হৃদস্পর্শ পর্ব ৫ 

হৃদস্পর্শ পর্ব ৫

#লিখাজামিয়াপারভীন_তানি

আইসক্রিম সজীবের মুখে লেগে পুরোই জোকারের মতো লাগলছিলো, সাইমা হেসে দেয় সজীব কে দেখে।
প্রিয়তমার মুখের হাসি সব রাগ ভুলিয়ে দিতে পারে মুহুর্তেই। সজীব ও দুষ্টুমি করে সাইমার গালে আইসক্রিম লাগিয়ে দেয়। মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি আসে সজীবের, সাইমার মুখের আইসক্রিম খেয়ে নেয়। সাইমার রাগ টা কমে গিয়ে শিহরিত হয়ে ওঠে।
বিয়ের পর থেকে রাগারাগি করতে করতে ২ সপ্তাহ পার হয়ে যায়। সজীব অফিসে বসে বসে চিন্তায় পড়ে যায়, ভালোবাসতে গিয়ে একের পর এক ভুল করে চলেছে সে। সাইমার সাথে দুরত্ব বেড়েই চলেছে। বিয়ের আগেই বরং ভালো ছিলো, অন্তত মেয়েটা ওর সাথে ঘুরতে যেতো, হাসতো। এখন হাসি কি ভুলেই গেছে, সব সময় ঝগড়া বেধে যায় যেকোনো কারণে। ওর নিজের ও বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে অনেক। সব কিছুতেই জোর করা উচিৎ হয়নি ওর। মনে মনে ঠিক করে কিছু গিফট নিয়ে যাবে আজ। যেই ভাবা সেই কাজ, চট করে অফিস এর দায়িত্ব ম্যানেজার কে বুঝিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

মনে মনে খুব খুশি হয়ে বাসায় ফিরে সন্ধ্যায়, সাইমা দরজা খুলেই বসে পড়ে। সাইমার পাশে বসেই গিফটের প্যাকেট গুলো সাইমার হাতে দিতেই সেগুলো রেখে দেয়।
• “ খুব শখ করে এনেছিলাম, খুলেও দেখলে না! ”
• “ প্রয়োজন হবেনা আপনার দেওয়া কিছু। আর কিছু না আনলে খুশি হবো, আর যা এনেছেন তা আপনার বোনকে দিয়ে দিন। খুশি হবে সুপ্তি। ”
• “ তোমার কি মনে হয় সুপ্তি ভিখারী, তোমার জিনিস সে নিবে। ” চট করে মেজাজ টা খারাপ হয়ে যায় সজীব এর।

সুন্দর করে সাইমার পাশ থেকে উঠে যায়, সাইমার আগের ড্রেস গুলো কে বের করে। সাইমা কিছু বোঝার আগেই সব ড্রেস কে পানিতে চুবিয়ে আসে। সাইমা পরে বুঝতে পেরে এগিয়ে যেতে নিলে, সাইমাকে কোলে তুলে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে। শাওয়ার ছেড়ে দেয়, দুজনেই ভিজে যায় মুহুর্তে। সাইমা কে এই ভাবে ভিজা অবস্থায় কখনো দেখেনি সজীব। অপলক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে সাইমাকে। সাইমা রেগে গিয়ে কয়েকটা কিল মারে, সজীবের হাতে।
• “ এতো পাগলামী করোনা সজীব, ভালো লাগে না আমার। ”

সজীব সাইমার ঠোঁটে হাত দিয়ে কথা বলতে নিষেধ করে।
• “ খুব সুন্দর লাগছে তোমায়, বারবার প্রেমে পড়তে ইচ্ছে হয়। ”
• “ কিন্তু আমি যে তোমার নই৷ ”
• “ এই প্রথম তুমি আমাকে তুমি ডাকছো, খুব আপন মনে হচ্ছে তোমাকে। আস্তে আস্তে ভালোও বাসবে। ”
• “ অখেয়ালে বলেছি হয়তো, ছাড়ুন এখন। ”

মাথা মুছে ঘরে আসে সাইমা,
বাধ্য হয়ে সজীবের আনা নীল পাড়ের পিংক কালারের শাড়িটা পড়ে। মনে মনে ভাবে, ছেলেটার চয়েস তো ভালোই। চার টা শাড়ি এনেছে সজীব, চার টাই সুন্দর লেগেছে সাইমার। সজীব মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো সাইমার দিকে। সাইমা সজীবের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে,
• “ খুব সুন্দর পছন্দ আপনার, কিন্তু এগুলো আমি পড়ছি না। আজ বাধ্য করলেন তাই পড়েছি, কাল থেকে আর পড়বোনা। ”
• “ সব সময় ঘাড় ত্যাড়ামো না করলে হয় না? একটু কি ভালো থাকা যায়না আমার সাথে? ”
• “ না যায় না! আই হেট ইউ, খুব খুব ঘৃণা করি আপনাকে। ”
• “ ভালো কখনো বাসার চেষ্টা ও করোনি, ঘৃণা তো আশা করাই যায়। ব্যাপার না, তুমি পাশে আছো এটাতেই হবে। আজ থেকে তোমার কোন কাজেই বিরক্ত করবোনা। শুধু চোখের সামনে থেকো। ”
• “ ন্যাকামি, হুহহ!”

সজীব রান্নাঘরে গিয়ে নিজের জন্য খাবার নিয়ে খেয়ে শুয়ে পড়ে, সাইমার বুক ধক করে উঠে। এতো দিন এতো ঝগড়া ঝাটি হলেও এক সাথে খেয়েছে। আজ যেনো খুব মিশ করছে, খেতে বসে খেতে পারলোনা ঠিক মতো। একটু রাগ ও হলো, চাদর আর বালিশ নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। রাতে ঠিক মতো ঘুমাতেও পারেনা সাইমা। ১৫ দিন সজীবের বুকের উপর ঘুমিয়েছে, কিন্তু আজ একা একা লাগছে।

ভোরের দিকে সাইমা ঘুমিয়ে পড়ে। সজীব ঘুমের ঘোরে বিছানা হাতড়ায়, সাইমা নেই বুঝতে পেরে ভয় পেয়ে যায়৷ চলে গেলো না তো আবার। উঠে বসতেই মেঝেতে চোখ পড়ে, গুটিশুটি হয়ে শুয়ে আছে সাইমা। শাড়ির কোন ঠিক নেই, সব এলোমেলো হয়ে আছে। পেট বেরিয়ে গেছে, হাটু পর্যন্ত শাড়ি উঠে গেছে। খুব কাছে যেতে ইচ্ছে করছিলো সজীবের। উঠে যেতে গিয়েও চলে যায়, সাইমা বিরক্ত হবে তাই।

°°°

• “ রান্নাঘরে এতো সকালে এসেছো কেনো আম্মা? ” সুপ্তি কামরুননাহার কে জিজ্ঞেস করে।
• “ আর বলিস না! সজলের নাকি মাথা টা খুব ধরেছে। কফি খেলে ওর ভালো লাগবে। ”
• “ আম্মা! আজ ভার্সিটি তে অনুষ্ঠান আছে। তুমি যাবে আমার সাথে? ”
• “ শরীর টা ভালো লাগছেনা রে। তোর ভাবীকে না হয় বল!”
• “ ভাবীইই!” সাইমা যেমন রাগী, ভয়েই আঁতকে উঠে নাম টা শুনে।
• “ ওমা, বাসায় আসার পর এতো গুণগান করলি ভাবীর, এখন ভয় পাচ্ছিস কেনো?”
• “ না মানে! ভাবীকে এখনো বাসায় তুলে নিচ্ছোনা। তাই বল্লাম আর কি। ”
• “ হুম, আমি ভাবছি ওর সাথে গিয়ে দেখা করে আসবো। ”
• “ কবে যাবে? ”
• “ কালই না হয় যাই, আজ তুই একাই যা ভার্সিটি তে। ”

°°°

সাইমার উঠতে খুব দেরি হয়ে যায়, উঠে দেখে সজীব নেই ঘরে। হয়তো অফিস চলে গেছে, নিজে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা বানিয়ে খেয়ে নেয়। তাড়াহুড়ো করে অফিসে চলে আসে।

অফিসে আসতেই বসের ঝাড়ি,
• “ কি ব্যাপার সাইমা! রোজ রোজ দেরি করে আসছো? এভাবে চলতে থাকলে তো চাকুরী করার দরকার নেই। ”
• “ সরি স্যার! কিছুদিন ধরে বেশ অসুস্থ আমি, তাই দেরি হয়ে যাচ্ছে। নেক্সট দিন থেকে আর দেরি করবোনা। ”
• “ সব কাজেই অজুহাত লেগেই থাকে! যান নিজের কাজে যান। মেইল দিয়েছি, সেগুলো চেক করুন। ফাইল গুলো দেখুন, প্রেজেন্টেশন রেডি করে তারপর আসবেন আমার রুমে। ”

সাইমা হাসিমুখে কথা বলে বেরিয়ে আসে, কাজ করতে করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়, শেষ করতেই পারেনা। চার টার দিকে হটাৎ করে সেন্সলেস হয়ে যায় সাইমা। পাশের ডেস্কের কলিগ রুনা পানি ছিটা দিলে জ্ঞান ফিরে। ততক্ষণে অনেকেই উৎসুক হয়ে নাটক দেখছে এমন টাই মনে হয় সাইমার কাছে।

বস এসেই জিজ্ঞেস করে,
• “ আপনি এতো অসুস্থ, বাড়ি গিয়ে রেষ্ট নিলেই পারেন। আসার কি দরকার ছিলো শুধুশুধু। ”
• “ আসলে স্যার! দুপুরে লাঞ্চ করতে ভুলে গিয়েছিলাম কাজের প্রেসার এ। তাই হয়তো এমন হয়েছে। এখন ঠিক আছি স্যার।
• “ ইটস ওকে, আগে কিছু খেয়ে তারপর কাজ করবে তো!”

বসের চোখে সাইমার জন্য যেনো অন্যরকম মায়া। সাইমা বসের কথায় সায় দেয়, কিছু খেয়ে নিয়ে আবার কাজ শুরু করে। কাজ কম্পিলিট করে জমা দিয়ে বাসায় ফিরতে রাত ৮ টা বেজে যায়। সজীব আগেই এসে পড়েছিলো, খুব টেনশন করছিলো সাইমার জন্য। কিন্তু প্রকাশ করেনি, কারণ সাইমা বিরক্ত হবে।

সাইমা নিজে থেকেই বলে,
• “ আজ অফিসে অনেক কাজ ছিলো, তাই দেরি হয়ে গেছে। ”
• “ কৈফিয়ত দিতে হবেনা। কাজ থাওতেই পারে। ”

সজীবের এমন ইগনোর সাইমার ইগো তে লাগে। সাইমা ফ্রেশ হয়ে কিছু খেয়ে শুয়ে পড়ে মেঝেতে। সজীব মনে মনে কষ্ট পাচ্ছে কিছুই বলে না। নিজেও খেয়ে নিয়ে শুয়ে যায়। সারাদিনের ক্লান্তির পর অনায়াসে ঘুম চলে আসে দুজনের।

°°°

পরেরদিন শুক্রবার ছিলো, সেদিন সকালে,
সানিয়া হক কয়দিন ধরে পাগলের মতো কেঁদে চলেছে, মেয়েটা কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেলো নাকি! রবিউল অনেক খোঁজ করার চেষ্টা করে, কোথাও খুঁজে পায়নি সাইমা কে।

• কি ব্যাপার আম্মা! আর কতো ন্যাকা কান্না কাঁদবেন? মরে যায়নি হতচ্ছাড়ি মেয়েটা। যে সবার মান সম্মান ডুবিয়ে পালিয়ে গেছে তার কথা ভেবে কাঁদার কোন মানে হয় না। অনেক গুলো কাজ জমে গেছে, শেষ করুন তো। আজ আবার বাসায় মেহমান আসবে!” কথাগুলো বলে সানিয়ার একমাত্র ছেলের বউ মিলা।
• “ কে আসবে? ”
• “ তা জেনে আপনার কি? বসে বসে অন্ন ধ্বংস করছেন, কাজ করে পুষিয়ে দিন। ”

রবিউল হকের দিকে তাকিয়ে মিলা বলে,
• “ যান তো বাবা! বাজার করে আনুন। আজকাল কাজের লোক পোষা অনেক কষ্ট কর। আর আপনারা থাকতে কাজের লোকের ই বা কি দরকার! ”
• “ যাচ্ছি বউমা, যাচ্ছি। ”

রবিউল যেতে যেতে কয়েকফোটা পানি ফেলেন চোখ দিয়ে, আবার মুছে নেয়। শাস্তি পাচ্ছে যে , নিষ্পাপ মেয়েটার ক্ষতি করার শাস্তি।

°°°

সাইমা খুব অসুস্থ , সজীব শুধু দেখে কিন্তু কিছুই বলে না আর। শুক্রবার বিধায় দুজনেই বাড়িতে আছে।

• “ আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করো, আমার বোন কেও কষ্ট দিয়েছো। আম্মাকে কিছুতেই বোঝাতে পারিনি। তোমার সাথে দেখা করতে আসছে। অন্তত মায়ের সাথে খারাপ বিহেভ করোনা। ”

সাইমা কিছুই বলে না, শুনে থেকে যায়। নিজের ইচ্ছেমত কাজ সারতে থাকে।
সজীব বাজার করে আসছি বলে বেরিয়ে আসে, কিন্তু কামরুননাহার আগেই চলে আসে ঠিকানা অনুযায়ী।
কলিংবেল দিতেই দরজা খুলে দেয় সাইমা,

সালাম না দিয়েই চলে আসে, কামরুন্নাহার সাইমার পিছে পিছে আসে। সাইমা বসতে বলে,
কামরুননাহার সাইমার হাত ধরে বলে,
• “ বাহহ! তুমি তো অনেক সুন্দরী! তাই তো বলি সজীব এতো খুশি থাকে কিসের জন্য। আমি তো তোমাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে যেতে এসেছি বৌমা। এতো বড় বাড়ি পড়ে থাকতে এই একটা ঘরে তোমার থাকতে অনেক কষ্ট হয় জানি তো। আমাদের সাথে থাকবে, ননদ দেওরের সাথে মজা করবে। অনেক সুখে থাকবে তুমি মা! ”
• “ হুম, এখানেই অনেক সুখে আছি আন্টি, তাছাড়া আমি আপনাদের করুণার পাত্রী না। নিজের খরচে চলতে জানি। তাছাড়া আপনার ছেলের যা চরিত্র! আপনারা কেমন তা আল্লাহ ই জানে। আমি তো চাইনা ওই ফালতু ছেলের সাথে ঘর করতে। আচ্ছা আপনারা যদি ভালোই হবেন, তাহলে ওই ধোকাবাজ কে জন্ম দিলেন কিভাবে? নাকি ওর বাবার চরিত্র খারাপ ছিলো? নাকি আপনার? চরিত্র নাকি বংশ থেকেই মানুষ পায়। ”
• “ চুপ করো মা! চুপ করো! তোমার শ্বশুর অনেক ভালো মানুষ ছিলেন, অন্তত মৃত মানুষ কে নিয়ে খারাপ কিছু বলো না । ”
• “ হুম ভালো, তাহলে কি বলতে চাচ্ছেন আপনি খারাপ? ”

কামরুন্নাহারে চোখে জল ছলছল করছে। সাইমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, “ ভালো থেকো মা! ” বলেই বেরিয়ে চলে আসে কামরুননাহার ।

চলবে……..

[ আসছে সাইমার জীবনে আরোও করুণ কাহিনী, আজ মন ভালো ছিলো না, তাই লিখতে ইচ্ছে না থাকা স্বত্বেও লিখলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here