হৃদস্পর্শ পর্ব ১৬ 

হৃদস্পর্শ পর্ব ১৬
লিখা: জামিয়া পারভীন তানি

রেহানের সাথে এক ঘরে থাকতে হবে শুনে সাইমার বিরক্ত লাগছে, তবুও বাধ্য হয়। রেহান স্নেহার সাথে অনেক খেলা করে, এরপর ঘুমিয়ে পড়ে। স্নেহাকে বেডে শুইয়ে দেয়, এরপর সাইমার দিকে তাকিয়ে বললো,
• “ সরি, আপনি বিরক্ত হচ্ছেন জানি। কিছুই করার নেই, দুইটা দিন সহ্য করুন দয়া করে।”
• “ কাজ কতটুকু এগুলো সেটা বললেই আমি খুশি হবো মি. রেহান। ”
• “ আপনার ভাই…. “
• “ সে দায়ী! ”
• “ না তা বলিনি, হতে পারে আবার নাও পারে। ”
• “ এতক্ষণে সবাই ঘুমিয়ে গেছে, আপনি বাইরে থেকে ঘুরে আসুন। ”
• “ হুম যাচ্ছি, দরজা লাগিয়ে রাখবেন। আমার গলা না পেলে খুলবেন না। ”

রেহান সাবধানতার সাথে সাইমার মা বাবার ঘরের সামনে যায়, বেডের পাশের ভয়েস রেকর্ডার বসিয়ে রেখেছিলো সেটা খুলে আনে। এরপর সাইমার ভাই ভাবীর রুমের পাশের জানালা থেকে ভয়েস রেকর্ডার নিয়ে আসে। ইয়ারফোন লাগিয়ে দুটো রেকর্ড ই শুনে। কিছুক্ষণ হতবাক হয়ে বসে থাকে। যেভাবেই হোক সাইমাকে নিয়ে বের হতে হবে। যেকোন মুহুর্তে এরা হামলা করতে দ্বিধা করবেনা।
সাইমার ফোনে অনবরত রিং দিতে থাকে, সাইমা ফোন ধরছেনা। বাধ্য হয়ে দরজা নক করে কয়েকবার। এতো তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলো নাকি! জোরে করে সাইমা বলে চিৎকার করাতে সাইমা দৌড়ে এসে দরজা খুলে। রেহান স্নেহা কে কোলে নিয়ে সাইমার হাত ধরে বলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে আসতে।

মেইন গেট খুলে দুজনেই রাস্তায় নামে, দুজন মিলে অনেক দৌড়ায়। অনেকটা যাওয়ার পর সাইমা থেমে যায়, রেহান কে জোরে করে থামতে বলে। রাত তখন ২ টা বাজে,

• “ কেনো বেরিয়ে আসলেন? কি হয়েছে আপনার? ”

রেহান কিছু বলার আগেই সাইমা দেখে সাইমাদের বাড়ি টা আগুনে জ্বলছে।
• “ আগেই জানতাম এমন কিছু একটা হবে। ওরা তোমার ভালো চায় না সাইমা। ”

সাইমা রাস্তার ওপর বসে পড়ে, রেহানের কথাতে উঠে দাঁড়ায়। কারণ এই জায়গায় ওদের বিপদ হতে পারে।

°°°

সজীব সাইমার ফোনে অনেকবার রিং দিয়েছে। ফোন সুইচড অফ বলছে বারবার। খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছে সজীব, সাইমার পুরো অতীত না জেনে ওভাবে যেতে দেওয়া উচিৎ হয়নি বলে আফসোস করছে। সজীব ওর বন্ধুকে ফোন দেয় , সব কিছু খুলে বলে। বন্ধু নিপু ডিবি পুলিশ কর্মকর্তা। নিপু সজীব এর থেকে সব শুনে আর বসে থাকতে পারেনি। দুজন মিলে বিশ্বস্ত ফোর্স নিয়ে হেলিকপ্টার যোগে রাজশাহী আসে।

সাইমার দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী খোঁজ নিয়ে জানতে পারে বাড়িটা দাউদাউ করে পুড়ছে। সজীবের বুকের ভেতর ব্যথা শুরু হয়, “ সাইমা আর তার কলিজার টুকরা মেয়ে স্নেহা ঠিক আছে তো!” রেহান কে অনেকবার ফোন দিতে থাকে। কিন্তু রেহান ও ফোন ধরছেনা।

প্রচুর মানুষের ভীড় জমে আছে, দমকল বাহিনী আগুন নেভায়। সজীব নিপুর সাথে দাড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে। সাইমা ভেতরে ছিলো, সাইমা কি তবে আর নেই।

আগুন নেভানোর পর বাসা থেকে দুইটা লাশ বের হয়। সজীব বুঝতে পারে, সাইমা নেই এখানে ।
সজীবের ফোনে আননোন নাম্বার থেকে কল আসে, সজীব রিসিভ করতে ওপাশ থেকে বলে,

• “ ভাইয়া, আমি রেহান! কোথায় আপনি? ”
• “ কোথায় আছো তোমরা আর ভালো আছো তো!”
• “ আমরা একটা ক্লিনিকে আছি। আপনি যেখানে থাকুন তাড়াতাড়ি আসুন। ” ক্লিনিকের ঠিকানা বলে দেয় রেহান।

সজীব নিপুকে সাথে নিয়ে তাড়াতাড়ি ক্লিনিকে যায়, গিয়ে দেখে সাইমাকে শক্ত করে ধরে আছে রেহান। দৌড়ে গিয়ে সাইমা কে নিজের কাছে নেয় সজীব। সাইমার মানসিক অবস্থা বুঝতে পারে ভালো নেই। রেহানের দিকে তাকায় সজীব, রেহানের শার্ট রক্তাক্ত হয়ে আছে।

রেহান নিজে থেকে ই বলে,

• “ ওই বাড়ি নিরাপদ না ভেবে তাড়াতাড়ি করে বের হয়ে আসি। অনেকটা পথ আসার পর আগুন দেখে সাইমা ঘাবড়ে যায়, রাস্তায় বসে পড়ে। ও যদি ওখানে সময় নষ্ট না করতো তাহলে এমন টা হতো না। ”
• “ কি হয়েছে কি? ”
• “ কেউ আমাদের উদ্দেশ্য করে গুলি ছুড়ে, হয়তো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যায়। স্নেহার হাতে লাগে গুলি। ছোট মানুষ এতো যন্ত্রণা নিতে পারেনি। অজ্ঞান হয়ে হসপিটাল এর অপারেশন থিয়েটার এ আছে। সাইমা তখন থেকে এবনরমাল বিহেভ করছে! ”

সজীবের কান্না চলে আসে, তার কলিজার টুকরা আজ অপারেশন থিয়েটার এ। সাইমা ইতিমধ্যে সজীবের মুখে গলায় আঁচড়ে দেয়, একটাই কথা, “ আমার মেয়েকে ঠিক করে দাও!”

সাইমার হাত দুটো চেপে ধরে বুকের মাঝে আঁকড়ে রাখে সাইমাকে। নিপু রেহানের সাথে পরিচিত হয়। রেহান নিজে যায় নিক্টস্থ থানায়, জিডি করে। ভয়েস রেকর্ডিং এর এক কপি করে পুলিশের হাতে জমা দেয় প্রমাণ স্বরূপ।

পরেরদিন রেহান ফ্রেশ হয়ে হসপিটাল এ আসে, এখন একটু নিশ্চিত সে। কারণ মূল অপরাধী ধরা পড়ে গেছে।

সাইমা আইসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সজীব ও। রেহান এসে জিজ্ঞেস করে,

• “ স্নেহা এখন কেমন আছে? ”
সজীব বলে,
• “ রিস্ক আছে এখনো, বাচ্চা মেয়েটা আমার। এতো ধকল সহ্য করতে পারছেনা। ”
• “ সাইমা ভাবীর ভাই নামের পিশাচ টা কে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাথে ওর অভদ্র স্ত্রী আর বাচ্চা টা কেও। ”
• “ ছেলে হয়ে বাবা মা কে পুড়িয়ে মারলো কিভাবে? ” সজীব জিজ্ঞেস করে রেহান কে।

• “ এখনও অনেক কিছু জানার বাকি আছে আপনার, ওই শয়তান গুলোর স্বীকারোক্তি আগে লাগবে। কি কি অপরাধ করেছে সব বেরিয়ে আসবে। ” রেহান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো।

• “ আপনি এসব কি বলছেন? ” সাইমার যেনো বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে ।

রেহান বলতে শুরু করে,
• “ সানিয়া হক আর রবিউল হক এর দীর্ঘদিন কোন সন্তান হচ্ছিলো না। বাড়ির কাছের একটা অনাথ আশ্রমে সানিয়া হক যাওয়া আসা শুরু করেন। একটা বাচ্চা সানিয়া কে মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে ফেলেছে। রবিউল হক যখন জানতে পারেন। বাচ্চাটাকে ঘরে নিয়ে আসেন, নিজ পরিচয় দেন। কয়েকটা মাস সুমনকে নিয়ে বেশ সুখেই দিন পার করে হেনা আর রবিউল। বিয়ের দীর্ঘ ১০ বছর পর সানিয়া জানতে পারে সে মা হতে চলেছে। এদিকে ৬ বছর বয়স তখন সুমনের। সানিয়া সুমন কে প্রথম সন্তান হিসেবে পরিচয় দেয়, আর তাদের ঘর আলো করে আসে সাইমা। যাকে ২য় সন্তান হিসেবে পরিচয় দেয় রবিউল। ”

সাইমা একটু রেগে যায়,

• “ আপনি এসব কি বলছেন? সুমন সত্যিই আমার আপন ভাই নয়? ”

রেহান বলে,

• “ আপনি পুরোটা না শুনে এতো উত্তেজিত হবেন না প্লিজ। ”

কিছুক্ষণ থেমে রেহান আবার বলা শুরু করে,
• “ সুমন যত বড় হতে থাকে ততই অধঃপতন এ যেতে থাকে। যখন সাইমার বয়স ১৮ তখন সুমনের ২৩ বছর বয়স। বিয়ে করে আনে হুট করেই মিলা নামের এক মেয়েকে। সাইমা একাদশ শ্রেণী থেকেই ক্লাসমেট আলিফের প্রেমে পড়ে। ৫ টা বছর প্রেম করে আলিফের সাথে। ততদিনে মিলার বদৌলতে সুমন জেনে গেছে সে সাইমার আপন ভাই না। মিলা সুমনের কানে কুমন্ত্রণা দিতে থাকে যেভাবেই হোক সম্পত্তি গুলো রবিউল এর কাছ থেকে লিখিয়ে নিতে। কথা অনুযায়ী সুমন ব্যবসা দেখাশোনা করার নাম করে সম্পত্তির ফাইল রেডি করে। ধোঁকা দিয়ে ব্যবসার ফাইলের সাথে সম্পত্তি লিখিয়ে নেয়। এরপর যখন কোর্টে যায় বুঝতে পারে সব সম্পত্তি সাইমার নামে উইল করা। রবিউল এর সাইন কোন কাজেই আসবেনা। ”

সাইমা নিজেও অবাক হয়ে যায়,

• “ এইজন্য বুঝি আমার ক্ষতি করে বেড়াচ্ছে? আমার মেয়ের যদি কোন ক্ষতি হয় ওদের কে নিজ হাতে খুন করে ফেলবো আমি। ”

চলবে……

গল্প প্রতিদিন রাত ১০ টা বা পরে দিবো ইনশাআল্লাহ, কেউ আশা করি নেক্সট কখন দিবো এটা জিজ্ঞেস করবেন না। কারণ ব্যস্ততার জন্য সবার এসএমেস দেখা সম্ভব হয়না। তখন আবার মন খারাপ করবেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here