হৃদস্পর্শ পর্ব ১২ 

হৃদস্পর্শ পর্ব ১২
লিখা : জামিয়া পারভীন তানি

সাইমা সজীবের দিক থেকে মুখ সরিয়ে আগুন্তুক এর দিকে তাকিয়ে থ হয়ে দাড়িয়ে থাকে । সুপ্তি খুশিতে আত্মহারা হয়ে ভাই ভাবীর উদ্দেশ্য বলে,

• “ উনি আমাদের ভার্সিটির প্রফেসর, রেহানুজ্জামান। আমি উনাকে খুব পছন্দ করি, অনেক ভালো ও বেসে ফেলেছি এই কয়েকদিনে। উনি আজ আমাকে বলেছে আমাকে বিয়ে করতে চায়। ভাইয়া ভাবী তোমরা কিছু বলো!” সুপ্তি প্রচণ্ড এক্সাইটেড হয়ে কথাগুলো একদমে বলে ফেলে।

সজীব এগিয়ে যায়, রেহানের সাথে হ্যান্ডসেক করে, একে অপরকে সালাম বিনিময় করে। সাইমা থ হয়ে দাড়িয়ে ই থাকে।

সজিবের কথায় রেহান সোফায় বসে, সুপ্তি ও বসে একপাশে। রেহান বলে উঠে,

• “ ভাইয়া আমি কোন প্রকার ভণিতা না করে বলতে চাই, সুপ্তিকে আমি আজই বিয়ে করতে চায়। আপনি চাইলে খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন। আর আমি আমার সব পরিচয় পত্র নিয়েও এসেছি। গাড়িতে অবশ্য আমার মামনি ও আছে। আমার গার্জিয়ানদের উপস্থিতি তেই সুপ্তি কে বিয়ে করতে চাই। ”

সজীব কিছুক্ষণ চুপ হয়ে বসার পর বলে,
• “ আমার বোন টা অনেক আদরের, ও যখন মুখ ফুটে আমার কাছে কিছু চেয়েছে। আমি অবশ্যই দিতে পারি। কিন্তু আজকেই না হয়ে কিছুদিন সময় নিলে হয়না। এতে আপনারা দুইজন দুজন কে বুঝলেন, একটা অনুষ্ঠান এর আয়োজন করতে পারতাম। ”
• “ যত কম খরচ হয় বিয়েতে, সেই বিয়ে বেশী কল্যাণ কর। এই কথার পর আর কোন আপত্তি থাকার কথা না। ” রেহান মুচকি হেসে সাইমার দিকে তাকায়। এরপর আবার বলে,
• “ গাড়িতে উকিল সাহেব, কাজী, আমার মামনি সবাইকে ডাকতে চাচ্ছি। ”

সজীব রাজি হয়ে যায়, সাইমা যেনো অবাক হতে থাকে। মুখের ভাষা যেনো ফুরিয়ে গেছে। চিৎকার করতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু পারছেনা। যেনো অনেক বড় শক লাগলে মানুষ পাথর হয়ে যায়, ঠিক সেভাবে পাথরের মতো দাড়িয়ে থাকে।

সজীব বোনের খুশির জন্য এতো খুশি যে সাইমার মতামত নিতে ভুলে গেছে। ৩০ মিনিটের মধ্যে সুপ্তির সাথে রেহানের বিয়ে যায়। সজীব স্নেহা কে রাহিলার কাছে দিয়ে সব দায়িত্ব পালন করে । সুপ্তির বিয়ের দোয়া যখন কাজী সাহেব পড়াচ্ছে তখন সজল আর মাহিরা বাসায় ঢুকে।

দুজনেই চমকে যায় এই ছোট খাটো বিয়ের অনুষ্ঠান দেখে। সজল জিজ্ঞেস করে,

• “ আমার বোনের বিয়ে দিয়ে দিলে ভাইয়া, আর আমিই জানলাম না। ”
• “ তোর ফোন সাইলেন্ট মোড খুল, দেখ কতবার রিং দিয়েছি। ”
• “ সরি ভাইয়া! আমিও আজ মাহিরা কে বিয়ে করে ফেলেছি। ”
• “ হটাৎ! ”
• “ মাহিরার জেদে! ”
• “ খুব ভালো হয়েছে! ছোট দুই ভাইবোনের বাসর ঘর এই বাড়িতেই সাজাবো। ” উচ্চস্বরে হেসে উঠে সজীব।

মাহিরা সজলের পিছনে গিয়ে দাঁড়ায়। সজল কে বলে,

• “ এই সেই রেহান, যার সাথে আমার বিয়ের কথা হয়েছিলো। ”
• “ কিহহহহহ!”

দুইজনে চমকে গেছে। রেহানকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে দুজনে। রেহান উঠে এসে সজলের সাথে হাত মেলায়,
• “ আরে ছোট সমন্ধী বাবু, অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে হবে, ভবিষ্যৎ এর কথা ভেবে এগিয়ে যেতে হবে। শুধু শুধু অতীতের কথা চিন্তা করে সুপ্তিকে কষ্ট দেওয়া ঠিক মনে করিনি। তাই আপনাকে লুকিয়ে বিয়েটা সেরে নিলাম। ” মুচকি হাসি দিয়ে সজলের দিকে তাকায় রেহান।
• “ ঠিকই তো, সুপ্তি যদি চায়, অবশ্যই আমরা খুশি। ”

রেহান অনেক্ষণ সাইমাকে পর্যবেক্ষণ করে সাইমার কাছে এগিয়ে যায়, সাইমার সামনাসামনি দাড়িয়ে আছে রেহান। সাইমা কোন কথা না বলে রেহানের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে। সজীব সাইমার ব্যপার টা এতক্ষণে খেয়াল করে সাইমার কাছে এগিয়ে আসে। রেহান তখন সাইমার চোখের সামনে হাত দিয়ে তুড়ি মারে।

সাইমা যেনো এতক্ষণ ঘোরের মধ্যে ছিলো, হটাৎ ঘোর কেটে দিয়ে সম্বিত ফিরে পেয়েছে। মুখে শুধু উচ্চারণ করে “ আলিফ ” সাথে সাথেই মাথা ঘুরে পড়ে যেতে নিলে সজীব তাড়াতাড়ি জড়িয়ে ধরে।
• “ সাইমা, এই সাইমা, কি হলো, কথা বলছোনা কেনো! ”
সজীব ঘটনার আকস্মিকতায় কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা। সাইমার এভাবে পড়ে যাওয়া তে সবাই কাছে এগিয়ে এসেছে, রেহান সাইডে সরে আসে।

মুচকি মুচকি হাসতে শুরু করে, মিস সাইমা, আপনার জীবন নরক বানিয়ে দিবে এই রেহান। সবে তো শুরু হলো খেলা।

সজীব সাইমার মুখে পানির ছিটা দিতে সাইমা উঠে বসে, মাথাটা খুব ঝিম ধরে আছে।
তার আলিফ কি তাহলে ফিরে এসেছে! ফিরেই যদি আসবে তাহলে সুপ্তি কে বিয়ে কেনো করলো ।সে কি আমাদেরকে কষ্ট দিতে এসেছে! সেদিনের পর কোথায় হারিয়ে গেলে আলিফ ! আজ কেনো ফিরে আসলে তুমি। কি চাও আমার কাছে? নিজের হাত দিয়ে দুই কান চেপে ধরে চিৎকার করে উঠে। দৌড়ে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়।

অতীতের স্মৃতি, বর্তমানের সংসার সাইমা কে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে আলিফ বলেছিলো,
• “ তোমার হাত দুটি কখনো ই ছেড়ে যাবোনা! সব সময় আগলে রাখবো অনেক যত্ন করে। ”
• “ যদি আমি হারিয়ে যাই! ”
• “ তাহলে আমিও হারিয়ে যাবো চিরতরে। ”
সাইমাকে বুকে জড়িয়ে নেয় পরম আদরে,

• “ তোমার হৃদয়ের মাঝে, আমার সকল সুখ লুকিয়ে আছে।
তোমার মুখ পানে তাকিয়ে, আমার সব যাতনা ভুলে যাই।
তোমার হাত দুটি ধরে আমি, সারাটি জীবন হাটতে চাই।
যদি কখনো তোমায় হারিয়ে ফেলি, আমিই হবো সবচেয়ে বড় অসহায়।
পুরো পৃথিবী খুঁজলে ও দেখবে! আলিফ বলে আর কেউ নাই। ”
• “ আমি কখনোই তোমাকে ছেড়ে যাবোনা আলিফ, মৃত্যু ই একমাত্র আমাদের আলাদা করতে পারবে। ” সাইমা আলিফকে জড়িয়ে ধরে এই প্রতিজ্ঞা করেছিলো।

দরজায় সজীবের ডাকে বর্তমানে ফিরে আসে সাইমা। আলিফ কেনো আমাকে বিপদে রেখে চলে গিয়েছিলে? কেনো আবার আমার জীবনে ফিরে আসলে? কেনো কেনো? এতো যখন ভালোবাসতে! তাহলে কেনো আমার সুখ তোমার সহ্য হচ্ছেনা। আল্লাহকে এতো ডাকলাম, তাও কেনো আমাকে সুখ দিচ্ছেন না! আমাকে আর কতো সহ্য করতে হবে! অতীত ভুলে বর্তমান নিয়ে যখনই সুখে থাকার চেষ্টা করছিলাম তখনই কেনো তোমাকে ফিরে আসতে হবে আলিফ!”

দরজায় সবার ডাকাডাকি তে সাইমা দরজা খুলে দেয়।

• “ আমি ঠিক আছি সজীব! তুমি ভাই বোন দের নতুন সংসার গুছিয়ে দাও। আমি প্লিজ একটু একা থাকতে চাই। ”
• “ কিন্তু! ”
• “ প্লিজ, যাও। ”
• “ হ্যাঁ যাচ্ছি! দরজা লাগাবেনা আর। ”
• “ হু”

সাইমা বেডে শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, কি করবে এখন সে কিছুই বুঝতে পারছেনা।

মাহিরা সজলকে বলে,

• “ আমি জানি সজল, রেহান ঠিক বুঝেছে যে আমি আজই বিয়ে করবো। তাই তোমার বোনকে টোপ হিসেবে ব্যবহার করে এই বাড়িতে ঢুকে গেছে। ”
• “ আরে না না! সুপ্তি বললো তো, রেহানকে কিছুদিন আগে থেকেই পছন্দ করে সে। ”
• “ তুমি বুঝতে পারছোনা কেনো? তাছাড়া রেহান এই কয়দিন এখানে থাকুক। আমি আমাদের বাড়ি যেতে চাই, তুমিও চলো। ”
• “ নাহহ এখন যাওয়া যাবেনা, সুপ্তি কষ্ট পাবে। এখানেই থাকো।

মাহিরা মন খারাপ করে বেডে বসে পড়ে।

°°°

সুপ্তি সোফায় বসে আছে, রেহান রুমে আসাতে উঠে দাড়ালো।
রেহান সুপ্তির খুব কাছে যায়, রেহানের নিঃশ্বাস এ সুপ্তি শিহরিত হয়ে উঠছে। রেহান সুপ্তির ঠোঁটের কাছে ঠোঁট নিয়ে যায়। আস্তে করে সুপ্তিকে বলে,

• “ বিয়ের কথা ভুলে যাও সুপ্তি, আমি তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা কখনোই দিবো না। বিয়েটা তো একটা গেম ছিলো। ”

সুপ্তি এমন মুহুর্তে এই কথা আশা করেনি, বিস্ফোরিত চোখে রেহানের দিকে তাকিয়ে থাকে। রেহান বেডে গিয়ে শুয়ে পড়ে।

সুপ্তি রেহানকে ধাক্কা দিয়ে বলে,
• “ কেনো এমন করলেন আমার সাথে ? ”
• “ ভাই হত্যার প্রতিশোধ নিতে!”
• “ মানে? ”
• “ এসব বুঝবেনা! এখন প্রচুর ঘুম আসছে। বিরক্ত করোনা তো। ”

সুপ্তি সোফাতে বসে পড়ে, কি বললো রেহান! কিসের প্রতিশোধ! কিছুই বুঝতে পারছেনা সে। চিন্তা করতে করতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ে সুপ্তি।

°°°

সাইমা সিজদায় গিয়ে কেঁদে ই চলেছে, সজীব বাধ্য হয়ে সাইমাকে সিজদা থেকে টেনে তুলে। বুকের সাথে জড়িয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করে,

• “ অনেক্ষণ থেকে সহ্য করছি, এবার বলো কি হয়েছে তোমার? ”
• “ আ আ লি ফ… ”
• “ আবার আলিফ! বলেছিনা আলিফ মরে গেছে। সে ফিরে আসবেনা। ”
• “ ফিরে এসেছে, রেহান ই আলিফ! ”

সজীব এবার রেগে যায়, সাইমা কে জোরে করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়।

• “ পাগল হয়ে গেছো তুমি! আলিফ আলিফ করে তোমার মাথা পঁচে গেছে। যেই দেখলে রেহানের মতো হ্যান্ডসাম ছেলে , ওমনি রেহান কেই আলিফ মনে হতে শুরু করলো। জানো রেহানের ব্যাকগ্রাউন্ড! পুরো ৬ বছর বিদেশে থেকে ৬ মাস আগে দেশে ফিরেছে। সব কিছু দেখেশুনেই বোনের বিয়ে দিয়েছি। আর তুমি! ছিহহহ সাইমা ছিহহহ। তোমার একটা মেয়ে আছে, তাকে ভুলে গিয়ে আলিফ কে নিয়ে মেতেছো। খুব ঘৃণা হচ্ছে তোমার প্রতি। এভাবে দিনের পর দিন তো স্ত্রীর মুখে পরপুরুষের নাম শুনে ভালো থাকা যায় না!”

সাইমার চোখ দিয়ে অনর্গল পানি ঝরছে, সজীব ও ভুল বুঝলো!

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here