হৃদয়ের_আয়না পার্ট_০৩

0
368

হৃদয়ের_আয়না
পার্ট_০৩
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস
মেঘের বাবার মন খারাপ কারণ পাত্রপক্ষ বিয়ে ক্যান্সেল করে দিয়েছে।পাত্রপক্ষ বিয়ে ভাঙ্গার কারণটা ঠিকভাবে বলে নি শুধু বলেছে সমস্যা আছে।যায় হোক তার ধারণা মেঘ এইকথায় খুব কষ্ট পেয়েছে তাই তিনি কিছুদিন মেঘকে বাইরে থেকে ঘুরে আসতে বলেছেন।আমি এই সুযোগে ওকে আমার বাসায় নিয়ে যায়।মা ওকে দেখে খুব খুশি হয়েছে।কথা বলতে বলতে হঠাৎ করে আমি মাথা ঘুরিয়ে পড়ে যায়।অনেকক্ষণ হয়ে গেল আমার জ্ঞান আসছে না দেখে আমাকে তাড়াতাড়ি মেডিকেলে ভর্তি করা হয়।পরে জানতে পারি আমার হার্টে প্রব্লেম হয়েছে।বেশিজোর ৪ মাস বাঁচতে পারবো।কেউ যদি আমাকে ১টা হার্ট দিয়ে দেয় তাহলে আমি বাঁচতে পারব।এই দুনিয়ায় এমন কেউ নেয় যে কিনা টাকার বিনিময়ে নিজের মূল্যবান হার্ট দিয়ে দিবে।এই কথা শুনে মা বাবা সবাই কেঁদে ফেলেছে।তুলি যেদিন এই খবর শুনেছে সেদিন থেকে ওর আমার রিলেশন ব্রেক আপ করে দিয়েছে।ওর এক কথা মৃত্যুপথযাএী একজনের সাথে রিলেশন রাখার কোন মানে হয় না।যেদিন আমার ভালবাসার মানুষের সার্পোট সবচেয়ে বেশি দরকার ছিল সেদিন সেই আমাকে ছেড়ে চলে গেল কিন্তু মেঘ ও একবারের জন্যও আমাকে ছেড়ে যায়নি বরং আমার মনে সাহস যুগিয়েছে যে আমি তাড়াতাড়ি ঠিক হয়ে যাব।আমার কিছু হবে না।অথচ এই মেয়েকে আমি একদিন তুলির জন্য কষ্ট দিয়েছি সেটা ভাবতেই আজকে খুব কষ্ট হচ্ছে।
.
.
“আন্টি আংকেল প্লিজ আপনারা কাঁদবেন না দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।আমি আপনাদের বলছি আমি নিজে সবকিছু ঠিক করে দিব”
“মারে এইসব কি বলছিস।দেখেছিস ডাক্তার কি বলল,এখন ১টা হার্ট আকাশকে কে দিবে?”
“বললাম না এইসব নিয়ে চিন্তা করে আপনারা কাঁদবেন না।আমি নিজ হাতে সব সামলিয়ে নিব।আপনারা ঠিকই তাড়াতাড়ি heart donor পেয়ে যাবেন।শুধু আমার একটা ইচ্ছে পূরণ করে দিবেন প্লিজ”
“কি ইচ্ছে মা?”
“অনেক আগে থেকে আমার খুব শখ আমি আকাশের বউ হব।ওর সাথে সংসার করব,আমার এই ইচ্ছে শুধু পূরণ করে দেন।আমি কথা দিচ্ছি আমি আকাশের সাথে খারাপ কিছু হতে দিব না”
“কিন্তু মেঘ”
“কোন কিন্তু না যদি আপনারা আমাকে আপনাদের মেয়ে ভেবে থাকেন তাহলে প্লিজ আমার এই ইচ্ছা পূরণ করতে হেল্প করুন”
“আমরা নাহলে মানলাম কিন্তু আকাশ,ও কি মানবে?”
“ওকে আপনারা মানাবেন যেইভাবে হোক।বাকিটা আমি দেখে নিব।”
আমি প্রথমে এই বিয়েতে রাজি হতে চায় নি।কি করে এই বিয়ে করব যাকে ভালবাসতাম সে আমাকে এই অবস্থায় রেখে চলে গেছে আর আমিতো মেঘকে শুধু ফ্রেন্ডই ভাবি তাহলে কি করে ওকে বিয়ে করব,কিভাবে ওর জীবনটা আমি নষ্ট করব।অনেকটা জোর করেই মেঘের সাথে আমার বিয়ে দেওয়া হয়।মেঘের বাবা সবকিছু জেনে বিয়েটা দিতে চান নি কিন্তু মেঘের সুখের কথা ভেবে উনি বিয়েটা দিলেন।অবশেষে এই অবস্থায় আমি ওকে বিয়ে করলাম।
.
.
“কেন এমন করলি মেঘ?”
“কারণ আমি তোকে ভালবাসি”
“কিন্তু আমিতো তোকে ভালবাসি না শুধু বন্ধু ভাবি। তাছাড়া আমাকে তুই এমন মুহুর্তে বিয়ে করেছিস যেখানে আমি এই পৃথিবীতে মাত্র কয়েকদিনের পথযাত্রী।কেন নিজের সর্বনাশ তুই নিজে ডেকে আনলি?কি পাবি আমার কাছ থেকে?কিচ্ছু না, তাহলে জেনেশুনে কেন এই ভুল পথে পা বাড়ালি,”
“আমিতো তোর কাছ থেকে কিছু পাবার আশায় তোকে বিয়ে করে নি।তোকে ভালবাসি তাই তোকে বিয়ে করেছি। সেই কলেজ লাইফ থেকে তোকে ভালবাসি কিন্তু আমাকে তুই কোনদিনও বুঝিস নি।যাইহোক দেখ, আমার ভালবাসার মানুষের ভালোর জন্য আমি সবকিছু করতে পারি।তোর কিচ্ছু হবে না দেখে নিস।এই মেঘ তোকে কিচ্ছু হতে দিবে না”
“কেন মিথ্যা আশা দেখাচ্ছিস আমাকে।আমি জানি আমি আর বেশিদিন বাঁচবো না।মাত্র ৪মাস আছি আমি এই পৃথিবীতে।তাহলে এই মিথ্যা সান্ত্বনা কেন?”
“মিথ্যা আশা তোকে দেখাচ্ছি না।বললামতো আমি সবকিছু ঠিক করে দিব।একটু ভরসা রাখ আমার উপর।প্লিজ কাঁদিস না,তোর কান্না আমার সহ্য হয় না।আকাশ একটা আবদার রাখবি আমার প্লিজ”
“আবদার!কি আবদার”
“আজকে আমি তোর বুকে মাথা রেখে ঘুমায়।জানি না জীবনে আর কখনো এই সুযোগ আসবে কিনা?”
“এরকম করে কেন বলছিস।তোর কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি না তুইই এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাবি।”
“কি জানি হয়ত।মানুষতো,মানুুষের জীবনের কোন ভরসা নেয়।আজ আছি কাল নাও বা থাকতে পারি।আমি এই দুনিয়ায় থাকি আর নায় বা থাকি কিন্তু তোর এই হৃদয়ে আমি সবসময় থাকব।তুই চাইলেও এই হৃদয় থেকে আমাকে কখনো মুছতে পারবি না।মরে যাওয়ার আগে আমি এমন বন্দোবস্ত করে যাব যাতে তোর এই হৃদয়ে শুধু আমার শুধু আমার অস্তিত্ব থাকে”
“তোর কথার অর্থ বুঝতে মাঝে মাঝে আমার খুব কষ্ট হয়।কি বলিস কিছু বুঝতে পারি না”
“বুঝতে হবেও না আগে বল আমার আবদারটা রাখবি?”
“মেঘ কেন এইসব করছিস?কি হবে এইসব করে?”
“আকাশ তুই আমাকে না ভালবাসছ কিন্তু আমার ভালবাসাকে অবহেলা করিস না।একটু হলেও এর মূল্য দিস। তোর বউ হিসেবে এতটুকু অধিকারতো আমার আছে?”
“কাঁদিস না,আয়”
“থ্যাংকস আকাশ”
.
.
এরপরে দেখতে দেখতে ৩মাস কেমন করে কেটে গেল বলতে পারবো না।এখন মেঘের জন্য আমার ভালবাসা তৈরি হয়েছে।কত কি না করে মেয়েটা আমার জন্য।এইরকম লক্ষ্মী একটা মেয়েকে ফেলে আমি কি করে যে ওই তুলির প্রেমে পড়েছি তা ভাবতেই লজ্জা লাগছে।আমি প্রথমে তুলির রুপ দেখে পছন্দ করেছিলাম কিন্তু আজ বুঝেছি ভালবাসার জন্য রুপ না একটা ভালো মন দরকার যা তুলিদের মতন মেয়েদের মধ্যে থাকে না।আমি আমার এই হৃদয়ের আয়না দিয়ে আজকে তোকে দেখেছি মেঘ।এই হৃদয়ের আয়নায় তুই একমাত্র আমার চোখে দেখতে সুন্দর আর সেই সাথে সুন্দর তোর মনটাও যার সাথে অন্য কোন কিছুর তুলনা হয় না।আমি কেন আগে আমার এই হৃদয়ের আয়না খুলে তোকে দেখিনি।আগে দেখলে হয়ত অনেক আগেই তোর প্রেমে পড়ে যেতাম।কিন্তু এখন তোকে ভালবাসলে কি হবে আমি যে আর বেশিদিন নেই।
.
.
এর কয়েকদিন পরে জানতে পারি আমাকে একজন তার heart দিবে।তাহলে আল্লাহ এতদিনপর মুখ তুলে চেয়েছে।কে হার্ট দিবে তা জানতে চেয়েছিলাম ডাক্তারের কাছে।তিনি শুধু বলেছেন সে নাকি আমার খুব কাছের একজন মানুষ।আমাকে যে হার্ট দিবেন তাকে একটাবার দেখতে চেয়েছিলাম কিন্তু ডাক্তার বলল ওনার সাথে দেখা করা যাবে না।ওনি দেখা করবেননা।খুব জেদ উঠে গিয়েছিল সেদিন।উনি কেমন আমার আপন মানুষ যে আমাকে হার্ট দিবে অথচ একটাবারও আমি তাকে দেখতে পাবো না।মা বাবা আর মেঘকে আমি এই খবরটা দিলাম। তারা খুব খুশি হয়েছিল কিন্তু আমি নিষেধ করে দিয়েছিলাম যে আমাকে হার্ট দেওয়া লাগবে না কারণ যে আমাকে হার্ট দিবে আর আমি তাকে দেখতে পাবো না তা কেমন করে হয়!তাছাড়া সে টাকাও নাকি নিবে না।আমাকে হার্ট দিলে সে নিজে মারা যাবে আবার বলছে আমার খুব কাছের মানুষ তাহলে সে যদি একটাবার আমাকে দেখা না দেয় আমি নিজের কাছে নিজে অপরাধী হয়ে থাকব সারাজীবন।পরে মা বাবা আর মেঘ অনেক বুঝালো।ভেবে দেখলাম আমি ছাড়া ওদের কেউ নেই আমার জন্য না হোক ওদের জন্য হলেও আমাকে বাঁচতে হবে।তাই আমি হার্ট নিতে রাজী হলাম।শুধু একটাই আফসোস আমার সেই আপন মানুষটাকে আমি দেখতে পাবো না
.
.
এরমধ্যে একদিন তুলি আমার বাসায় এসে হাজির।বাসায় এসে মেঘের সামনে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
“তুলি এইসব কি হচ্ছে?”
“বাবু প্লিজ আগের কথা সব ভুলে যাও।শুনেছি তোমাকে নাকি কেউ হার্ট দান করছে।তুমিতো আবার আগের মতন স্বাভাবিক ভাবে বাঁচবে।চল নতুন করে সব কিছু শুরু করি”
“তুলি এইসব কি বলছ?তুমি হয়ত ভুলে গেছ আমি বিবাহিত।আমার ঘরে স্ত্রী আছে”
“তাহলে কি হয়েছে দরকার হলে ওকে তালাক দিয়ে দিবে।অনেকে ২য় বিয়ে করে বউকে তালাক দেয় তাহলে তুমি পারবে না কেন?”
“তুলি তোমার মাথা ঠিক নেই।সেদিন আমাকে ফেলে চলে গিয়েছিলে যখন আমার সবচেয়ে বেশি তোমাকে দরকার ছিল কিন্তু তুমি ছিলে না।তোমার জায়গায় এই মেয়েটা এতদিন আমার খেয়াল রেখেছে।আমি কয়েকদিন পর মরে যাব সেটা জেনেও আমাকে বিয়ে করেছে।আমার কাছে কোনকিছুর আশা না করে আমাকে নিঃস্বার্থভাবে ভালবেসেছে তাহলে ওকে কেন আমি তালাক দিব”
“দিবে একশবার দিবে কারণ দিতে তুমি বাধ্য।হয়ত তুমি ভুলে গেছে আমিই তোমার জীবনের প্রথম ভালবাসা।তাই তোমার উপর সবচেয়ে বেশি অধিকার আমার”
“না তোমার কোন অধিকার নেই।এখন আমার উপর যদি কারও অধিকার থাকে সেটা আমার স্ত্রী মেঘের”
“ও,আচ্ছা এখনতো আমাকে ভালো লাগবেনা।আরেকজনকে পেয়ে গেছ তাইনা?এইমেয়ের কারণে আজকে আমাকে এইসব কথা শুনাচ্ছ।সব দোষ এই মেয়েটার,আমাদের দুইজনের ভালবাসায় আগে থেকে ওর কুদৃষ্টি ছিল।ও সবসময় আমাদের দুইজনের মাখখানে আসতে চাইত।এখনতো ওর সব ইচ্ছা পূরণ হয়ে গেছে।কেনরে মেঘ খুব খুশি লাগছে তোর তুই জিতে গেছিস আর আমি হেরে গেছি।তাহলে তুই ভুল ভাবছিস,মনে রাখবি আমি ওর প্রথম ভালবাসা আর তুই আমাদের দুইজনের মাঝখানে শুধু ১টা থার্ড পারসন”
“তুলি এইবার কিন্তু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে”
“ও এখন বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে তাই না?সব হয়েছে এই মেয়েটার জন্য,এই মেয়েটার সব দোষ এই কথা বলে ও আমার সামনে আমার মেঘকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল”
“তুলি অনেক সহ্য করেছি আর না।এখন আরেকটা কথা বললে আমি তোমার জিভ টেনে ছিড়ে ফেলব। তোমার সাহস কি করে আমার সামনে আমার স্ত্রীকে এইভাবে অপমান করার।তুমি আমার প্রথম ভালবাসা ছিলে তাই হাত তুলেনি কিন্তু তুমি যদি এখানে আর ১মিনিটও দাঁড়াও সত্যি বলছি আমার হাত উঠে যাবে”
.
.
আমার সামনে আমার স্ত্রীকে তুলি অপমান করে চলে গেল।সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম এই বুকে।না জানি এই মেয়েটা কেমন করে তুলির সব অপমান মুখ বুজে সহ্য করে।কেন ও তুলির কথার পাল্টা জবাব দেয় না।ওর উপরেও আমার রাগ উঠছে।কিন্তু মেয়েটা মনে হয় কাঁদছে তাই আর বেশিক্ষণ রাগ ধরে রাখতে পারলাম না।গিয়ে দেখি নিশ্চুপভাবে কান্না করছে।
“জানু তুই ওকে কিছু বলিসনি কেন?মেয়েটা তোকে কত কিনা বলে গেল আর তুই..”
“কি বলব আকাশ ওতো ঠিকই বলেছে।ভুল কিছু তো বলেনি”
“মেঘ!”
“হ্যা মেঘ,মেঘ সত্যিই বলছে।ও তোর জীবনের প্রথম ভালবাসা আর আমিই তোদের দুইজনের মাঝখানে এসে পড়েছি”
“চুপ কি উল্টাপাল্টা কথা বলছিস।ও আমার পাস্ট আর তুই আমার বর্তমান।আমি ওকে আর ভালবাসি না।এইদিকে আয় দেখি”
“না আসবো না”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here