মন ফড়িং ❤ ১৪. 

0
344
মন ফড়িং ❤
১৪.
নাজমুল সাহেব নিদ্রের ঘাড়ে হাত রেখে বললেন
– my dear son, তল্পিতল্পা গুছিয়ে ফেলুন। আগামীকাল আমাদের ফ্লাইট।
– সকালে?
– হ্যাঁ বাবা সকালে। তোমার দাদীর আর আমার তল্পিতল্পা গোছানো প্রায় শেষ।
– বাবা?
– হ্যাঁ বল।
– চলো না একেবারেই ফিরে যাই দেশে।
– নারে। অভ্যস্ত হয়ে গেছি এই কালচারে। নিজেকে বদলাই কীভাবে?
– মানুষের  ধর্মই হচ্ছে বদলে যাওয়া।
– যাহ, যা যা প্রয়োজন গুছিয়ে ফেল। তারপর রাতে বিশাল ঘুম দিবি।
নাজমুল সাহেব ধীরে ধীরে বারান্দা থেকে নিজের রুমের দিকে এগোলেন। সত্যিই ছেলের কথাটা ভেবে দেখার মতো। এখানে তারও কেমন দম বন্ধ লাগছে আজকাল।
আসমা জামান স্বামীর ছবির দিকে তাকিয়ে আছেন। মন তার অতীতে যাত্রা করেছে আজ বহুদিন পর।
পুরো বাড়িতে উৎসব শুরু হয়েছে। এক গ্রামের পুরো মানুষ ভীড় জমিয়েছে মাতবর বাড়ির একমাত্র কন্যার বিয়ের সাজ দেখার জন্য। আসমা জামান এর বয়স তখন কেবল ২২ শে পা দিয়েছে। লাল টুকটুকে বেনারসি তে তাকে অপূর্ব সুন্দর লাগছে। বর যাত্রী আসলো সেই রাত ১০ টায়। দুপুর থেকে ভারী শাড়ী আর গহনা পড়ে বসে থাকতে থাকতে সে ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ করে ছোটো মামী তার কান ধরে টেনে ঘুম থেকে উঠিয়ে বললো
– আর কতো ঘুমাবি রে? বর চলে এসেছে রে, উঠ!
বাসর রাতে আসমা জামানকে অবাক করে তার স্বামী ক্ষমা চেয়েছিলেন। কারণ, দুপুরের পরিবর্তে রাতে আসার জন্য। সেই কতো যুগ আগের ঘটনা। যাতায়াত ব্যবস্থা ছিলো খুবই খারাপ। গ্রামের পথ হলে য়ো কোনো কথাই ছিলো না। আসমা জামান লাজুক স্বরে বলেছিলেন
– আপনি ক্ষমা চাইবেন না।
– কেনো আসু?
স্বামীর আদরের ডাকে সে লাজে রাঙা হয়ে মাথা নিচু করে চুপ করে ছিলেন। প্রশ্নের উত্তর দেয়ার ক্ষমতা সে হারিয়ে ফেলেছিলেন।
তার স্বামীই তাকে পড়াশোনা ছাড়তে দেননি। কিন্তু মানুষটা তাকে ছেড়ে চলে গেলো। একাকী জীবন পার করে দেয়ার মতো যন্ত্রণা এই পৃথিবীতে নেই। একজন মানুষকে হাশরের মাঠে পাশে পাবার আশায়, জান্নাতে একসাথে থাকার লোভ সামলাতে ক’জন মানুষ ছাড়তে পারে? সে তো পারবেনা।
এক ছেলে নিয়ে জীবন পার করে দিলেন। ছবির মানুষটা হাসি মুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। নিদ্রের সাথে মানুষটার বেশ মিল আছে। স্বভাবে কিছুটা, চেহারায় মিল আছে। শুধু মিল নেই একটা বিষয়ে। সেটা হচ্ছে – রসিকতার বিষয়ে। মানুষটা বেশ রসিকতা জানতো। তুচ্ছ কোনো বিষয় নিয়ে এমন রসিকতা করতেন যে,আসমা জামান হাসতে হাসতে অস্থির হয়ে যেতেন।
হাসি খুশি মানুষটা দুম করে হাওয়া হয়ে গেলো।
নাজমুল সাহেব পানির বোতল নিয়ে মায়ের রুমে এসে হাজির।
আসমা জামান ছেলেকে আসতে দেখে ছবিটা সরিয়ে ফেললেন। নাজমুল সাহেব ব্যাপারটা বুঝতে পেরেও না বোঝার ভান করে বললেন
– মা, সব গোছানো শেষ?
আসমা জামান বললেন
– আমরা গিয়ে উঠবো কই?
– হোটেলের কি অভাব আছে?
– হোটেলে থাকা আর বাসায় থাকা কতো পার্থক্য তুই জানিস?
– মাটির চুলার রান্না খাবারের তুলনা নেই মা। আচ্ছা চলো একটা ব্যবস্থা হবেনেই। আগে তোমার বাবার বাড়ি গিয়ে দেখি।
– ঘাড় ধরে বের করে দিবে।
– এতো সোজা নাকি? টাকা থাকলে সব হয় মা বুঝছো?
– তা না হয় বুঝলাম। কাল কটায় বের হবো আমরা?
– ৯ টায় হলেই হবে।
– নিদ্রের কী অবস্থা? ও গোছানো শুরু করেছে?
– বলে তো এলাম। আচ্ছা মা তুমি থাকো আমি একটু বাইরে থেকে ঘুরে আসি।
– হাবিজাবি খাবি না তো আবার?
– না মা। এই একটু ঘুরে আসতে ইচ্ছে হলো।
রশীদ সাহেব বেশ চিন্তায় আছেন। অদ্রি তাকে পুরো বাড়ি এমনকি উঠোন, ফুলের বাগান সবকিছু মেরামত করে নতুনত্ব আনার দায়িত্ব দিয়েছে। তার উপর ১৫-২০ জনের মতো মানুষের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা সব তার উপর চাপিয়ে দিয়েছে মেয়েটা। তাছাড়া আর কেউই তো নেই দায়িত্ব নেবার মতো। তার ছেলেদের এই দায়িত্ব দেয়াই যাবেনা কারণ অদ্রি তাদের সাথে কথাবার্তা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেনা। তাছাড়া টাকা পয়সার ব্যাপারে অদ্রি হিসাব নিজ থেকে চাইবেনা। রশীদ সাহেবের নিজ থেকেই দিতে হবে।
তার প্রথম কাজ হবে রংমিস্ত্রির সাথে কথা বলা। তারপর দিনমজুর দিয়ে পুরো বাড়ির আগাছা কেটে পরিষ্কার করাতে হবে। বাগানের পুরো অবস্থা খারাপ, এটা বেশ ঝামেলায় ফেলবে।
মুদির দোকানে চেনাজানা আছে, লিস্ট ঠিকঠাক মতো করে দিলে আর কোনো ঝামেলা নেই। কিন্তু তার আগে সবকিছুর জন্য মোটামুটি কী পরিমাণ টাকা লাগবে, অদ্রিকে জানাতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় নাজমুলকে জানানো হয়নি।
আলনা থেকে আধা ময়লা ফতুয়া টা গায়ে দিলেন। সেল ফোনটা হাতে নিয়ে ফ্লেক্সিলডের দোকানের দিকে পা বাড়ালেন।
বিদেশে ফোন দিতে অনেক টাকা লাগে তাই ফ্লেক্সিলডের দোকানে যাওয়া।
লোড দেয়ার পর তিন বার রিং বাজার পরে নাজমুল সাহেব ফোন রিসিভ করলেন।
রশীদ সাহেব বললেন
– কেমন আছিস দোস্ত?
– এই আছি বেশ। তোর কী খবর?
– আর খবর! ছোটো মেয়েটার বিয়ে, জামাই বেশ বড়লোক। বুঝিসই তো।
– বুঝেছি চুষে খাচ্ছে তোকে নাকি খেতে চাচ্ছে?
– আরে তা না। ছেলে শুধু বলেছে মেয়েকে ধুমধামে উঠিয়ে দিলেই হবে।
– শোন প্রথম দিকে এমনই বলে। পরে দেখা যায় বড়লোক ভিক্ষুক।
নাজমুল সাহেব হো হো হো করে হাসতে শুরু করলেন।
হাসি থামিয়ে বললেন
– এই বড়লোক ভিক্ষুক তুই খুঁজে বের করেছিস নাকি তোর মেয়ে?
– মেয়ে।
– দাওয়াত দেয়ার জন্যই তো ফোন দিয়েছিস?
– হ্যাঁ, তোর পরিবারের সবাইকে দাওয়াত রইলো।
– আমরা আগামীকালের ফ্লাইটে দেশে আসছি। থাকার কোনো জায়গা নেই।
– ও নিয়ে চিন্তা করিস না। আগে তুই আয় তারপর দেখা যাবে।
– তোর মেয়েটা কি তোর মতোই আবুল দেখতে হয়েছে নাকি ভাবীর মতো সুন্দরী?
রশীদ সাহেব বিরক্ত হয়ে বললেন
– মোটেও আমি আবুলের মতোন দেখতে না।
– রিপা কি মিথ্যা বলতো?
– অতীত তুলিস না। বড্ড ব্যথা লাগে রে ভাই।
– আচ্ছা যা তুললাম না। তো আগামীকাল ফিক্সড?
– ইনশাআল্লাহ। তয় রাখি এখন বেশি টাকা কেটে যাচ্ছে।
– আচ্ছা।
অদ্রি জানালা দিয়ে নিস্তব্ধ সোনালী দিনের সৌন্দর্য দেখে রিতাকে বললো
– প্রকৃতির মতো কেউ সুন্দর হতে পারে কখনো?
অদ্রি তাকে এই টাইপের প্রশ্ন করতে পারে ভাবতেও পারেননি। আমতা আমতা করে বললেন
– আল্লাহ তো তার চেয়েও সুন্দর।
– আল্লাহ তায়ালা তো সবচেয়ে বেশি সুন্দর। তার সাথে কোনো কিছুরই তুলনা হয়না।
– হ্যাঁ, আল্লাহ মাফ করো। ভুলে কথাটা বলছি।
– কোনো মানুষ হতে পারে প্রকৃতির মতো সুন্দর?
– মনে হয়না।আর হলেও আমি চোখে দেখিনি।
– আমি দেখেছি জানেন। খুব কাছ থেকে দেখেছি কিন্তু ছুঁয়ে দেখার সাহস হয়নি। খুব কাছ থেকে পেয়েও স্পর্শ করার অধিকার আমার ছিলোনা।
চলবে……!
© Maria Kabir

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here