হৃদস্পর্শ প্রথম পর্ব

হৃদস্পর্শ প্রথম পর্ব

__ “ তোমার পা দুটো একবার ছুঁতে দিবে? একটু….. ”

__ “ আর একবার যদি আমাকে স্পর্শ করার ট্রাই করেন, তো হয় আপনাকে জানে মেরে ফেলবো না হয় নিজে মরবো। এক্ষুণি আমার ঘর থেকে বেরিয়ে যান বলছি, নইলে চিৎকার দিবো আমি। ”
__ “ তাহলে তো কাল ব্রেকিং নিউজ আসবে ‘ রাতে হাজবেন্ড কে ঘর থেকে বের করে দিলো ওয়াইফ ‘ ”
__ “ কেনো! নিউজ কি আপনি বের করবেন? ”
__ “ কেনো গো! এতো চেতছো কেনো! তুমি এতো রাতে বের করে দিলে বাড়ি ওয়ালী আন্টি এই সব রটিয়ে বেড়াবে। তুমি বোঝো না নাকি! ”
__ “ কে বলেছিলো আপনাকে আমার হাজবেন্ড এর পরিচয় দিতে? ”
__ “ হাজবেন্ড এর পরিচয় না দিলে তোমাকে বাসা ভাড়া কে দিতো শুনি!”
__ “ তার ফায়দা লুটে নিচ্ছেন! ”
__ “ কি আজব তুমি! এখন তো আমরা রিয়েল হাজবেন্ড ওয়াইফ!”
__ “ আমি কখনোই মানি না এই বিয়ে! ”
__ “ আমি মানি! একদিন তোমার হৃদয় জয় করেই ছাড়বো! ”
__ “ না পারলে জোর খাটাবেন? ভন্ড!”

আর কোন কথা না বলে উল্টো দিকে মুখ দিয়ে শুয়ে পড়ে সাইমা। সজীব আস্তে করে বেডে উঠে, সাইমার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বললো ,
__ “ ভালোবেসে না পেলে একটু তো জোর করতেই হবে। ”

সাইমা উল্টো ঘুরে সজীব কে এক ধাক্কায় ফেলে দেয় নিচে ।

__ “ আর একবার ও যদি আমার কাছে আসতে চেষ্টা করেন! তাহলে! …… ”

__ “ তাহলে কি! একশো বার যাবো! ”

সাইমা চোখ বন্ধ করলো, “ এখন থেকে কি এই বাজে ছেলের অত্যাচার সহ্য করতে হবে! কিভাবে করবো সহ্য! আমার যে ওকে ভালোবাসা সম্ভব না! সে বুঝেও কেনো আমার সাথে এমন করলো! ”

__ “ ভালোবাসি তাই! ” সাইমা ভাবনার ছেদ করে সজীব এর একটা কথায় চমকে যায়।

__ “ আমি যে আপনাকে ভালোবাসি না! ” সাইমা আস্তে করে বলে।

__ “ ভালো তুমিও আমাকে বাসো! জেদ ধরে আছো তাই! দেখবে কিছুদিন পর তুমি নিজেই আমার কাছে এক মুঠো ভালোবাসা চাইবে। আর আমি এক সিন্ধু ভালোবাসা দিবো। ”

__ “ বাজে কথা বলবেন না! আমি ঘুমাবো, কাল অফিস আছে! দয়া করে ঘুমাতে দিন। ”

সাইমার কথার উত্তরে সজীব বলে,

__ “ আমি কোথায় ঘুমাবো! পাশে তো নিবে না জানি! ”

সাইমা একটা বালিশ আর চাদর নিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ে। এরপর বলে,

__ “ আর বিরক্ত না করে ঠিক মতো ঘুমাতে দিন। ”

__ “ নিচে শোবে না! ঠাণ্ডা লেগে যাবে। ”

__ “ নাহহহ! আপনার কোলে গিয়ে ঘুমাবো! ডিসগাস্টিং। ”

__ “ তাই তো চাই! ”

সাইমা উল্টো দিক ঘুরে শুয়ে পড়ে, চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলে। কি থেকে কি হয়ে গেলো! দুচোখ বেঁয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। এমন জীবন তো সে চায় নি। চেয়েছিলো ভালোবেসে ঘর বাঁধতে। একটা ঝড় তার জীবন টাকে এলোমেলো করে দিয়েছে। এক বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরেক বিপদের মাঝে এসে পড়েছে। কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যায় সাইমা বুঝতে পারেনা।

সকাল ৬ টা,
সজীবের ঘুম ভাঙে সাইমার অস্ফুট স্বরে, সাইমা বিড়বিড় করে কি যেনো বলছে। সজীব বেড থেকে নেমে সাইমার পাশে গিয়ে বসে। সাইমা ঘুমের ঘোরে বলছে,

__ “ আলিফ! আমাকে ছেড়ে যেওনা! ফিরে এসো! খুব কষ্ট হচ্ছে আমার। ”

সজীব ইচ্ছে করে সাইমার কানের কাছে গিয়ে বলে,

__ “ কখনো ছেড়ে যাবোনা। ”

সজীব সাইমার হাত নিয়ে নিজের গলাতে দেয়, সাইমাও ঘুমের ঘোরে সজীব কে আঁকড়ে ধরে। হৃদস্পর্শে তোমাকে আমার করে নিবো সাইমা। সজীব চোখ বন্ধ করে, সাইমার নিঃশ্বাস এর গরম বাতাস উপভোগ করতে থাকে।

সকাল ৭ টা,
ফোনে এলার্ম এর শব্দে চোখ খুলে সাইমা। সজীব কে জড়িয়ে আছে দেখেই মেজাজ টা খারাপ হয়ে যায়। জোরে করে ধাক্কা দেয় সজীব কে। সজীব উঠে যায়, বলে,

__ “ এমন করে ধাক্কা দিচ্ছো কেনো! ”

__ “ আপনার সাহস হয় কিভাবে আমাকে স্পর্শ করার! ”

__ “ নিজের বিয়ে করা বউকে স্পর্শ করেছি, ক্ষতি কিসের। ”

সাইমা এলার্ম বন্ধ করে, ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। ৯ টায় অফিসে যেতে হবে, অনেক কাজ আছে তার। এখন ওর সাথে তর্ক করে সময় নষ্ট করার মানেই হয়না। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে রান্নাঘরে ঢুকে। এক কাপ চা বসাতে গিয়ে মনে হয়, সজীব তো আছে। আরেক কাপ পানি দিয়ে দেয়। তাড়াতাড়ি করে ব্রেড এ জেলি মাখিয়ে নেয় সাইমা।
একটা প্লেটে করে সজীবের সামনে দিয়ে আসে,

__ “ আমি তো ভেবেছিলাম তুমি একাই খাবে! ”

সাইমা মাথা ঘুরিয়ে মুখ বাঁকিয়ে চলে আসে রান্নাঘরে। নিজে কোনরকম খেয়ে নিয়ে চা কাপে নেয়। সজীব কে এক কাপ দিয়ে নিজেও এক কাপ নিয়ে নেয়।

__ “ আলিফ আলিফ করে চিৎকার করছিলে! তাই তোমার কাছে গিয়েছিলাম। ”

__ “ একশবার আলিফ কে ডাকবো! আর ভুলেও কাছে আসবেন না! ”

__ “ একদিন দেখবে তুমি নিজেই আমার কাছে আসবে। যাই হোক! অফিসে যাও দেখেশুনে, আমাকে আমার বাসায় যেতে হবে। কাল থেকে তোমার সাথে আছি, বাসাতে খবর ও দিইনি। সবাই নিশ্চিত টেনশন করছে। ”

__ “ যান যান! আর আসবেন না এখানে। ”

__ “ রেডি হয়ে নাও, একসাথে বেরুবো! তোমাকে অফিসে নামিয়ে দিয়ে তারপর বাসায় যাবো। ”

সাইমা কথা না বলে রান্নাঘরে ড্রেস নিয়ে ঢুকে যায়। এক রুমের ছোট্ট বাসা, চাকুরীর জন্যই নিজের শহর ছেড়ে এতদূর আসা। সজীব ই এই রুম টা ঠিক করে দিয়েছে তাও হাজবেন্ড ওয়াইফ পরিচয় এ। ফেসবুকে একটা গ্রুপ থেকে সাইমা আর সজীব এর পরিচয় হয়। গ্রুপে দুজনেই এডমিন ছিলো, কিন্তু সাইমাকে সব সময় সজীব খুব রাগাতো। সজীব কে এই জন্য পছন্দ করতো না সাইমা। সজীব ইচ্ছে করেই সব সময় সাইমার সাথে ঝগড়া করতো।

__ “ আলিফ সম্পর্কে সব কিছু জানার পরও কেনো বিয়ে করলেন আমাকে? ”
রেডি হয়ে এসেই সজীব কে জিজ্ঞেস করে সাইমা।

__ “ তোমাকে প্রথম দেখাতেই ভালোবেসে ফেলেছিলাম তাই! ”

__ “ হুহ! প্রথম দেখা। ”

__ “ জানো! তোমাকে ভালোবাসতাম অনেক আগে থেকেই। কিন্তু বলার সাহস পাইনি। কারণ তুমি সব সময় আলিফের নাম জপতে। খুব কষ্ট পেতাম তখন জানো! ”

__ “ আলিফ কে আমি এখনো ভালোবাসি! ওর কাছেই ফিরে যাবো আমি। ”

__ “ পারবেনা এই বন্ধন ছেড়ে যেতে। চলো তোমার অফিসে দেরি হয়ে যাবে। ”

সাইমা বাধ্য মেয়ের মতো বেরিয়ে পড়ে, সজীব নামার আগেই সিএনজি পেয়ে যায়। সজীবের অপেক্ষা না করেই উঠে যায় সাইমা।

সারাদিন কাজের পর দুপুরের ব্রেক এ লাঞ্চ করে নেয় সাইমা, রিলাক্স হয়ে বসে ভাবতে থাকে আলিফের কথা।

ভার্সিটি লাইফের প্রেম,
__ “ সব সময় তোর হাত টাই ধরে রাখবো। ” সাইমার হাত জড়িয়ে আলিফ সব সময় এই কথা বলতো।

চোখ খুলে সাইমা, জল গড়িয়ে পড়ছে, “ আলিফ তুই কোথায় চলে গেলি! নিয়ে যা আমাকে। আমি আর পারছিনা রে সহ্য করতে। এভাবে কতো দিন সজীবের থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবো রে! আমি ওকে ভালোবাসি না! তাও সে আমাকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করেছে। কিভাবে মুক্তি পাবো আমি এই কষ্ট থেকে। ”

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আলিফের নাম্বারে আবার ডায়াল করে সাইমা,
The number you are calling is currently switched off, please try again later.

“ উফফ এই ডায়ালগ শুনতে শুনতে পাগল হয়ে গেলাম। ”

চোখ মুখে পানি দিয়ে আসে সাইমা। অফিসের কাজে মন দেয়।

,,,
সজীব কে বাড়িতে দেখে খুব রেগে যায় ওর মা কামরুননাহার।
__ “ কি রে বেয়াদব ছেলে, কাল থেকে কতো বার ফোন দিয়েছি তুই দেখেছিস! ”

__ “ মা! আমি বিয়ে করেছি কালকে! ” কোনরকম ভনিতা ছাড়াই বললো সজীব।

__ “ কি বললি তুই! বেরিয়ে যা বাসা থেকে, আজ থেকে জানবি তোর মা মরে গেছে। ”

__ “ মেয়েটা কে জোর করে বিয়ে করেছি, মানে বাধ্য করেছি বিয়ে করতে। এখন কি করে মানিয়ে নিবো সেটা না বলে বলছো বের হয়ে যা! তাহলে জন্ম কেনো দিয়েছিলে, ছেলের বিপদে যদি মা হয়ে পাশে না থাকো তো?”
কান্নায় ভেঙে পড়েন কামরুননাহার,

__ “ তুই ছেলে হয়ে এই কথা বলতে পারলি! জানিস তুই কতো টেনশন করেছি তোর জন্য। ”

__ “ এতো কেঁদো না তো! আমি মরিনি! ”

__ “ মেয়েটা কে? ”

__ “ সাইমা ওর নাম! যাই হোক ওর আগে একবার বিয়ে হয়েছিলো দুইদিন পর ডিভোর্স হয়ে গেছে। তাই ও বিয়ে করতে চাইনা। জোর করে বিয়ে করেছি! এখন তুমি বলো ওকে কি মেনে নিবে? ”

__ “ হায় আল্লাহ রে! দেশে কি আর মেয়ে ছিলো না? কপাল পুড়াইলি তুই আমার রে! ”

__ “ তার মানে মেনে নিবেনা, তাইতো! ”

__ “ স্বামী ছাড়া মেয়েকে তুই বিয়ে করেছিস, দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে। আর কখনো আসবি না তুই। ”

__ “ হুমম আমি চলেই যাবো! ভালো থেকো! ”

সজীব বাসা থেকে বের হতে গেলে কামরুননাহার বলে,

__ “ ওই মেয়েরে তালাক দিয়ে দে, যদি তুই আমাকে ভালোবাসিস তাহলে তালাক দিবি । নইলে আমার মরা মুখ ও তুই দেখতে পারবি না। ”

__ “ মা! ”

__ “ তোর মা নাই! বের হো বাড়ি থেকে। ” কোনরকম সজীব কে বের করে দিয়েই কাঁদতে বসলেন কামরুননাহার।

সজীব চুপচাপ সাইমার ঘরের আরেকটা চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে বসে থাকে। অফিস শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে সাইমা, দরজা তে তালা নাই দেখে অবাক হয়। নক দিতেই সজীব দরজা খুলে দেয়। সাইমা জোরে করে চিল্লিয়ে উঠে…….

হৃদস্পর্শ প্রথম পর্ব
#লিখাজামিয়াপারভীন_তানি

( গল্পটা নতুন শুরু করলাম, যদিও অনেক রোমান্টিক গল্প হবে। অনেক কষ্টের কাহিনী ও আছে। কেমন হয়েছে জানিনা, তবে চেষ্টা করবো ভালো করে লিখার। আর কাহিনী সবই কাল্পনিক )

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here