মন ফড়িং ❤ ১৯.

0
1297
মন ফড়িং ❤
১৯.
– একই অবস্থা মানে?
– মানে কিছুই না।
অদ্রির মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। ভালোবাসি – কথাটা সে সেধে বলেছে আর  নিদ্র কিনা পাত্তাই দিলো না।
নিদ্র কে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো। আচমকা অদ্রির আচরণে নিদ্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো
– কী হলো আবার?
– কিছুই না।
– তাহলে এভাবে ধাক্কা দিলেন কেনো?
– আমার ভালো লাগছেনা। রুমে যাবো।
অদ্রি বাম হাত দিয়ে দরজা খুলতে পারছিলো না।
নিদ্র হাসছিলো।
– দরজা আমি খুলে দিচ্ছি। দেখি কীভাবে যান!
অদ্রি বাধ্য হয়ে ডান হাত দিয়ে দরজা খুলতে গিয়ে আবার ব্যথা হলো। এবার রক্ত পড়তে শুরু করলো। পড়নের সাদা কামিজ রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে।
নিদ্র অদ্রির বাম হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে বিছানার উপর বসিয়ে দিলো।
আশেপাশে রক্ত মোছার কিছু না পেয়ে তোয়ালে দিয়ে রক্ত মুছে দিতে লাগলো।
নিদ্রের চোখ লাল হয়ে আছে। সম্ভবত খুব বেশি রেগে আছে।
– রুমে গিয়ে ড্রেস চেঞ্জ করে নিবেন।
– দরজাটা…..
– দিচ্ছি।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও অদ্রিকে চলে যেতে হচ্ছে। তার সেই রুমে একাকীত্ব তাকে আবার ভর করবে। সাদা কামিজ, ওড়নায় রক্ত লেগে কেমন যেন আঠা আঠা ভাব হয়ে গেছে। পুরো শরীর ঘিন ঘিন করছে। রক্ত এখনো টপটপ করে পড়ছে।
রক্তের গন্ধটা মনে হলো তার নাকের মধ্যে লাফ দিয়ে ঢুকে পড়লো। পেটের মধ্যে গন্ধটা গুলিয়ে বমি আসার মতো অবস্থা। গন্ধটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। মাথার মধ্যে সব হঠাৎ করে ফাঁকা ফাঁকা লাগতে শুরু হলো। তারপর অদ্রির আশেপাশে সব আবছা হতে হতে নিকষ কালোতে রূপ নিলো। আর কিছুই মনে নেই।
নিদ্র দরজার সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে অদ্রির চলে যাওয়া দেখছিলো। মনের মধ্যে ক্ষীণ আশা ছিলো, ও ফিরে এসে জাপটে জড়িয়ে ধরবে। কিন্তু সেই আশা মনে হয় পূরণ হবেনা।
অদ্রি দাঁড়িয়ে গেলো। তার কিছুক্ষণ পরই অদ্রি মাটিতে লুটিয়ে পড়লো।
নিদ্র নিজের চোখকেই বিশ্বাস কর‍তে পারছেনা। একটু আগেও তো ও স্বাভাবিক ছিলো এখন এমন কেনো হলো?
অদ্রিকে কোনোমতে কোলে তুলে নিয়ে রুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
রিতা অদ্রির রুমের দিকে আসছিলো। অদ্রিকে নিদ্রের কোলে দেখে প্রথমত সে হতভম্ব হয়ে গেছেন, দ্বিতীয়ত অদ্রির অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার কথা শুনে আরো বেশি হতভম্ব হয়ে গেলেন।
রশীদ সাহেবকে দিয়ে ডাক্তার ডাকানো হলো। ডাক্তার সাহেব হাতে ব্যাণ্ডেজ় লাগিয়ে দিয়ে যাওয়ার সময়  বলে গেলেন
– শরীর দূর্বল ছাড়া কিছুই তো এখন পাচ্ছিনা। প্রেশার নরমাল। হাতের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরা দেখেই মনে হয় অজ্ঞান হয়ে গেছে। তারপরও আমি কিছু টেস্ট লিখে দিচ্ছি কিছুটা সুস্থ হলে করে ফেলবেন।
রিতা বললেন
– এখনকার জন্য কোনো মেডিসিন বা কোনো নির্দেশনা?
– আমি ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে দিয়েছি। সকালে ঘুম ভাঙবে। দুধ, ডিম আর সবুজ শাক সবজি খাওয়াবেন। খাওয়া দাওয়ার যেন অনিয়ম যেন না হয়।
রিতা নিদ্রের দিকে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে আছে। ছেলেটাকে তার সুবিধার মনে হচ্ছে না।
হাতে তো ফোসকা পড়েছিলো, এরকম ছন্নছাড়া ভাবে কাটলো কীভাবে?
না, ছেলেটার মধ্যে সমস্যা আছে।
নিদ্র রাতে না খেয়েই রইলো। আসমা জামান অনেক বলার পরও কোনো কথা শুনলো না। নাজমুল সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন
– এতো সাধতে হবেনা। যার পেট তারই জ্বালা নাই, তোমার এতো সমস্যা কই?
– রাতে না খেয়ে থাকাটা ঠিক না, নাজমুল।
– ও তো ছোটো না যে বুঝেনা।
রশীদ সাহেব রাতে খেতে বসেও খেতে পারলেন না চিন্তায়। মেয়েটার কিছু হয়ে গেলে তার যে কী হবে যে জানে।
নিজের মেয়ের মতোই অদ্রি।
রিতা অদ্রির রুমের ফ্লোরে বিছান পেতে শুয়ে আছ।নিদ্র ছটফট করছিলো অদ্রির কাছে যাওয়াদ জন্য কিন্তু রিতার কারণেই পারছেনা।
নিজের রুমে পায়চারি করেই পুরো একটা রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিলো নিদ্র।
অসহ্যকর লাগছে তার। রিতাকে তার সহ্য হচ্ছেনা।
আজানের পর পর রিতার ঘুম ভেঙে গেলো। অনেক কাজ পড়ে আছে তার।
রিতাকে চলে যেতে দেখে নিদ্র অদ্রির রুমে গিয়ে দরজা আটকে দিলো।
অদ্রির বিছানার পাশে টুল নিয়ে বসে পড়লো।
ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে নিদ্রের ভেতরে হুহু হাওয়া বইতে লাগলো। কেমন বিষণ্ন লাগছে অদ্রিকে। চোখের দু কোণায় পানি জমে আছে। ঠোঁট দুটো কেমন শুষ্ক হয়ে আছে।
অদ্রির ঘুম ভেঙে যাওয়াতে নিদ্র বললো
– আর একটু ঘুমান।
অদ্রি উঠতে গিয়ে হাতে ব্যথা পেয়ে আবার শুয়ে পড়লো। ওড়নাটা আশেপাশেই নেই, অদ্রির সংকোচ হচ্ছে এভাবে নিদ্রের সামনে শুয়ে থাকতে।
– এখন কি সকাল?
– হ্যাঁ, অনেক সকাল।
– আমার ওড়নাটা একটু খুঁজে দিবেন।
প্রায় বাধ্য হয়েই কথাটা নিদ্রকে বললো।
নিদ্র অদ্রির পাশে বিছানার উপর বসলো।
– আমিই তো।
– একটু দূরে বসুন।
নিদ্র আরো বেশি কাছে বসলো। দু হাতের মধ্যে অদ্রির মুখ তুলে নিয়ে শুষ্ক ওষ্ঠে নিজের ওষ্ঠ গভীর ভাবে গলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলো।
অদ্রি প্রথমে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করলেও নিদ্রের কাছে হার মানলো।
কতক্ষণ যে এভাবে ছিলো তাদের কারোরই জানা নেই। নিদ্র অদ্রির গলায় চুমু দিয়ে অদ্রিকে নিজের দিকে আরো কাছে টেনে নিলো।
অদ্রির বুকে ঠোঁট ঘষে দিয়ে বললো
– সারারাত ঘুমাতে পারিনি। শুধু আপনার রুমের আশপাশে ঘুরে বেড়িয়েছি।
আপনার দারোয়ানের জন্য একটুও কাছে আসতে পারিনি।
– ঠিক বুঝলাম না।
– রিতা নামের কে যেন উনি আপনার রুমেই ঘুমিয়ে ছিলেন।
নিদ্রের চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে অদ্রি বললো
– ঠিক হয়েছে। আমাকে তো বেশ ভালোভাবেই তাড়িয়ে দিলেন।
– আমি আপনাকে তাড়িয়ে দেয়ার কে শুনি? আমি তো পুরোটাই আপনার নিজের।
– বাহ! ভালো ডায়লগ জানেন দেখছি।
অদ্রির বুকে ঠোঁট ঘষতে লাগল নিদ্র। অদ্রির কেমন যেন লাগছে।
না সে নিদ্রকে না করতে পারছে না সহ্য হচ্ছে তার।
– নিদ্র?
– হুম।
– আপনি আমাকে ভালোবাসেন তো?
– কেনো এমন মনে হচ্ছে?
অদ্রির চোখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিদ্র বেশ অবাক হলো। অদ্রির চোখ ছলছল করছে।
কান্না জড়িত কণ্ঠে বললো
– আপনি শুধু আমার শরীর খুঁজে বেড়ান।
অদ্রি এরকম কথা বলতে পারে নিদ্রও ভাবতে পারেনি।
নিদ্র অদ্রিকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে গেলো। তারপর বললো
– আজ থেকে আমি আপনাকে আর স্পর্শ করবো না! হ্যাপি?
– হ্যাঁ। ভালোবাসলেই কি স্পর্শ করতে হবে নাকি? স্পর্শ ছাড়াও তো এতোদিন আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছি। তাহলে এখন কেনো পারবো না?
– আপনি ঠিক বলেছেন। আচ্ছা আপনি থাকুন। আমার ঘুম আসছে, ঘুমাবো।
নিদ্র চুপচাপ চলে গেলো। অদ্রির চোখ বেয়ে দুফোটা জল গড়িয়ে পড়লো গলায়, যেখানে একটু আগেও নিদ্র চুমু এঁকে দিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিলো তাকে।
চলবে…..!
© Maria Kabir

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here