নষ্ট গলি পর্ব-৪১

0
573

নষ্ট গলি পর্ব-৪১

লেখা-মিম

আনিকার রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দাটা দক্ষিণমুখী। প্রায় সারাটাদিন ধরেই মাতাল হাওয়ার আনাগোনা থাকে এই বারান্দাটাতে৷ বিশেষ করে রাতের বেলায়। রাতের খাবার সেড়ে বারান্দায় বসে আছে আনিকা আর মায়া। খুব মনোযোগ দিয়ে আনিকার কথাগুলো শুনছে মায়া।

– বিশ্বাস করেছিলাম ওকে। এতটা করেছি যে নিজের সম্মানটুকু ওর হাতে তুলে দিতে দ্বিধা করিনি। কতটা বিশ্বাস করলে একটা মেয়ে মানুষ তার প্রেমিকের সামনে নগ্ন হতে পারে ভেবে দেখতো? আর ও কি করলো? বিশ্বাসটাকে পা দিয়ে পিষে ফেললো।

দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো মায়া। চাইলে এই মূহুর্তে আনিকাকে কড়া গলায় বলতে পারতো, তোকে না করেছিলাম। কেনো গেলি?
এধরনের প্রশ্ন করাটা মায়ার কাছে অদ্ভুদ এবং অহেতুক মনে হয়। যা হয়ে গেছে তা তো আর বদলানো সম্ভব না। তাছাড়া তার কর্মফল তো সে ভুগছেই। নতুন করে তার কর্ম মনে করিয়ে দেয়ার কি আছে?

কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলতে শুরু করলো আনিকা।

– ওর সাথে যতবার রুমডেটে গিয়েছি প্রতিবারই ওর কোনো না কোনো বন্ধুর বাসায় গিয়েছি। ওর বন্ধুরা জানতো ওর সাথে আমি……
জানিস সে মূহুর্তে এই কথাটা একটাবারের জন্যও মাথায় আসেনি বদ্ধরুমে আমি আমার প্রেমিকের সাথে কি করছি সেটা তো ওর বন্ধুরা জেনে যাচ্ছে। নিজেদের মধ্যে হয়তোবা আলোচনাও করছে। আমার আড়ালে হয়তোবা আমাকে নিয়ে নোংরা মন্তব্য করছে। আমার প্রেমিককে হয়তোবা জিজ্ঞেস করছে রুমডেট কেমন ছিলো? কেনো মাথায় আসেনি আমি জানিনা। সত্যি জানিনা৷ লাজ লজ্জার মাথা খেয়ে বসেছিলাম একদম। আর এখন…. মনে হলেই গা কাঁটা দিয়ে উঠছে। কিভাবে পারলাম ওর বন্ধুদের সামনে দিয়ে ঐ রুমে যেতে? ওর বন্ধুরা জানতো কি কাজ করতে ঐ ঘরটাতে আমি যাচ্ছি। অনেক মানুষই হয়তো আমার নিকৃষ্ট কাজের গল্পটা জানে। রাস্তা দিয়ে যখন হেঁটে যাই তখন হয়তো আমার আড়ালে আমাকে নিয়ে বাজে কথা বলে। গা ঘিনঘিন করছে খুব। মনে হচ্ছে গায়ে আগুন লাগিয়ে দেই। কি করলাম আমি এটা? কেনো করলাম?

এতক্ষণ নিঃশব্দে কাঁদছিলো আনিকা। শেষের কথাগুলো বলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো৷ মনে হচ্ছে যেনো চাপা কষ্ট আর অপরাধবোধটা ওর ফুসফুসটাকে দখলে নিয়ে নিয়েছে। কোনোভাবেই নিঃশ্বাসটা ফুসফুস অব্দি পৌঁছাচ্ছে না। দম আটকে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে।
রুমে যেয়ে পড়ার টেবিলের উপর থাকা পানির বোতলটা নিয়ে এলো মায়া। আনিকার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো

– একটু পানি খা। গলাটা বোধহয় শুকিয়ে এসেছে।

ধীরে ধীরে পানি খাচ্ছে আনিকা। গলাটা সত্যিই শুকিয়ে এসেছিলো। পানি খাওয়া শেষে জোরে একটা নিঃশ্বাস নিলো সে। এতক্ষণে মনে হচ্ছে নিঃশ্বাসটা ফুসফুস অব্দি একটু হলেও পৌঁছেছে।

– শোভন ভাই ব্রেকআপ কেনো করতে চায়? কিছু বলেছে?
– হুম।
– কেনো?
– আমাকে নাকি আর ভালো লাগছে না। আমার সবকিছুতেই নাকি বিরক্ত লাগে। আগের মত ম্যাজিক নাকি আর খুঁজে পায়না।
– আর?
– আমি আনস্মার্ট। ওর ভার্সিটিতে নাকি অনেক সুন্দর মেয়ে আছে। সেক্সি ফিগার। দেখলেই নাকি চোখ জুড়িয়ে আসে৷ ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকলেও একঘেয়েমি আসবে না। বন্ধুদের গার্লফ্রেন্ডগুলো নাকি আমার চেয়ে হাজারগুনে ভালো। তাদের সামনে আমাকে পরিচয় করাতে লজ্জা লাগে।
– তুই সুইসাইড করতে চাচ্ছিলি কেনো?
– কারনগুলো কি যথেষ্ট মনে হচ্ছে না? সারা শরীরে ঐ মানুষটার স্পর্শ লেগে আছে। অবৈধ সম্পর্কের নোংরা স্পর্শ। মনে হলেই গা ঝাড়া দিয়ে উঠে। সেইসাথে কিছু মানুষের নজরে আমি “ইউজড মাল” নামে পরিচিত হয়ে গেছি। আমার ভবিষ্যত কি বলতে পারবি? বাবা মা কি আমাকে ঘরে বসিয়ে রাখবে? কোনোদিনও না। পাঁচ ছয় বছর পর ঠিকই বিয়ে দিবে। ততদিনে নিশ্চয়ই ঐ নোংরা স্পর্শ মুছে যাবে না। গায়ে লেগেই থাকবে। সেই সাথে ইউজড মাল তকমাটাও। আমার পরিবারের রক্ষণশীলতা দেখে আমার হাজবেন্ড হয়তোবা ভাববে আমি অতি মাত্রার সতী মেয়ে। আমাকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে৷ রাস্তাঘাটে আমার সেই নোংরা ঘটনার সাক্ষ্যীরা আমাদের দেখবে। নোংরা হাসি হাসবে আর বলবে, আরে এই মালটারে তো আমার বন্ধু কবেই খায়া দিছে। আর সেই মানুষটা যদি কখনো জানে আমি তো সতী না। মিথ্যা ভ্রমে সংসার করে গেছে উনি। তখন কি হবে বল তো? ভবিষ্যত অন্ধকার। নূন্যতম আলা আমি দেখতে পাইনা। যত ভাবি ততই মনে হয় অন্ধকারের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছি। এমন মানুষের বেঁচে থাকার কি আদৌ কোনো মানে আছে?
– ভবিষ্যত কি হবে তা তুই জানিস না আমিও না৷ সেটা তো ভাগ্যের উপর নির্ভর করে। তোর স্বামী মানুষটা কেমন হবে তা আমি জানি না। তবে এটা কি জানিস মানুষরুপি কিছু ফেরেশতা আছে। ফেরেশতাগুলো আমাদের জীবনে আসে একরাশ স্নিগ্ধ আলো নিয়ে৷ এমনও তো হতে পারে এমন একজন ফেরেশতা তোর জন্যও অপেক্ষা করছে।
– মিথ্যা আশায় আমি দিন কাটাতে রাজি না। এগুলো নেহায়েৎ মিথ্যা ছাড়া আর কিছু না।
– গল্প শুনবি আনিকা? আমার গল্প?
-কি গল্প শুনবো তোর? তুই যে কতটা সুখী তা আর নতুন করে কি শুনবো?
– সুখের আড়ালের ভয়ংকর সত্যিটা শুনবি না?
– মানে?

খানিকটা নড়েচড়ে বসলো মায়া। নিজের অতীতটাকে কখনো কারো সামনে মেলে ধরে না। মায়ার চকচকে দুনিয়ার সাথে পরিচিত মানুষগুলো জানেই না ওর অতীত কতটা কালো ছিলো। আজ অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেই কালো অতীতকে নাড়া দিতে হবে। কাছের মানুষটাকে যে সেই কালো অতীত থেকে অনেক কিছু শিখানোর আছে। খোলা চুলগুলো খোপা করে নিলো মায়া। বারান্দার বাহিরে তাকিয়ে বললো,

– আনিকা আমি একজন প্রস্টিটিউট ছিলাম। জন্মসূত্রে। আমার মাও ছিলো এই পেশায়।

আনিকার ভ্রু কুঁচকে মায়ার দিকে তাকালো। একরাশ বিস্ময় আর প্রশ্নের ছোটাছুটি করছে ওর চোখে। মায়ার মাত্র বলা কথাগুলো বড্ড দোটানায় ফেলে দিয়েছে ওকে৷ কথাগুলো কি সত্যি নাকি বাজে কৌতুক ছিলো সে হিসেব মিলাতে পারছেনা আনিকা। হুট করেই যেনো মনে হচ্ছে কান্নাটা আটকে গেছে। কষ্টের চাপ কমে গেছে। কি বললো মায়া এটা?

– অবাক হচ্ছিস খুব তাই না রে?
– কেমন কথা বললি এটা?
– সত্যি বলেছি। আমার ঝলমলে দুনিয়াটা দেখলে কেও বিশ্বাস করবে না আমার অতীত কতটা ফ্যাকাশে ছিলো।
– সিরিয়াসলি তুই…….
– নিজেকে নিয়ে, নিজের মা কে নিয়ে নিশ্চয়ই কেও এমন নোংরা মজা করবে না।
– সোহান ভাই কি জানে এসব?
– হুম। ঐ মানুষটা আমাকে ঐ পাড়া থেকে তুলে নিয়ে এসেছে। নিজের স্ত্রীর সম্মান দিয়েছে। আমাকে বাঁচতে শিখিয়েছে। তার বউ একজন প্রস্টিটিউট জানা সত্ত্বেও কোনো স্বার্থ ছাড়া অকারনে ভালোবেসেছে৷ আগলে রেখেছে। কখনো আমাকে নিয়ে এমন চিন্তা করেনি আমার শরীরে এর আগেও বহু পুরুষের হাত পড়েছে। সেই প্রথম দিন থেকে এখন পর্যন্ত মানুষটা যতবার আমার দিকে তাকায় ততবার সেই একই মুগ্ধতা খুঁজে পাই৷ তার চোখে তিল পরিমান মুগ্ধতা বা ভালোবাসা কোনোটারই ঘাটতি হতে দেখিনি।
প্রায় আড়াই বছর আগে গল্পটা শুরু হয়েছিলো। তখন ঐ পাড়াতে আমার চাহিদা আকাশচুম্বী৷ আতিপাতি কাস্টমারদের কাছে আমাকে নেয়া হতো না। মোটা অংকের টাকা যারা দিতে পারবে শুধু মাত্র তাদের কাছেই আমাকে পাঠানো হতো। একদিন এই মানুষটা এলো। মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে আমাকে সাথে করে নিয়ে গেলো৷ উনার দেখা পাওয়ার আগ পর্যন্ত ধারনা ছিলো পুরুষ হলো মাংসখেকো৷ কিন্তু সেদিন মনে হচ্ছিলো আমি কোনো পুরুষের ঘরে আসিনি৷ আমি একজন মানুষের ঘরে এসেছি। সেই রাতে মানুষটা আমাকে বলেছিলো ঐ ঘরটা আমার ঘর। আমার সংসার। নিজের মতো করে যেনো আগলে রাখি। যত্ন করি। কথাগুলো কানের মাঝে ঘন্টার মতো বাজছিলো। একে তো জ্বর ছিলো। তার উপর এসব কথা। দুটো মিলিয়ে মনে হচ্ছিলো আমি আর এই জগতে নেই৷ বোধহয় স্বপ্নের রাজ্যে ভাসছি। ঘুমটা ভাঙলে বা জ্বরটা কমলেই একদম মুখ থুবড়ে এসে সেই নোংরা জগতে পড়বো।

(চলবে)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here