হৃদস্পর্শ  ২য় পর্ব

হৃদস্পর্শ  ২য় পর্ব

#লিখাজামিয়াপারভীন_তানি

__ “ কি করছেন কি আপনি! গোটা ঘরে পানি কিসের? ”
সাইমা ঘরে ঢুকেই দেখে সজীব কাকভিজা হয়ে ভিজে আছে, ঘরেও পানি পড়ে অনেক। রেগে গিয়ে জোরে করেই কথাটা বলে সেই জন্য।

__ “ মাথা টা গরম হয়ে ছিলো! তাই ঠান্ডা করার জন্য ঝর্না ছেড়ে রেখেছিলাম। ওখানে ই এতক্ষণ ছিলাম, ঘরে কিভাবে পানি এলো দেখিনি। ”

__ “ আপনি কি ঠিক করেই রেখেছেন! এখানে থাকবেন আর আমাকে অত্যাচার করবেন। ” কথাটা বলতে বলতে রুমে ঢুকে পা টিপে টিপে, নইলে স্লিপ খেয়ে পড়ে যাবে সাইমা। অফিসে সারাদিন গাধার খাটুনি খেটে এসে বাসায় একটু রেষ্ট নিবে কিনা, পুরো রুম এর অতিরিক্ত পানি ছেঁকে ফেলে ঘর মুছে নিজেও ফ্রেশ হতে ২ ঘন্টা লেগে গেলো সাইমা। এদিকে সজীব আগেই ফ্রেশ হয় বেডে গিয়ে ঘুম দিয়েছে। ফ্রেশ হয়ে এসে যে একটু রেষ্ট নিবে তার উপায় নেই। ভন্ড টা বেডে হাত পা ছেড়ে শুয়ে আছে।

খুবই বিরক্ত হয়ে ফ্লোরে একটা টাওয়েল আর চাদর বিছিয়ে সেখানেই শুয়ে পড়ে। ক্লান্তির দরুণ ঘুমিয়ে পড়ে সাইমা।

°°°
সজীব কে সে মোটেও সহ্য করতে পারতো না আগে থেকেই, কিন্তু সজীব সব সময় সাইমার সাথে ঝগড়া ও করতো মানসিক সাপোর্ট ও দিতো। সাইমা নতুন জব পায় ঢাকাতে, সজীব কে খুশি হয়ে বলে জবের কথা।

__ “ জব তো পেলে, এখন ঢাকায় একা কিভাবে থাকবে শুনি? ”
__ “ যদি এতো চিন্তা হয় আমার জন্য, একরুমের একটা বাসা ঠিক করে রাখলেই তো পারেন।”
__ “ সে আর বলতে! অবশ্যই করবো, জানিই তো তোমার এই দুনিয়ায় আপন বলতে কেউ নেই। ”
__ “ যদি মনে করেন করুণা করছেন, তাহলে কিছুই করতে হবেনা। ওকে ”
__ “ না না! তুমি আসো তো, আমি স্টেশন এ তোমাকে নামিয়ে নিবো। অসুবিধা হবে না তোমার। ”

যেদিন সাইমা প্রথম ঢাকা যায়, সেদিন ই সজীবের সাথে প্রথম দেখা হয় সাইমার। এতো দিন তো ফেসবুকে কথা বলেছে, ছবি দেখেছে সজীব। সাইমা কে দেখে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে অনেক্ষণ।
সাইমা কাছে গিয়ে বলে,
__ “ আমার মনে হয় আপনি সজীব, তাইনা! ”
__ “ চলুন যাওয়া যাক। ”
__ “ আগে তো তুমি করে বলতেন! এখন আপনি করে বলছেন যে! ভয় পেলেন নাকি?”
__ “ না মানে! মেয়েদের সাথে আমি তেমন কথা বলতাম না, কখনো সামনাসামনি কথা হয়নি। তাই….”
__ “ যাই হোক! চলুন ”
__ “ হুমম চলুন মানে চলো। ”

একই রিকশা তে সেদিন সজীবের সাথে উঠে সাইমা। দুজনের একটু ইতস্তত লাগলেও মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। সজীব আড় চোখে সাইমা কে বারবার দেখতে থাকে, সজীবের চোখে শ্রেষ্ঠ সুন্দরী সাইমা। সাইমা ব্যাপার টা বুঝতে পেরে বলে,
__ “ লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে মজা নেই বোধ হয়। ”
__ “ মানে? ”
__ “ কিছুনা।” আবার দুজনেই চুপ হয়ে যায়।

বাসার রুম টা চার তলায়। সাইমা অনেক ক্লান্ত বলে সজীব ই লাগেজ নিয়ে উঠে। সাইমা রুমে ঢুকে দেখে একটা ডবল খাট, প্রয়োজনীয় বাসন পত্র, একপাশে এক্টা টেবিল কিনে রাখা আছে।

__ “ এগুলো কার? ”
__ “ তোমার জন্য কিনেছিলাম, নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস। লাগেই তো সব সময়। ”
__ “ ওকে, খরচ কতো হয়েছে বলুন, নেক্সট মান্থে দিয়ে দিবো। ”
__ “ লাগবেনা, মানে ফ্রেন্ড হিসেবে আমার তরফ থেকে গিফট। ”

তখনই বাড়ি ওয়ালী আন্টি আসে, এসেই সজীব কে বলে,
__ “ ও মা! কি কিউট বউ তোমার, একেবারে যেনো পরী। ” এরপর সাইমার দিকে তাকিয়ে বলে, “ নাম কি তোমার মা? ”

সাইমা অবাক হয়ে সজীবের দিকে তাকায়, সজীব চোখ ইশারা করে আন্টির সাথে কথা বলতে বলে।
__ “ জ্বী আন্টি, আমি সাইমা। এই বাসা টা কি আপনাদের! অনেক সুন্দর তো। একদম মনের মতো এই ঘর টা। ”
__ “ তুমি নিজে সুন্দর, তাই ঘর ও সুন্দর। যেহেতু তোমরা আজ প্রথম এসেছো! রান্না তো করোনি, দুপুরে আমার বাসায় খাওয়ার দাওয়াত দিতে এলাম গো। ”
__ “ জ্বী আন্টি, এসবের কি দরকার ছিলো বলুন, আমরা তো কিনে নিতে… ”

মুখের কথা কেড়ে আন্টি বলে,
__ “ কেউ দাওয়াত দিলে কবুল করতে হয় বউ, বুঝেছো। ”

সাইমার এইখান থেকেই সজীবের উপর রাগ উঠে যায়, না পারছে কিছু বলতে না পারছে সহ্য করতে। আন্টিকে হাসিমুখে বিদায় দিয়ে সজীব এর দিকে ঘুরে তাকালো। সজীব কানে হাত দিয়ে ইশারায় সরি বলে,

__ “ আমি আপনার স্ত্রী? ”
__ “ আরে রাগ করছো কেনো? ঢাকায় সিংগেল মেয়েকে কে বাসা ভাড়া দিতো শুনি। এই রুম টা অনেক সুন্দর, তোমার উপযোগী। তাই মিথ্যে বলে বাসাটা নিয়ে নিয়েছি। এতো রাগ করো না তো, ফ্রেশ হয়ে চলো দাওয়াত খেতে যাই। ”

°°°

সাইমার ঘুম ভাঙে সজীব এর ডাকে, ফ্লোরে শুয়ে থেকে মাজা ব্যথা হয়ে গিয়েছে সাইমার।
আড়মোড়া ভেঙ্গে সাইমা বললো,

__ “ কি হলো! ডাকছেন কেনো? “

__ “ রাতের খাবার খেয়ে নাও, এরপর গিয়া বিছানায় ঘুমাও। ”
__ “ রান্না কে করেছে? ”
ভাত আর ডিমভাজি, ডাল রান্না করেছে সজীব।
__ “ এতো কথা না বলে খেয়ে নাও। ”

__ “ আপনি কি এখানেই থাকবেন, বাসায় কি যাবেন না? ”

__ “ আমি এখানে থাকলে কি প্রব্লেম তোমার? ”

__ “ আমার ভালো লাগে না আপনাকে, বুঝেন না? ”

__ “ কিছুই করার নেই, এখন ভালো লাগেনা পরে ভালো লাগবে। ”

__ “ তার মানে আপনি কিছুতেই যাবেন না, আমাকে ই চলে যেতে হবে তাহলে! ”

সজীবের খুব রাগ উঠে যায় সাইমা চলে যেতে চেয়েছে তাই। সজীব সাইমাকে জোর করে চুমু খায়। কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ায় সাইমার কান্নার জন্য।

__ “ বাধ্য মেয়ের মতো থাকলে এসব জোর কখনোই করতাম না, সরি। এখন খেয়ে নিয়ে আমাকেও খেতে দাও। নাকি গো ধরে বসে থাকবে, আমাকে আরোও খারাপ বিহেভ করিয়ে নিবে তোমার সাথে। ”

সাইমা উঠে এসে অল্প একটু খেয়ে নেয়, সজীব বেশি করে খেতে বাধ্য করে, নিজেও খেয়ে নেয়।

সাইমা কান্না স্বরে বলে,
__ “ আজ যা করলেন, নেক্সট টাইম এমন হলে আমার মরা মুখ দেখবেন। ”

__ “ আত্মহত্যা মহাপাপ, করলে শাস্তি তুমি পাবে! ”

°°°

আলিফ কে ছোট থেকেই খুব পছন্দ করতো সাইমা, ম্যাচিউর হবার পর থেকে আলিফের সাথে ৪ বছর প্রেম করে সাইমা। বাসায় যখন জানাজানি হয় সাইমার বাবা বিয়েতে অস্বীকার করেন। আলিফ কে তার পছন্দ না! কিছুতেই মেনে নিবেনা উনারা আলিফ কে।

সাইমা তখন মহা বিপাকে পড়ে, বাসায় বন্দী করে রাখে ওর বাবা। একদিন এর ভিতর এক পঞ্চাশ উর্ধো বুইড়া লোকের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয় সাইমার। সাইমা বাধ্য হয়ে বিয়ে করলেও মন থেকে মেনে নিতে পারেনি।
সাইমা কে অবশ্য মোহরানা বাবদ কিছু টাকা দেওয়া হয়। নিজের কাছেই রেখে দেয় সাইমা। আলিফ কে ভালোবেসে স্বামীর অত্যাচার মেনে নিতে পারেনি। সাইমার বাবা ভাবে বিয়ের পর সাইমা সব মানিয়ে নিতে বাধ্য। বিয়ের দুইদিন পর সুযোগ বুঝে সাইমা পালিয়ে আসে প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট নিয়ে। বান্ধবীর সাহায্যে এক টা মেসে উঠে। আলিফের সাথে অনেক যোগাযোগ করার ট্রাই করে।
কিন্তু নাহ! আলিফ যেনো দুইদিন এ হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে।

৬ টা মাস সাইমা প্রচুর কষ্ট করে, তিনটা টিউশনি করে যা টাকা পেতো তার কিছুটা করে জমিয়ে রাখতো। বৃদ্ধ স্বামী মেয়ের পালিয়ে যাওয়াতে ডিভোর্স দুইদিন পরই দিয়ে দিয়েছিলো। কিন্তু সাইমার বাবা সাফ জানিয়ে দেয়, মেয়ে তাদের কাছে মৃত।

সাইমা ও মনে মনে ঠিক করে নেয়, যে বাবা মা মেয়ের ক্ষতি করতে পারে, তাদের বাবা মা পরিচয় নাই বা দিলাম। ৭ মাস পর ফাইনাল এক্সাম শুরু হয়, টিউশনি করে এক্সাম খুব একটা ভালো হয়না সাইমার। তবুও নিষ্ঠুর পৃথিবীতে বেঁচে থাকার লড়াই তো করতেই হবে সাইমার।

খারাপ সময় গুলো তেই পরিচয় হয় সজীব এর সাথে ফেসবুক গ্রুপের মাধ্যমে। সাইমা সুখের দুঃখের সব কথা এই ছেলেটাকে বলে দিতো। এই ছেলেটার সাথে রোজই সাইমার ঝগড়া হতো আবার সজীব ই সাইমা কে কাছে টেনে নিতো।

ঢাকায় প্রথম দিন হাজবেন্ড ওয়াইফ পরিচয় এ দেওয়ার পর সজীব এর উপর রাগ করে থাকতো সাইমা। প্রথম মাস অফিস চলছে, খুব কাজ থাকতো। একদিন সজীব ফোন দেয় সাইমা কে।
__ “ হুম বলেন কি বলবেন? ”
__ “ তুমি আজ দেখা করতে পারবে? ”
__ “ অফিসে তো প্রচুর কাজ।”
__ “ সন্ধ্যার পর আসিও। আমি তোমার বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসবো না হয়। ”

সজীব এই কাজ টা প্রায়ই করতো, অফিস শেষ এ সাইমা কে নিয়ে ঘুরতে যেতো। হয়তো টং এর দোকানে চা, না হয় হাটাহাটি, কিংবা রেস্টুরেন্ট এ ডিনার।

সাইমার ভিতরের রাগ প্রকাশ করতো না কখনো, ক্ষতি তো আর করছেনা সজীব।
দুই মাস এভাবেই চলে, হুটহাট সাইমার বাসায় আসা, বেড়ানো। দুইমাস পর সাইমাকে শুক্রবার দুপুরের আগে পার্কে ডাকে সজীব। সাইমা ও যায়, কারণ সজীব সব সময় তাকে সাহায্য করে আসছে। একটু ঘুরতে তো যাওয়া ই যায়।

পার্কে গিয়ে সজীব আগে থেকেই বসে থাকে, সাইমা কে দেখে থমকে যায়। শাড়ি পড়েছে মেয়েটা আজ। যেনো স্বর্গ থেকে নেমে আসা কোন অপ্সরা তার দিকে এগিয়ে আসছে। নীল শাড়ি তে যেনো নীল পরীর মতো লাগছে।

সাইমা কাছে আসতেই বুঝে সজীব ওকে দেখে চমকে গিয়েছে। হাতে তুড়ি মেরে বলে,

__ “ আসলে কলিগের বিয়ে ছিলো, খুব করে ডেকেছিলো। বাধ্য হয়েই শাড়ি পড়ে গিয়েছিলাম। আপনি এমন সময় দেখা করতে চাইলেন। চেঞ্জ করে আসার সময় ই পাইনি আসলে। ”

__ “ পরীর মতো লাগছে! তুমি এতো ই সুন্দরী। ”

__ “ বাদ দিন, বলুন কি বলতে ডাকলেন। ”

সজীব সাইমার হাত ধরে, সাইমা নিজেও অবাক হয়ে যায়। দুইমাসে একটা ছেলে কখনো ই তার হাত ধরেনি। আজ কিনা সেইই হাত ধরেছে।
সাইমা কে অবাক করে দিয়ে সজীব বলে,
__ “ ভালোবাসি তোমাকে, অনেক আগে থেকে।
হবে কি চলার পথের সঙ্গী আমার। ”
__ সাইমা হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে, “ সম্ভব না! ”

__ “ তুমি চাইলেই সম্ভব। তোমার আলিফ এক বছরেও ফিরেনি! তার জন্য কিসের এতো অপেক্ষা করবে তুমি! আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি সাইমা, পারলে তুমি সময় নাও। কিন্তু বিয়ে টা হয়ে গেলে তোমার সাথে সাক্ষাত এ পাপ হবে না। যদি তোমার আলিফ ফিরে আসে, চলে যেও তুমি। মুক্ত করে দিবো তোমায়। প্লিজ ফিরিয়ে দিও না ।”

সাইমা উঠে যেতে চাইলে সজীব হাত ধরার চেষ্টা করে, সাইমা বেকায়দায় সজীবের উপর পড়ে যায়। ওপেন প্লেসে এই অবস্থায় কেউ দেখলে পরিস্থিতি খারাপ হওয়া টাই স্বাভাবিক। এলাকার কিছু ছেলে এসে চারিদিকে মুহুর্তের মধ্যে ভিড় করে আজেবাজে কথা বলা শুরু করে ওদের।

চলবে…….

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here