ঝরা ফুল পর্ব : ৫

ঝরা ফুল পর্ব : ৫

লেখা : জামিয়া পারভীন তানি

শাওনের নিরবতা দেখে মৌরী শাওনের পা জড়িয়ে বলে,

__ “ প্লিজ সত্যিই টা কাউকে বলোনা, আমায় যদি ডিভোর্স দিতেই হয় তাহলে আমার পড়াশোনা শেষ হবার পর চাকুরী পাওয়া পর্যন্ত ওয়েট করিও। আমি তোমাকে ঠকাতে চাইনি, তাই বিয়েটা করতে চাইনি। মা জোর করাতে আমি বাধ্য হয়েছি। প্লিজ দয়া করো শাওন, আমি তোমার কাছে স্ত্রীর অধিকার চাইনা। তুমি চাইলে আরেকটা বিয়েও করতে পারো। কিন্তু তবুও আমাকে এখুনি তাড়িয়ে দিও না। আমাকে বের করে দিলে সমাজের সামনে মুখ দেখাতে পারবোনা। আমার তখন আত্মহত্যা ছাড়া কোন উপায় থাকবেনা। প্লিজ চুপ করে থেকোনা। দয়া করে কথা বলো, কথা দাও কাউকে বলবে না। ”

শাওন মৌরীর হাত ধরে তুলে, আস্তে করে বলে,

__ “ বিয়ে কখন করেছিস আর ডিভোর্স কেনো হলো? ”

__ “ সেদিন রাতে বাসায় লোড শেডিং করিয়ে আমায় ওই তুলে নিয়ে গিয়েছিলো মিথ্যে বলে বোকা বানিয়ে। ”

__ “ আর তুই বড়লোক জামাই পাবি আশায় নাচতে নাচতে চলে গেছিস। ”

__ “ ভুল বোঝো না প্লিজ।” মৌরী সব কথা খুলে বলে।

শাওন কিছুক্ষণ পাগলের মতো ঘরের মধ্যে পায়চারী করে, এরপর মৌরীর সামনে আসে।
__ “ শয়তান টা তোকে কিভাবে আদর করেছে রে, যার জন্য তুই পাগল হয়ে গেছিস। আমি কি পারিনা ভেবেছিস, সব ভুলিয়ে দিবো তোকে। “

মৌরীকে বুকে টেনে নিয়ে ঠোঁট দুটো নিজের ঠোঁটে নিয়ে নেয়। মৌরী ছাড়ানোর চেষ্টা করেও পারেনা। ১০ মিনিট পর ছাড়লে মৌরী হাঁপিয়ে যায়, কোনরকম শাওনের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলে,

__ “ দয়া করে থামো শাওন, এটা পাপ হচ্ছে তোমার আমার দুজনের ই। আমাদের বিয়ে হলেও এটা বৈধ হয়নি৷ কারণ রিমন অন্যায় করলেও আমাদের ধর্মে বলে, ডিভোর্স এর পর চার মাস মেয়ে অন্য বিয়ে করতে পারবেনা। যদি বিয়ে করে তাহলে সেটা বিয়ে বলে গণ্য না। আমাদের পাপ হয়ে যাবে, আমি তোমায় ভালোবাসিনা ঠিকই কিন্তু তুমি তো ভালোবাসো। তাই দয়া করে পাপ করিও না প্লিজ। ”

শাওন মৌরী কে ছেড়ে দিয়ে বাইরে চলে আসে। ছাদের এক কোণে বসে অস্থিরতায় ভোগে।

শ্যামা মৌরীর সাথে কথা বলতে আসে, দুজনের বয়সে ৬ মাসে ডিফারেন্স হলেও তারা একই ক্লাসে পড়ার সুবাদে বান্ধবী। মৌরী কে জিজ্ঞেস করে,

__ “ কিরে কেমন কাটলো রাত্রি, তোর ঠোঁট তো দেখি এখনো লাল হয়ে আছে। ”

মৌরী হটাৎ করে মুখে হাত দেয়, শ্যামলী হাসতে লাগে।

__ “ থাক, আমার কাছে তোর আর লজ্জা পেয়ে কাজ নেই। ”

মৌরী মাথা নিচু করে বসে থাকে, তার কাছে শুধু মনে হচ্ছে এই সহজ সরল মানুষ গুলো কে সে ঠকাচ্ছে। নিজ স্বার্থের জন্য এমন টা কি ঠিক হচ্ছে। তার ও তো কিচ্ছু করার নেই, সে যে নিরুপায় হয়ে গেছে।

__ “ কিরে কথা বলছিস না যে, নাকি বরের সোহাগ পেয়ে আমাদের ভুলে গেলি। ”

__ “ কি যে বলিস তুই, তোদের কেনো ভুলবো। গতকাল থেকে মানসিক ভাবে অসুস্থ আমি। তাই সব কিছু মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। ”

__ “ আম্মু তো ঘরে খিল দিয়েছে, চল রান্না টা করে নিই। ”

দুজনে রান্নাঘর এ ঢুকে রান্নায় মন দেয়। রান্না শেষ করে মৌরী মামা মামী ঘরে যায়, আস্তে করে বলে,

__ “ মামা, মামী আপনারা চলুন, খেয়ে নিবেন। “
রিয়াদ আহমেদ বেরিয়ে গেলে মৌরী মামীর পাশে গিয়ে বসে,

__ “ আমি জানি মামী আমাকে আপনাদের পছন্দ হয়নি। আপনি যদি চান ছেলেকে আরেকটা বিয়ে করাতে পারেন। কিন্তু ভাগনী হিসেবে আমাকে বঞ্চিত করবেন না প্লিজ। আমি কখনো আপনার ছেলের বউয়ের অধিকার চাইবোনা। ”

__ “ কি যা তা বলিস! সতীনের ঘর করবি নাকি। নিজের স্বামীর ভাগ কেউ দেয় না। আর তুই কিনা! ”

শাওন ছাদ থেকে নেমে আসার সময় মৌরী আর ওর মায়ের কথা শুনে ডাইরেক্ট মায়ের ঘরে আসে।
মৌরীর গালে চড় মেরে বসে শাওন।

__ “ আর নেক্সট টাইম যদি ফালতু কথা বলিস তো তোকে কেটে টুকরো করে দিয়ে জেলে যাবো। ”

ছেলের হটাৎ করে এমন ব্যবহার এ ভয় পেয়ে যান সালেহা খাতুন। ভয়ে ভয়ে বলে,

__ “ আরে না রে, ও আর এমন বলবে না। তুই শুধু শুধু রাগ করছিস। ও তো আমার রাগ ভাঙানোর জন্য এসব বলছিলো। ”

শাওন একটু শান্ত হয়ে মৌরীর দিকে তাকায়, দেখে মেয়েটার চোখে জল চিকচিক করছে। শাওন রুম থেকে বেরিয়ে যায়, নিজের রুমে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে বাসা থেকে বেরিয়ে যায় না খেয়ে। সবাই নাস্তা করলেও মৌরী করেনি, শাওনের ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে কাঁদতে থাকে।

২০ মিনিট পর মৌরী ফোনে ভাইব্রেশন হচ্ছে, আননোন নাম্বার থেকে কয়েকবার কল আসছে, মৌরী রিসিভ না করায় কেটে যাচ্ছে। বাধ্য হয়ে মৌরী ফোন রিসিভ করে সালাম দেয়, ওপাশ থেকে সালামের জবাব না দিয়েই বলে,

__ “ ডিভোর্স দিতে না দিতেই নতুন জোগাড় করে ফেলেছো?”

__ মৌরী বিস্ময়ের সাথে বলে, “ কে? ”

__ “ এক রাতেই ভুলে গেলে, তোমার প্রাক্তন হাজবেন্ড কে। ”

__ “ যার জন্য আমার জীবন টা নষ্ট হয়ে গেছে তাকে কি ভোলা যায়। কেনো এমন করলেন আপনি? প্রশ্ন টা আমাকে খুব পীড়া দেয়। আপনি খারাপ হলেও আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা জন্মেছিলো। কিন্তু ছেড়ে দিলেন কেনো? কি অপরাধ আমার বলুন? ”

__ “ প্রতিশোধ নিয়েছি। আমার দাদীর সাথে হওয়া অন্যায় এর প্রতিশোধ। আমার বাবার জীবনে অন্ধকার অধ্যায়ের কারণ যারা তাদের উপর প্রতিশোধ নিয়েছি। বিয়ে করেও সুখী হবেনা তুমি। আমার সাথে কাটানো মুহুর্তের আগে তোলা তোমার ভিডিও এখন ইউটিউব এর ভাইরাল ভিডিও। ”

__ “ কিহহহহহ! আপনি এই কাজ করতে পারেন না। যেভাবেই হোক আপনি আমার স্বামী। কেউ নিজ স্ত্রীর এতো বড় ক্ষতি করতে পারেনা। আপনি মিথ্যে বলছেন। ”

__ “ তোমার ফেসবুক একাউন্ট চেক করে দেখো! হাহাহা ”

মৌরী ফোন কেটে দিয়ে ফেসবুকে লগইন করে, মেসেঞ্জারে রিমনের পাঠানো ভিডিও। প্লে করে নিজেকে সামলাতে পারেনা মৌরী। ভিডিও ডিলিট করে দেয়, অজ্ঞান হয়ে যায় মৌরী। বারবার রিমনের ফোন আসাতে ভাইব্রেশনের জন্য মৌরী আস্তে আস্তে উঠে বসে, ফোন রিসিভ করে। রিমন বলে,

__ “ এতবার কল দেওয়া লাগছে কিসের জন্য? ফোন রিসিভ করছিলেনা কিসের জন্য? ”

__ “ তুই এমন করতে পারিস না, আমি তোকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। তুই আমার সর্বনাশ করলি তো। আমার আর বাঁচার ইচ্ছে নেই। যা করলি আমার সাথে তার বিচার পরকালে তুই পাবি। ” বলেই ফুঁপিয়ে কাঁদছে মৌরী।

__ “ হাহাহা ! ভয়ে কাঁদছো নাকি। ভিডিও ইউটিউব এ দিই নি। শুধুমাত্র তোমার মেসেঞ্জারে দিয়েছিলাম। তোমাকে এখুনি মরতে হবেনা। তুমি জাস্ট সবাইকে বলবে রিমন তোমার সাথে কি করেছে। তাহলে তোমার ফ্যামিলি যখন আমার বাবাকে জানাবে আমি খুশি হবো। কথা শুনবে তো! ”

__ “ শাওন সব জানে! ”

__ “ বাহহহ! ভাগ্য দেখি খুব ভালো। মেয়ে ডিভোর্সি জেনেও কিছু বলছেনা। যাই হোক! তুমি যদি বাসায় না বলো, তোমার আমার রিলেশন কি ছিলো! তাহলে এই ভিডিও নেটে ছাড়তে আমি দুইবার ভাববো না। ”

__ “ আর কি চান? আমার মৃত্যু! ”

__ “ তুমি মরবে কেনো? আগের কাজ আগে শেষ করো । তারপর বাকিটা বলবো। ”

__ “ আমি আপনার সাথে দেখা করতে চাই রিমন। প্লিজ একবার আসুন আমার কাছে। ”

__ “ কেনো শাওন কি বেডে তোমায় সুখ দিতে পারেনি! যে আমায় ডাকছো? ”

__ “ ছিঃ ”

__ “ যা বলছি ভুল বলেছি নাকি? ”

__ “ শাওন এমন কিছুই করেনি আমার সাথে। আপনার মতো অভদ্র না সে। ”

__ “ তাই নাকি! যাও গিয়ে এখুনি জানাও, ২৪ ঘন্টার ভিতরে যদি বাবার কাছে ফোন না আসে। তাহলে ভেবে নিও বাকিটা কি হতে পারে। ”

মৌরী ফোন কেটে দেয়, কাঁদতে থাকে । দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। শাওন ফিরে এসে শোনে সকাল থেকে মৌরী না খেয়ে ঘরে দরজা লক করে রেখেছে। রাগ হয়ে যায়। শাওন অনেক্ষণ ডাকার পরও মৌরী দরজা খুলছেনা দেখে শাওন টেনশনে পড়ে যায়। জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে থাকে শাওন। মনের ভিতর ভয় ঢুকে যায়, “ মেয়েটা নিজের কোন ক্ষতি করে ফেললো না তো আবার। ”

দরজা ভেঙে শাওন ভিতরে ঢুকে, মৌরী মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। গোটা মেঝেতে রক্ত, শাওন খেয়াল করে মৌরীর হাতে কেটে দিয়েছে। সেখান থেকেই ব্লাড বের হচ্ছে। শাওন মৌরী বলে চিৎকার করে উঠে। বুকের সাথে জড়িয়ে রাখে কিছুক্ষণ। বুঝতে পারে এখনো শ্বাস বইছে।
তাড়াতাড়ি করে হসপিটালে নিয়ে যায় শাওন। এমার্জেন্সীতে রাখা হয় মৌরীকে। ডক্টর এসে দুই ব্যাগ বি পজেটিভ রক্ত জোগাড় করতে বলে। রোগীর অবস্থা জানতে চাইলে ডক্টর বলে,
__ “ অনেক রক্ত বের হয়ে গিয়েছে, দোয়া করুন, বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছে। ”
শাওন আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি রক্তের ব্যবস্থা করে ফেলে। মনে মনে খুব প্রার্থনা করতে থাকে যেন মৌরী সুস্থ হয়ে যায়।

মৌরীর বাবা মা ভাই সবাই খবর পেয়ে চলে আসে হসপিটাল এ। শাওন রাগ দমন করতে না পেরে প্রথমে রিমনের কে কল দেয়, রিসিভ হতেই শাওন বলে,

__ “ আজ যদি মৌরীর কিছু হয়ে যায় তাহলে তোকে নিজ হাতে খুন করবো রিমন। ”

__ শাওনের কথা শুনে রিমনের বুক ধক করে উঠে, তাড়াতাড়ি বলে, “ কি হয়েছে মৌরীর? ”

__ “ মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে, প্রচুর রক্ত বের হয়ে গেছে। যদি কিছু হয় তোকে মাটিতে পুতে ফেলবো। আমার মৌরীর জীবন নিয়ে তুই অনেক খেলেছিস। এবার তোকে দেখে নিবো রিমন। ”
রিমনের মৌরীর জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে, মেয়েটা কে দেখে ভালোবেসে ফেলেছিলো। শুধুমাত্র প্রতিশোধ এর আগুনে জ্বলে মেয়েটার এত ক্ষতি করেছে। আর মৌরী যদি মরে যায়, নিজেকে ক্ষমা করতে পারবেনা। রিমনের চোখে এক ফোঁটা জল আসে, একি মৌরীর প্রতি ভালোবাসা নাকি হারানোর ভয় বুঝতে পারেনা।
ফোনের ওপাশে শাওন ওকে অনেক কথা শুনাচ্ছে রিমন আর উত্তর দেয়নি, শাওন ফোন কেটে দিয়ে ওর চাচা রিসাদ কে ফোন দিয়ে শাসিয়ে দেয়।

চলবে…….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here