টেস্টটিউব  ৪র্থ পর্ব ( অন্তিম পর্ব )

0
284

টেস্টটিউব
৪র্থ পর্ব ( অন্তিম পর্ব )
#লিখা:#Nilufar_Nijhum

– কিসের ভয়!
– যদি এতেও ভাল কিছু না হয়?
– কি হবে না হবে সেটা পরের কথা, আগেই খারাপ টা ভেবে নিচ্ছো কেন! আগেতো চেষ্টা করতে হবে। আল্লাহ্‌ সহায় থাকলে ইনশাআল্লাহ আমরা সফল হবো দেখে নিও। তার চেয়ে এসব বাদ দিয়ে যা বলছি তাই কর। আম্মাকে ডেকে আনো।
– আচ্ছা যাচ্ছি।

নীলা আম্মাকে ডাকতে গেছে, এদিকে আমি ভাবছি কিভাবে আম্মাকে সব টা বোঝাব!

– আবির আমাকে ডাকছিলি বাবা?
– হ্যাঁ আম্মা, আসলে একটা কথা বলার জন্যই ডাকছিলাম।
– কি কথা?
– আম্মা, তার আগে বলো, তুমি নীলাকে তো ভালবাসো, তাই না? বলো ভালবাসোনা?
– হুম্ম বাসিতো। ও তো আমার কাছে, আমার মেয়ের মত, কিন্তু-
– কিন্তু আমাদের বাচ্চা হচ্ছেনা বলেই তোমার মন খারাপ তাইতো?
– হুম্ম বুঝতেই তো পারছিস। কত সখ করে তোর বিয়ে দিলাম, তুই যাকে পছন্দ করলি তাকেই বউ করে আনলাম অথচ কপালে কিনা এই লিখা ছিল!
– আচ্ছা আম্মা ধর, নীলা যদি তোমার ছেলের বউ না হয়ে মেয়ে হতো, আর ওর শ্বশুর বাড়িতে যদি বলা হতো, ওর বাচ্চা হয়না বলেই ওরা আবার তাদের ছেলের বিয়ে দিতে চায়, তুমি মা হয়ে কি সেটা মেনে নিতে পারতে? না সইতে পারতে?
– না, বাবা, এসব ভাবি বলেইতো এতদিন মুখ বুঝে আছি। ভেবেছিলাম আল্লাহ হয়তো একদিন না একদিন মুখ তুলে চাইবেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তো কোন আশায় আর রইলো না।
– আম্মা এখনো আশা আছে, হয়তো পদ্ধতিগত ব্যাপারটা আলাদা। আচ্ছা, তুমি আর একটা কথা বলতো, এই সমস্যা যদি নীলার না হয়ে আমার হতো? প্লিজ আম্মা তুমি বুঝার চেষ্টা কর।
– কি করতে চাস? খুলে বলতো।
– আম্মা ডাক্তার নীলাকে নিয়ে ডেকেছিল, আমি সেই হিসাবে ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো, দরকারে ভাল গাইনী দেখাবো। তারপর বাকি সবকিছু উনাদের কাছেই। তোমরা আগের সময়ের মানুষ, তাই হয়তো এটাকে অন্য ভাবে ভাবছো, তবে নিঃসন্তান থাকার চেয়ে এটা অনেক ভাল।
– আচ্ছা, আমিতো এতকিছু বুঝিনা, তুই যা ভাল বুঝিস তাই কর। তোরা ভাল থাকলে আমিও ভাল থাকবো। আমি নিজেও চাই তুই আর নীলা সারাজীবন একসাথে ভাল থাক।

আম্মার এমন কথা শুনে নীলা আম্মাকে ধরে কাঁদতে লাগে। আম্মা নীলাকে বুকে নিয়েই বলে-
– পাগলি মেয়ে, আমিতো জানি তোরা দুটিতে একটা প্রাণ। শুধুমাত্র আমার স্বপ্ন টা পুরণ হয়না ভেবেই কষ্ট পাচ্ছিলাম।
– আম্মা, আমিও তো কষ্টে থাকি, আপনাদের ইচ্ছে পুরণ করতে পারিনা ভেবে।
– আর মন খারাপ করোনা, আবির যা বলে তাই কর। ডাক্তার যেভাবে বলেন তাই কর। বাকিটা আল্লাহ ভরসা। কিন্তু একটা ব্যাপার বুঝছিনা,এটা কি বুঝলাম নাতো!

আম্মার কথা শুনে আমি বলি,
– আম্মা ওইটা টেস্টটিউব পদ্ধতি। বাকিটা ডাক্তারের কাছে গেলেই জানবো। উনি আমাদের মতামত জানতে চেয়েছিলেন।
– আচ্ছা যা তাহলে। সবকিছু যেন ভালই ভালই হয়।
– ইনশাআল্লাহ আল্লাহ ভরসা আম্মা। তুমি দোয়া কর। যেন আল্লাহ আমাদের সহায় হোন।

তারপর ডাক্তারের কাছে নীলাকে নিয়ে যাই ডাক্তারের কাছে যেতেই, ডাক্তার নীলাকে বলে-
– দেখুন, আপনি তো মা হতে পারছেন না ভেবেই কষ্ট পাচ্ছেন অথচ এইভাবে আপনার সে স্বপ্ন পূরণ হবে। শুধু আপনার মনে সাহস রাখতে হবে আর আমাদেরকে একটু কো- অপারেট করতে হবে।
– জ্বি, আমি চেষ্টা করবো।
– এইতো ভেরী গুড! আপনাকে বাকিটা বুঝিয়ে দিবো তাহলে এটার ব্যাপারে আপনার সমস্ত ভীতি চলে যাবে। তাছাড়া এটা এখন প্রায়শ হচ্ছে। আমরা এর সমন্ধ্যে জানিনা বলেই এটাকে ভয় পাই।

ডাক্তারের কথা শুনে আমি বলি, ম্যাডাম একটু খুলে বলুন তো, টেস্টটিউব পদ্ধতিটা আসলে কি? নীলা তো খুব ভয় পাচ্ছে ভাবছে , এটা খারাপ কিছু!

– এটা খারাপ বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। আসলে আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) বা কাঁচের ভেতর নিষেক (ভিট্রো = কাঁচ, ইন ভিট্রো = কাঁচের ভেতর) বা টেস্ট টিউব পদ্ধতি হচ্ছে মানবদেহের বাইরে শুক্রাণুর দ্বারা ডিম্বাণু নিষিক্ত করার পদ্ধতি। এই পদ্ধতির মাধ্যমে আপনাদের মত যারা নিঃসন্তান তারা সন্তান লাভ করে থাকেন। টেস্ট টিউব এই পদ্ধতিতে স্ত্রীর ডিম্বানু ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতে অত্যন্ত সন্তর্পণে বের করে আনা হয়। তারপর সেটিকে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর ল্যাবে সংরক্ষণ করা হয়। একই সময়ে স্বামীর অসংখ্য শুক্রাণু সংগ্রহ করে তা থেকে ল্যাবে বিশেষ প্রক্রিয়াজাত করণের মাধ্যমে বেছে নেওয়া হয় সবচেয়ে ভালো জাতের একঝাঁক শুক্রাণু। তারপর অসংখ্য সজীব ও অতি ক্রিয়াশীল শুক্রাণুকে নিষিক্তকরণের লক্ষ্যে ছেড়ে দেওয়া হয় ডিম্বাণুর পেট্রিডিশে। ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর এই পেট্রিডিশটিকে সংরক্ষণ করা হয় মাতৃগর্ভের অনুরূপ পরিবেশের একটি ইনকিউবিটরে। ইনকিউবিটরের মধ্যে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পরই বোঝা যায় নিষিক্তকরণের পর ভ্রূণ সৃষ্টির সফলতা সম্পর্কে। ভ্রূণ সৃষ্টির পর সেটিকে একটি বিশেষ নলের মাধ্যমে জরায়ুতে সংস্থাপনের জন্য পাঠানো হয়। জরায়ুতে ভ্রূণ সংস্থাপন সম্পন্ন হওয়ার পরই তা চূড়ান্তভাবে বিকাশ লাভের জন্য এগিয়ে যেতে থাকে । যার ফলে জন্ম নেয় টেস্টটিউব বেবি। এই টেস্টটিউব বেবি মাতৃগর্ভেই বেড়ে ওঠে এবং সেখান থেকেই জন্ম নেয়। কোনো টেস্টটিউবে এই শিশু বেড়ে ওঠে না। স্বাভাবিকভাবে জন্ম নেওয়া শিশুর সঙ্গে টেস্টটিউব বেবির জন্মদানের প্রক্রিয়ায় পার্থক্য এটুকুই যে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় জন্ম নেওয়া শিশুর পুরোটাই সম্পন্ন হয় মায়ের ডিম্বনালি এবং জরায়ুতে। আর টেস্টটিউব বেবির ক্ষেত্রে স্ত্রীর ডিম্বাণু এবং স্বামীর শুক্রাণু সংগ্রহ করে সেটিকে একটি বিশেষ পাত্রে রেখে বিশেষ যন্ত্রের মধ্যে সংরক্ষণ করা হয় নিষিক্তকরণের জন্য। নিষিক্তকরণের পর সৃষ্ট ভ্রূণকে স্ত্রীর জরায়ুতে সংস্থাপন করা হয়। সূচনার এই সময়টুকু ছাড়া বাকি সময়টাতে শিশু একদম স্বাভাবিক গর্ভাবস্থার মতোই মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠে। এবার বুঝেছেন?
– জ্বি ম্যাডাম। তবে আমার স্ত্রীকে একটু বুঝান, ওর মনেই যত ভয় কাজ করছে।

এরপর ডাক্তার নীলাকে বুঝিয়ে বলেন-
– শুনুন, ভয়ের কিছু নেই, এমন নয় যে এইভাবে কেউ বাচ্চা নিচ্ছেনা। এটা সর্বশেষ উপায়। সুতরাং ভয়কে জয় করতে হবে।

ওর সাথে কথা বলা শেষে ম্যাডাম বলেন-
– আবির সাহেব আপনাকে একটু মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়ে থাকতে হবে এসময়, আপনার স্ত্রীর প্রতি এইসময় একটু বেশিই খেয়াল রাখতে হবে, এবং যত্ন নিতে হবে। আর আরো একটা জরুরী কথা হচ্ছে , এই চিকিৎসা একটু ব্যয়বহুল।
– ম্যাডাম তার জন্য সমস্যা নেই।
– আচ্ছা ওই কথায় রইলো তাহলে। সামনে সপ্তাহে আসবেন, বাকি সব প্রসেস গুলো তখনি বুঝিয়ে দিবো কেমন?
– জ্বি অবশ্যই।

ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে নীলাকে নিয়ে বাড়ি ফিরছি- এমন সময় ও বলে উঠলো-
– আবির,
– হুম,
– আমারতো বিশ্বাস-ই হচ্ছেনা আমি সত্যি সত্যি মা হতে পারবো!
– বিশ্বাস হবেনা কেন বল, ডাক্তারের সব কথা তো নিজের কানেই শুনলে, এবার খুশিতো? আর তো বলতে পারবেনা, তুমি কখনো মা হতে পারবেনা?
– সব কিছু তোমার ভালোবাসার জোরেই হচ্ছে। অন্য কেউ হলে ভুল বুঝে দূরে সরিয়ে দিতো। আমার ভাগ্য আমি তোমাকে পেয়েছি।
– আমি ভাবছি আম্মা কতটা খুশি হবেন।
– হুম্ম আম্মা তো এই চেয়েছেন, সব সময়।
– আচ্ছা, একটা জিনিস মিস করে ফেললাম,
– কি?
– এই সুযোগে আমার একটা বিয়ে করা হতো।
– কি বললে?
– কিছুনা, ভুল করে মুখ থেকে বের হয়ে গেছে।
– পাজি কোথাকার! ভুল করে! আর একবার বলে দেখো, তোমার কি অবস্থা করি!
– আচ্ছা, বাবা বলবোনা হলো তো?
– হুম্মম, হলো!
– নীলা, জানো সত্যি বলতে আজ আমি খুব খুশি।
– কেন?
– আমার পাগলিটার মুখে হাসি ফুটেছে বলে।
– এই জন্য খুশি?
– বাবা হওয়ার জন্য খুশি না?
– না তা কেন? তবে যে আসবে সে তো আর তোমার আগে আমার কাছে বেশি নয়! সবকিছুর আগে তুমি আমার কাছে। তারপর অন্যকিছু।
– হুম্ম বুঝলাম।
– কি বুঝলা!
– বুঝলাম আমি একটা পাগলকে বিয়ে করেছি।
– হুম্মম যেমন তেমন পাগল নয়, একেবারে তোমার জন্য পাগল।
– হয়েছে, এবার চুপ কর,বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি। মানুষে দেখলে সত্যি সত্যি বলবে ছেলেটা পাগল হয়ে গেছে!
– এই কথা! আমার তো সব সময় জোরে জোরে সবাইকে বলতে ইচ্ছে করে, আমি তোমাকে ভালবাসি।
– আল্লাহ! এবার আল্লাহর ওয়াস্তে চুপ কর!
– আচ্ছা, তবে ডাক্তারের কথা মনে আছেতো? এখন থেকে তোমার বেশি বেশি যত্ন নেয়া লাগবে।
– সেতো পরে, এখন তো নয়।
– উঁহু আমি এখন থেকেই নিবো।
– আচ্ছা, নিও।

১০ মাস পর…..

নীলা ক্লিনিকে অ্যাডমিট, কিছুক্ষণের মধ্যে ওকে ওটিতে নেয়া হবে। যাওয়ার সময় বারবার আমার হাত ধরে কান্না করে বলছিলো, আমাকে যদি ও আর ফিরে না দেখে, তাই শেষ দেখা দেখে নিচ্ছে। আমি এত শক্ত মনের হয়েও কান্না চেপে রাখতে পারিনা।

৩ ঘন্টা প্রায় শেষ, আমি কি করবো, কিছুই বুঝিনা, শুধু অস্থির হয়ে পাইচারি করতে থাকি। আমার এমন অবস্থা দেখে আম্মা বারবার বলেন,
– তুই একটু শান্ত হ। এত অস্থির হোসনা, আল্লাহ কে ডাক, একমাত্র আল্লাহ ভরসা। উনি চাইলে ডাক্তারদের ওসিলাই সব ভালই ভালই মিটিয়ে দিবেন।

৪ঘন্টা পর গাইনি ম্যাডাম বের হয়েই বললেন-
– আবির সাহেব, আল্লাহর রহমত আর আপনাদের দোয়ায় অপারেশন সাকসেস!
– ম্যাডাম কোন সমস্যা হয়নিতো?
– কেস একটু ক্রিটিক্যাল ছিল, তবে শেষ পর্যন্ত সব ভালই হয়েছে। আর আপনাদের একটা ফুটফুটে মেয়ে হয়েছে।
– আমি কি এখন নীলার সাথে দেখা করতে পারবো?
– পারবেন তবে এখন নয়। উনাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে , আই সিউ তে। উনার ঘুম ভাঙলে আয়া আপনাকে ডেকে দিবে , আমি বলে রেখেছি। বাচ্চার ও এক্সট্রা কিছু ট্রিটমেন্ট চলছে সেসব মিটে গেলে দেখতে পারবেন।
– বেডে কখন দেয়া হবে?
– একটু সময় লাগবে।
– আচ্ছা। ম্যাডাম আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। এতটা করার জন্য।
– আরেহ এটাতো আমাদের কর্তব্য! আপনাদের মুখে হাসি ফুটাতে পেরেছি, এটাই বড় ব্যাপার। তাছাড়া এটা আমার কাছে একটা চ্যালেঞ্জ ছিল মি.আবির। আল্লাহ সহায় ছিলেন, আর আপনাদের ভাগ্য ভাল ছিল। সবকিছু আল্লাহর ইচ্ছে।

নীলাকে বেডে দেয়া হয়েছে, ওর পাশেই ছোট্ট পুতুল টাকে নিয়ে আম্মা বসে আছেন। আমাকে দেখেই বললেন,
– এই নে, ওকে একটু কোলে নিয়ে বউমার সাথে কথা বল, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।

আমি আমাদের ছোট্ট পুতুল টাকে কোলে নিয়ে ওর মুখের সামনে ধরে বললাম,
– ও কার মত হয়েছে বলতো-?
– তোমার মত।
– তোমার স্বপ্ন পূরণ হল তাহলে?
– হুম্মম।
– ওকে পেয়ে আমাকে ভুলে যেওনা কেমন!

আমার কথা শুনে নীলা কাঁদে। এই কান্না কষ্টের কান্না নয় সুখের কান্না!

——-

#রিপোস্ট: এই গল্প টা হঠাত করেই ভেবে লিখা। আসলে ছোট বেলা থেকে এই পর্যন্ত অনেক পরিবারকে ভাঙতে দেখেছি শুধুমাত্র তাদের সন্তান হয়না বলেই! এমনকি নিজের আত্মীয়দের মধ্যেও দেখেছি। যেখানে, শুধুমাত্র বাচ্চার কারণে ১০/১২ বছরের সংসারটা ভেঙে গেছে !

#তাইএইখানেআমিদুটোমেসেজদিতেচেয়েছি,

১. ভালবাসার বিকল্প কিছুই হয়না, শুধুমাত্র ভালবাসার জোরেই অনেক অসাধ্যকে সাধন করা সম্ভব। তাই শুধুমাত্র একটা সমস্যার কারণে কাছের মানুষটিকে ছেড়ে যেতে নেই। বরং তার পাশে থেকে সেটাকে মোকাবিলা করতে হয়।

২. যাদের সন্তান হচ্ছেনা, তারা অবশ্যই এটা বিকল্পরূপে ভাবতে পারেন। তাতে সন্তানহীন হওয়ার কষ্ট থেকে অন্তত বাঁচতে পারবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here