খেলাঘর পর্ব-২৮

0
591
খেলাঘর পর্ব-২৮

খেলাঘর পর্ব-২৮

লেখা-সুলতানা ইতি
আজ নির্ঝরিণী ও কোন হেল্প করেনি সকাল থেকেই স্কুলে যাওয়ার জন্য তার কতো আয়োজন ভাবা যায় বিখ্যাত কন্ঠ শিল্পী আয়াপ খান আসছে

মিথিলা – আয়ান নির্ঝরী খেতে আয়, আমার লেইট হয়ে যাচ্ছে

আয়ান এসে বল্লো আপু
– আজ নির্ঝর কে খাবার টেবিলে পাবি না

মিথিলা- কেনো

আয়ান- আজ নির যেই সাজ দিয়েছে খেতে গেলে ওর লিপইস্টিক নষ্ট হয়ে যাবে না হি হি হি

মিথিলা কিছু বলার আগে নির্ঝরিণী এসে বল্লো
– আপু তুমি ফাজিটার কোন কথা শুনবে না,দেখো আমি কেমন সেজেছি

মিথিলা বোনের দিকে তাকিয়ে আয়ান কে বল্লো
– কিরে দুষ্টু কই নির্ঝর সেঝেছে বল

নির্ঝরিণী – আরেহ আপু আমি কেনো সাজতে যাবো বলো,আমি তো তোমারি বোন তাই না

আয়ান- ঠিক আছে তুই মিথিলার বোন কিন্তু আলাদা,রাগি, গুন্ডি,বদমেজাজি আর কতো কি

নির্ঝরিণী – আপু ওকে কিছু বলো আমি কিন্তু না খেয়ে চলে যাবো বলে দিলাম

মিথিলা মিষ্টি স্বরে ভাইকে ধমক দিয়ে বল্লো
– তোরা কবে যে বড় হবি, এখন ও একজন আরেকজনের পিছনে লেগে থাকিস

আয়ান- তোর মতো বোন রুপি মা যতো দিন থাকবে ততদিন আমরা বড় হবো না

নির্ঝরিণী – ঠিক বলেছিস ভাই, আপু একদম মায়ের মতো মমতাময়ী,, বইয়ে পড়েছি মা না থাকলে নাকি বড় বোন মায়ের জায়গা নিতে পারে,তুই আমাদের মায়ের জায়গা ই নিয়েছিস আপু

মিথিলা কিছু বল্লো না,আবেগে কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে তার
– তোরা খেয়ে দরজায় তালা টা লাগিয়ে চলে যাস, আমি ছাবি নিয়ে যাচ্ছি আমার লেইট হয়ে গেছে অনেক

মিথিলা না খেয়ে বেরিয়ে গেলো ভাই বোন দের দুষ্টুমিষ্টি ঝগড়া দেখে খাওয়ার কথা ভুলেই গেছে এ দিকে দশ মিনিট লেইট হয়ে গেছে আজ কি হয় কে জানে

মিথিলা আজ স্কুলে যেতেই প্রিন্সিপ্যাল তার রুমে ডেকে নিয়ে অনেক কথা শুনিয়েছে তাকে শেষে লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়েছে, আর যেন কখনো লেইট করে না আসে আসলেই তার বিরুদ্ধে কঠিন স্টেপ নেয়া হবে

মিথিলা কিছু না বলে মাথা নিছু বেরিয়ে গেলো কি বলবে সে দোষ তো তার ই, এভাবে প্রায় ই ওর লেইট হয়,কাল থেকে আর ও ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হবে

নির্ঝরিণী স্কুলে আসতে ই ওর বেষ্ট ফ্রেন্ড আনিশা বল্লো
কিরে আজ এতো তাড়াতাড়ি এলি তোকে তো ক্লাস শুরু হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে ছাড়া এতো সকাল কখনো স্কুলে আসতে দেখিনি

নির্ঝরিণী – উফফ আশা (আনিশা কে নির্ঝরিণী আশা ডাকে, আনিশা নির্ঝরিণী কে ঝড় বলে ডাকে)আজকের দিনে আমি লেইট করে আসবো এটা তুই ভাবলি কি করে

আনিশা- সেটাই তো তুই যে গান পাগলি তার উপর তোর পছন্দের শিল্পী আসছে তোর কি আজ আর বাড়িতে মন বসবে,আজ তো ঝড়ের গতিতে আসবি

নির্ঝরিণী – চল তো আগের সারিরর সিট নিতে হবে নইলে উনাকে দেখতে পাবো না,,

আনিশা- হুম তাই তো,না দেখলে কি তোর ঘুম হবে
নির্ঝরিণী – ফাউল বকিস না,,চল

আজ উতলা স্কুলে আসতে লেইট হয়ে গেছে,, আজকের দিনে লেইট হওয়া ঠিক মানতে পারছে না মেজাজ তার খুব বিগড়ে আছে, কিন্তু স্কুল ঘেটে আয়ান কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই তার মন টা ভালো হয়ে গেলো

উতলা আয়ানের দিকে তাকিয়ে সব সময় একটা মিষ্টি হাসি দেয় আজ ও তার ব্যাতিক্রম হয়নি

আজ উতলা পাস কেটে যেতেই আয়ান চারি দিকে তাকিয়ে দেখলো নির্ঝরিণী আসে পাশে আছে কি না, যখন দেখলো নেই
তখন উতলা কে পিছন থেকে ডাক দিলো,
– এই উতলা শুনতো

উতলা লাজরাংগা চাহনিতে আয়ানের দিকে তাকিয়ে একটি নিঃশব্দ হাসি দিয়ে বল্লো
– ডেকেছো?

আয়ান উতলা কে ডেকে অস্বস্তিতে পড়ে যায় আবার উতলা তাকে তুমি করে বলছে এটা তো তার হার্টে গিয়ে বিঁধেছে

উতলা- তুমি কিছু বলছো না যে

আয়ান স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে বল্লো
– তু- তুই আজ এতো লেইটে আসলি যে

উতলা কানে পিছনে চুল গুঁজতে গুঁজতে বল্লো
– মা আজ চুল বেধে দিতে সময় নিয়েছে তাই

আয়ান একটু হাসার চেষ্টা করে বল্লো
– ওহ

উতলা আর কিছু না বলে চলে গেলো আয়ান যেন হাফ ছেড়ে বাছলো আবার চারি দিকে তাকালো না নির্ঝরিণী নেই
উতলা কে দেখলে আমার কি যেন হয় বুঝি না বাপু,
উতলা বেশি ফর্সা নয়, আবার উজ্জ্বল শ্যামলা ও না তবু ও ওর চেহারা এতো মিষ্টি,সব ছেয়ে ওর হাসি সুন্দর এই হাসিতেই আমি শেষ,

চোখের পাপড়ি গুলো বড় বড় নিচের দিকে তাকিয়ে হাটলে যেন চোখ বুঝে হাটছে এমন মনে হয় ভারী মায়াবী লাগে তখন,

উতলা কে দেখলে আমার মন সত্যি উতলা হয়ে উঠে,ঠিক মতো গুছিয়ে কথা ও বলতে পারি না ওর সামনে গেলে

এমন সময় সিয়াম এসে আয়ানের পিঠে থাপ্পড় মেরে বল্লো সালা তুই এখানে

আয়ান উতলার চিন্তায় বুধ হয়ে ছিলো সিয়ামের থাপ্পড় চমকে উঠে

সিয়াম- সালা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমাচ্ছিলি নাকি, চমকে উঠলি যে

আয়ান- কিছু না চল

সিয়াম- আজকের অনুষ্ঠান হোষ্ট করে সোহাগ ভাই,উনার উপস্থাপনা খুব সুন্দর হয়

আয়ান- হুম ভালো, চল গিয়ে বসি আয়ান আসতে আসতে লেইট করে ফেলেছিলো তাই ওরা সবার পিছনে সিট পেয়েছে

সবাই বসে অপেক্ষা করছে কিন্তু গায়ক এখন ও এসে পৌছয়নি,দশ মিনিট লেইট
এমন সময় গাড়ির হর্ন শুনা গেলো সবার মধ্যে চাঞ্চল্যতা দেখা দেয়

আয়াপ খান এসেই আর দেরি করেনি সোজা স্টেজে চলে আসে
নির্ঝরিণী অপলক ছেয়ে আছে হাজার হাজার কোটি কোটি বালিকার হার্ট থ্রব আয়াপ খানের দিকে,সত্যি ওর কন্ঠের থেকে ও অনেক সুন্দর, জোড়া ভ্রু, খোঁচা খোঁচা দাড়ি,হেয়ার স্টাইল সব যেন নজর কাড়া, মুখে যেন হাসি লেগেই আছে

আনিশা নির্ঝরিণী কে ধাক্কা দিয়ে বল্লো
– কিরে তোর মাঝে আছিস তো নাকি আয়াপের মাঝে হারিয়ে গেছিস

নির্ঝরিণী – পাকনামি করিস না তো,সামনে তাকা
নির্ঝরিণী আবার আয়াপের মাঝে ডুবে গেলো, এতো দিন শুধু গান শুনেছে,আজ গান ও শুনিবে দেখবে ও

আয়াপ – গাইজ আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত তোমাদের অপেক্ষা করানোর জন্য তবে আর তোমাদের অপেক্ষা করতে হবে না তো হয়ে যাক গান
আয়াপ গিটার বাজিয়ে গান ধরলো
“আমি তোমাকে আর ও কাছে থেকে তুমি আমাকে আর ও কাছে থেকে
যদি জানতে চাও তবে ভালোবাসা দাও ভালোবাসা নাও।।

নদী কেনো যায় সাগরের ডাকে
ছাতক কেনো বৃষ্টির আশায় থাকে
যদি বুঝতে চাও
আমি তোমার ঐ চোখে চোখ রেখে
তুমি আমার ঐ চোখে চোখ রেখে।।
স্বপ্ন দেখে যাই
তবে ভালোবাসা দাও, ভালোবাসা নাও

কাছে এলে যাও দূরে শরে
কতো দিন রাখবে আর একা করে
মনের টেনে নাও
আমি তোমার ঐ হাতে হাত রেখে
তুমি আমার ঐ হাতে হাত রেখে ।।

এসো এগিয়ে যাই
শুধু ভালোববাসা দাও ভালোবাসা নাও”

গান শেষ হতেই,দর্শকের রিকুয়েস্ট আরেকটা গাইতে হবে
আয়াপ চোখ বন্ধ করে আবার গান ধরলো

“ভালোবাসি কতো টা নাই বা বলি
কিছু কথা শুনার বোঝার কি বলি ।।
বুঝে নাও তুমি আমার চোখ টা দেখে
আছে কতো ভালোবাসা হৃদয় মেখে

বুঝে নাও তুমি আমার চোখ টা দেখে আছে কতো ভালোবাসা হৃদয় মেখে

যে পথে চলে সবাই সে পথে চলি না কারনে অকারনে ভালোবাসি বলি না ।।

বুঝে নাও তুমি আমায় চোখ টা দেখে
আছে কতো ভালোবাসা হৃদয়ে মেখে ।।

আমাদের প্রেম কেনো সবার মতো হবে তবে কি এই প্রেম উদাহরণ রবে ।।

বুঝে নাও তুমি আমার চোখ টা দেখে আছে কতো ভালোবাসা হৃদয়ে মেখে

ভালোবাসি কতো টা না ই বা বলি কিছু কথা নয় শুনার বোঝার রেখে বলি।।

এভাবে কয়েকটা গান গেয়ে একটা বিরতি নিলো
নির্ঝরিণী তনয় হয়ে শুনছিলো আয়াপ যে স্টেজ থেকে নেমে গেছে সেদিকে তার খেয়াল নেই
আনিশা টিপ্পনী কেটে বল্লো
– আহ হারে রোমিও চোখের আড়ালে চলে গেছে, কিন্তু জুলিয়েট বুঝতেই পারেনি

নির্ঝরিণীর তনয়তা কেটে যায় আনিশার কথায়
নির্ঝরিণী -কিছু বললি?

আনিশা- নাহ কিছু বলেনি,আচ্ছা শুন না যদি এখন এই স্টেজে তুই একটা গান গাস তা হলে কেমন হবে বলতো

নির্ঝরিণী – মাথা খারাপ হয়নি আমার,এই স্টেজে গান গাওয়ার যোগ্যতা আমি রাখি না

আনিশা- আচ্ছা রাখিস কি রাখিস না দেখ তা হলে
আনিশা উঠে গেলো,কিন্তু কেনো গেলো নির্ঝরিণী বুঝতে পারেনি

কিছুক্ষন পর উপস্থাপক সোহাগ ভাই ঘোষনা দিলো
– গাইজ এখন নিশ্চই আপনারা বসে বসে বোর হচ্ছেন কিন্তু আমার মনে হয় আর বোর হতে হবে না আমদের অতিথি এখন একটু বিশ্রাম নিচ্ছে তার মাঝে এখন আপনাদের সামনে গান নিয়ে আসবে এই স্কুলের সবার পরিচিত বোন নির্ঝরিণী,

নির্ঝরিণী নিজের নাম ঘোষনা হতে দেখেই লাফিয়ে উঠে তার পর কিছু না ভেবেই স্টেজে গিয়ে গান ধরলো

“তুমি যে কতো আদরের তুমি রয়েছো মন ঝুড়ে
ওওও জানি না সেই তোমাকে
কেনো এতো ভালো লাগে
মন দুয়ারে ডেকে যাই সুখের আংগিনায়

তোমারি মনেতে আমি
ভালোবেসে স্বপ্নেতে নামি
ওও আছো যখন বুকের
ভিতর দেবো তোমায় সুখের আছর।।

ওও চাইছো যখন মনের পাঁজর
দেবো তোমায় প্রেমের বাসর”

নির্ঝরিণীর গান শেষ হতেই পিছনে ফিরে দেখে তার স্বপ্নের পুরুষ আয়াপ খান দাঁড়িয়ে আছে, সে ও সবার সাথে তাল মিলিয়ে হাত তালি দিচ্ছে
নির্ঝরিণী পলকহীন ভাবে কিছুক্ষন আয়াপের দিকে ছেয়ে থেকে তার পর দৌড়ে স্টেজ থেকে নেমে যায়,সিটে এসে ই বুকের মধ্যে হাত দিয়ে ছেপে বসে আছে,হার্টবীট দূর্ত চলছে তার

নির্ঝরিণীর পুরো ব্যাপার টা আয়াপ ফলো করে মুচকি হেসে নিজে গান ধরলো,দুপুর আড়াইটায় অনুষ্ঠান শেষ হয় সবাই অটোগ্রাফ ফটোগ্রাফ নেয়ার জন্য এগিয়ে গেলো আয়াপ খানের কাছে

শুধু নির্ঝরিণী যায়নি,তার স্টেজে চোখা চোখির কথা মনে পড়লেই হার্টবীট বেড়ে যায়
নির্ঝরিণী এখন ও হার্ট ছেপে বসে আছে

আয়াপ সবার ভীড় ঠেলে নির্ঝরিণীর কাছে গিয়ে বল্লো
হেই কোকিলা কন্ঠি তুমি ফটোগ্রাফ নেবে না
নির্ঝরিণী চমকে উঠে দাঁড়িয়ে যায়

আয়াপ আবার সেই পাগল করা হাসি দিয়ে বল্লো
কুল বেবী কুল,এতো নার্ভাস হচ্ছো কেনো, বাই দ্যা য়ে এখন আমার তাড়া আছে, তুমি এই কার্ড টা রাখো আর কিছু না হোক একটা মেসেজ অবশ্যই দিবে আর হা তুমি খুব ভালো গান করো
বাই কোকিলা কণ্ঠি ,
আয়াপ চলে গেলো
সবাই নির্ঝরিণী কে ঘিরে ধরলো
আনিশা- কিরে এতো গুলো মেয়ে থাকতে, উনি তোর সাথে নিজে নিজে কথা বল্লো কেনো,, নাকি তোকে উনার….

নির্ঝরিণী – আনিশা বাজে বকিস না তেমন কিছু ই না,তোদের কথায় গান গেয়েছি,গান ভালো হয়েছে সেটা ই বলেছে উনি

উতলা এসে যোগ দিলো
– তাই নাকি তা হলে তোকে কার্ড দিয়ে গেলো কেনো

নির্ঝরিণী আর কিছু না বলে দূর্ত পা ফেলে বাসায় চলে আসে
মিথিলা তখন এসে পৌছয়নি
নির্ঝরিণী কখন বোনের কাছে কথা গুলো বলবে সে জন্য ছটফট করছিলো

চলবে
ভুল ক্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here