অভিশপ্তরাত (৫মপর্ব)

0
662

অভিশপ্তরাত (৫মপর্ব)

Umme Nipa

উপমার জ্ঞান ফিরতেই দেখছে শিহাব উপমার মাথায় হাত বুলাচ্ছে।

উপমা চিৎকার দিয়েই বললো,শিহাব মায়া ঠিক নেই।ওখানে মায়া ছিল।মায়ার মুখ টা কি ভয়ংকর।

শিহাব সব বুঝতে পারলো তবুও কিছু হয়নি এমন ভাবে বললো,তুমি বাইরে কেন গেলে উপমা?এটা কি শহর?গ্রামে কেউ রাতে নামে?আর তোমার এ অবস্থা?আমি ভাবছি চলে যাব আগের জায়গায়।

উপমা: কেন যাবে?তোমাকে না পেয়েই তো গেলাম।কই গিয়েছিলে?

শিহাব: পুকুরপাড় এ বসেছিলাম।হঠাৎ চিৎকার শুনে দৌড়ে আসি আমি।দেখি ওখানে পরা।বাচ্চাটার ক্ষতি হলে কি হত বলতো?

উপমা পেটে হাত দিয়ে কাঁদছে। কত সাধনার ফল।আগলে রাখা বুঝি এমন ই কঠিন।

উপমা মনে মনে ভাবছে মায়া ঠিক নেই।মায়ার কিছু হয়েছে।না হয় মায়ার রূপ ধরে কেউ এসে ধোঁকা দিচ্ছে।ইদানীং মায়া বার বার স্বপ্নে আসাটাও কি কাকতালীয়? না কিছু একটা তো আছেই।

শিহাব গ্রামের হাসপাতালে ফ্রি চিকিৎসা দিচ্ছে।মানুষ এর কাছে অল্প দিনেই বেশ পরিচিত হয়ে গিয়েছে সে।
মায়ার কথা অনেকের কাছে জানতে চাইলেও কেউ তেমন কিছুই বলতে পারেনি।
উপমা প্রায় সময় নিজে কাঁথা সেলাই করে।পুকুরপাড় এ বসে কাথা সেলাই করা যেন তার পছন্দের কাজের একটি।

হঠাৎ মনে হল পাশে কারো উপস্থিতি।দমকা বাতাস এসে পরিবেশ টা কেমন থমথমে করে দিয়েছে।

উপমা এপাশ ওপাশ তাকাতে খানিক ভয় পেয়ে যায়। মনে মনে দোয়া পরে ফুঁ দিয়ে আবার কাথা সেলাই এ মনোযোগ দিল সে।হঠাৎ কানে ভেসে এলো কারো গুন গুন করে কান্নার আওয়াজ।উপমা আশেপাশে তাকাতেই খেয়াল করলো পুকুরের ঠিক ওপারে মায়ার মতন অবিকল কেউ মায়াভরা মুখ দিয়ে উপমার দিকেই তাকিয়ে আছে।দূর থেকেই মনে হচ্ছে কত জন্মের অভিমান ভরা মুখ।

উপমা দেখেও না দেখার ভান করে ঘরের ভিতর চলে গেল।

শিহাব আসলেই তাকে বলতে হবে,এ বাড়িতে কিছু একটা আছে যা ঠিক নেই।

শিহাব কিছুতেই কিছু সমাধান করতে পারছেনা।উপমার কাছে জিজ্ঞেস করাটাও বোকামী হবে।মায়ার মৃত্যু উপমা নাও মেনে নিতে পারে।ভয়ের কারণ হতে পারে যা ওর শরীরের পক্ষে ভালো নয়।
উপমা তার মামাকে জিজ্ঞেস করলো,আশেপাশে ফকির বা দরবেশ আছে মামা?

নিজাম চিন্তা ভরা মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো কেন?

 

উপমা: মামা ইদানীং খুব বাজে স্বপ্ন দেখি।ভয় পাই খুব।শিহাব এগুলো বিশ্বাস করেনা মামা।তুমি প্লিস ওকে কিছু জানিয়ো না মামা।

নিজাম: পাশের গ্রামে আজিজ নামে এক হুজুর থাকে।তার অনেক নাম আছে।তুই গেলে নিয়ে যাব।

উপমা রাজি হল।শিহাব বাসায় না থাকা অবস্থায় উপমা তার মামাকে নিয়ে সেদিকে গেলেন।

মস্ত বড় বাড়ি। উঠোন ভর্তি মানুষ এর লাইন।কেউ বা অসুস্থ,কেউ বাচ্চা নিয়ে আবার কেউ গর্ভবতী।এত মানুষ উপকার পেয়েছে বলেই এসেছে।

ঘন্টাখানেক পর উপমার সিরিয়াল এলো।ঘরের ভিতর দেয়ালে দেয়ালে অদ্ভুত ভাষায় কত কি লিখা।আসন পেতে বসে আছেন এক বৃদ্ধ লোক।দাড়ি নেই তবে মস্ত বড় ঘোঁফ।তার চারপাশে ২০-২৫টা বিড়াল।যাদের কপালে তিলক আঁকা।

ইশারা দিয়ে উপমাকে বসতে বললেন।
কি সমস্যা?গম্ভীর গলায় আজিজ উপমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

উপমা: কয়েকদিন যাবত আমি ঢাকা থেকে এখানে এসেছি।ইদানীং আমি বাসার আশেপাশে আজেবাজে কিছু দেখে ভয় পাচ্ছি।আমি মা হতে চলেছি।এতে আমার আর বাচ্চার দুজনের ই ক্ষতি।প্লিস কিছু একটা করুন।

উপমার হাত ধরে এদিক ওদিক দেখলেন আজিজ। স্পর্শটা উপমার খারাপ লাগলেও মনের ভুল বলে এরিয়ে গেছেন।

আজিজ: সন্তানের খুব বড় বিপদ।এর প্রানের ঝুঁকি আছে।

উপমা উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,আমি কি করতে পারি?

আজিজ: মারাত্মক কিছু আমি দেখছি।যে বার বার দেখা দিতে চায় সে বাচ্চার ক্ষতি করতে চায়।দূর থেকে ক্ষতি করতে চায়

উপমা কেঁদে দিল।বাবা এ আমার অনেক সাধনার ফল।অনেক বছর পর আমি মা হতে যাচ্ছি। প্লিস কিছু একটা করুন

আজিজ: একটা ছাগল দিবা।কেন কিসের জন্য এসব প্রশ্ন রাখবানা।

উপমা: আচ্ছা।

আজিজ: আর আমি কিছু তাবিজ দিচ্ছি একটা হাতে বাধবা।আরেকটা ঘরের দক্ষিণ পাশে ঠিক আছে?

উপমা: আচ্ছা

আজিজ:আর সামনের সপ্তাহে অমাবস্যা। আমি জ্বীন টানি।তুমি তখন উপস্থিত থাকবা।সেই জ্বীন সমাধান দিবে।

উপমা: আমার বর এসব ব্লিভ করেন না।ডাক্তার মানুষ বুঝেন ই তো।আমি মামাকে নিয়ে আসবো।

আজিজ:না কাউকে আনা যাবেনা। ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ এলে জ্বীন আসবেনা

উপমা: রাতে আমি কি করে আসবো?

আজিজ: দিনে এসে থাকবে।আমি রাতে কাজ শেষ এ পৌঁছে দিব

উপমা কিছু না ভেবেই সম্মতি দিল

শিহাবের কাছে সব কিছু লুকিয়ে গিয়েছে উপমা।জানে শিহাব রাগ করবে।হাতে তাবিজ দেখে শিহাব জিজ্ঞেস করে,কি এটা
উপমা মুচকি হেসে বলে মামা এনে দিল।শিহাবের আর সন্দেহ হয়না।

দু একদিন উপমা মায়াকে আর দেখেনা।কিন্তু শিহাব কিছুদিন যাবত মায়ার উপস্থিতি টের পায়।সন্ধায় বাইরে নামতেই অন্ধকারে গাছের আড়ালে কারো জ্বল জ্বল করা চোখ শিহাব দেখতে পায়।সামনে আসছেনা মায়া।কেন আসছেনা তা শিহাবের জানা নেই।

উপমাকে পাশে বসিয়ে শিহাব বার বার বলছে উপমার এসময়ে কিভাবে চলা উচিৎ, কি কি খাওয়া উচিৎ। কিন্তু উপমা আনমনা হয়ে ভাবছে আমাবস্যা আসতে আর মাত্র তিন দিন বাকি।কিভাবে রাতে যাবে?শিহাবকেই বা কি বলবে?

উপমা?

হুম

 

কি ভাবছো?

কই কিছুনা।

আজ একটা মজার ঘটনা হয়েছে জানো।এক বাচ্চা মেয়েকে আমি ওষুধ কিনে দিয়েছি বাচ্চার মা টাকা দিতে পারেনি বলে তার নাকফুল টা খুলে দিল।গ্রামের মানুষ কি সরল তাইনা?

উপমা: তারপর?

শিহাব: আমি নাকফুল ফিরিয়ে দিয়ে বললাম মেয়ের বিয়ের জন্য রেখে দিন

উপমা: মায়েরা এমন ই। সন্তানের জন্য সব পারে।

শিহাব: হু

উপমা মনে মনে ভাবতে লাগলো আমারো আমার সন্তানের জন্য পারতেই হবে

উপমা শিহাবের হাত নিজের পেটের কাছে কাছে চেপে ধরে বললো,মেয়ের নাম কি রাকবে?

শিহাব : ছেলে হবেনা কে বললো হুম

উপমা কিঞ্চিত চুপ করে থেকে বললো আমার মন বলছে মেয়ে হবে।মেয়ের কি নাম দিব বলো?

শিহাব: ঊষা।

উপমা: আচ্ছা তাই ই হবে। আমি মরে গেলেও ঊষার আলোয় জ্বল জ্বল করে রাখবে তোমার জীবন।

শিহাব উপমার মুখ চেপে ধরে বললো,এতকাল যে চাঁদ টা আমায় আলোকিত করলো তাকে ছাড়া আমার সারা পথ যে অন্ধকার হয়ে যাবে।তুমি বেঁচে থাকো আমার চোখের আলো হয়ে।

উপমা চোখ বন্ধ করে আছে।চোখের জল অনেক টা বাঁধ ভাঙা স্রতের মতন।যাকে কোন ভাবে আটকে রাখা যায়না। চোখ বন্ধ করেও না।

গড়িয়ে পরা পানি মুছে দিল শিহাব।উপমাকে কড়া স্বরে বললো এই যে ম্যাম যেটা বলা হয়নি,এ সময় কোন ভাবেই কান্না করা যাবে না।কেমন?

উপমা চোখ না খুলেই মুচকি হেসে বললো হুম।

গভীর রাত উপমা ঘুমচ্ছে। শিহাবের ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে চাঁদের আলো জ্বল জ্বল।দরজা খুলে পুকুরপাড় এ গিয়ে বসলো শিহাব।হঠাৎ ঘাড়ে কারো হাতের স্পর্ষ অনুভব হল।তাকিয়ে দেখলো উপমা

তুমি এলে এখানে?
উপমা শিহাবের পাশে বসে বললো এমনেই।
কিছুক্ষণ থেমে থেকে উপমা উঠে হাঁটা নিল।শিহাব পিছন পিছন ডাকছে আর যাচ্ছে। উপমা কোন ভাবেই থামছেনা।প্রায় আধাঘণ্টা হেঁটে উপমা এক নির্জন জায়াগায় থামলো।

চারপাশে খোলা জায়গা।অনেকদিন আগে হয়তো এখানে ধান চাষ করতো।দুপাশে বাশ বাগান এর ঝোপ।আর সামনেই একটা ডোবা

চাঁদের আলোয় ডোবার পানি চিকচিক করছে।আর ডোবার পাশেই বড় তাল গাছ।

শিহাবের ভয়ে গলা শুকিয়ে আসছে।

উপমা এখান থেকে চলো জলদি।কি বিশ্রী পচা পানির গন্ধ।

উপমা হাত জাগিয়ে ডোবার দিকে উদ্দেশ্য করে দেখালো

শিহাব তাকিয়ে দেখছে, মায়ার নিথর শরীর কোন এক ব্যক্তি গায়ে ফকিরের বেশ ভূষা সে টানতে টানতে ডোবায় ফেলল।শিহাব আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছে।কিছু করার নেই তার।শিহাব ভয় পেয়ে উপমার হাত ধরলো।হাত টা বরফের মতন ঠান্ডা আর শক্ত।শিহাব ভীত হয়ে উপমার দিকে তাকালো।উপমার মুখ টা হুবহু মায়ার মতন হয়ে গেল।সারা মুখে কাদা মাখা।গা থেকে যেন মাটি পঁচা গন্ধ ভেসে আসছে…

চলবে….

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here