ঝরাফুল পর্ব ১২ ( শেষ পর্ব)

ঝরাফুল পর্ব ১২ ( শেষ পর্ব)

লিখা : জামিয়া পারভীন তানি

মৌরীর চোখে মুখে পানি দিতে জ্ঞান ফিরে আসে, উঠে বসেই অস্ফুট স্বরে বলে,
__ “ শাওন “
__ শাওন কাছে এগিয়ে গিয়ে বলে, “ মৌরী ”

মৌরী শাওনের গলা জড়িয়ে ধরে, চোখ বন্ধ করে পরম আবেশে শুয়ে থাকে।
শাওন তখন কবিতা বলতে শুরু করে,

“ চোখ মেলে দেখো একবার,
দাঁড়িয়ে আছি তোমার দরজায়।
বন্ধ মনের দুয়ার দাও খুলে,
হৃদয় থেকে কাছে টেনে নাও আমায়।

ভালোবাসি তোমায় অনেক! হে প্রিয়া,
ধন্য করো আমায়! তোমার মন দিয়া।

ফিরিয়ে দিও না আমায় বারবার,
হৃদয়ে তুলে দাও ভালোবাসার ঝংকার।
অস্তিত্বে আমার মিশে আছো তুমি,
তোমার ডাকে সাড়া দিতে প্রতিক্ষমান আমি।

ভালোবাসি ভালোবাসি ভালোবাসি! হে প্রিয়া,
ধন্য করো আমায়! তোমার ঐ মন দিয়া। ” লিখা : জামিয়া পারভীন তানি

মৌরী চোখ খুলে শাওনের গলা জড়িয়ে ধরে আরোও শক্ত করে, আস্তে করে বলে,
“ ভালোবাসি হয়নি বলা তবুও অনেক ভালোবাসি,
সারাটি জীবন থাকবো শুধুই পাশাপাশি।
অনেক ভালোবাসি তোমায়! সবার চেয়ে বেশি,
ভালোবেসে ফোটাতে চাই তোমার মুখের হাসি,
বড্ড বেশি ভালোবাসি , শুধু তোমায় ভালোবাসি।” লিখা : জামিয়া পারভীন তানি

মৌরী উঠে দাঁড়ায়, রিমনের উদ্দেশ্যে বলে,
__ “ যে ছেলে ভুল বুঝে মিথ্যে প্রতিশোধ এর আশায় একটা মেয়ের জীবনকে নরক করে তোলে, সে কখনোই ভালোবাসতে পারে না। কিসের ভালোবাসো তুমি! যদি এক বিন্দু ভালোবাসতে তাহলে নিজের ক্ষতির পাশাপাশি আমার ক্ষতিও করতে না। কিসের বাচ্চা দাবী করো তুমি? যার পুরো হক শাওনের, তা পাবার আশা ছেড়ে দাও। এসেছে বাচ্চার বাবা! হুহহ, কোথায় ছিলে সেইদিন, যেদিন আমি সমাজের চোখে অসহায় হয়ে পড়েছিলাম। কোথায় ছিলো ভালোবাসা? যেদিন রাতের পর রাত কটুকথা শুনে দিন পার করেছি। বাচ্চা আসার খবরে সব লাঞ্চনা ভুলে তোমাকে জানিয়েছিলাম । ভেবেছিলাম ফিরে আসবে, নাহহহহ! আসোনি! তো এখন কিসের দাবী করছো! আমি তো বাচ্চাসহ সুইসাইড করতে গিয়েছিলাম, শাওন নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে আমাকে সেভ করেছে। আমার নিঃশ্বাস এখনও বইচজে শুধুমাত্র শাওনের জন্য। তবুও সেলফিশের মতো তোমার কাছে যেতে চাইতাম। কেনো যাবো! যেখানে আমি নিজেই শাওনের হয়ে গিয়েছি। শাওন কে ঠকালে আমার স্থান হবে জাহান্নামে। কারণ ওর মতো ভালো মানুষকে ঠকালে এমন শাস্তিই হবে। তাছাড়া শাওন কে এখন আমি অনেক ভালোবেসে ফেলেছি। আর আমার ছেলেকে যে বাবা না হয়েও বাবার চেয়ে বেশি দায়িত্ব পালন করেছে, ছেলে তার কাছে থাকাই উচিৎ। যদি নুন্যতম লজ্জ্বাবোধ তোমার থাকে তো শাকিব কে ফিরিয়ে দিবে। ”

রিমন মাথা নিচু করে বলে,
__ “ ঠিক বলেছো, আমি বড়ই পাপী। প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে তোমার ছেলেকে তোমার কাছে ই ফিরিয়ে দিবো। ”

__ “ তাই দিও, আগে এনে দিও, অসংখ্য দোয়া দিবো। ”

__ “ মজা করছো তাইনা! জাস্ট আধাঘন্টা ওয়েট করো। তোমার ছেলেকে তোমার কাছেই ফিরিয়ে দিবো। ”

রিমন বের হয়ে যায়, মৌরী তখন শ্যামলীর কাছে যায়।

__ “ বোন / বেষ্ট ফ্রেন্ড হয়ে এভাবে ক্ষতি করতে পারলি তুই, কিভাবে পারলি রে! ”

শ্যামলী মৌরীর পায়ে পড়ে যায়, কান্না করতে করতে বলে,

__ “ প্লিজ ক্ষমা করে দে আমাকে, পারলে শাস্তি ও দে আমাকে। ”

__ “ তোর শাস্তি আমার ভাবী হয়ে আমার ভাইয়ের ঘরে টুকটুকে বেবি আনা। ”

শ্যামলী হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে, সিপন তখন বলে ওঠে,

__ “ মৌরী! ”

__ “ হ্যাঁ ভাইয়া! বিয়ে যখন করেছো তখন অস্বীকার করোনা! তাহলে রিমন আর তোমার মাঝে পার্থক্য কোথায় থাকে বলো! আমার ভাই পৃথিবীর বেষ্ট ভাই। ”

__ “ ঠিক বলেছিস, মেনেই নিতাম ওকে, কারণ আমি ওর মতো না! কষ্ট দিতাম এই আর কি! ”

ভাইয়ের হাত ধরে এনে শ্যামলীর হাতে ধরিয়ে দেয়।

__ শ্যামলীর দিকে তাকিয়ে মৌরী বলে, “ কখনো আর পাপ কাজ করিস না, কষ্ট দিস না আর আমার ভাই টাকে। খুব শীঘ্রই বাবা মা তোদের হাত এক করে দিবে। ”

মৌরী মামীর দিকে তাকিয়ে বলে,
__ “ আপনার কোন আপত্তি নেই তো মামী! ”

__ “ আপত্তি থাকবে! যদি তুই মা না ডাকিস তাহলে। ”

__ মুচকি হেসে বলল, “ হুমম মা! আপনার কোন আপত্তি নেই তো! ”

__ “ বদ মেয়েটার একটা গতি হচ্ছে এটাই তো অনেক রে! তুই তো আমার চোখ খুলে দিয়েছিস, আজ থেকে তুইই আমার মেয়ে। তোর সন্তান আমারও নাতি। আর কখনো মন খারাপ করবোনা তোর জন্য। বরং খুশি আজ থেকে শাওনের মতো ছেলে পেয়ে। রামিজা আপাও ভাগ্যবতী সিপনের মতো ছেলে পেয়ে। সমাজের চোখে ঝরে যাওয়া ফুল গুলো কে আমাদের ছেলেরা দিয়েছে যোগ্য মর্যাদা। মা হিসেবে এটাই তো আমাদের জন্য গৌরবের রে। ”

মৌরীর বাবা মা দুজনের চোখেই পানি এসে গেছে, মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললো মৌরীর বাবা,

__ “ স্বামী সন্তান নিয়ে সুখে থাকিস মা! ”

__ “ দোয়া করো বাবা! ”

৩০ মিনিট পর রিমন ছেলেকে নিয়ে আসে,
মৌরীর হাতে শাকিব কে তুলে দেয়,

মৌরীকে ছেলেকে কোলে নিয়ে দেখে ছেলে ঘুমিয়ে আছে।

__ “ ছেলেটা কে দুইদিন কিছুই খাওয়াতে পারিনি! তোমার ছেলে কিছুই খায় না! ঠিক মতো যত্ন নিও ওর। ”

মৌরী পুরো কথা না শুনেই ছেলের ঘুম ভাঙানোর চেষ্টা করে, একটু কেঁদে উঠতেই খাওয়াতে শুরু করে মৌরী। মায়ের স্পর্শে ছেলেও যেনো মাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।

সন্তান কে যেনো মায়ের কোলেই মানায়, ছোট্ট চাঁদের টুকরো যেনো। ছেলেকে আদর করে, দুইদিন এর যতো দুঃখ ছেলের কাছে মৌরী বলে , ছেলে মায়ের স্পর্শে যেনো খিলখিলিয়ে হাসে।

রিমন চলে যাচ্ছিলো, তখন শাওন বলে,

__ “ পারলে ভালো হয়ে যেও! খারাপ কাজ ছেড়ে দিও! ” এরপর শাওন বড় চাচার দিকে তাকিয়ে বল্লো,

__ “ অনেক তো হলো চাচ্চু! এবার বরং ছেলের বিয়ে দিয়েন। ”

__ “ ছেলের বিয়ে হবেনা! যে হারে ড্রিংকস করে, লিভার ডিজিজ দেখা দিয়েছে! মৃত্যু ওর কাছিয়েই গিয়েছে। ” এক ফোটা জল ফেললেন রিসাদ আহমদ।

__ “ আহহ আব্বু! এসব বাদ দাও তো, আমি তো বেশ আছি। খুব শীঘ্রই আবার চলে যাবো বাইরে। ”

রিমন সবাইকে বিদায় জানিয়ে চলে যায়, শাওন মৌরী কে নিয়ে ফিরে আসে নিজেদের বাড়ি। শ্যামলী কেও নিয়ে আসে, ভালো করে বিয়ের অনুষ্ঠান করেই একেবারে সিপনের হাতে তুলে দিবে শ্যামা কে।

বাড়ি গিয়েই শ্যামা সিপন কে ফোন দেয়, রিসিভ করতেই শ্যামা বলে,

__ “ মাফ করেছো তো সিপন? ”

__ “ শত হোক আমার বাবুর আম্মুকে মাফ না করে কি পারি! ”

__ “ তা বাবুর আব্বু এখন কি করে? ”

__ “ বাবুর আম্মুর কথা চিন্তা করছে! হাহাহা ”

মৌরী শাকিব কে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে উঠতেই দেখে শাওন বেলকনি তে দাঁড়িয়ে আছে। মৌরী পা টিপে টিপে গিয়ে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে,

“ দেবে কি এক বিন্দু ভালোবাসা,
আমি ভালোবাসার সমুদ্র দিবো।
দেবে কি এক চিলতে হাসি,
তোমায় সুখের সাম্রাজ্যে ভাসাবো।

কাছে ডাকবে কি আমায়,
অধির আগ্রহে তোমার অপেক্ষায়।
ভালোবাসা পেতে চাই তোমার,
শুধু বেঁচে আছি এই কামনায়।” লিখা : জামিয়া পারভীন তানি

শাওন মৌরীর হাতে ধরে সামনের দিকে টানে, হাটু গেড়ে বসে বলে,

“ শত জনম ছিলাম বসে তোমার অপেক্ষায়,
এখন থেকে হবো আমরা! দুজন দুজনার।”

শাওন মৌরীকে একটা রিং পড়িয়ে দেয়, হাতে একটা চুমু দিয়ে হাত টা বুকের সাথে চেপে ধরে। মৌরী মাথা নিচু করে সব লজ্জ্বা ভুলে শাওনের কপালে কিস এঁকে দেয়। বাকিটা তাদের সুখের রাজ্যে, তারা সুখী থাকুক। নাই বা দেখলাম কি কি হচ্ছে। 😂😂😂

সমাপ্ত

#অন্ধবিশ্বাসের_পরিণতি গল্প শেষ করবো কাল।

নেক্সট গল্প দুইদিন পর দিবো, #বখাটে_হাজবেন্ড , এই গল্পটা কেমন লাগলো, আর নেক্সট গল্পের নাম কেমন লাগছে অবশ্যই জানাবেন। সবাইকে ধন্যবাদ এন্ড অনেক অনেক ভালোবাসা পাশে থাকার জন্য। ❤❤❤❤❤

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here