হৃদস্পর্শ পর্ব ৬

হৃদস্পর্শ ( পর্ব ৬)
#জামিয়াপারভীনতানি

দরজায় নক শুনে দরজা খুলতেই সাইমা দেখে সজীব মুখ থমথমে করে দাঁড়িয়ে আছে। সাইমা কিছুটা ভয় ই পেয়ে যায়, সজীবের মুখ টা দেখে। সাইমা কিছু বলার আগেই সজীব “ সাইমা ” বলে সাইমাকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চা ছেলেদের মতো কাঁদতে থাকে। সাইমা নিজেও চিন্তিত হয়ে যায়, ছেলেরা কখনো কাঁদে না। সজীব এর এমন কি হয়ে গেলো যে এভাবে কাঁদতে হবে তার। সাইমা কাঁপা কন্ঠে সজীব কে বলে,
__ “ স,,সজীব ! কি হয়েছে! ”

সাইমা কে ছেড়ে দিয়ে সজীব চোখ ছলছল দৃষ্টিতে বলে,
__ “ আম্মা নেই সাইমা! ”
__ “ মা…মানে! ”
__ “ এখুনি বাসায় চলো, রাস্তায় যেতে যেতে সব বলবো! ”
__ “ নেই মানে! কি হয়েছে উনার! খুলে বলুন! ” কণ্ঠে অনেক উত্তেজনা!
__ “ আম্মা মারা গেছে! সজল ফোন দিয়েছিলো। ”
__ “ কিহহহ! ”
সজীব এর কাছ থেকে নিজেকে ছড়িয়ে নিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে, তার জন্য সব কিছু হয়েছে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। আত্মঅনুশোচনার দহনে সাইমার ভিতর কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। নিজের খারাপ ব্যবহারের জন্য এতো টা খারাপ লাগা তৈরী হয় হটাৎ করে, মাথার মধ্যে যেনো বাজ পড়ছে বার বার। সে মেরে ফেলেছে তার শাশুড়ি কে, সে খুনী।

ক্ষনিকের মধ্যে এতো বেশী টেনশন করে ফেলেছে যে কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়ে। সজীব নিজেও বুঝতে পারছেনা, সাইমা তার মা কে কি এতোটাই ভালোবাসতো। যে তার মায়ের শোকে সাইমা অজ্ঞান হয়ে গেছে। সজীব বাড়িওয়ালী আন্টিকে দ্রুত সব বলে সাইমাকে কোলে নিয়ে প্রথমে হসপিটাল এ যায়। মায়ের জন্য ছটফট করলেও সাইমা কে তো ফেলে যেতে পারেনা। সাইমাকে চেক আপ করাতে, ফার্স্ট এইড দিতে এক ঘন্টা পার হয়ে যায়। সাইমার জ্ঞান ফিরলে সজীব জিজ্ঞেস করে,

• “ এখন কেমন আছো? ”
• “ বাসায় নিয়ে চলুন, আমার জন্য অনেক দেরি হয়ে গেছে। ”
• “ হুমম, চলো, এখন যাওয়া টা দরকার। ”

সজীব এর সাথে সাইমা এই প্রথম শ্বশুরবাড়িতে পা রাখে, বাড়ি আত্মীয় স্বজন পাড়া পড়শী তে পরিপূর্ণ হয়ে আছে।

বিশাল বড় ড্রইং রুমের একপাশে কামরুননাহার এর লাশ। মহিলাদের শুধু দেখতে দেওয়া হচ্ছে। সজীব পাশে গিয়ে বসে দুইফোটা অশ্রুবিষর্জন দেয়। সুপ্তি ত কাঁদতে কাঁদতে বার বার জ্ঞান হারাচ্ছে।
সজল ও পাশেই বসে কাঁদছিলো। সাইমা কামরুননাহার এর পা বরাবর বসে পড়ে, পা দু’টো তে হাত দিয়ে বিড়বিড়করে ক্ষমা প্রার্থনা করে, সজীব স্পষ্ট শুনতে পায় সাইমা ক্ষমা চাচ্ছে কিন্তু কেনো সেটাই বুঝতে পারেনা। অতিরিক্ত কাঁদছে মেয়েটা, সজীব কিছুতেই বুঝে না শাশুড়ির জন্য কাঁদছে নাকি অন্য কারণ আছে এর মধ্যে।

সাইমার পাশে এক পর্দানশীন মহিলা ছিলেন, উনি সাইমা কে জিজ্ঞেস করে, সম্পর্কে উনি কে হন। সাইমা কাঁদতে কাঁদতে বলে, “ আমার শ্বাশুড়ি হন। ” সজীব কেই যেই মেয়ে স্বামী হিসেবে মানতে চায়না, সে শ্বাশুরীর জন্য কাঁদছে। মায়ের জন্য কষ্ট সাথে বউয়ের ব্যবহার, সব কিছু মিলিয়ে সব কিছু ই যেনো সজীব এর মাথায় একেকটা বাজ পড়ার মতো মনে হচ্ছে।

সাইমা অতিরিক্ত কাঁদতে কাঁদতে আবারও অজ্ঞান হয়ে যায়, পাশের ভদ্রমহিলা সজীব এর সাহায্যে সাইমা কে ঘরে নিয়ে আসে। মুখে পানি ছিটা দেয়, ভদ্রমহিলা মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়।
সুপ্তি ও কাঁদতে কাঁদতে জ্ঞান হারায়, ওকেও সাইমার পাশেই এনে শোয়ানো হয়। দুজনকেই যত্ন নিতে থাকে ভদ্রমহিলা।

সজল সজীব কে বুকে জড়িয়ে ধরে আফসোস করছে, “ আমরা এতিম হয়ে গেলাম ভাই, কয়েক বছরের মধ্যে আমরা এতিম হয়ে গেলাম। আম্মা যে এভাবে চলে যাবে বুঝতেই পারিনি রে ভাই। ”

দুই ভাইয়ের হুহু কান্নায় গোটা কামরুননাহার ভিলা যেনো কেঁপে উঠছে। কেউ চিৎকার করে কাঁদেনি, চিৎকার করে কাঁদলে যে লাশের আযাব হয়। লাশ দাফন করা হয় আসরের নামাযের পর।

সাইমার আগে জ্ঞান ফিরে আসে, উঠেই বিড়বিড় করে অনুশোচনা করতে থাকে, “ আমি খুনী, আমি খুনী! ” ভদ্রমহিলা জিজ্ঞেস করলে সাইমা সব কিছুই বলে দেয় উনাকে, উনার বুকের উপর মাথা রেখে কাঁদতে থাকে এবার জোরে জোরে।
ভদ্রমহিলা বললেন,
• “ আমি সজীবের ফুপি হই, তুমি তো আমার ভাইপো বউ। যাই হোক! তুমি অনেক বড় পাপ করে ফেলেছো এটা বুঝতে পারাটাই অনেক। শুনো বউ, কথায় কথায় রাগ করোনা আর। যা বুঝলাম তুমি অনেক রাগী, তোমার জ্ঞান অনেক কম। তাই কিছু কথা বলি মনে কিছু নিও না৷ এক সাহাবি হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে অল্প কথায় কিছু নসিহত করুন। রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। সাহাবি কয়েকবার বললেন, আরও নসিহত করুন। প্রত্যেকবারই রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, রাগ বর্জন করো। -বোখারি শরীফ

বস্তুত রাগ মানুষের জীবনকে সহজেই বিষাক্ত করে তুলতে পারে। রাগের মাথায় এমন সব কাজ ঘটে যাতে পারে- যা ব্যক্তি, সমাজ তথা গোটা বিশ্বের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ। তাই রাগ হলে আলেমরা ‘আউযুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজীম’ পড়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এক হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যখন তোমাদের কারও রাগ আসে, তখন সে দাঁড়িয়ে থাকলে যেন বসে পড়ে। তাতে যদি রাগ দমে না যায়, তাহলে সে যেন শোয়ে পড়ে।’ -তিরমিজি

আবু দাউদ শরীফের একটি হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রাগ আসে শয়তানের কাছ থেকে। শয়তান আগুনের তৈরি। আর আগুন নেভাতে লাগে পানি। তাই যখন তোমরা রেগে যাবে, তখন অজু করে নেবে।’ আর মুসলিম শরীফের এক হাদিসে আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে রাগের সময় নিজেকে সামলে নিতে পারে, সেই প্রকৃত বাহাদুর। আরেক হাদিসে বলা হয়েছে, রাগ দেখানোর সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, আল্লাহতায়ালা তাকে কিয়ামতের দিন পুরস্কৃত করবেন।

তুমি অবশ্যই ভুল করেছো বউ, ইচ্ছে করে করোনি। রাগের বশে এতো বড় ভুল করেছো যে ক্ষমা পর্যন্ত চাইতে পারবেনা তুমি। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও, তওবা করো। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ো। তাহাজ্জুদ এর নামাজ পড়ো। আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, নিশ্চয়ই ক্ষমা পাবে। আর একটা কথা, তুমি তোমার স্বামীর অবাধ্য হইও না। বিয়ে যেভাবেই হোক সে তো তোমার স্বামী।

সাইমা খুব মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনছিলো, এমন সময় সজীব চলে আসে। বাবা মা চলে যাবার পর ফুপিই একমাত্র অভিভাবক। সাইমা ফুপির কাঁধে মাথা দিয়ে আছে দেখে একটু অবাক হলেও ফুপির পায়ের কাছে বসে দুঃখ প্রকাশ করে । ফুপি একটু বাইরে যায়, সজীব তখন বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো। সাইমা হটাৎ করেই সজীবের পায়ে ধরে কাঁদতে শুরু করে।

• “ আরে করছো টা কি! ছাড়ো পা, অন্যকেউ দেখলে খারাপ ভাববে। ”
• “ আমি ক্ষমা পাবার যোগ্য নই! সত্যিই টা জানলে আমাকে বের করে দিবে আমি জানি!”
• “ কি সত্যি, এখন তো অনেক কষ্ট হচ্ছে, তুমি শুধু শুধু কষ্ট বাড়িয়ে দিও না। ”
• “ আমি খুনী! ”
• “ পাগল হয়ে গেছো? ”
• “ উনাকে আমি খুন করেছি, আমার পরকালে শাস্তি হবে। অন্যায় করে ফেলেছি অনেক। তুমি শুনলে আমাকে ঘৃণা করবে এতোটা ই জঘন্য আমি। ”
• “ কিহহ! ”

• “ উনি আমাদের বাসায় গিয়েছিলো, আমি খারাপ বিহেভ করেছিলাম। উনি মনে কষ্ট নিয়ে চলে আসেন। পরে তুমি বাসায় গিয়েই বলো উনি আর নেই!”

• “ তুমি এতো নিচ! সজীব পা ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়ে, অথচ সুপ্তি বলেছিলো মা আমার বাসায় আসবে তোমাকে নিতে। আমি বাজারে গেলাম, মাকে ফোন দিই ফেরার পথে, উনি বললেন আজ আসতে পারবেনা, পরে আসবে। উনি তোমাকে বাঁচাতে মারা যাবার আগেই মিথ্যে বলে গেলো, কতটা ভালোবাসে তার ছেলের বউকে প্রমাণ দিয়ে গেলো। তুমি অসভ্য নিচ মেয়ে, আমার মা কে মেরে ফেললে! উনার হার্টে প্রব্লেম ছিলো, এতো ই খারাপ বিহেভ করেছো যে বাসায় এসেই হার্ট এটাক করেছে! ছিঃ সাইমা ছিঃ

সাইমা মেঝেতে বসে কাঁদতে থাকে, তখন ফুপি এসে বলেন,
• “ রাগের মাথায় ভুল করেছে বাবা! মাফ করে দিস। মেয়েটা অনুশোচনা করছে , ক্ষমা করে দেওয়া উচিৎ তোর। ”
• “ আমার মায়ের খুনীর সাথে কিভাবে সংসার করবো ফুপি?”
• “ কেউ ভুল করে তওবা করলে আল্লাহ ও ক্ষমা করে দেয়। চিন্তা করে দেখ তুই কি করবি!”

সুপ্তির জ্ঞান ফিরে আসে তখন লাস্ট কথা টা শুনে নেয়। তখন সুপ্তি নিজ চোখে দেখে সাইমা সজীবের পা ধরে কাঁদছে। সুপ্তি সজীব কে বলে,

• “ ভাবী আম্মা কে খুন করেছে ভাইয়া! কিভাবে? ”

সাইমা কে সজীব জোরে করে পা থেকে সরিয়ে দেয়, এতে সাইমার মাথা দরজায় লেগে মাথার অনেকটা কেটে যায় । সাইমা সজীবের দিকে একবার তাকিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

ফুপি সজীব কে এবার ধমক দিয়ে বলে,
• “ ওর আর তোর মধ্যে পার্থক্য তাহলে কোথায় থাকলো? ওর তোর মা কে মারার জন্যে প্রভাবিত করলে তুইও দায়ী পরোক্ষভাবে। রাগ, জেদ করতে করতে তোরা সব ধ্বংস করে দিচ্ছিস। এখনো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো! ওকে হসপিটাল এ নিয়ে যা!”

সজীব রাগের মাথায় প্রিয়তমা কে এতো জোরে আঘাত করবে বুঝতেও পারেনি। সাইমা কে কোলে তুলে নিয়ে হসপিটালের উদ্দেশ্যে ছুটে।

মনের মধ্যে একটাই ভয়, রাগারাগি করতে গিয়ে মা কে হারিয়ে ফেললাম। এবার সাইমার ও যদি কিছু হয়ে যায়। ও যে সজীবের হৃদয়ের রাণী, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা। কিভাবে থাকবে ওকে ছাড়া!

চলবে…..

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here