নেহার দায়িত্ব রাহিলা কে দিয়ে দুই হাত ভর্তি করে মেহেদী দেয় সাইমা।

সাইমার দুই হাত ব্লক আবার সুপ্তির হাত ও ব্লক। দুইজনে এবার সজীব কে জ্বালিয়ে খাচ্ছে, একবার সুপ্তি বলছে,
• “ ভাইয়া, পিঠ চুলকাচ্ছে, একটু চুলকিয়ে দাও না! ” সজীব বাধ্য ছেলের মতো কথা শুনছে।
জামিয়া পারভীন তানি
আরেকবার সাইমা বলছে,
• “ শোনোনা! চুলগুলো বেঁধে দাও না, বিরক্ত লাগছে, খুব গরম। ” সজীব সাইমার চুলগুলো কাঁকড়া দিয়ে বেঁধে দেয়।
ওদের দুজনের হুকুম শুনতে শুনতে সজীব এবার বলে,

• “ ভাগ্যিস, মাহিরাকে ওর বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো, নইলে ওকেও তোদের মতো চুলকিয়ে দিতাম। ”

সাইমা সজীবের কথা শুনে সজীবের হাতের উপর কিল বসিয়ে দেয়। সজীব উঁহু করে লাফিয়ে উঠে। তখন সাইমা বলে,

• “ খুবশখ তানা চুলকিয়ে দেওয়ার, আসো আমি তোমাকে চুলকিয়ে দিই।” এই বলে সজীব এর গাল দুটো টেনে ধরে।

সজীব সাইমার হাত সরিয়ে দিয়ে বলে ,
• “ আমাকেও মেহেদী দিয়ে সাজাবে নাকি? গাল তো লাল হয়ে যাবে। ”
• “ তুমি এমনিতেই লাল! তাই তোমাকে খয়েরী বাবু বানিয়ে দিলাম। ”
• “ কিহহহহহহ!”

সজীব আয়নাতে নিজের মুখ আর হাত দেখে তাড়াতাড়ি করে ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ ধোয়া শুরু করে। সাইমা ও হাত ধুয়ে নেয়, মেহেদী গোটা হাতে লেপ্টে গেছে একেবারে। আর এদিকে সুপ্তি সজীবের কাণ্ড দেখে হেসে খুন হয়ে যাচ্ছে।

সজীব সাইমার সামনে এসে বলে,

• “কাল অনুষ্ঠান! এখন আমি কি বলবো সবাইকে?”
• “ বলবে, বউ মেহেদী দিয়ে ঘুমিয়েছিল, খেয়াল করিনি, যখন আদর করতে গিয়েছি তখন বউ মেহেদী মাখিয়ে দিয়েছে। ”
• সজীব এর মুখ লাল হয়ে আছে, “ এই পাগলী বোনের সামনে এসব কি বলো!”
• সাইমা সুপ্তির দিকে ২৪ টা দাঁত বের করে বলে, “ এহহহহ! মনে হচ্ছে ও আদর খায় না! ”

জামিয়া পারভীন তানি
সুপ্তি লজ্জায় পালিয়ে যায় নিজের ঘরে।

সজীব সাইমার গালে নিজের গাল ঘষে দিয়ে বলে,
• “ আদরের চিহ্ন না হয় তোমার ও থাক!”

সাইমা লজ্জা পেয়ে পালিয়ে আসে, উপরে এসে দেখে সুপ্তি বেলকনিতে বসে আছে। সাইমাকে দেখেই সুপ্তি বললো,
• “ তুমি খুব খারাপ ভাবী! খুব লজ্জা দিয়েছো আমাকে। ”
• “ ইসসরে! বরের সাথে রোমান্স করতে লজ্জা লাগেনা বুঝি?”
• “ উঁহু ”
• “ কি? ”
• “ আচ্ছা ভাবী! ওর কি এখুনি যেতে হলো! ভাইয়ার বিয়ের অনুষ্ঠানের পরই না হয় যেতো! ”
• “ হয়তো জরুরী কাজ ওর!, যাওয়ার সময় তোকে কি বলে গিয়েছিল রেহান? কবে আসবে কিছু বলেনি? ”
• না গো! বুঝতে পারছিনা! হটাৎ করে ওর বিদেশ কেনো যাওয়া লাগলো? ও কি আমাকে ভুলে যাবে ভাবী?”

সাইমা সুপ্তির এমন কথাতে একটু চিন্তিত হয়, আসলেই তো রেহান কেনোই বা গেলো! কবে ফিরে আসবে কিছুই বলে যায়নি। তবুও সুপ্তির দিকে তাকিয়ে সুন্দর একটা হাসি দেয়, এরপর বলে,

• “ রেহান ঠিক ফিরে এসে তোমাকে সারপ্রাইজ দিবে দেখো!”
• “ সারপ্রাইজ! আমার খুব ভালো লাগে। ”
জামিয়া পারভীন তানি
চলবে……

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here