ঝরা ফুল পর্ব ৪

ঝরা ফুল পর্ব ৪

লেখা: #জামিয়াপারভীনতানি

শাওন মৌরীর পাশে গিয়ে বসে, জানে মেয়েটার উপর সারাদিন অনেক ধকল গেছে তারপরও মৌরীর পিঠে হাত দেয়। চমকে উঠে মৌরী, ধড়ফড় করে উঠে যায়। জোর গলায় বলে,

__ “ বাধ্য হয়ে তোমাকে বিয়ে করেছি, তার মানে এই না যে আমাকে তুমি কিনে নিয়েছো। খবর দার আমাক ছোঁবে না। ”

যে মৌরী ছিলো শাওনের ছোট বেলার খেলার সাথী। কতো দিন একসাথে মারামারি করেছে। একে অপরকে ছাড়া যেনো থাকতেই পারতো না। আর সেই মৌরী তার ছোঁয়া কে ঘৃণা করছে। সরে যায় শাওন,
আস্তে করে বলে,
__ “ সরি, আমি বুঝতে পারিনি। আমাকে দেখে তুই অখুশি হবি। আচ্ছা একটা কথা বলবি, তুই না আমার খেলার সাথী ছিলিস, এখন কেনো আমাকে সহ্য করতে পারছিস না। ”

মৌরী মনে মনে বলে, “ এতো হয়না! কারণ আমি রিমন কে ভালোবেসে ফেলেছি। এক জীবনে দুইজনের সাথে কি ঘর বাধা যায়। কখনো এটা হবার নয়। কিন্তু রিমন যে আমায় ছেড়ে চলে গেল। আমি কার কাছে সব সত্যি বলবো। ”
মৌরীকে চুপ থাকতে দেখে শাওন আবারও জিজ্ঞেস করে,

__ “ তুই কি রিমন কে ভালোবেসে ফেলেছিস, যার কারণে আমায় মানতে পারছিস না। ”

মৌরী কোন কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকে। শাওনের একটু রাগ হয়, এমন নিরবতার জন্য। মৌরীর হাত ধরে ঝাঁকি দিয়ে বলে,

__ “ আমি মুর্তি নয়, কথা বলছি তোর সাথে। তুই জবাব দিচ্ছিস না কিসের জন্য। ”

__ “ আহহহ ছাড়ো! লাগছে হাতে। ”

__ “ তুই কি আমার উপর বিরক্ত হচ্ছিস?”

__“ আমার একটু সময় লাগবে, প্লিজ একটু একা থাকতে চাই। আমার বিশ্বাস তুমি আমায় ভুল বুঝবেনা। ”

__ “ তাড়িয়ে দিচ্ছিস তাইনা ! ”

মৌরী কথা না বলে বেডে উঠে মাঝে কোলবালিশ দিয়ে শুয়ে পড়ে। শাওন বুঝতে পারছেনা মৌরীর কি এমন হয়ে গেলো। চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ে, স্মৃতির পাতায় ভেসে উঠে শুধুই মৌরীর স্মৃতি।

মৌরী শাওনের থেকে পাঁচ বছরের ছোট। শাওন মাস্টার্স পাশ করে এখন সরকারি কলেজের প্রফেসর হয়েছে। আর মৌরী অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। শ্যামা মৌরীর ৬ মাসের বড়। দুটো তেই এক ক্লাসে পড়ে। সব সময় দুটো মিলে খেলা করতো । আর শাওন গিয়ে দুজনকে বিরক্ত করতো। একবার মৌরী শাওনের উপর রাগ করে শাওনের চুল ধরে গালে কামড়ে দেয়।

শাওন নিজের গালে হাত দিয়ে মুচকি হেসে ফেলে, পরক্ষণেই মন খারাপ হয়ে যায় মৌরীর এমন ব্যবহারের জন্য।

• •
শাওনের আম্মু আব্বু আর শ্যামা বসে আছে, শাওনের আম্মু কখনোই চায়নি মৌরী এই বাড়ির বউ হোক।
স্বামী কে রাগারাগি করে বলছেন,

__ “ তোমার বোনের মেয়েকে উদ্ধার করতে গিয়ে আমার ছেলের জীবন টা নষ্ট করে দিলে। ওই নষ্টা মেয়ে কি না কি করে বেড়িয়েছে আর এখন এর দায়ভার আমার ছেলেকে নিতে হবে। ”

শ্যামা হুট করে বলে বসে,
__ “ আম্মু তুমি কি জানোনা! ভাইয়া মৌরীকে কতো টা ভালোবাসে। কতো টা চিন্তিত থাকে মৌরীকে নিয়ে সেটা তো আমিও জানি, আব্বুও জানে। ”

রিয়াদ আহমেদ গম্ভীর স্বরে মেয়ে কে চলে যেতে বললেন, এরপর স্ত্রী কে বললেন,

__ “তোমরা মেয়েরাই মেয়েদের শত্রু, দোষ কি তোমার মাঝে নেই। তুমি তো কালো, তোমার মা ও তো তোমাকে আমার ঘাড়ে জোর করে চাপিয়ে দিয়েছে। আমার ছেলেটার গায়ের রঙ আমার মতো হলেও মেয়ে টা তোমার মতো হয়েছে। কখনো কি আফসোস করেছি তোমাকে নিয়ে। ভালো বেসে সুখে থাকার চেষ্টা ই করেছি। তুমি তাহলে কেনো তোমার ছেলের ভাগ্য মেনে নিতে পারছোনা। মৌরী আমার বোনের মেয়ে, ওর প্রতি বিশ্বাস আছে। তাছাড়া ও যদি খারাপ ই হয় তাহলে সেটা আমার ছেলে বুঝবে। তোমাকে এই নিয়ে এতো চিন্তা করা লাগবেনা। ”

__ “ তুমি আমাকে এভাবে অপমান করলে, ওই চরিত্রহীনা মেয়ের জন্য আমাকে অসম্মান করলে। আমি তোমাকে কখনো ক্ষমা করবোনা। একদিন দেখিও তুমি আজকের ব্যবহারের জন্য আমার কাছে ক্ষমা চাইবে। ”

__ “ এই জন্যই বলে মেয়ে মানুষের মোটা বুদ্ধি, বুঝানোর জন্য উদাহরণ দিলাম, আর তুমি সেটা নিয়েই ঝগড়া শুরু করে দিলে। ”

__ “ বুঝানোর জন্য দুনিয়ায় আর কিছু ছিলো না, আমি আর আমার মেয়ের গায়ের রঙ টাই বড় হয়ে গেলো। হায় আল্লাহ! আমি আর বাঁচতে চাইনা। ”

__ “ আহহহ! ন্যাকামি বাদ দিয়ে এখন ঘুমাও। “
রিয়াদ আহমেদ পাশ ফিরে শুয়ে পড়েন, আর বউয়ের ফিচফিচানি কান্না শুরু হয়।

পরদিন সকালে মৌরীর ঘুম ভেঙে খেয়াল করে শাওনের বুকের মাঝে শুয়ে আছে। শাওন ও ওকে জড়িয়ে শুয়ে আছে । এমন টাই তো চেয়েছিলো সে, স্বামীর বুকে মাথা দিয়ে আরামে ঘুমাবে। কিন্তু শাওন! ওকে কি মেনে নেওয়া সম্ভব। মৌরী উঠে যেতে গিয়ে শাওনের ঘুম ভেঙে যায়। শাওন মৌরীর কোমর ধরে আরোও আরাম করে ঘুমানোর চেষ্টা করে। মৌরী খুব রেগে যায় এবার, শাওনের বুকে জোরে করে কিল মেরে দেয়।
শাওন ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলে
__ “ কি হয়েছে! একটুকু ও কি ঘুমুতেও দিবেনা!”

__ “ কে নিষেধ করেছে ঘুমাতে, তাই বলে কি আমাকে জড়িয়ে ঘুমাতে হবে নাকি। ”

__ “ আমি আমার বউ কে জড়িয়ে ঘুমিয়েছি। তোমার আপত্তি থাকলে অন্য ঘরে যাও গিয়ে। ”

__ “ ঘুমের ঘোরে কি পাগল হয়ে গেলে তুমি। তোমার বউ তো আমি, আমি অন্য ঘরে যাবো কিভাবে যদি যেতে না দাও তো। ”

__ “ তাহলে আমার বুকেই থেকে যাও! ”

__ “ তুমি আবার আমাকে তুমি ডাকা শুরু করলে কবে থেকে। ”

__ “ বউ কে তুমি বলেই ডাকতে হয় তো। ”

মৌরীকে দুই হাত দিয়ে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিয়ে শাওন আবার বলে,

__ “ সব কিছু কি আবার নতুন করে শুরু করা যায় না। তোমার হাত ধরে আমি পৃথিবী ঘুরতে চাই। সব অতীত কি ভুলে যাওয়া যায় না। বড্ডো ভালোবাসি যে তোমায়। সেই ছোট বেলা থেকেই তোমার সাথে মজা করতে করতে কখন যে তোমার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম নিজেও জানিনা। রিমনের সাথে তোমার বিয়ের কথা শুনে খুব কষ্ট পেয়েছিলাম। যখন বিয়েটা ভেঙে যায় আর তোমায় হারাতে চাইনি। নিজের আপন করে নিতে চাই, হবেনা কি তুমি আমার! ”

মৌরী নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে যায়,

__ “ ক্ষমা করে দিও আমাকে, আমি তোমাকে কখনো ভালোবাসার চোখে দেখিনি। আমি তোমাকে মেনে নিতে পারবোনা। ”

__ “ কার জন্য আমার সাথে এমন করছো তুমি? ”

__ “ কে কে কে কেউ না! তোমাকে বলতে বাধ্য নই। ”

মৌরী উঠে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। ডিভোর্স পেপার টার কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছে মৌরী। যেটা জড়িয়ে শুয়ে ছিলো।

শাওন গত দিন থেকেই খেয়াল করেছে মৌরীর হাতে একটা পেপার। কিন্তু সেটা বিছানায় পড়ে থাকতে দেখে খুলে দেখে।
ডিভোর্স পেপার দেখে শাওনের মাথা খারাপ হয়ে যায়, একা একা বেডে কয়েকটা লাত্থি দেয়। শব্দ শুনে মৌরী ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে, শাওনের হাতে পেপার টা দেখে বুঝতে বাকি থাকেনা কি হয়েছে।

মৌরী ওয়াশরুমের দরজার সামনে থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাথা নিচু করে ফেলে সে। এতো বড় সত্যিই কথা মেনে নেওয়া সব ছেলের পক্ষে সম্ভব না । শাওন মৌরীর দিকে অনেক্ষণ তাকিয়ে থাকে, ভাবে মৌরী নিজে হয়তো খুলে বলবে সব কিছু।

কিছুক্ষণ পর শাওন মৌরীর দিকে এগিয়ে যায়, হাতের পেপার দেখিয়ে বলে,
__ “ এটা কি মৌরী? তুই এভাবে আমাকে ধোঁকা দিতে পারলি। ”

মৌরী চোখের পানি ছেড়ে দেয়, যদি শাওন ও রিমনের মতো ডিভোর্স ধরিয়ে দেয়। তাহলে কি হবে তার। ভয় মৌরীর ভিতরে জেঁকে বসেছে।

চলবে…………

আজ একটু অসুস্থ, তাই এটুকুই দিলাম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here