স্যার যখন স্বামী সিজন২ পার্ট_০৫

0
370

স্যার যখন স্বামী সিজন২
পার্ট_০৫
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

মেয়ের কথার আওয়াজ শুনতে না পেয়ে অনেকটা ভয় গেল মেঘ।তাড়াতাড়ি করে লাইটটা জ্বালাতে গেলে তমা ওর মায়ের হাতটা ধরে ফেলে।

“মামণি লাইটা জ্বালানোর দরকার নেই।এমনে ভালো লাগছিল না তাই লাইট অফ করে রেখেছি।এত ভয় পেতে হবে না।”
“ও আচ্ছা।কি হয়েছে তোর যে ভালো লাগছে না।শরীর খারাপ নাকি?”
“না,”
“তাহলে,,”
“মামণি তুমি এত প্রশ্ন কর কেন?রাতের খাবার খেয়েছ?”
“খেতে ইচ্ছে করছে না।তুই তো খাস নাই তাই তোকে ডাক দিতে এসেছি।চল,টেবিলে ভাত বেড়ে দিই।”
“না, মামণি খাবো না।বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি।খিদে নেই।তুমি বরংচ খেয়ে নাও।নাহলে আবার অসুখে পড়বে।এমনেতেই অসুখে পড়লে তোমার অসুখ আর ছাড়তে চায় না।”

“আচ্ছা না খেলে চুপচাপ করে শুয়ে যা। আমাকে নিয়ে টেনশন করতে হবে না”এই বলে মেঘ ওর রুমে চলে গেল।

কিন্তু মা আর মেয়ের এই দুইজনের বুকে যে গোপন কষ্ট ছিল তা ওরা একে অপরের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিল।কেবল তাদের চোখের গোপন অশ্রু এই কষ্টের সাক্ষী হিসেবে রইল।
.
.
এর কয়েকদিন পর,,

“আন্টি,, তমা কোথায়?”
“ছাদে গেছে মনে হয়।”
“ও আচ্ছা শোন তুমিতো জানো দিপার বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসছে।ওর বিয়ের অনুষ্ঠান আমাদের গ্রামে বাড়িতে করছি।আমরা কালকে পরিবারের সবাই মিলে বাড়িতে যাচ্ছি। তাই তুমি আর তোমার মেয়ে ও কালকে আমাদের সাথে সকালে রওনা দিবে বুঝলে…..।কোন ধরণের Excuse কিন্তু চলবে না সেটা আমি আগেই বলে দিলাম।আর এখন তোমার মেয়েকে নিয়ে আমি মার্কেটে যাব।পারমিশন দাও।”
“আচ্ছা নিয়ে যাস।”
“মুচকি হেসে,এইতো লক্ষ্মী আন্টি।”
“আচ্ছা আমি ওকে ছাদ থেকে ডেকে নিয়ে আসছি।”

ছাদে গিয়ে দেখি ওর হাতে গিটার।লম্বা খোলা চুলগুলো বারবার বাতাসের কারণে ওর চোখে মুখে এসে উপচে পড়ছে।কিন্তু ওর মধ্যে অবাধ্য চুলগুলোকে সরানোর কোন লক্ষণই দেখছি না।এইরকম দৃশ্যের একটা ছবি মোবাইলে তুলে রাখলে মন্দ হয় না।চটপট এই দৃশ্যের একটা ছবি তুলে ফেললাম।

.
.
ও গিটারে একধ্যানে গানের সুর তুলছে।আন্টির কাছে শুনেছিলাম তমার বাবাও নাকি অনেক ভালো গিটার বাজায়।তমা হয়ত সেই গুণটাও পেয়েছে।দাঁড়িয়ে থেকে চুপচাপ ওর গিটার বাজানো শুনছি।হঠাৎ ও একটা গান ধরল:-

খোদায়া ভে হায়……ইশকেহে কেসা ইয়ে আজিবরে(||)

দিলকি কারিব লায়া দিল্কা নাসিবরে(||)

খোদায়া ভে হায়……ইশকেহে কেসা ইয়ে আজিবরে(||)

আখোসে খাব রুঠে
আপনোকে সাথ জুঠে
তাকতি হো ইয়ে রাহুমে
পেরোকি ছালে বুঠে(||)
পায়েসে তারাপ রাহে
সাহিল কারিব রে(||)

খোদায়া ভে হায়……ইশকেহে কেসা ইয়ে আজিবরে(||)

.
.
“কি ব্যাপার গান বন্ধ করলে যে।ভালোই তো গাচ্ছিলে।”
“আরে আপনি?কখন এলেন?”
“যখন তুমি গিটারে গানের সুর তুলছিলে ঠিক তখন এলাম।আরে,,,এইটা ওই গিটারটা না।”
“হ্যা।ওই গিটারটা।”
“এখনো যত্ন করে রেখে দিয়েছ দেখছি।”
“মুচকি হেসে।হ্যা রেখেছি।কোন বয়স্ক লোক ভালবেসে এই গিটারটা আমাকে আমার জন্মদিনে গিফট করল।উনার নিজের মেয়ে এখন কাছে নেই তাই আমাকে তার নিজের মেয়ে মনে করে তার সবচেয়ে প্রিয় গিটারটা আমাকে দিয়ে দিল তাহলে এই গিটারের অযত্ন কিভাবে করি?”
“হুম, কিন্তু লোকটার নামটা ঠিকভাবে জানতে পারলাম না।”
“হ্যা, সেটাই।ভাগ্যিস গিটারে উনার নামটা লিখা ছিল তাই পরে দিয়ে নামটা জানতে পেরেছি নাহলে নামটাও অজানা রয়ে যেত।”

তমা গিটারের গায়ে লিখা তন্ময় নামটা আলতো করে ছুঁয়ে দেখল। ওর কাছে বারবার মনে হচ্ছে নিজের ওর আপন মানুষের হাতের ছোঁয়া এই গিটারে লেগে আছে।
.
.
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তমার সাথে কথা বলার সময় উপর থেকে খেয়াল করলাম রাস্তায় একটা ছেলে সাইকেল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আর তমার দিকে হা করে তাকিয়ে আছি।একে রোজ একি টাইমে একি জায়গায় দেখতে পাই।প্রথমে বিষয়টা না বুঝলেও এখন আমার কাছে সব ক্লিয়ার।ব্যাপারটার সমাধান আজকেই করতে হবে।

“তমা বাসায় যাও। ”
“কেন?এখানে তো বেশ লাগছে।”

রাগী চোখে ওর দিকে তাকালাম।ওর অনেক কাছে গিয়ে ওকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে গালে জোরে একটা কামড় দিলাম।

“উফ,কি করলেন এইটা?এত জোরে রাক্ষসের মতন কামড় দিলেন কেন?রাক্ষস একটা…… “সেও অনেকটা রাগ নিয়ে কথাটা বলল।
“বেশি কথা বললে আরেকটা গাল বাকি আছে ওইখানেও কিন্তু কামড় দিয়ে দিবো। তোমাকে বাসায় যেতে বলছি সুতরাং বাসায় চলে যাবা এত প্রশ্ন কর কেন?”
“আজব লোকতো একটা।আপনার কথামত চলতে হবে কেন ?”

ওর চুলির মুঠি এবার শক্ত করে ধরলাম।
“এই মেয়ে শোন কোন কারণ ছাড়াতো আর এমনি এমনি বাসায় যেতে বলছি না।কারণ একটা অবশ্যই আছে। চোখ কানতো কিছুই খোলা রাখ না তাই কিসের জন্য এই কথা বলছি বুঝতে পারছ না।ভালোভাবে আমার কথা এখন না শুনলে আমি কিন্তু উল্টাপাল্টা কিছু করে বসবো।তখন কিন্তু আমাকে দোষারোপ করতে পারবে না।”

এই কথা শুনে ওর চোখ-মুখের চাহনি অনেকটা ভয়ার্ত হয়ে গেল তা বেশ বুঝতে পারছি।আমার অন্য কথার মানে ওর মাথার গিল্লুতে না ঢুকলেও এই কথার মানে ও বেশ বুঝতে পেরেছে তাই চুপচাপ আমার কথা মেনে নিয়ে বাসায় চলে গেল।
.
.
রাস্তায় গিয়ে ওই ছেলেটার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম।
দেখলাম ছাদের দিকে বারবার উঁকিঝুকি মারছে।রাগটা আরো বেড়ে গেল।তারপরও অনেক কষ্টে নিজের রাগকে কন্ট্রোলে আনলাম।

“এখানে দাঁড়িয়ে কি করছ?!

কারোর গলার আওয়াজ শুনে ছেলেটা ভ্যাবাচেকা খেল।এরপর আহাদকে দেখেই বলল,

“আমাকে কিছু বলছেন?”

আহাদ চারিদিকটা চোখ দিয়ে ভালোভাবে বুলিয়ে নিয়ে চোখ দুটি বড় বড় করে এবার বলল,”এখানে আমি আর তুমি ছাড়াতো তৃতীয় কাউকে দেখছি না।তাহলে বুঝতেই পারছ প্রশ্নটা কাকে করেছি।”
“ও আচ্ছা।আসলে এখানে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে আসছি।এখানের সবকিছুই বেশ সুন্দর।”কথাটা বলে লজ্জামুখে ছেলেটা একটা হাসি দিল।
“তাই নাকি?ভ্রু কুচকে আহাদ প্রশ্নটা করল?তা এখানে কি এমন প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখলে যে রোজই একি জায়গায় এসে তোমার দাঁড়িয়ে থাকতে হয়?” প্রশ্নটা এবার ও বেশ কঠিন গলায় করল।
“মানে এখানের দোকান,, গাছ, বাড়ি, ছাদ….বলে জিহবায় কামড় মারলো,মানে…… বাড়ি,গাড়ি এইগুলা আর কি…..”বলে হাত দিয়ে গলা চুলকাতে লাগলো।
“আর ছাদের উপরে দাঁড়ানো মেয়েটা…. ওকে কেমন লাগে?”
“বেশ সুন্দর….”আস্তে করে কথাটা বলে ছেলেটা মুচকি হাসলো।

এবার ছেলেটার কলার খুব শক্ত করে ধরে আহাদ বলল,,”আমি বয়রা না যে আস্তে করে আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে আমি তা শুনতে পাবো না।কি উদ্দেশ্য এখানে আসা হয় মনে হয় আমি তা বুঝি না।”
“ভাইয়া,,, আমি মেয়েটাকে ভালবাসি।”এবার খুব সাহস করেই ছেলেটা কথাটা বলল।
.
.
এবার ছেলেটার কলার ছেড়ে দিয়ে আহাদ খুব শান্ত গলায় বলল,,”হুম বুঝলাম।কিন্তু কাউকে ভালোবাসতে হলে প্রথমে তাকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় এই কথাটা মনে হয় তুমি জানো না।আমার মনে হয় তুমি অনার্স লেবেলের স্টুডেন্ট। এখনো কোন চাকরি কর না।ভালোবাসা দিয়েতো আর সারাজীবন পেট ভরবে না।সেজন্য কাউকে ভালোবাসার আগে প্রথমে যোগ্যতা অর্জন করতে হয়।একটা কথা নিশ্চয় তোমার জানা আছে,”অভাব যখন দরজায় এসে দাঁড়ায় ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়।” ”
“ভাইয়া আমি অনার্স ফোর্থ ইয়ারে পড়ি।কয়েক বছর পর আমি ঠিকইই ভালো একটা চাকরি পাবো তাতে কোন সন্দেহ নাই।এই যোগ্যতা আছে বলে আমি আশা করি।যাকে ভালবাসি তাকে অনেক হ্যাপী রাখতে পারবো।”
.
.
ছেলেটার কথাটা শুনে আহাদের এবার মনে মনে খুব হাসি পেল। কোন রকমে ও হাসিটা অফ করে রেখেছে।

“তুমি মনে হয় শফিক আংকেলের ছেলে রাফী তাই না?”
“হ্যা”
“হুম।শোন পড়াশুনা কর ভালো কথা।কিন্তু আজকালকার বাজারে পড়াশুনা করলেই ভালো চাকরি পেয়ে যাবা…কথাটা অনেকটা মামার বাড়ির আবদারের মতন হয়ে গেল তাই না?এটা কোন টিভি সিরিয়ালের নাটক বা সিনেমা না যে পড়াশুনা কর বলেই তুমি অবশ্যই ভালো একটা চাকরি পেয়ে যাবে। তোমার মত অনেক ভালো স্টুডেন্টই পড়াশুনা করে কই সবাই কি ভালো পোস্টে চাকরি করছে।ভালো চাকরি পেতে হলে অনেক পরিশ্রম,আর সেখানেই ফোকাস করতে হয়।এটা অনেকটা সময়ের ব্যাপার।আল্লাহ সহায় থাকলে ভালো চাকরি পেয়ে যাবে তাতে সন্দেহ নেই।কিন্তু ভালোবাসার মানুষকে সবসময় সুখী রাখতে হলে আগে যোগ্যতাটা অর্জন কর,ভালো মানুষ হও তারপর যাকে খুশি তাকে ভালোবাসো আমার কোন আপত্তি নেই এই উপদেশটা আমি একজন শিক্ষক হিসেবে একজন ছাত্রকে দিলাম।যদি আমার উপদেশ তোমার ভালো না লাগে তাহলে you can avoid it.তোমার পার্সোনাল লাইফ তুমি যা খুশি করতে পারো যাকে খুশি তাকে ভালোবাসতে পারো তাতে আমি বাধা দিবো না। কিন্তু ওই মেয়েটা বাদে।”
“কেন?”
“কারণ She is my wife.”
“কিহ!?আপনি কবে বিয়ে করেছেন?আমরাতো কিছুই জানি না।”
“ঘরোয়াভাবে বিয়ে হয়েছে।এখনো অনুষ্ঠান করে তোমার ভাবিকে ঘরে তুলে আনেনি।অনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করলে সবার আগে আমি তোমাকে আমাদের বিয়ের কার্ডটা পার্সোনালভাবে দিয়ে আসবো কেমন?
আর হ্যা এতক্ষণ আমি তোমাকে ভালোভাবে কথাগুলো বুঝালাম কারণ প্রথমত আমি কারোর সাথে প্রথমে খারাপ ব্যবহার করিনা।এটা আমার একটা ভালো গুণ।এরপর থেকে আর কোনদিনও যদি আমি দেখি এখানে দাঁড়িয়ে আছ তাহলে আমার খারাপ রুপটা দেখতেও তোমার বেশি সময় লাগবে না।এই এলাকায় এতদিন ধরে আছ, তাহলে নিশ্চয় জানা হয়ে গেছে আমি যেমন খুব ভালো তেমনি খুব খারাপও।”
জ্বী, ভাইয়া,বুঝি গেছি।আর বুঝাতে হবে না।আসি তাহলে,,আসসালামু আলাইকুম।
.
.
“আরে,,, করছেনটা কি?দরজাটা বন্ধ করছেন কেন?”ভীত কন্ঠে তমা কথাটা বলল।

আহাদ ওর কোন কথার উত্তর না দিয়েই তমাকে একটানে নিজের কাছে এনে খুব শক্ত করে ওকে জড়িয়ে ধরল।

তমা বেশ ভালোই বুঝতে পারল,, কোন একটা কারণে উনার রাগ উঠেছে তাই এখন ওর উপর দিয়েই উনি সব রাগ ঝাড়বে।

তমার ঘাড়ে হালকা একটা কামড় দিয়েই সেখানেই মুখটা রেখে আহাদ বলতে শুরু করল,,”আজকের পর থেকে আর বিকালে ছাদে যাবে না।”
“কেন?কি হয়েছে?”(ভীত কন্ঠে)
“কারণ আমি বলছি তাই।এখন থেকে আমি যা বলব ঠিক তাই শুনবে।তোমার কাছে খারাপ লাগলেও শুনতে হবে।”
“পারবো না”
পারবো না কথাটা শুনেই আহাদ এবার তমার ঘাড় থেকে মুখটা সরিয়ে ওর চোখে রাগিভাবে তাকালো।আহাদের রাগি চেহেরাটা দেখেই তমার মুখটা ভয়ে শুকিয়ে গেল।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here