স্যার যখন স্বামী সিজন২ পার্ট_০৪

0
715

স্যার যখন স্বামী সিজন২
পার্ট_০৪
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

তন্ময়ের ছবিটা বুকের মধ্যে রেখে মেঘ শুয়ে রইল।
ওর সাথে কাটানো রঙ্গিন মূহুর্তগুলো এখন চোখে ভাসছে।

“আমার বাবুর আম্মু কি করছে?”
“বাবুর আব্বু কি চোখে কিছু দেখে না।গাছে পানি দিচ্ছি। এখন ছাড়ো তো কাজ করছি।”
“উহুম এখন ছাড়া যাবে না।আমার এখন বাবুর আম্মুর সাথে রোমান্স করার ইচ্ছা করছে।এই বলে আরো শক্ত করে ও জড়িয়ে ধরল।”
“এই ছাড়ো তো সময় অসময় নাই উনার রোমান্স করতে ইচ্ছা করছে তাই বলে এখানে চলে এল।সবসময় এইসবের মুড থাকে না।”
“আচ্ছা।তাই না?আমার রোমান্সের বারোটা বাজিয়েছ না?দাঁড়াও দেখাচ্ছি মজা।”

কিছুক্ষণ পর,,

পানির পাইপ নিজের কাছে এনে,,”আশ্চর্য পানি আসছে না কেন?”
“তন্ময় তুমি পানির পাইপের ওপর কেন দাঁড়িয়ে আছো?সরে আসো ওইখান থেকে।”
“আমার ইচ্ছা।তাতে তোমার কি?”
“আরে তুমি এইভাবে এভারেস্ট পাহাড়ের মতন পাইপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলে গাছে পানি দিবো কি করে?ছোট বাচ্চাদের মতন এই রকম দুষ্টুমি না করে সরে আসো।”
“আচ্ছা। যেমন তোমার ইচ্ছা।”এই বলে ও সরে আসলেই হঠাৎ করে পানির পাইপ হতে পানি বের হয়ে আসে আর আমি পুরো ভিজে গোসল করে ফেলি।এই দৃশ্য দেখে তন্ময়ের কি হাসি!
“এখন গাছে বেশি করে দাও বলে আরো জোরে জোরে শয়তানি ভাবে হেসে উঠল।
“এই তুমি এটা কি করছ?”
“কি করছি।”(না জানার ভান করে)
“কিছুই জানো না তাই না।দাঁড়াও” বলে ওকেও ভিজিয়ে গোসল করিয়ে দিলাম।

“মেঘ আমাকে এইভাবে ভিজালে কেন?”
“বেশ করেছি।তুমি পারলে আমি কেন পারবো না।
আমি ফাজলামি করলে যত দোষ আর তুমি করলে কিছুই না।”

“হিহিহি করে শয়তানিমার্কা হাসিটা আবার দিল।”
“এই তুমি এত কাছে আসছ কেন?দেখো আমি পুরো ভিজে গেছি। এখন কোন দুষ্টুমি হবে না।”
“এই কথা বললে তো আমি আর মানবো না সুন্দরি।আমিতো কাছে আসবেই।”
“ওই ভালো হবে না কিন্তু। আমি,,আমি তোমাকে……”বলে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করছিলাম।
“হুম হুম আমিও দেখতে চাই কি করতে পারো তুমি…..হাহাহা……এই বলে ওর ঠোটের অনেক কাছে আসলাম।
.
.
“তন্ময় করছেনটা কি?”

তন্ময়”-ওহ আমাদের এই রোমান্টিক মূর্হুতে কাবাবের হাড্ডি হতে কে আসছে?(বিড়বিড় করে) পুষ্প তুমি!”
“হ্যা আমি। কি করছিলেন আপনারা।” (হাঁপাতে হাঁপাতে)
মেঘ- “পুষ্প তুমি হঠাৎ হাঁপাতে হাঁপাতে এখানে আসলে যে।”
“না কিছু না।তন্ময় আপনার কাছে কি সময় হবে?আসলে বাসায় একাএকা ভালো লাগছে না।আমার সাথে ঘুরতে যাবেন। ”
“ওকে নো প্রবলেম।চল।মেঘ আমি ওকে নিয়ে হেঁটে আসছি।তাড়াতাড়ি চলে আসবো “এই বলে আমার গাল ছুঁতে গেলে পুষ্প ওর হাত ধরে টেনে আমার কাছ থেকে সরিয়ে আনে।
“কি করছেনটা কি?চলেন নাহলে দেরি হয়ে যাবে।”

পুষ্পের এইধরণের ব্যবহারে খুব খারাপ লাগতো তখন। মনে হত ও আমাদের মাঝে সবসময় দেয়াল তৈরি করছে চাইছে।যখনি আমি আর তন্ময় রোমান্সের মুডে একে অপরের কাছে চলে আসি ঠিক তখনি জানি না ও কোথা থেকে এসে পড়ে।ও অনেকটা মানুষিক টাইপের রোগী ছিল যার কারণে কিছু বলতে চাইলেও বলতে পারতাম না।মনের ভিতরে সব কথা রেখে দিতাম।
.
.
“বৌমা এত রাত হয়ে গেল তন্ময় এখনো আসেনি।”
“না আম্মু,”
“মেঘ, এত রাত পর্যন্ত একটা অবিবাহিত মেয়ের সাথে এভাবে তন্ময়ের বেড়ানোটা আমি ঠিক চোখে দেখছি না।প্রায়ই এই মেয়ে তন্ময়কে নিয়ে অনেক রাত পর্যন্ত এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ায়।এই জিনিসটা কিন্তু মোটেও ভালো নয়।পুরুষ মানুষ যদি ঘরে বউ রেখে অন্য আরেকটা মেয়েকে নিয়ে এত রাত বিরাত করে ঘুরে বেড়ায় তাহলে কি অঘটনটা ঘটতে পারে বুঝতে পারছ ব্যাপারটা?”
“আম্মু আমি তন্ময়কে বিশ্বাস করি।ও এমন কিছু করবে না যাতে আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা হয়।”
“মারে,বিশ্বাস ভালো, কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস সেটা অনেক ভয়ানক।পুরুষ মানুষকে অন্ধ বিশ্বাস করতে নেই।এরা যদি একবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় আর অন্য মেয়ের দ্বারা মোহিত হয়ে পড়ে তাহলে সোনার সংসারটা ভাঙ্গতে এক সেকেন্ডও লাগবে না।তোমার শুশুড়কে সবসময় আমি নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রেখেছি তাই ওর ভালাবাসাটা শুধু আমাকে ঘিরেই ছিল কিন্তু তুমি তন্ময়কে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না রেখে ও যা করছে তাই করতে দিচ্ছ,কোন বাজে বাধা দিচ্ছ না এটা একজন স্ত্রী হিসেবে তুমি মোটেও ঠিক করছ না।ওকে নিজের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা কর আর ওই মেয়েটাকে বলবা ওর থেকে যাতে দূরে থাকে।”
“জ্বী আম্মু।”
.
.
শাশুড়ি মার কথাগুলো সেদিন আমাকে অনেক ভাবালো।পুষ্পের সাথে তন্ময়ের চলাফেরাটা আমার এমনিতেই অনেক আগে থেকে ভালো লাগত না আর এখন এইসব কথা শুনে মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছিলো। তন্ময়কে হারনোর ভয়।

জানালার ধারে অনেকক্ষণ ধরে চেয়ে আছি তন্ময় কখন আসবে?এরপর জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম পুষ্প তন্ময়ের হাত আটকিয়ে দিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে ওর গালে কিস করেছে।এই দৃশ্য দেখেই মাথাটা দ্বিগুণ খারাপ হয়ে গেল।

অনেক রাত করে তন্ময় বাসায় আসলে ওর গাল আর শার্টে লাল লিপিস্টকের দাগ দেখে সেদিন আর মাথা ঠিক রাখতে পারিনি আমি।মনের ভিতরে যা ছিল তাই সরাসরি বলে ফেললাম।
.
.
“আজ এত দেরি হল যে বাসায় আসতে?”
“আরে বলনা, পুষ্প মেয়েটা আস্ত পাগলী।ওর সাথে না মিশলে বুঝতাম না।আজ অনেক জায়গায় ঘুরেছি ওকে নিয়ে।অনেকদিন পর এত ঘুরাঘুরির পর মোডটা ভালো হয়ে গেল।”
“হ্যা, সেটাতো নিজের চোখে দেখতে পারছি।”
“মানে,,”
“মানে এ কয়েকদিন ধরেই দেখতে পারছি মেয়েটার সাথে তোমার ঘুরাফেরা অনেক ভালো লাগছে।এজন্যিতো এত রাত করে বাসায় এসে পড়ার পরও এত জোরে জোরে হাসাহাসি হচ্ছিল।আর আজকে বাসার সামনে এসে ও তোমাকে কিস করল মোডতো বেশ ভালোইই হবার কথা। এত যদিই ওর সাথে ঢলাঢলি করতে ভালো লাগে তাহলে এখানে কেন আসছ?ওর বাসায় গিয়ে একরুমে ওর সাথে রাতটা কাটিয়েই আসতে পারে?”
.
.
এ কথাটা শুনা মাত্র তন্ময় সেদিন অনেক জোরে আমাকে থাপ্পড় দিলো।টেবিলে মাথাটা ঠেকায় কপালটা অনেক ফুলে গিয়েছিল।কিন্তু তন্ময়ের সেদিকে কোন খেয়াল ছিল না।

“কি বলছ এইসব। Mind your language, Megh.”

“ও এখন আমার উচিত কথা শুনতেও খারাপ লাগছে।আমি জানি আমাদের সাংসারিক জীবনের এই কয়েকবছরে আমি তোমাকে কোন সন্তান দিতে পারেনি।এইজন্য প্রায় তুমি আপসেট থাকো।এই বিষয় নিয়ে আমি নিজে অনেক দুঃখ পেলেও সবসময় তোমাকে খুশি রাখার চেষ্টা করে আসছি।প্রথম প্রথম পুষ্পের সাথে মিশতে দেখে তোমাকে একটু একটু হাসতে দেখতাম তাই পুষ্পের সাথে তোমার মিলামিশাকে আমি কখনো খারাপ নজরে দেখি নি।কিন্তু এখন ওর সাথে তোমার মিলামিশাটা আমার কাছে একটু বেশিই ঘনিষ্ঠ মনে হচ্ছে।”
“মেঘ চুপ থাকো।নাহলে আমি কি করে ফেলবো আমি নিজেও জানি না।”
“নিজের স্ত্রীকে বাসায় রেখে অন্য আরেকটা মেয়েকে নিয়ে মিশতে, কথা বলতে, ঘুরতে এত ভালোইই লাগে তোমার!কয় আমার সাথে তুমি যখন মিশো তখন তোমাকে তো এতটা খুশি দেখায় না।এই বলতো তোমাদের সম্পর্কটা শুধু কিস পর্যন্ত নাকি আরো অনেক গভীরে?”
“মেঘ বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।আমার সহ্যক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে।আরেকটা আজেবাজে কথা বললে আমি,,,”
“শার্টের কলার ধরে এই কি করবে তুমি,হ্যা….কি করবে।আমার গায়ে হাত তুলবে তুমি।তোল হাত তোল দেখি। সেটাইতো পারবে এখন।সত্যি কথা বললে এমনিতেই পুরুষদের সহ্যক্ষমতা হারিয়ে যায়।তখন মেয়েদের গায়ে নির্লজ্জের মতন হাত তুলতেও তোমাদের দ্বিধাবোধ জাগে না।আমি জানি না আমি আর কোনদিনও মা হতে পারবো কিনা?এই দুঃখটা আমার সবসময়ের জন্য থাকলেও আমি শুধু একটা বিষয় ভেবে খুশি হতাম আর তা হচ্ছে আমার কাছে আমার তন্ময়ের ভালোবাসা আছে।আমার দুঃখ ভুলার জন্য তোমার ভালবাসাটাই আমার কাছে যথেষ্ট।এমন অনেক মানুষ আছে যাদের অনেক দেরিতে সন্তান হয় বা সারাজীবনটা পাড় হয়ে গেলেও সন্তান হয় না।কিন্তু সেই দম্পতিদের ভালোবাসা সত্যিকারের হলে তাদের সন্তান না থাকলেও ভালোবাসাটা অটুট থাকে।কিন্তু আমাদের বিবাহিত জীবনের সম্পর্কটা মাত্র সাড়ে চার বছরের।সন্তান দিতে না পারায়,আগের থেকে চেহেরাটা অনেক খারাপ হয়ে যাওয়ায় এখন আর আমাকে ভালো লাগে না তাই না?ওই মেয়েটাকে ভালো লাগে। এই বললা নাতো তোমাদের সম্পর্কটা কতটা গভীরে।সব হয়ে গেছে না তোমাদের মধ্যে।ওহ শিট আমি বেক্কলের মত কি প্রশ্ন করছি, আমার প্রশ্নের সত্য উত্তর দেওয়ার সাহস আছে তোমার? ওই মেয়েটা আমাদের বাসায় এসে আমার সামনেই তোমাকে জড়িয়ে ধরে,কিস করে তার মানে আড়ালেও অনেককিছু হয়ে গেছে তোমাদের মধ্যে। ইউ…. ক্যারেকটারলেস একটা।”
.
.
চিৎকার দিয়ে উঠলাম।ভয়ে আমার হাত পা কাঁপা শুরু করল।পুরো শরীর বেয়ে ঘাম ঝড়ছে।আবার এই স্বপ্নটা দেখলাম!

জানালা দিয়ে চাঁদের আলো রুমে এসে পড়ছে।মেঘ জানালার পাশে গিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে আর অতীতের স্মৃতিগুলো আওড়াচ্ছে।সেদিন ভুলটা আসলে কার ছিল আমার নাকি তন্ময়ের!?যে তন্ময়কে আমি কোনদিনও ভুল করতে দেখি নি,সবসময় আমার করা ভুলগুলো ধরিয়ে দিয়ে তা সংশোধন করে দিয়েছে, যার বিবেক-বুদ্ধি এত ভালো সে কিভাবে এতবড় ভুল করে?নিজের মনটাকে একটু শান্তনা দেওয়ার জন্য অতীতের সুখের স্মৃতিগুলো খুঁজে বেড়াতে যায় তখনি তার সাথের দুঃখের স্মৃতিগুলোও এসে ভিড় জমায়।
.
.
ক্যারেক্টারলেস একটা…. এ কথা বলার সাথে সাথে জানিনা সেদিন তন্ময়ের কি হয়েছিল আমার মাথার চুলগুলো খুব জোরে মুঠি করে ধরে প্যান্টের বেল্ট খুলে জানোয়ারের মতন ইচ্ছেমত মারা শুরু করল।সেদিন ওর চেহেরার আরেকটা রুপ দেখতে পেয়েছিলাম।কি হিংস্র সে রুপ!ওর রাগ যতক্ষণ না পর্যন্ত কমছিল ততক্ষণ পর্যন্ত জানোয়ারের মতন আমাকে মেরেই চলেছিল।শাশুড়ি মা সেদিন ঘুমের ঔষুধ খেয়ে ঘুমিয়েছিল তাই আমার কান্নার আওয়াজ সেদিন ওনি শুনতে পারেননি।এরপর থেকে ওর সাথে আমার দূরত্বটা বেড়ে চলল।
.
.
মেঘ ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত ৮টা বাজছে।মেয়েটা মনে হয় অনেক আগেই বাসায় চলে এসেছে। এখনো ও রাতের খাবারটা খায়নি। তমাকে ডাক দেওয়ার জন্য মেঘ ওর রুমের দিকে গেল।

“তমা ঘরটা অন্ধকার করে রেখেছিস কেন মা?”
…..
“তমা,,কিরে কথার জবাব দিচ্ছিস না কেন?”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here