ঝরা ফুল পর্ব ২

ঝরা ফুল পর্ব ২

লেখা : জামিয়া পারভীন তানি

রিমনের সাথে মৌরী রেস্টুরেন্ট এ বসে আছে, ওয়েটার এগিয়ে আসে। দুজনের উদ্দেশ্যে একটা পেপার এগিয়ে দিয়ে বলে,

__ “ স্যার এন্ড ম্যাম, আমাদের রেস্টুরেন্ট এ যারা আসে তাদের এই পেপারে সাইন করতে হয়। এটা আমাদের সিকিউরিটির জন্য বা আপনাদের সিকিউরিটির জন্য করে থাকি। ”

মৌরী রিমনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে বলে,
__ “ এই নিয়ম আবার কবে চালু হলো? ”

রিমন মুচকি হেসে বলে,
__ “ আমাদের তো ভালোই হচ্ছে, ক্ষতি তো আর হচ্ছেনা একটা সাইন করলে। ”

রিমন তাড়াতাড়ি সাইন করে মৌরীর দিকে এগিয়ে দেয়, মৌরীও বোকার মতো কাগজে কি লিখা আছে না পড়েই সাইন করে দেয়। ”

রিমন ওয়েটার কে চোখ টিপে ইশারা করে, ওয়েটার চলে যায়। কিছুক্ষণ পর স্যুপ দিয়ে যায়।

__ “ আমি স্যুপ তেমন পছন্দ করিনা। ”

রিমন তখন বলে,
__ “ ওহহহ সরি, আমি তো জানতাম না। আরে খাও খাও, একদিন টেস্ট করেই দেখো। ভালো তো লাগতেও পারে । ”

মৌরী টেস্ট করতে গিয়ে ভালো লাগাতে পুরোটা শেষ করে ফেলে। এরপর ডিনারে বিরিয়ানী অর্ডার করে।

ডিনার শেষ হতেই, মৌরীর মাথা চক্কর দেওয়া শুরু হয়।

মৌরীর ঠোঁট দুটো তে গভীর চুম্বন করে ছেড়ে দিয়ে রিমন বলে,

__ “ কি এতো ভাবছো শুনি। এতো চিন্তা করে কি লাভ বলো। এখানে কিভাবে এলে কিছুই মনে করতে পারছোনা তাইনা। আসলে তোমাকে যখন প্রথম দেখি, তখনই প্লান করে ফেলি কিভাবে তোমাকে নিজের করে পাবো। সেইজন্যই তো গিফট কিনার নাটক করে তোমায় বাসা থেকে বের করি। আসলে কি বলোতো, তোমাদের বাসার লোড শেডিং হয়নি, আমিইই লাইন কেটে দিয়েছিলাম। এরপর শপিং শেষ এ তোমার খাবারে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে দিই। হোয়াট এ প্লান ম্যান। ” হাহাহা

মৌরী নিজের যত শক্তি আছে সব দিয়ে রিমন কে খামচি দিতে শুরু করে, খুব ঘৃণা হচ্ছে নিজের প্রতি, রিমনের প্রতি। রিমন মৌরীকে শক্ত করে ধরে মৌরীর গলাতে চুমু দিতে থাকে। আধা ঘণ্টা পর নিজ হাতে মৌরীকে নিজের কেনা ড্রেস টা পরিয়ে দেয়। এরপর বলে,

__ “ নিজের হাজবেন্ড কে এতো ঘৃণা করতে হয়না সুন্দরী। ড্রেস, রিং সব তোমার জন্যই কেনা। তোমার বিয়ের পোশাক আর এনগেজমেন্ট রিং। কাল ওয়েটার এর কাছে যে পেপারে সাইন করেছিলে সেটা তোমার আর আমার বিয়ের ডকুমেন্ট। ”

মৌরীর মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়ে, রিমনের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে অনেক্ষণ। এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রিমন আবার বলে,

__ “ এভাবে হা করে থেকোনা, মশা ঢুকবে। আর ভেবোনা তোমায় ভালোবেসে বিয়ে করেছি। খুব শীঘ্রই ডিভোর্স পেয়ে যাবে। ”

একের পর এক বাজ মৌরীর মাথায় যেনো পড়ছে। ঠিক ভাবে দাঁড়াতেও পারেনা তবুও রিমনের গলাতে গিয়ে কামড় বসিয়ে দেয়, এরপর বলে,

__ “ স্মৃতি শুধু আমার একার না আপনারাও থাকুক। এই কামড়ের দাগ অনেকদিন আমার কথা মনে করিয়ে দিবে। ”

__ “ তোমার কথা এমনিতেই সারাদিন ভাবি সুন্দরী, ভুলেও ভেবো না মৌসুমীর বিয়ে এটেন্ড করতে এসেছি। আমি শুধুমাত্র তোমাকে পাবার জন্য এসেছি এই প্রথম্বারের মতো দাদা বাড়িতে। ”

মৌরী এবার চোখের জল ছেড়ে দিয়ে বলে,
__ “ কেনো! কি এমন ক্ষতি করেছিলাম আমি আপনার! ”

__ “ বাসায় চলো এখন। ” টানতে টানতে বের করে রিমন মৌরীকে। হোটেল ম্যানেজার কে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বের হয়ে আসে রিমন।

→→→ বাসায় সবাই খুব পেরেশানি তে আছে, রামিজা আহমেদ খুব পায়চারী করছেন। রাবেয়া মেয়ের মেয়ের বিয়ের জন্য ব্যস্ত হলেও বোনের মেয়ের জন্য টেনশন এ মাথা ফেঁটে যাচ্ছে এমন অবস্থা। কিন্তু রিমন ও যে নিখোঁজ সবাই এই কথা ভুলেই গেছে।

মৌরীর নিখোঁজ হবার পর শাওন খুব অস্থির হয়ে গেছে, রাত্রে এতটুকু ও ঘুমাইনি । সবার কাছে গিয়ে শাওন বলে,

__ “ অনেক হয়েছে, বিয়ের অনুষ্ঠানে ছিলো একটা মেয়ে। হটাৎ করে গায়েব হবার তো কথা নয়। নিশ্চিত ওর কোন বিপদ হয়েছে। থানায় একটা ডায়েরী করা দরকার। ”

মৌরীর বাবা মোতালেব সাহেব কথায় সায় দেন। হাজার হোক আদরের মেয়ে বলে কথা। শাওন বাসা থেকে বের হয়ে একটু সামনের দিকে এগিয়ে যায় । হটাৎ করে মৌরীকে দেখে থেমে যায় শাওন। মৌরী বাসার খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে।

__ “ কিরে তুই এখানে কি করছিস, আমরা তোকে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে গেলাম। ”

__ “ শাওন। ” শাওন বলেই শাওনের বুকে অজ্ঞান হয়ে যায় মৌরী।

শাওন মৌরীকে কোন রকম কোলে তুলে নিয়ে নিজের বাসায় ফিরে আসে দাদার বাসায় না গিয়ে। বেডে শুইয়ে দেয় আগে, শাওনের মা বাবা আর মৌরীর মা বাবা কে জানায় আগে। সবাই মৌরীর এমন অবস্থা দেখে অবাক হয়ে গেছে। এক রাতে মৌরীর মুখে কালো আভা পড়েছে, চোখের নিচে কালো দাগ। মনে হচ্ছে খুব টর্চার করা হয়েছে মেয়েটার উপর।

__ “ মনে হয় ওকে খুব মারা হয়েছে, ওর অবস্থা খুবিই খারাপ আন্টি। কি করবেন এখন, হসপিটাল এ নিবেন নাকি। ”

__ “ না থাক! বেশি জানাজানি হয়ে গেলে ওর আর বিয়েই হবেনা কখনো। আগে ওর জ্ঞান ফিরুক, এরপর ওর মুখে আগে শুনি কি হয়েছে। এরপর কোন সিদ্ধান্ত নিবো। ”

__ “ আন্টি আপনি কি মা! মেয়ের জীবনের চেয়ে মান সম্মান বড় হয়ে গেলো। ”

শাওনের আম্মু বলে,
__ “ তুই চুপ থাক একটু, এখানে বড়ো রা আছে। তাদের কথার মাঝে বার্তা ঢুকাস না। ”

মৌরীর জন্য শাওন এর চোখ লাল হয়ে এসেছে, রাত থেকে টেনশন এ ঘুমায়নি, আর এখন মৌরী অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। শাওন গিয়ে মৌরীর চোখে পানি ছিটা দিতেই মৌরী জেগে উঠে।

__ “ মা ”

__ “ সারারাত কোথায় ছিলিস মুখপুড়ি। বাপের মুখে কি চুনকালি লাগাতে গিয়েছিলিস। সারারাত বাইরে পার করে আসতে পারলি, আসার আগে বিষ খেয়ে আসতিস। দাফন দিয়ে দিতাম, তাও ভালো সমাজের কাছে কটু কথা শুনতে হতো না। ”

কোথায় মায়ের কাছে একটু ভরসা পাবে, তা নয় এতো গুলো কথা শুনে চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। মৌরীর মা আবারও বলে,

__ “ কার ঘরে গিয়ে রাত কাটিয়ে এসেছিস, তার নাম শুধু বল। তাকে দেখে নিবো আজ আমি। ”

মৌরী মাথা নিচু করে বলে,
__ “ আমি কোন পাপ করিনি, কারোও ঘরেও যায়নি। ” মনে মনে ভাবে, “ রিমন তো আমার হাজবেন্ড, কোন পাপ হয়নি আমার। কিন্তু ও তো বললো ডিভোর্স দিয়ে দিবে। কেনো এমন করলো?” নিজের মনের সাথে যুদ্ধ করতে থাকে মৌরী।

__ “ তাহলে সারারাত কার কাছে ছিলিস, সবাই জানে তুই হারিয়ে গেছিস। এক রাত পর বাড়ি ফিরে এসেছিস। এখন তোকে বিয়ে করবে কে? ”

__ “ কেনো আন্টি, এক রাত বাইরে কাটিয়ে আসলে বুঝি মেয়ে খারাপ হয়ে যায়। আপনাদের সমাজ যদি মৌরীকে না মেনে নেয় তাহলে আমাকে বলিয়েন। অবশ্য আমি বিদেশে মানুষ হয়েছে। এক রাত কেনো হাজার হাজার রাত বাইরে কাটালেও মেয়েদের বিয়ে হয়। যদি বলেন তো মৌরীকে আমি বিয়ে করবো। এক রাত বাইরে কাটানো আমার কাছে কোন ব্যাপার না। ” পিছন থেকে রিমন এসে কথাগুলো বলে।

মৌরীর লজ্জায়, ঘৃণায় মুখ লাল হয়ে গেছে। কি চাচ্ছে টা কি রিমন। কিছুই বুঝে উঠতে পারছেনা মৌরী। এর চেয়ে চুপ থাকাই বেটার ভেবে চোখ দিয়ে অঝোরে জল বেয়ে পড়ে।
শাওন রিমনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, এরপর বলে,

__ “ হটাৎ মৌরীকে বিয়ে করতে চাইছো যে। আগে থেকেই পছন্দ করতে নাকি!”

__ “ এই বাসায় এতো সুন্দরী, সেক্সি মেয়ের জায়গা হবেনা শুনে কি চুপ থাকা যায়। ”

শাওন এর ইচ্ছে হচ্ছে রিমন কে মেরে নাক ভোঁতা করে দিতে। মৌরীর জন্য বাজে ওয়ার্ড ইউজ করছে এই ছেলে অথচ শাওন নিজে কিছুই করতে পারছেনা।

হটাৎ করে মৌরীর মায়ের চোখ পড়ে মৌরীর পোশাকের দিকে,

__ “ তুই এই পোশাক কোথায় পেলি? আগে তো এমন পোশাক তোর ছিলো না। ঠিক করে বল কার সাথে আকাম করেছিস! ”
মৌরী চুপ করে আছে দেখে ওর মা ওকে মারতে হাত ওঠায়, তখন রিমন হাত ধরে নিয়ে বলে,
__ “ আহহহহ! মেয়েদের গালে মারতে নেই, দেখতেই পাচ্ছেন মেয়েটা সিক । এরপরও ওকে মারতে হাত কাঁপছে না আপনাদের। ”

মৌরী যখন থেকে জানতে পেরেছে রিমন ওকে বিয়ে করেছে, ঘৃণা টা অনেকটা কমে এসেছে। শুধু কৌতূহল কাজ করছে, কেনো রিমন এমন করছে ওর সাথে।

শাওন তখন বলে ওঠে,

__ “ আচ্ছা রিমন ভাইয়া, কাল রাতে তুমি কোথায় ছিলে? ”

শাওনের কথায় সবাই যেনো চমকে উঠে, সত্যিই তো রিমন ও তো বাসায় ছিলো না। তাহলে কি রিমন ই মৌরীকে নিয়ে গিয়েছিলো। সবার মনে অজানা আশঙ্কা ভর করে।

রিমন তখন অবজ্ঞা করে বলে,

__ “ আমাকে এখানে ডাকার আগে কি বলা হয়েছিলো আর হলো কি! লোড শেডিং হয় না, হুহহহ! আমি কি অন্ধকার এ বসে থেকে বড় হয়েছি নাকি। 5 স্টার হোটেলে গিয়ে রাত্রি যাপন করে এসেছি। দাদু বাসায় এসেই শুনলাম নাকি মৌরীকে সারারাত পাওয়া যায়নি, তাই দেখতে এলাম। কি অবস্থা, এসে যা দেখলাম বলার বাইরে। আর তুই যা বললি, মানে আমাকে সন্দেহ করলি। এটা জাস্ট ভাবার বাইরে। ”

রিমনের দিকে তাকিয়ে মৌরী অবাক হয়ে যাচ্ছে, কিভাবে পারছে সে এমন করতে। এতটুকু কাঁপছেনা মিথ্যে বলতে।

চলবে……..
( কাল অনেকে বলেছেন প্রথম পর্ব নাকি রেপ দিয়ে শুরু করেছি। এখন তো বুঝলেন সম্পূর্ণ না পড়লে কিছু বুঝা যায়না। আরোও এমন অনেক কাহিনী আছে। )

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here