ঝরা ফুল পর্ব ১১

ঝরা ফুল পর্ব ১১
লিখা : জামিয়া পারভীন তানি

শাওন মৌরীকে বাহুডোরে আবদ্ধ করে, মুখটা মৌরীর কানের কাছে এনে ফিসফিসিয়ে বলে,

__ “ বাবুটা তোমার কাছে এনে দিবো তো, এরজন্য তোমাকে খেতে হবে। তুমি না খেলে বাবুর খাবারে অভাব পড়বে, তখন বাবুকে কি খেতে দিবে শুনি? ”

__ “ সত্যিই এনে দিবে, তাহলে দাও আমি খাচ্ছি। ”

….
পরেরদিন পারিবারিক সবাইকে নিয়ে কোর্ট বসে। রিমন এর পরিবারের তিনজন, শাওনের পরিবারের চারজন, সিপন আর ওর বাবা মা কে নিয়ে কোর্টের আয়োজন করা হয়।
দুই পক্ষের উকিল আছে সাথে,
প্রথমে রিমনের বক্তব্য শুনার জন্য রিমন কে বলতে বলা হয়, রিমন শুরু করে,

__ “ মৌরী আমাকে ধোঁকা দিয়েছে প্রথমে, তার জন্য তাকে শাস্তি পেতে হচ্ছে। ”

উকিল সাহেব বললেন,
__ “ কি রকম ধোঁকা, যদি খোলাসা করে বলতেন। ”

__ “ আমার ফুপাতো বোন সে, কিন্তু তার পরিচয় আমি আগে জানতাম না। কারণ আমার বাবা রিসাদ আহমেদ ওই পরিবারের সৎ ছেলে। বিধায় দাদীর বাসায় কখনো যাওয়া হয়নি। দাদার ফ্যামিলির কে কে আছেন শুধু এইটুকুই জানতাম। মৌরীর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ফেসবুকে। ওর ‘ মৌ রী ‘ নামের ফেসবুক একাউন্ট এর মাধ্যমে। ”

মৌরী চিৎকার করে বলে,
__ “ মৌ রী নামের আমার কোন ফেসবুক আইডি ছিলো না। আর ওকে আমি মৌসুমীর বিয়ের আগে চিনতাম ও না। সব মিথ্যে কথা বলছে সে, আমার সন্তান কে কেড়ে নেওয়ার জন্য। ”

রিমনের উকিল সাহেব বললেন,
__ “ মিসেস মৌরী, আপনি একটু থামুন। আপনার বক্তব্য আমরা পরে শুনবো। ”

রিমন আবারও বলা শুরু করে,
__ “ মৌরী দীর্ঘ দিন আমার সাথে প্রেম করে অথচ সে জানতো না যে আমি ওর মামাতো ভাই হই। কারণ সে আমাকে আগে কখনো দেখেনি। আমার ফেসবুক আইডির নাম আমার সারর্টিফিকেট এর নামে ‘ রায়হান আহমেদ’ কিন্তু এই নাম তারা জানে না। আমার ডাক নাম রিমন হিসেবেই তারা আমাকে চিনতো। ”

মৌরী আবারও চিল্লিয়ে বলে,
__ “ সব মিথ্যে কথা। ”
সিপন মৌরীকে ধমক দিয়ে বলে,
__ “ আহহ! চুপ কর না, কি বলে আগে শুন। পরে উত্তর দিস সব কিছুর একই সাথে। ”

রিমন আবার বলা শুরু করে,
__ “ মৌরী ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দেয় প্রথমে, এরপর দুজনের মধ্যে চ্যাট হতো। ওইই প্রথম মেয়ে যাকে আমি ভালোবাসতে শুরু করি। খুব ভালোবাসতাম ওকে আমি, কিন্তু ও যে সবার সাথে ফ্লার্টিং করতো তা বুঝতে পারিনি। এক মাস আমার কাছে ওর ছবি পাঠাতো বিভিন্ন ভাবে তোলা। সব ছবি প্রিন্ট করা আছে, দেখতাম ওকে ছবিতেই। কথা হয়নি কখনো। ছবি দেখেই ওর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু ওর খোঁজ নিতাম অনেক, ওর সব ডিটেইলস জোগাড় করে ফেলি। পরিচয় পাই ও আমার ছোট ফুপির সন্তান। বেশ খুশি থাকতাম ওকে সারপ্রাইজ দিবো ভেবে। কিন্তু কিছুদিন পর দেখি সে আইডি তে আমাকে ব্লক করে দিয়েছে। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম সেদিন, ব্লক করার কারণ ছিলো ওর সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম। তখন সে জানিয়ে দেয় সে আমায় ভালোবাসে না, তার নাকি ব্রেক আপ হয়েছিলো তাই সময় কাটাতে আমার সাথে অভিনয় করে। এরপর আরোও বলে আমার নাকি চরিত্র খারাপ কারণ আমি বিদেশী।

কখনো আমি খারাপ ছিলাম না, ওর এই অভিনয় এ আমি ডিপ্রেশন এ ভুগতাম। যেই আমি জাহাজের কোন মহিলা কে প্রশ্রয় দিতাম না, সেই আমি জাহাজ এ গিয়ে ডিপ্রেশন এ ভুগে নেশা করা শুরু করি। এরপর নারীদের সাথে অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ি। ”

রিমন কিছুক্ষণ থামে, শ্যামলী আর মৌরী দুজনের চোখেই পানি।

রিমন আবার বলতে শুরু করে,
__ “ পরবর্তীতে আমার মনে প্রতিশোধ এর আগুন জ্বলে ওঠে। ঘৃণার জন্ম হয় মৌরীর উপর। বিয়ের অনুষ্ঠান এ আসার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল মৌরীর ক্ষতি করা। তাই ওকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম, রেজিস্ট্রেশন করে বিয়ে করে ওর সাথে সম্পর্ক করে ওকে ডিভোর্স দিয়ে দিই। কিন্তু আমার বাচ্চাকে কিছুতেই মৌরীর কাছে দিবো না। বিয়ে আমি কখনোই করবোনা, মেয়েদের প্রতি ঘৃণা থেকে। কিন্তু আমার ছেলেকে ওই পাপী মহিলার কাছে দিবো না। ”

রিমন মৌ রী আইডির সাথে চ্যাট লিস্ট গুলো দেখায়, মৌরীর পাঠানো ছবি গুলো ও দেখায়।

মৌরী বলে,

__ “ বাংলা তে মৌ রী লিখা কোন ফেসবুক আইডি কখনোই আমার ছিলো না। বিশ্বাস না হলে ওই আইডি এর আসল মালিক কে তা চেক করে দেখুন! কার ফোন নাম্বার দিয়ে খোলা। আমার এক্টাই আইডি ইংলিশ এ লিখা ‘MOURI AHMED’ এছাড়া কখনো কোন আইডি চালাইনি। ছবি গুলো আমারই কিন্তু কে কখন তুলেছে আমি নিজেও জানিনা। ”

মৌরী কান্নায় ভেঙে পড়ে, শ্যামলী খুব কাঁদতে থাকে। এরপর শ্যামলী বলে,

__ “ আমি কিছু কথা বলতে চাই! ”

অনুমতি দেওয়ার পর শ্যামলী বলা শুরু করে,
__ “ ওই আইডি টা আমি চালাতাম, মৌরীর নামে। ”

সবাই অবাক হয়ে যায়, শাওন এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিলো, এবার বলে,

__ “ ছি: শ্যামা ছিহহহ! মরতে পারিস না অন্যের ক্ষতি করে বেড়াস, তোর মতো বোন থাকার চেয়ে মরে যাওয়ায় বেটার। ”

শ্যামলী এবার কেঁদে কেঁদে বলে,
__ “ মৌরী আমার বান্ধবী, বোন যাই হোক না কেনো! ও অনেক সুন্দর দেখতে। আমার সাথে সব সময় ক্লোজ থাকতো, সব সময় ছেলেরা ওর দিকে হা করে তাকিয়ে থাকতো। আর আমি কালো বলে কখনোই পাত্তা পেতাম না। তাই ওকে খারাপ করতে ওর নাম পরিচয় এ ফেইক একাউন্ট খুলেছিলাম। অনেকের সাথে ও হয়ে কথা বলেছি প্রেম করেছি। বেশি এডিক্টেড হবার আগে সরে যেতাম। এতে আনন্দ পেতাম কিন্তু মৌরীর যে এতো বড় ক্ষতি হবে তা বুঝতে পারিনি। আমার পাপের শাস্তি মৌরী পেয়েছে আর তার শাস্তি এখন আমিও পাচ্ছি। ”

রিমন মৌরী শাওন তিনজনেই অবাক হয়ে যায়, সাথে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে যায়।

__ “ বিনা দোষ এ তুমি আমায় শাস্তি দিলে রিমন! যে অন্যায় আমি করিনি তার প্রতিশোধ নিলে? অনেক কষ্ট দিয়েছো আমাকে, এখন আমার সন্তান কে ফিরিয়ে দাও প্লিজ। দয়া করো! আমাকে না, আমার সন্তান কে দয়া করো। ও তো অনেক ছোট! না খেয়ে মরে যাবে। প্লিজ ফিরিয়ে দাও ওকে। ” মৌরী হাত জোড় করে রিমনের কাছে ভিক্ষা চায় নিজের সন্তান কে।

__ “ প্লিজ রিমন ভাইয়া! আমার করা শাস্তি মৌরী কে দিবেন না প্লিজ, শাকিবকে ফিরিয়ে দিন। পারলে আমাকে মেরে ফেলুন, তাও ভালো মৌরীকে আর কষ্ট দিয়েন না। ও সারাজীবন কোন পাপ করেনি তাও শাস্তি ভোগ করছে ।আর আমি আমার পাপের শাস্তি পাচ্ছি। ”
শ্যামলীর কথায় উত্তরে সিপন বলে,

__ “ বেশ হয়েছে তোর জন্য শ্যামা, তুই ও তোর সন্তান কে হারাবি এর জন্য। ”

__ “ সিপন! ”

__ “ কিসের সিপন! তুই যে এইসবের মূলে আমি অনেকদিন আগেই জেনেছিলাম। যার শাস্তি তোকে আমি দিয়েছি। তুই মৌরীর আইডি দিয়ে আমার ফ্রেন্ডের সাথে মজা নিতে গিয়েছিলিস না জেনেই। আমার ফ্রেন্ড সেই আইডি হ্যাক করে ফোন নাম্বার উদ্ধার করে, এরপর আমি আর সে দুজনে মিলে ফোন নাম্বার টা নিয়ে থানায় জিডি করে তোর ঠিকানা উদ্ধার করি। এরপর ই তোর সাথে প্রেমের অভিনয় করেছিলাম। কিন্তু রিমন ও যে সেম কারণে এইসব করেছে তা আমি জানতাম না। নইলে আমার বোনের জীবন নষ্ট করার জন্য সেদিন ই তোকে মেরে ফেলতাম। ”

হৈচৈ আর রহস্য দেখে বিচারক হাঁপিয়ে গেলেন। এই ঝামেলা থেকে বিচারক ৩০ মিনিট বিরতি চাইলেন। এরপর বিচারক বেরিয়ে গেলে সিপন ওর বোন কে জড়িয়ে ধরে বলে

__ “ মাফ করে দিস বোন! ভাই হয়েও তোকে রক্ষা করতে পারিনি। ”

__ “ আমার ছেলেকে এনে দাও ভাইয়া! ”

রিমন মৌরীর সামনে এসে দাঁড়ায়,

__ “ মাফ কিভাবে চাইবো সেই মুখ আমার নেই, পাপ করে ফেলেছি জীবনে অনেক। ক্ষমা তুমি নিজেও করতে পারবেনা আমি জানি। তারপরও বলবো ক্ষমা করে দিও। আরেকবার কি সুযোগ দিবে আমায়! তোমার ভালোবাসা পাবার। ”

মৌরী কিছুই বলে না, সামনের দিকে তাকিয়ে দেখে শাওন করুণ দৃষ্টি তে তাকিয়ে আছে।
মৌরী দৌড়ে গিয়ে মায়ের কোলে শুয়ে পড়ে,
__ “ মা গো! আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আর সহ্য করতে পারছিনা। আমার ছেলেটা কে ফিরিয়ে দাওনা প্লিজ। ”

রামিজা মেয়েকে বুকের মাঝে নিয়ে শান্তনা দিতে থাকে।

এরই মাঝে শাওন শ্যামার গালে কয়েকটা চড় মারে, সিপন তখন মারতে বাধা দেয়।
__ “ ওকে এখন মেরো না ভাই, ওর ক্ষতি না হয়ে ওর বাচ্চার ক্ষতি হবে। ডেলিভারী হবার পর ওর শাস্তি ও পাবে। ”

৩০ মিনিট পর বিচারক আবারোও আসেন, রিমনের দিকে উদ্দেশ্য করে বলেন,

__ “ আপনি এখন কি চান মি. রিমন? ”

__ “ মৌরীকে সহ আমি আমার সন্তান কে চায়, যদি মৌরী ফিরে আসে তো!”

শাওনের দিকে তাকিয়ে বিচারক বলেন,

__ “ আপনি কি চান মি. শাওন আহমেদ? “

__ “ অবশ্যই আমি আমার স্ত্রীকে ভালোবাসি, আর ওর সন্তান কে নিজের সন্তানের পরিচয় দিয়ে এসেছি। দুজনকেই আমি চাই, যদি মৌরী চায় তাহলে। ”

শাওন করুণ দৃষ্টি তে মৌরীর দিকে তাকালো।
বিচারক বললেন,

__ “ সবই যখন ভুল বুঝাবুঝির জন্য হয়েছে! তাহলে মিসেস মৌরী ই বলবে তিনি কাকে চান? তবে সন্তান তার কাছেই থাকবে! ”
মৌরীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন “ আপনি কাকে চান মিসেস মৌরী ‘ শাওন ‘ নাকি ‘ রিমন ‘, যাকে চাইবেন তার সাথে ই সংসার করতে পারেন। যদি রিমনের সাথে সংসার করতে চান তাহলে নতুন করে বিয়ে করা লাগবে এই আর কি। ”

মৌরী কি করবে! মৌরীর মাথা চক্কর দিতে শুরু করে। অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় কোর্টের ভিতরেই।

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here