হৃদস্পর্শ পর্ব ১৪

হৃদস্পর্শ পর্ব ১৪
লিখাঃ জামিয়া পারভীন তানি

রেহান সজীব কে মুচকি হাসি দিয়ে ভুলিয়ে দেয়, আস্তে করে বলে,
• “ আপনি আলিফের কথা জানেন? ”
• “ না জানার কি আছে! সাইমার অতীত সব কিছুই আমি জানি! ”
• “ তাই তো, হাজবেন্ড ওয়াইফের মাঝে কোন কিছু গোপন থাকা ভালো না। এতে দূরত্ব বাড়ে।”
• “ অবশ্য সাইমা এখনো মনে মনে কষ্ট পায়, অতীতের স্মৃতি ভোলা এতো সহজ নয়। ”
• “ ভাবী তার মানে কি এখনো ভাইকে ভালোবাসে? ”
• “ হয়তো বাসে, এটা তার ব্যপার। তার অতীত ভুলে বর্তমান নিয়েই ভাবা উচিৎ। তা আলিফ এখন কোথায়? ”
• “ কেনো জানেননা? ”
• “ কিভাবে জানবো! সাইমা তো নিজেই জানেনা। আমাকে কিভাবে বলবে। ও তো এখনো আলিফ কে খোঁজ করে। ”
• “ আমি তো ভাবি সাইমা ভাবী ভাইকে হত্যা করেছে!”
• “ কিহহহহ! আলিফ মারা গেছে! ”
• “ যেদিন উনার বিয়ে হয়েছিলো সেদিন ই তো আলিফকে হত্যা করা হয়। ”
• “ সেদিন থেকে সাইমা আলিফকে পাগলের মতো খুঁজেছে! তাহলে কে হত্যা করেছে আলিফকে? ওর বাবা মা! ”
• “ আপনি জানেন না! ”
• “ সাইমার সাথে পরিচয় হয়েছে ওর ডিভোর্স এর ৬ মাস পর! কিভাবে জানবো!”
• “ মানে কি! ”
• “ এটাই সত্য, সাইমাকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো! দুইদিন পর সুযোগ বুঝে বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। বন্ধু বান্ধবী দের সাহায্য নিয়ে ডিভোর্স করিয়ে নেয়। অনেক স্ট্রাগল করে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে। এরপর আমার সাথে পরিচয়, সব সময় আলিফের কথা বলতো। মাঝে মাঝে কাঁদতো, আলিফ ধোঁকা দিয়েছে এই বলে। ওর বিপদে ওকে একা ছেড়ে দিয়েছে এই কথা বলতো। ওর ছন্নছাড়া জীবন, একা একা থাকা, এইসব দেখে ওকে পছন্দ করেছিলাম। কিন্তু বিয়েটা করতে ওকে বাধ্য করেছিলাম বলে এখনও আমাকে ক্ষমা করতে পারেনি। ”
• “ আপনাকে কিছু বলার ছিলো! আমি আলিফের ভাই না! ” রেহানের সত্যতা সব স্বীকার করে সজীবের কাছে।

°°°

সজীব ঘরে গিয়ে দেখে সাইমা ফুঁপিয়ে কাঁদছে! মেয়ের মাথার কাছে বসে।
• “ কি হয়েছে, এভাবে কাঁদছো কেনো!” সজীব সাইমার পাশে বসে সাইমাকে জিজ্ঞেস করে।

সাইমা সজীবের বুকে মাথা রাখে, এরপর চোখ মুছে বলে,

• “ ও ভাবছে আমি আলিফকে হত্যা করেছি! ও প্রতিশোধ নিতে চায়। ”
• “ যা হবার হয়েছে! কাল তুমি যাচ্ছো রেহানের সাথে। ”
• “ রেহান আমার ভালো চায়না! সে আমার সাথে বাজে বিহেভ করেছে আজ। তুমি যাবে আমার সাথে। ”
• “ ওকে সব বুঝিয়ে বলেছি! ও তোমার আর ক্ষতি করবেনা ময়না! তোমাকে নিয়ে রেহানের মনে যতো অভিযোগ ছিলো সব দূর হয়ে গেছে। এখন তুমি নিশ্চিন্তে ওর সাথে তোমাদের বাসায় যেতে পারো। আর একটা কথা, আমিও যাবো কিন্তু একদিন পর। যা প্লান করার করেছি, আর চিন্তা নাই তোমার। তোমার ভালোবাসার মানুষের আত্মা এবার জাস্টিস পাবে। মন খারাপ করোনা, তুমি এখন শুধুই আমার। পরকালে যদি তাকে চাও তো চলে যেও, কিন্তু এখন শুধু আমার। ”
• “ ও যদি আমার হতো তবে ওকে আমি পেতাম ই। আল্লাহ ওকে আমার ভাগ্যে লিখেনি সজীব। আমার ভাগ্যে তুমি আছো! তোমার সাথে ই থাকতে চাই ইহকালে ও পরকালে ও। আলিফকে ভালোবাসতাম! তাই চাই ও ন্যায়বিচার পাক। ওকে তো আমার জন্যই ওরা মেরে ফেলেছে! ওদের কাউকে ছাড়বোনা আমি! কাউকেই না! ”

সজীব সাইমার কপালে চুমু এঁকে দেয়,
এরপর বলে,
• “ তুমি আমাকে ভালোবাসো সাইমা!”
• “ হুমম, অনেক বেশী। আর কেনো তোমাকে ভালোবাসি জানো! তুমি আমার অতীত জানো! জেনেও আমায় কতো ভালোবাসো! এইজন্য ই তোমাকে প্রেমে পড়তে আমি বাধ্য সজীব। আমি অতীত ভুলে তোমার সাথে সুন্দর ভবিষ্যৎ কাটাতে চাই। চলো বারান্দায় যাই, আজ সারারাত তোমার সাথে গল্প করবো। ”

°°°

রেহান ঘরে এসে দেখে সুপ্তি সোফাতেই ঘুমিয়ে আছে, “ কি নিষ্পাপ মেয়েটা! ওকে কষ্ট দেওয়ার কোন মানেই হয়না। কি দরকার মাহিরার ভালোবাসার ঘর ভাঙার! এই মেয়েটা তো আমাকে কম ভালোবাসে না! ওর জন্যই না হয় নতুন করে ভালোবাসবো!”

রেহান সুপ্তির পাশে বসে, সুপ্তির মুখের উপর ফুঁ দেয়। সুপ্তি নড়ে চড়ে উঠে, কিন্তু আবার ঘুমিয়ে যায়। রেহান এবার সুপ্তির কানে জোরে করে ফুঁ দেয়, সুপ্তি ঘুমের ঘোরে “ উউউ ” শব্দ করে রেহানের মুখে হাত দিয়ে সরিয়ে দিতে চায়। রেহান হাত টা ধরে একটা আঙুল কামড়িয়ে দেয়। সুপ্তি উফফ বলে তাড়াতাড়ি করে উঠে দাড়াতে গিয়ে রেহানের উপর পড়ে যায়। জর্জেট এর শাড়ি পড়ে ছিলো সুপ্তি, লাল রঙের শাড়ি, ফরসা গাল, চোখে গাড় কাজল লেপ্টে আছে, চোখে ঢুলুঢুলু ভাব, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক, সুপ্তির উপর রেহানের আকর্ষণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সুপ্তি এই প্রথম কোন ছেলের বুকের সাথে লেপ্টে আছে, হৃদস্পন্দন বেড়েই চলছে সুপ্তির। এতো ঘনঘন নিঃশ্বাস ছাড়ছে দুজনে। দুজনের হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে। রেহান সুপ্তির ঠোঁটে নিজের ঠোঁট দিয়ে আবদ্ধ করে, সুপ্তি লজ্জ্বায় চোখ বন্ধ করে ফেলে। হাত দিয়ে রেহান কে খামচিয়ে ধরতে গিয়ে রেহানের গলায় নখ বসিয়ে দেয়।

• “ বাঘিনী! আমার গলা তো ছিলে দিলে, থামো তোমার জন্য সিংহ হতে হবে! ”

একথা বলে মুচকি হাসি দিয়ে সুপ্তি কে কোলে তুলে নেয়, বেডে গিয়ে শুইয়ে দেয়। ভালোবাসার পরশে একে অপরের মাঝে ডুবে যায়।

°°°

বেলকনি তে বসে সজীবের সাথে গল্প করতে করতে কখন যে সাইমা ঘুমিয়ে গেছে নিজেও জানেনা! সকালে ঘুম থেকে উঠে খেয়াল করে সজীবের পেটের সাথে মাথা গুঁজে শুয়ে আছে সাইমা। সজীব ও সোফায় হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। সাইমা মাথা তুলে সজীব এর দিকে একবার দেখে। এরপর সজীবের পেটে আস্তে করে কামড় দেয়। সজীব লাফ দিয়ে উঠে,

• “ জংলী বিল্লী, দেখাচ্ছি মজা! ”
সাইমা হাসতে হাসতে দৌড়ে পালায়, ঘরের এই মাথা থেকে ও মাথা দুজন মিলে দৌড়াদৌড়ি করে। একসময় সাইমাকে সজীব ধরে ফেললে সাইমা ব্যালেন্স হারিয়ে বেডের উপর পড়ে, সজীব সাইমার উপরে পড়ে। সজীব সাইমার ঠোঁট অনেক্ষণ নিজের আয়ত্ত্বে রাখে। সজীবের স্পর্শ গুলো সাইমাকে আজ পাগল করে দিচ্ছে। এতোটা ভালোলাগা, সজীবের সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে। জোর করে সম্পর্ক করলে ভালোলাগা গুলো থাকেনা। কিন্তু ভালোবাসার সম্পর্ক গুলো তে আত্মার ও মিলন ঘটে।

হটাৎ স্নেহা কান্না করে উঠে, সাইমা মেয়ের কান্নাতে উঠতে চাচ্ছে, সজীব ছাড়ছে না।

• “ আহা! ছাড়ো তো, মেয়ে কাঁদছে তো!”
• “ আরেকটু থাকো আমার কাছে! মেয়েকে তো সব সময় ই আদর করো, আমাকে আদর করতে গেলেই তোমার মেয়ে হিংসা করে। তোমাকে কেঁড়ে নেয় আমার কাছে থেকে। ”
• “ ন্যাকামি করতে হবেনা! ও কাঁদছে, ক্ষুধা পেয়েছে হয়তো। ”
• “ না একটু পর!”

সজীব সাইমার শরীরে ভালোবাসার স্পর্শ দিতেই আছে, সাইমা সজীব কে ঠেলে দিয়ে উঠে যায়।
স্নেহা কে কোলে নিয়ে কাপড় চেঞ্জ করে দেয়, সজীব সাইমাকে কাতুকুতু দিয়ে বিরক্ত করতে থাকে। সাইমা স্নেহা কে তাড়াহুড়ো করে খাইয়ে বেডে শুইয়ে দেয়। এরপর সজীব এর দিকে তাকায়। স্নেহার নোংরা কাপড় গুলো হাতে নেয়, এরপর সজীব এর দিকে এগিয়ে যায়।

• “ কি কি কি করতে চাচ্ছো! ” সজীব ভয় পেয়ে যায়।
• “ এগুলো দিয়ে তোমাকে আদর করবো, কাছে এসো, পালিয়ে যাচ্ছো কেনো? ”
• “ দেখছো স্নেহা, তোমার আম্মু কতো বিচ্ছু! তোমাকে আদর করে আর আমাকে টর্চার! ”

সজীব এক লাফে ঘর থেকে পালিয়ে যায়, সাইমা সজীবের কাণ্ড দেখে হাসতে থাকে।

°°°

সকালে নাস্তার টেবিলে সবাই একসাথে খেতে বসে, মাহিরা খুব ভীতু চোখে রেহানকে পর্যবেক্ষণ করছে। রেহান এটা দেখে সবার সামনে বলে উঠে,

• “ আমার বিয়ে তো মাহিরার সাথে ঠিক হয়েই গিয়েছিলো ! মাহিরা পালিয়ে না গেলে ও আমার বউ হতো! ”

সুপ্তি মাহিরা দুজনে ই খাবার মধ্যে কাশতে শুরু করে। সুপ্তির দিকে একগ্লাস পানি এগিয়ে দেয় রেহান। মাহিরাও ভয় পেয়ে যায় সবার সামনে ।

সুপ্তির কাশি কমলে সুপ্তি রেহানের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকায়, রেহান বলে,

• “ জুটি তো আগে থেকেই ঠিক থাকে! এইজন্যই তো মাহিরা পালিয়ে গিয়ে সুপ্তির মতো সুন্দরী বউ পেয়েছি! অবশ্য মাহিরার এক চোখ ট্যারা ছিলো, সুপ্তি তো একদম নিখুঁত। ”

মাহিরা এবার রেগে যায়,

• “ আমার চোখ ট্যারা! ফাইজলামি করেন! আপনার নাক বোচা! নিজের খুঁত ঢাকতে আমাকে ব্লেম করেন! ”

রেহান তখন বলে,

• “ আরে তুমি তো কথাও তোতলিয়ে বলো! বেঁচে গেছি তোতলা মেয়ে বিয়ে করতে হয়নি! ”

সজীব আর সজল মুখ চেপে হাসছে, মাহিরার সজলের দিকে চোখ পড়তেই রাগ উঠে যায়। পাশের ফ্রিজ থেকে ডিম এনে সজলের মুখে মাখিয়ে দেয়,

• “ হাসো! আরোও হাসো। হাসলে তো তোমায় সুন্দর লাগে তাই ফেসিয়াল করিয়ে দিলাম। ”

রেহান ডাইনিং ছেড়ে পালিয়েছে মাহিরার কীর্তি দেখে ।

চলবে……

এখন থেকে গল্প দিতে রাত ১০ টাও বাজতে পারে। পরেরদিন পড়ে নিবেন, গল্প শেষ না করেই অনেকে খারাপ মন্তব্য করেন। আশা করি কেউ খারাপ মন্তব্য করবেন না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here