হৃদয়ের_আয়না পার্ট_০৪

0
377

হৃদয়ের_আয়না
পার্ট_০৪
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস
“না আসবো না”
“থাপ্পড় খাবি কিন্তু আয় এদিকে।”
“……….”
“বুঝছি তুই যেই জেদি সেই জেদি রয়ে গেলি।কোনদিন তুই আমার কোন কথাটা শুনেছিস যে আজ শুনবি।সবসময় নিজের মন যা চায় তাই করস।আর তাইতো আমার মতন এমন একটা ছেলেকে বিয়ে করে নিজের দুর্ভাগ্য ডেকে আনলি। এখন কাছে আসতে বলছি কিন্তু দেখ তুই আসছিস না।এই কথাতেই কাজ হয়েছে সুড়সুড় করে আমার কাছে আসল।”
“এরকমভাবে কেন বলছিস তুই?কয় নিজের দুর্ভাগ্য ডেকে আনলাম।আমি জানতাম তুই আবার আগের মতন হয়ে যাবি।দেখ না আমার এই বিশ্বাস মিথ্যা হয়নি।তোর অপারেশন তাড়াতাড়ি হবে।তুই সুস্থ হয়ে যাবি। তাহলে এইসব কথা বারবার বলে আমাকে কষ্ট দিস কেন?”
“ওকে তখনি জড়িয়ে ধরলাম।দেখ কাঁদিসনা আর।আমি বুঝতে পারি নি আমার এই কথা তোকে এত কষ্ট দিবে।এই কথা তোকে এত কষ্ট দিবে জানলে আমি কখনো তোকে এই কথা বলতাম না। Sorry রে।জানু আমাদের কাঁদার দিন শেষ।আমি তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাব।তুই আমাকে নিয়ে যেমন সংসার করার স্বপ্ন দেখতি ঠিক তেমন ভাবে আমরা আমাদের সংসারটা সাজাবো।তুলির কথায় কষ্ট পাস না।ও একটা পাগল। আর যদি কখনো ও তোকে কিছু বলতে আসে ওকেও তুই পাল্টা জবাব দিয়ে দিবি।জানু তুই জানিস তুই আমার কে?”
“………”
“তুই হচ্ছিস আমার হৃদয়ের আয়না।যেদিন থেকে তোকে আমি আমার হৃদয়ের আয়না দিয়ে দেখেছি সেদিন থেকে তোকে ভালবাসি।সেদিন থেকেই তুই হয়ে গেলি এই আকাশের হৃদয়ের আয়না”
“সত্যি!”
“হুম আমার হৃদয়ের আয়না।আর শোন তোকে কান্নাকাটিতে একদম মানায় না। আর কান্নাকাটি করিস না।এবার হাস বলছি,হাস”
“এইতো গুড গার্ল ”
.
.
সেদিন ডাক্তারের কাছে আবার গেলাম।উনাকে আবারও জিজ্ঞাস করলাম আমাকে যে হার্ট দিচ্ছে তাকে দেখতে পারব কিনা?ডাক্তারের উত্তরে আমি আবারও নিরাশ হলাম।
“আচ্ছা মিস্টার আকাশ আপনার এই হার্টের প্রবলেমতো আরও অনেক আগে থেকে ছিল।তখনই তো আপনার এলার্ট হয়ে যাওয়া উচিত ছিল”
“হ্যা আমার শরীরটা তখন কিছুটা খারাপ লাগত।কিন্তু আমি তা পাত্তা দিতাম না।আর পরিবারের কারও সামনে আমি এরকম পরিস্থিতিতে পড়ি নি।কিন্তু সেদিন সবার সামনে মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গেলাম।আর তারপর এই মেডিকেলে এসে জানতে পারলাম আমি এখন আমার এই রোগের লাস্ট স্টেজে আছি।অনেক দেরি হয়ে গেছে আমার এই রোগ সম্পর্কে জানতে”
“হ্যা সেটাই,কিন্তু এখন আল্লাহর কাছে শোকরিয়া করেন যে আপনি এখন ১টা হার্ট পেয়ে যাচ্ছেন”
“আচ্ছা ডাক্তার আমাকে যে হার্ট দিচ্ছে তার বয়স কত হতে পারে সেটা জানতে পারি”
“তিনি একজন মধ্যবয়স্ক লোক।আনুমানিক বয়স ৩০ বছর হবে।আপনি যেদিন মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন সেদিনি তিনি এই মেডিকেলে আসেন ওনার ছেলেকে নিয়ে।ওনি আমাকে আপনার রোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাস করলেন।আমার কাছ থেকে তিনি আপনার রোগ সম্পর্কে জানতে পারেন”
“আচ্ছা!কিন্তু এরকম টাইপের কোন লোক আমার পরিচিত বলে মনে হয় না”
“ওই লোকটি বলেছেন তিনি আপনাকে চিনেন।
লোকটি এই ঘটনার প্রায় ২মাস পর এক্সিডেন্ট করে।ওনার বাঁচার সম্ভাবনা নেই বললে চলে।একদিন ওনি আমাকে ডাক দিয়ে খুব কষ্টে একটা কথা বললেন।আপনি নাকি তার ছেলের জীবন বাঁচিয়েছেন।আপনার কারণে তিনি তার ছেলেকে পেয়েছেন।সেজন্য তিনি চিরঋণী আপনার কাছে।তাছাড়া তিনি নিজেও আর বেশিদিন বাঁচবেন না।তাই তিনি তার হার্ট দিয়ে আপনার সেদিনের সে উপকারের মূল্য দিতে চান”
“ও আচ্ছা।আজকে তাহলে আসি ডাক্তার”
.
.
বাসায় এসে অনেক্ষণ ধরে ভাবছি এইরকম বয়সের কাউকেতো আমি চিনিনা।আর উনার ছেলের জীবন বাঁচিয়েছি!তা কেমন করে সম্ভব।এইরকম উপকারের কথাতো আমার ঠিক মনে পড়ছে না!
“কিরে আকাশ অনেক্ষণ ধরে দেখছি তুই কোন কিছু নিয়ে ভাবছিস।এত কি ভাবছিস তুই?”
“জানু,আজকে ডাক্তারের কাছে গেছি”
“হঠাৎ করে!কোন দরকার ছিল”
“আসলে আমাকে যে হার্ট দিবে তার সম্পর্কে একটু জানার জন্য ডাক্তারের কাছে গেলাম।এরপর ডাক্তার আমাকে যা যা বলল তা আমি মেঘকে খুলে বললাম”
.
.
“মেঘ আমার যতটুকু মনে আছে আমি এইরকম বয়সের কোন লোকের ছেলেকে সাহায্য করিনি।কিচ্ছু ঢুকছে না মাথায়।ডাক্তারের কথাগুলো কেমন যেন অদ্ভুত লাগল।মনে হল…”
“কি মনে হল!”
“মনে হল উনি সত্যটা লুকিয়ে আমাকে মিথ্যা কথা বলছেন”
“তুইও না বড় আজিব।ডাক্তার তোকে মিথ্যা বলতে যাবে কেন?দেখ এইসব ফালতু চিন্তা বাদ দে।ওই লোকটা নিজেও আর বেশিদিন বাঁচবে না তাই ওনি ওনার নিজের হার্ট দিয়ে তোর জীবন বাঁচাতে চাইছেন।বিষয়টা অনেক সিম্পল”
“কিন্তু আমার থেকে বিষয়টা সিম্পল লাগছেনা।মনে হচ্ছে আমার এই অপারেশনের পর আমার কাছের কাউকে আমি হারাতে বসবো।মনে খুব অস্বস্তি লাগছে।তাই নিজের মনকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বারবার বিষয়টা ভালোভাবে বুঝার চেষ্টা করছি।১টাবার যদি ওই লোকটাকে দেখতাম তাহলে আমার মনের সব ভয় আর সন্দেহ দূর হয়ে যেত”
“দেখ আকাশ এই অপারেশনের পর যা হবে ভালোই হবে।তুই আর অযথা টেনশন নিস না।আকাশ আজকে আমাকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাবি ”
” ঘুরতে যাবি?”
“হুম খুব ইচ্ছে করছে আজকে দিনটাই তোর সাথে ঘুরতে আর সময় কাটাতে”
.
.
আজকে মেঘকে নিয়ে সারাদিন ঘুরলাম,মার্কেটে গেলাম।মার্কেটে খুব সুন্দর একটা গোলাপি শাড়ি দেখলাম।ভাবছি আমার অপারেশনের পরদিন আমি মেঘকে এই শাড়ি গিফট দিব।ওকে সারপ্রাইজ দিবো।তাই চুপচাপ শাড়িটা কিনে ফেললাম।বাসায় এসে আলমারিতে এটা লুকিয়ে রাখলাম।অনেকদিন পর আবার সেই চাঞ্চল্যকর দিনগুলো ফিরে পেলাম।মেঘের সাথে আজকে সারাটাদিন কাটিয়ে মনটা আবার আগের মতন সতেজ হয়ে গেছে।আমার এই অপারেশনের পর আমি আর মেঘ আমাদের সংসারটা সাজাবো, দিনদিন আমাদের ভালবাসা বাড়বে।সময়ের সাথে সাথে অন্যান্য সবার মতন আমাদেরও ছেলেমেয়ে হবে।আচ্ছা ছেলে হলে কি নাম দিব?আর যদি ছেলে না হয়ে মেয়ে হয় তাহলে?বুঝতে পারছিনা।আমার এই অপারেশনের পর আমি এই বিষয় নিয়ে মেঘের সাথে কথা বলব।আল্লাহ আমাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে দাও যাতে মেঘের সব স্বপ্ন আমি পূরণ করতে পারি।
.
.
পরেরদিন রাতে তুলি আমাকে কল দিয়ে বলে ও এর ব্যবহারের জন্য অনুতপ্ত,আমার কাছে ক্ষমা চায়।সেজন্য আমার সাথে কালকে দেখা করতে চায়।আমিও ভাবলাম ঠিকাছে দেখা করি গিয়ে।এরপরের দিন ওর কাছে যায়।ও আমার কাছে বারবার তার ব্যবহারের জন্য আমার কাছে ক্ষমা চায়,আমিও ওকে ক্ষমা করে দেই।বাসায় এসে দেখি মেঘ কাঁদছে।ওকে এর কারণ জিজ্ঞাস করলে আমাকে অনেক উল্টাপাল্টা কথা শুনিয়ে দেয়।ও আজকে আমাকে আর তুলিকে একসাথে দেখেছে। আর তার কারণে ও মনে করে নিয়েছে আমার সাথে তুলির রিলেশন এখনো চলছে।ওকে অনেক বুঝিয়েছি কিন্তু আমার কথাগুলোকে কোন গুরুত্ব দিলো না।ও ওর বাবার বাসায় রাগ করে চলে গেল।আমিও রাগ করে করে ওর রাগ আর ভাঙ্গায়নি।
.
.
৩ ফেব্রুয়ারির দিন ডাক্তার আমাকে কল দিয়ে জানিয়ে দিলো ওই লোকটার আজকে সকালে অবস্থা খুব খারাপ ছিল।একটুআগে মারা গেছেন উনি তাই আজকে নাকি আমার অপারেশন হবে। ভালোই হয়েছে ভাবলাম সুস্থ হয়ে ১৪ই ফেব্রয়ারি মেঘকে আমার ভালবাসার কথা জানিয়ে দিব,ওর সব রাগ ভাঙ্গিয়ে দিবো।কিন্তু ওই লোকটার জন্য খারাপ লাগছে সে এই দুনিয়া থেকে আজকে বিদায় নিলো।অবশেষে ৩ ফেব্রুয়ারি আমার অপারেশন হয়ে গেল।এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ।১৪ই ফেব্রুয়ারি আমি মেঘকে মোবাইলে মেসেজ পাঠায় বাসায় এসে আমার সাথে আজকে রাত ৮:০০টায় দেখা করার জন্য।পুরো রুম খুব সুন্দর করে সাজায় ঠিক যেমনটা মেঘ পছন্দ করে।অনেকক্ষণ ধরে ওর জন্য অপেক্ষা করছি কিন্তু ওর আসার নাম নেই।আমি ওকে ডেকেছি কিন্তু ও আসবে না তা কেমন করে হয়।এরকম করে ১,২,৩ঘন্টা ওর জন্য অপেক্ষা করছি কিন্তু ও আসছে না।শেষ পর্যন্ত ও আসলোই না,এত্ত অভিমান আমার উপরে।রাতে কলিং বেলের আওয়াজ পেলাম। দেখলাম আমার নামে একটা চিঠি এসেছে।মেঘের চিঠি!
.
.
ডায়রিতে মেঘের সেই চিঠিটা আছে।কিন্তু সেই চিঠির নিচের অংশ ছিড়া।
প্রিয় আকাশ,
আজ তুই একটা নতুন জীবন পেয়েছিস।আজকে তোর একটা নতুন জীবনের সূচনা হবে।তোর বর্তমান আর ভবিষ্যৎ জীবন খুব সুন্দর আর সুখের কাটোক আমি সেই দুয়া করি।আকাশ ওইদিন তোর আর আমার ঝগড়াটা আমি ইচ্ছে করে সৃষ্টি করেছিলাম।জানি তুই কোন দোষ করিস নি।কিন্তু কি করব বল সেইদিনের সেই ঝগড়াটা খুব দরকার ছিলরে।সেদিনের সেই ব্যবহারে তুই অনেক কষ্ট পেয়েছিলে জানি কিন্তু সেদিন ঝগড়াটা না হলে তোর সাথে আরও কয়েকদিন থাকলে তুই আমার মায়ায় আরও জড়িয়ে যেতি।আমার কারণে তুই আরও বেশি কষ্ট পেতি।বিয়ের দিন আমি তোকে একটা কথা বলেছিলাম মনে আছে তোর।তোকে বলেছিলাম না আমি সবসময় তোর হৃদয়ে থাকব,মরে গেলেও তোর হৃদয়ে এমনভাবে গেঁথে থাকব তুই চাইলেও আমাকে তোর হৃদয় থেকে মুছে ফেলতে পারবি না।দেখ আমি আমার কথা রেখেছি আমি সত্যিই তোর হৃদয়ে আছি।এখন থেকে আমার অস্তিত্ব তোর হৃদয়ে।সেখানে শুধু আমি শুধু আমি আছি।
এরপর মেঘ আপু আর কি লিখলো সেটা জানতে পারলাম না।বুঝতে পেরেছি সেদিন প্রচণ্ড জেদ,আর অভিমানে আকাশ এই চিঠির নিচের অংশ ছিঁড়ে ফেলে।
.
.
তার মানে মেঘ তুই!তুই আমার হৃদয়ে!আমাকে হার্ট তুই দিয়েছিলি।না আমি এইসব বিশ্বাস করি না।সব মিথ্যা।ডাক্তার তো বলেছিল মধ্যবয়স্ক একলোক আমাকে হার্ট দিয়েছে।তাহলে ডাক্তার কি আমাকে মিথ্যা বলল কিন্তু কেন?ওই ডাক্তারকে আমি ছাড়ব না যদি আমাকে মিথ্যা কথা বলে থাকে।আমি সরাসরি ডাক্তারের কাছে গেলাম।
“আমাকে হার্ট কে দিয়েছে?”(রেগে)
“I am extremely sorry mister akash.আমি আপনাকে ওইদিন মিথ্যা কথা বলেছিলাম।”
“মানে?”
“আপনাকে হার্ট আপনার স্ত্রী দিয়েছে।”
“নিজের রাগকে আর কনট্রোল করতে পারলাম না।রাগে ডাক্তারকে একটা ঘুষি দিলাম।”
“কেন আমাকে মিথ্যা কথা বললেন আপনি?কেন?(কেঁদে)আপনি জানেন না আপনার এই ১টা মিথ্যা কথায় আমার পুরো দুনিয়ায় অন্ধকার ছেয়ে গেছে।আপনার কথায় বিশ্বাস করে আমি এই অপারেশনটা করিয়েছি।আমার অপারেশনের কারণে আমি যে আমার হৃদয়ের আয়নাকে হারাবো তা ভাবতে পারিনি।আপনার ওইদিনের কথাগুলো আমার মিথ্যা মনে হয়েছিল।কিন্তু মেঘকে সব বলার পর ও আমাকে এইসব নিয়ে ভাবতে নিষেধ করে। তাই আমি এই বিষয়টা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলি।সেদিন যদি আমি এই বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে এর সত্যতা বের করে ফেলতাম তাহলে আজকে আমাকে এইদিন দেখতে হতনা।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here