হৃদয়ের_আয়না পার্ট_২

0
446

হৃদয়ের_আয়না
পার্ট_২
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস
আকাশ চলে যাওয়ার পর আমি লুকিয়ে আকাশের ড্রয়ার থেকে চাবিটা নিয়ে স্টোররুমের দরজা খুলি। দরজা খুলার পর আমি যা দেখি তা দেখে খুব খারাপ লাগছে।একটা মেয়ের ছবি রঙ তুলি দিয়ে আঁকা হয়েছে।সেই ছবিগুলো পুরো দেওয়াল জুড়ে আছে।বুঝতে পেরেছি এই ছবিগুলো আকাশ এঁকেছে,খুব হিংসে হচ্ছে।এই মেয়েটার মধ্যে এমন কি আছে যা আমার মধ্যে নেই।আমি তো মেয়েটার থেকেও আরও বেশি সুন্দর তাহলে?সেখানে একটা আলমারি আছে সেটা খুলতে গিয়ে দেখি অনেকগুলো শাড়ি ভাজ করে রাখা আছে।বুঝতে পেরেছি এই শাড়িগুলো ওই মেয়েটার।তার মানে আমি আজকে যে শাড়ি পড়েছি সেটা আকাশ আমার জন্য আনেনি এই শাড়িটা ছবিতে আঁকা এই মেয়েটার শাড়ি।মেয়েটার ছবির কাছে দাঁড়িয়ে আছি।খুঁটিয়েনাটিয়ে ওকে অনেকক্ষণ দেখলাম।ও তাহলে তুমি সেই মেয়ে যার জন্য আকাশ আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো।তোমার জন্য আজও পর্যন্ত ও আমার দিকে ভালবাসার দৃষ্টিতে তাকায় নি,আমাকে ভালবাসতে পারে নি,তোমার কারণে শুধু তোমার কারণে আমি আকাশের জন্য এতকিছু করার পরেও ওর মনে এতটুকু জায়গা বানাতে পারেনি।বলতে পার তোমার মধ্যে এমন কি আছে যা আমার মধ্যে নেই?আমার তো মনে হয় তোমার থেকেও বেশি গুণ আমার মাঝে আছে,আমি শুধুমাত্র এই পরিবারের জন্য আকাশের জন্য নিজেকে বদলেয়েছি যা তুমি পারবে না,খুব ভালবাসি আকাশকে এরজন্য নিজের জীবনও বিলিয়ে দিতে রাজী আছি আমি, তুমিই বল,আমার মতন করে তুমি আকাশকে ভালবাসতে পারবে?পারবে আমার মতন করে আকাশের জন্য নিজের জীবন ত্যাগ করতে? পারবে না?এতসহজ না এইসব শুধু তখনি করা যায় যখন কাউকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসা যায়।আকাশের জন্য আমি সবকিছু করতে পারব,সবকিছু কিন্তু তুমি!তুমিতো আমার মতন করে এইসব করতে পারবে না তাহলে আকাশ কেন আমাকে ভালবাসে না,কেন ও তোমাকে ভালবাসে?বল কি আছে তোমার মধ্যে প্লিজ একটাবার বল,কিছু একটা পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম।এটা কি ডাইরি!এটা আকাশের ডাইরি।
.
.
“জানু কি করছিস?”
“কিছু না,”
“ওই তুই এই মোটা ফ্রেমের চশমাটা কেন পড়ছ বলত একদম বুড়ি বুড়ি লাগে?”
“তাতে তোর কি?”
“জানু আমার অনেক কিছু,আমার বেস্টফ্রেন্ড তুই, তুই জানস এই মোটা ফ্রেমের চশমাটার জন্য কোন ছেলে তোর প্রেমে পড়তে চায়না।”
“শুধু এই কারণে”
“না,আরও অনেক কারণ আছে।এই ধর তোর এই ছোট ছোট কোকড়া চুলগুলো যদি একটু স্ট্রেইট করতি,চুলগুলো একটু বড় লম্বা করতি,মেয়েদের মতন চলতি,ওদের মতন করে নিজেকে সাজাতি দেখতি তোর পিছনে ছেলেদের লাইন পড়ে যেত।”
“তার মানে তুই কি বলতে চাচ্ছিস আমি মেয়ে না?”
“আরে সেটা বলে নি,তুই মেয়ে কিন্তু চলস ছেলেদের মতন করে,তোর মধ্যে মেয়েদের কোন লক্ষণই নেই।পুরো ছেলেদের মতন গেট আপ।”
“ও কিন্তু আমার সাজতে ভালো লাগে না,আমার এইভাবে চলতে ভালো লাগে,”
“সেটাই,বিশ্বাস কর তুই যদি একবার আমার মনের মতন করে সাজতি আমি সত্যিই তোর প্রেমে পড়ে যেতাম।”
“সত্যি!!”
“হুম কিন্তু এখন সেই চাঞ্জ নেই।”
“কেন?”
“কারণ,তোকে আমি আমার বেস্টফ্রেন্ডের চোখে দেখি,তাই তোকে প্রেমিকার চোখে কখনো দেখতে পারবো না,”
“ও তাহলে তো মনে হয় তোর বেস্টফ্রেন্ড হওয়াটা আমার লাইফের সবচেয়ে ভুল কাজ।”
“নারে,ভুল না ঠিক কাজ,তোর মতন বন্ধুর কোন তুলনা হয় না।তোকে আমি আমার মনের কোন আসনে বসয়েছি সেটা তুই নিজেই জানিস না তাইতো তোকে ভালবেসে আমি জানু বলি।ইয়ে মানে মেঘ,”
“হুম বল,”
“বলছি আমার এসাইনমেন্টা করে দিবি প্লিজ,
“ও তাইতো বলি,এত আদুরেভাবে কথা বলছিস কেন?”
“কেন আমি কি কখনো বলি না,নাকি?”
….
“জানু প্লিজ,করে দেনা?নাহলে স্যারের খুব বকা খাব,তুই কি চাস আমি স্যারের হাতে বকা খাই,”
“এতযদি স্যারের বকা খাওয়ার ভয় থাকে তাহলে কেন করলি না,”
“এমনি,”
“এমনি না,তুই তোর সব এসাইনমেন্ট আমাকে দিয়ে করাস একটাও নিজ থেকে করস না,পারব না আজকে করে দিতে,যা ভাগ এখান থেকে,”
“আমি জানি তুই মুখে না বললে ও ঠিকই করে দিবি।”
“হুম বেশিই জানস তুই?আচ্ছা বলত কালকে তো সারাদিন ফ্রি ছিলি তাহলে কেন কাজটা শেষ করস নাই?”
“আসলে কি বলব জানু,কালকে একটা হুরপুরীকে দেখছি,মেয়েটা কি সুন্দর দেখতে,আমি প্রথম দেখায় ওর প্রেমে পড়ে গেছি যাকে বলে love at first sight.”
“ও,আকাশ মেয়েটা দেখতে খুব সুন্দর নারে?”
“হ্যা খুব,খুব খুব সুন্দর দেখতে যেন রংতুলি দিয়ে কেউ ওকে এঁকেছে।”
….
“কিরে কি হল তোর,”
“শরীরটা ভালো লাগছে না রে আমি আসি”
“ওই জানু আমার এসাইনমেন্টা”
“করে দিবো,আর আকাশ আজকের পর থেকে আমাকে আর জানু বলে ডাকিস না,তাহলে তুই যার প্রেমে পড়েছিস যদি তার সাথে তোর প্রেম হয়ে যায় সে খুব মাইন্ড করবে রে?আজকে থেকে আমাকে জানু বলে আর ডাকবি না প্লিজ।”
“মেঘ কি বলস তুই,তোকে ভালবেসে এই কথা বলি,আর সে যদি আমাকে তোকে জানু বলে ডাকাতে মাইন্ড করে তাহলে এইরকম হিংসুটে মেয়ের সাথে আমি রিলেশন রাখবো না।এই ডাকটা শুধু তোর জন্য only for u.”
(এখনকার কথা আর তখনকার কথায় মিল থাকবেনা)”তাহলে তোর প্রেমিকাকে কি বলে ডাকবি?”
“সেটা এখনো ভাবে নি রে,তখনেরটা তখন দেখা যাবে।”
.
.
“জানু কালকে তোকে একটা মেয়ের কথা বলছি না,”
“হ্যা,”
“ওই মেয়েটাতো আমাদের সাথে পড়ে একি ডিপার্টমেন্টে।”
“তাই!”
“আরে হ্যা,”
“দেখবি না আমার হুরপরিকে? ওই যে দেখ,”
“তুলি!!”
“হ্যা তুলি তুই কেমন করে ওর নাম জানোস?”
“কারণ ও আমার ফুফাতো বোন।”
“তোর বোন Omg.তোদের দুইজনের মধ্যে কোন মিল নেই কোথায় ও আর কোথায় তুই?”
…..
“সরি জানু,আমি তোকে হার্ট করার জন্য কথাটা বলে নি,”
“হ্যা আমি জানি,আমি কষ্ট পায়নি।”
“জানু পরিচয় করিয়ে দিবি না তুলির সাথে,”
“এখনি”
“হ্যা,জানু।”
আচ্ছা।এরপর তুলির সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিল।আস্তে আস্তে আমি মেঘের থেকে তুলিকে বেশি টাইম দিতে লাগলাম।এর কয়েকমাস পর তুলির সাথে আমার রিলেশন হয়ে যায়।ফলে আমার আর মেঘের এতদিনের ফ্রেন্ডশিপে একটা দেয়াল তৈরী হতে থাকে। ও যে আস্তে আস্তে আমার থেকে দূরে সরে যেতে থাকে সেটা আমার নজরে লাগে নি।
.
.
একদিন ওকে দেখলাম গাছের নিচে চুপচাপ বসে আছে।আগের থেকে অনেক শুকিয়ে গেছে,খুব মায়া লাগল,
“জানু কি করছিস একলা এখানে,”
“তেমন কিছু না,তা বল তোর তুলি কেমন আছে।”
“আমি কেমন আছি সেটা জিজ্ঞাস না করে তুলির খোঁজ নিচ্ছিস,”
“কারণ তুলি ভালো থাকলে তুইও ভালো থাকবি সেজন্য”
“এরমধ্যে তুলি চলে আসে,আকাশ তোমাকে না বলছি তুমি মেঘের সাথে কথা বলবে না,আমার সহ্য হয় না”
“আরে তুলি,আস্তে মেঘ সামনে আছে,”
“তো কি হয়েছে,এই মেঘ শুন তুই আর আকাশের সাথে কথা বলতে আসবি না,আকাশের সাথে তোর কথা বলা আমি পছন্দ করি না,বুঝতে পেরেছিস।”
এরপর তুলি আমাকে সেখান থেকে টেনে নিয়ে গেল। কিন্তু সেদিন যে মেঘ লুকিয়ে অনেক কেঁদেছিল তা আমার অজানা ছিল। এরপর অনেকদিন হয়ে গেল ওকে আর ভার্সিটিতে দেখিনি। তুলিকে একদিন ওর কথা জিজ্ঞাস করাতে ও বলেছিল ও নাকি ওর বাবার কাছে চলে গেছে। শুনে খুব খারাপ লাগল এতদিনের ফ্রেন্ডশিপ আমাদের একটাবার আমাকে বলে গেল না?বলে গেলে পারত,কিছু বলে যায় নি খুব খারাপ লাগছে নিজের থেকে,তুলির সাথে থেকে থেকে আমি মেঘের খোঁজ নেওয়াটাও ভুলে গেছি।আমার আর তুলির রিলেশন এখন ১ বছর ধরে চলছে।এর মাঝে কতবার যে মেঘকে মনে পরেছে তা বলে বুঝাতে পারবো না।ইচ্ছে করত ওকে গিয়ে একবার দেখি আসি কিন্তু সেইদিনের সেই ঘটনা আর ওর খোঁজ না নেওয়ায় নিজেকে খুব অপরাধী মনে হত।তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ওর বাবার বাড়িতে গিয়ে ওকে দেখতে যায় নি।এর ১ বছর পর তুলি আমাকে খুশি হয়ে একটা খবর দেয়,আকাশ জানো মেঘের বিয়ে হচ্ছে।
“বিয়ে!”
“হ্যা যাক ভালো হয়েছে আমাদের জীবন থেকে আপদটা বিদায় নিবে।ওকে আমার একেবারে সহ্য হয় না দেখতে না এখানে থাকতে কেমন কুদৃষ্টি দিয়ে আমাদের ভালবাসা দেখত,আর সারাক্ষণ ড্যাবড্যাব চোখে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকত,ভালোই হয়েছে বিয়ে হয়ে যাচ্ছে,এখন ও আর আমাদের মাঝে আসতে চাইলেও আসতে পারবে না।শুন তোমাকে দাওয়াত দিচ্ছি অবশ্যই বিয়ের ২ দিন আগে সেখানে যাবে।আমিও যাব ফুফাতো বোন বলে কথা।খুব মজা করব সেখানে।”

যাক এই সুযোগে ওকে দেখতে পারবো। কিন্তু খুব খারাপ লাগছে জানি না কেন মনে হচ্ছে কি যেন আমার থেকে হারিয়ে যাচ্ছে।
.
.
বিয়ের ২দিন আগে সেখানে গেলাম।গিয়ে দেখি আগের সেই মেঘ আর নেই,অনেক চেঞ্জ হয়েছে ও!
কি সুন্দর লাগছে ওকে বলে বুঝাতে পারবো না,এখন সে মোটা ফ্রেমের চশমা আর পড়ে না চোখে কাজল দেয়,কুঁকড়ানো ছোট চুলগুলো আগের থেকে অনেক লম্বা হয়েছে,চুলগুলো স্ট্রেইট করে ফেলেছে,একটা গোলাপি রঙের শাড়ি পড়েছে,,ওর চেহারায় মেকাপের ছোয়া নেই কিন্তু ওকে দেখে মনে হচ্ছে সদ্য ফোটে উঠা এক শাপলা ফুল।
“এটা কি মেঘ!”
“আকাশ তুই এখানে?”
“হ্যা আমি,জানু কেমন আছিস,কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেলি,খুব মিস করেছি এতদিন তোকে,এত রাগ কিসের তোর কিছু না বলে এখানে চলে এসেছিস আবার শুনছি তুই নাকি বিয়ে করছিস,এত তাড়াতাড়ি কেন বিয়ে করছিস?খুব কষ্ট হচ্ছে আমার প্লিজ তুই বিয়েটা করিস না,এই কথা বলতে বলতে কখন যে ওকে জড়িয়ে ধরেছি বলতে পারবো না।”
“আরে এত প্রশ্ন একসাথে কোনটা ফেলে কোনটার উত্তর দিবো, আর এত কাঁদছিস কেন তুই প্লিজ কাঁদিস না তোর কান্না আমার সহ্য হয় না”
“তুইও তো কাঁদছিস”
“কই কাঁদছি”
“চাল ঝোটা আর অভিনয় করিস না,চোখের পানি মুছে ফেললে কি হবে আমি সব বুঝি”
“খুব মিস করেছিস আমাকে”
“হ্যারে খুব,তুই আমাকে মিস করিস নি”
“না একটুও না”
“আবারও মিথ্যা বলছিস,তুই মিথ্যাটাও ঠিকভাবে বলতে পারিস না,মেঘ তুই কি সত্যিই বিয়ে করছিস।”
“আরে না,আমি না করে দিয়েছি এই বিয়ে আমি করছি না”
“মানে”
“বাবা আমাকে না জানিয়ে বিয়ের কথাবার্তা ফাইনাল করে ফেলেছে।আজকে সকালে আমি পাত্রপক্ষকে জানিয়ে দিয়েছি আমি এই বিয়ে করতে পারবোনা।আমাকে বিয়ে করতে আসলে আমি উল্টাবাল্টা কিছু করে বসবো।এইমাত্র পাত্রপক্ষ বিয়ে করবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে,”
“সত্যি বলছিস”(খুব খুশি লাগছে আমার কিন্তু কেন তা জানি না)
“আরে আর কতক্ষণ এইভাবে জড়িয়ে রাখবি,তুলি দেখলে রাগ করবে”
“আমি ওকে ছেড়ে দিলাম।মেঘ আমার সাথে যাবি,মা তোকে দেখতে চেয়েছিলো। দেখ না করিস না প্লিজ”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here