হৃদস্পর্শ পর্ব ১৩

হৃদস্পর্শ পর্ব ১৩
#লিখা : জামিয়া পারভীন তানি

সাইমা উঠে দাড়ালো, এরপর সজীবের সামনে গিয়ে সজীবের গলা জড়িয়ে ধরে।

• “ আমাকে ভুল বুঝোনা! আমি আমার অতীত সত্যিই ভুলতে চাই। তাছাড়া তোমাকে আগে না ভালোবাসলেও এখন অনেক ভালোবাসি!”
• “ ও তাই বুঝি! তাহলে এতো আলিফ আলিফ করছো কেন? ”
• “ রেহান দেখতে পুরোপুরি আলিফের মতো! কিন্তু কিভাবে তা বুঝতে পারছিনা আমি। আমি জানি ও আলিফ হতেই পারেনা। কারণ আলিফের হাসি এমন নয়। ”
• “ তুমি কি পাগল হয়ে গেছো! কি বলছো এইসব। ”
• “ বুঝতে পারছিনা আমি। পরে তোমাকে বুঝিয়ে বলবো। ”

সজীব কে বুকের সাথে জড়িয়ে রাখে সাইমা। সজীব ও সাইমাকে জড়িয়ে ধরে বললো,
• “ আজ কতো দিন পর তোমাকে কাছে পেয়েছি তা কি জানো! ”
• “ ভুলে ই তো গিয়েছিলে আমায়, তোমার অবহেলা কতো কষ্ট দিতো আমাকে তা কি তুমি জানো!”
• “ ভুলিনি! তোমাকে দেখার পর থেকে তোমাকে ভালোবাসি, তোমার অতীত জেনেও ভালোবেসেছি। হয়তো বিয়েটা জোর করে করেছিলাম। কারণ জানতাম জোর না করলে তুমি আর কখনো বিয়েই করবেনা। তোমার সাথে রাগারাগি, ভুল বুঝাবুঝি দুরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। দুজনের সমপরিমাণ রাগ, মায়ের মৃত্যু, বিজনেস এর পুরো ভার আমার কাঁধে। সব মিলিয়ে আমি যেনো মানব যন্ত্র হয়ে গিয়েছিলাম। সজল কে আজ কাজ বুঝিয়ে দিয়ে তোমার সাথে কাটাতে পেরেছি সময় । বিয়ের পর থেকে এতোদিন তোমার সাথে ভালো করে কথা পর্যন্ত বলা হয়ে উঠে নি। আজও নিজের রাগের বশে তোমায় বকাবকি করে ফেললাম। মাফ করে দিও সাইমা, আমার প্রাণের স্ত্রী, আমার ভালোবাসা। ”
• “ আমি তোমাকে আগে ভালোবাসতাম না! সব সময় আলিফের কথা চিন্তা করতাম। যখন ফুপি বুঝিয়ে দিয়েছিলো স্বামী ছাড়া অন্য কাউকে না ভাবতে, তখন থেকে নামায পড়া শুরু করেছিলাম। বিশ্বাস করো! তখন থেকেই একটু একটু করে তোমার প্রেমে পড়েছিলাম। তোমার অবহেলা আমাকে তোমার দিকে আকৃষ্ট করেছে। আমিও তোমাকে খুব ভালোবাসি! কিন্তু কথা দিতে হবে আমি যা করবো তার জন্য তুমি আমাকে ভুল বুঝবেনা আর। ”
• “ কি করতে চাও!”
• “ রাগ করোনা! এটা আমার আগেই করা উচিৎ ছিল। আমি আমার বাবা মায়ের সাথে যোগাযোগ করতে চাই। ”
• “ হুম, আমিও এই বিষয়ে চিন্তা করেছিলাম, বেমালুম ভুলে গিয়েছিলাম এই বিষয় টা। ”
• “ যদি কিছু মনে না করো, কালই যেতে চাই। ”
• “ জো হুকুম লাল সুন্দরী! ”
• “ কি বলো এইসব! আমি লাল নাকি! ”
• “ তাইতো, লাল টকটকে তোমার গাল, সব সময় রক্তবর্ণ ধরে থাকে। লাল সুন্দরী ই তো! ”
• “ আর তুমি লাল বান্দর! ” সাইমা হাসতে শুরু করে।

সজীব সাইমার কপালে ভালোবাসার স্পর্শ দেয়। আজ অনেকদিন পর সাইমা সজীবের পাশে রাত্রে শুয়ে আছে। সজীব ঘুমিয়ে পড়লে সাইমা সজীবের হাত আলতো করে সরিয়ে দেয়। উঠে আসে বেড থেকে। ধীরে ধীরে নিচে নেমে আসে। ড্রইং রুমে দরজা ভিড়ানো ছিলো। দরজা টা ভিতর থেকে লাগিয়ে দেয়। আলিফের মামনি আসমা খানমের পায়ের কাছে বসে সাইমা।

একবার আলিফের সাথে নদীর চরে দৌড় প্রতিযোগিতা করছিলো দুইজনে। আলিফ জিতে গিয়েছিলো বলে সাইমা আলিফের পিঠে অনেকগুলো কিল মেরেছিলো। দুজন দুজনকে বালু দিতে সাদা ভুত বানিয়ে ফেলেছিলো। স্মৃতি গুলো মনে পড়তেই সাইমা ডুকরে কেঁদে উঠে। আসমা খানম উঠে বসে,

• “ কি দোষ করেছিলো আমার ছেলেটা! ওকে এভাবে মেরে ফেললে কেনো সাইমা! ”
• “ কি বলছেন মামনি! আলিফ মরতে পারেনা! ও নিশ্চিত বেঁচে আছে। ”
• “ আমার ছেলেটাকে হত্যা করে স্বামীর সংসার করছো তুমি! শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে। ”
• “ মামনি, এসব মিথ্যা,আলিফ বেঁচে আছে, আমার মন সব সময় বলে ও ভালো আছে। আমি আলিফকে অনেক খুঁজেছি। কিন্তু কোথাও পাইনি, তার মানে এই নয়্ যে ও মরে গেছে। ”
• “ কিভাবে পারোও একজনের লাশের উপর আরেকজনের সাথে সংসার করতে! ”
• “ বিশ্বাস করুন! আমি এসব কিছুই জানিনা! আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়েছিলো, দুইদিন পর সুযোগ পেয়ে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর আলিফের খোঁজ করি অনেক। কোথাও পাইনি আমার আলিফকে। ”
• “ কোথাও খুঁজে পাওনি বলেই আবার সংসার করতে শুরু করলে। ”
• “ আপনি ভুল বুঝছেন, সজীব এর সাথে বিয়ে হয়েছে এক বছর আট মাস। আর ওই ঘটনা তিন বছর আগের। আমি যখন সম্পুর্ণ একা হয়ে গিয়েছিলাম তখন সজীব আমাকে সাপোর্ট করেছে মাত্র। ”
• “ খুবিই ভালো করেছো!”
• “ মামনি প্লিজ রেহান যেনো সুপ্তি কে মেনে নেয়, ওরা সুখে থাকুক এটুকুই চাই আমি। দয়া করে অতীত নিয়ে আর কষ্ট পাবেন না। আমি যদি ভুল করে থাকি তার শাস্তি আল্লাহ আমাকে দিবেন। আপনারা প্লিজ অতীতের জন্য বর্তমান খারাপ করবেন না! সুপ্তি অনেক ভালো মেয়ে, ওকে ছেলের বউ হিসেবে মেনে নিবেন প্লিজ। ”
• “ আমি মানার কে? রেহান কে গিয়ে বলো। সে ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিতে চায়। তোমাকে অনেক কষ্টে খুঁজে বের করেছে। সে কি ছেড়ে দিবে নাকি। ”
• “ তো যা শাস্তি দেওয়ার দিন, মাথা পেতে নিবো। ”
• “ রেহান পুলের ধারে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে, গিয়ে শুনে আসো। ”
• “ জ্বী ”

সাইমা ড্রইং রুম থেকে বের হয়ে পুলের দিকে পা বাড়ায়।

°°°

সজীবের ঘুম ভেঙে সাইমাকে পাশে না দেখে ঘাবড়ে যায়, স্নেহা বেডের ধারে চলে গেছে, পড়ে যেতে পারে। স্নেহাকে ধরে দোলনাতে শুইয়ে দেয়। সজীব প্রথমে ভেবেছিলো সাইমা ওয়াশরুমে, কিন্তু দরজা খোলা দেখে বুঝতে পারে সাইমা বাইরে গেছে।

সজীব নিচে নেমে এসে সাইমাকে মনে মনে খুঁজতে থাকে।

°°°

• “ মি: রেহান, আপনার সব কিছু না জেনে এমন করা কি ঠিক? ”

রেহান সাইমার দিকে ঘুরে তাকায়, পুলের উপর থেকে সাইমার দিকে এগিয়ে আসে। সাইমা নিজেও রেহানের চাহনিতে ভয় পেয়ে যায়।

• “ কি কি কি কি করতে চাচ্ছেন! ”

রেহান সাইমাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে,

• “ দুইটা বছর তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি তোমায় ডার্লিং, তোমার পুরনো প্রেমিক কে একটু সোহাগ করবেনা? ”
• “ আপনি আলিফ না! আলিফ এতো অসভ্য ছিল না। ”
• “ যদি আমি আলিফ না হই তাহলে আমি কে শুনি?”
• “ আমি জানিনা কে আপনি! কি চান আমার কাছে? ছাড়ুন বলছি! ”

সাইমা ছাড়িয়ে নিয়ে চলে যেতে গেলে রেহান সাইমার হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে নিজের কাছে। গলার কাছে এক হাত আরেক হাত পেটে দিয়ে নিজের সাথে জড়িয়ে রাখে। সাইমা চিৎকার করতে লাগলে মুখ চেপে ধরে,

• “ চিতকার করলে লাভ নেই, তুমি নিজেই আমার কাছে এসেছো! আমি যাইনি। তোমার পেয়ারী বর তোমাকে ই ভুল বুঝবে। ”
• “ ঘরে নতুন বউ রেখে আমার সাথে এইরকম করতে লজ্জ্বা করে না! ”
• “ একসময় আমার বুকে লুতুপুতু করতে! ভুলে গেছো। ”
• “ আপনি আলিফ না, আমি জানি! আলিফ এতো অশ্লীল ছিলো না। ”

সাইমার চুল গুলো টেনে ধরে বলে,

• “ অশ্লীলতার কিছুই করিনি কখনো, কতো কিছু ই তো বাকি!”

সাইমা কোনভাবে ছুটে সরে যায়, দাড়িয়ে হাঁপাতে থাকে। তখন সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে সজীব দাড়িয়ে আছে।
সাইমা ভয় পেয়ে যায়, সজীব কে দেখে।

• “ কি ব্যপার, এতো রাতে এখানে কি করছো সাইমা। ” সজীব কৌতূহল বশত জিজ্ঞেস করে।

সাইমা তাড়াহুড়ো করে বলে,

• “ পানি খেতে এসেছিলাম, হটাৎ দেখি পুলের এইদিকে লাইট জ্বলছে। তাই দেখতে এসেছিলাম, উনি এখানে আছে তাই কথা বলছিলাম। ”
• “ ওহহহ, হাপাচ্ছো কেনো এতো তাহলে। ”
• “ আসলে ভয় পেয়ে গেছিলাম! উনি ফাজলামি করে গায়ে তেলাপোকা ছুড়ে মেরেছিলো। ”

সজীবের মনে আবার সন্দেহ জাগে, সাইমা মনে হয় না সত্য বলছে। তারপরও রেহানের দিকে তাকিয়ে হাসলো।
রেহান মনে মনে বলছে, কতো চালাক তুমি সাইমা। বর কে ধোঁকা ভালোই দিতে জানো!”
সাইমা সজীবের থেকে সরে নিজের রুমে চলে আসে। সজীব রেহানের সাথে কথা বলা শুরু করে।

• “ নতুন জায়গা, তাই ঘুম আসছেনা! ” রেহান সজীব কে বলে।
• “ হুমম সবিই তো বুঝলাম! তা আলিফ তোমার বড় না ছোট ভাই ছিলো? ”

রেহান সজীবের দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here