স্যার যখন স্বামী সিজন২ পার্ট_১৬

0
504

স্যার যখন স্বামী সিজন২
পার্ট_১৬
#লিখা জান্নাতুল ফেরদৌস

“তার মানে আমার সাথে আপনার সম্পর্ক যাতে শেষ না হয় সেজন্যই আমার অতীত শুনতে চাচ্ছেন না।আপনি তা এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন?”

তমার দুই গাল টান দিয়ে ফারিদ বলল,,
“এই পিচ্চি আমি তা বলছি নাকি?তুমি যা ভাবছ আসলে তা নয়।তুমি ৩০ মিনিট ধরে বসে আছ সাথে আমাকেও বসিয়ে রাখছ তোমার অতীতের কাহিনী আমাকে শুনাবে বলে।কিন্তু তুমি নিজেই কিছু বলতে পারছ না।আর কেন পারছ না সেটা আমি ভালো করেই বুঝতে পারছি।এতটুকু আমি বুঝতে না পারলে কি আর বুঝলাম তোমাকে”

অবাক হয়ে উনার দিকে তাকিয়ে আছি।কি বুঝতে পেরেছেন উনি।আজব!

“তুমি আসলে এখন আনইজি ফিল করছ কথাটা বলতে।বিবেক বলছে কথাটা বলতে কিন্তু মন সায় দিচ্ছে না এখন।তাই এইরকম পরিস্থিতিতে তোমাকে এইসব কথা বলতে আমি জোর করছি না।তোমার অতীতের সব ঘটনা আমি শুনব তবে এখন না আমাদের বিয়ের বাসর রাতে।তখন না হয় পুরোটা রাত তোমার কথা শুনে পাড় করব আর তোমার খারাপ অতীতকে সেদিন মুছে দিয়ে একটা নতুন সকালের সূচনা করব যেখানে তোমার খারাপ অতীতের কোন চিহ্ন থাকবে না।নইতবা যখন এই কষ্টের অতীত নিজের মধ্যে চেপে রাখতে তোমার খুব কষ্ট হবে তখন আমার কাধে মাথা রেখে সেই কষ্টের অতীতের কথাগুলো বলিও।সেইদিন আমিও তোমার কষ্টের ভাগীদার হবে।আমি সেদিনটার অপেক্ষায় থাকব।

আর আরেকটা তোমার মন যা বলবে তাই করিও। ইচ্ছা হলে বলিও নাহলে তা গোপন রেখে দিও।দুইটা করার অধিকার তোমার আছে।তবে তা এখন নয়।বিয়ের পরের দিনগুলোর জন্য জমা রাখিও।”
“………”

“আর এই এংগেজমেন্ট আংটিটা খুলে হাতে রাখছ কেন?মাইর দিব একটা।দাও আংটিটা দাও।এখনি পড়িয়ে দিই।”

অবাকের রেশ কিছুতেই কমছে না।উনি কি সত্যিই এত ভালো নাকি আমার সামনে ভালো হওয়ার অভিনয় করছেন। না, না উনাকে বিশ্বাস করা যাবে না।এত মিষ্টি মিষ্টি কথায় আমি গলব না।সব অভিনয়।সব পুরুষইই এক।হয়ত উনার কোন স্বার্থ লুকিয়ে আছে তাই আমাকে বিয়ে করার জন্য এত মিথ্যা কথা বলছেন।বুঝি বুঝি সব বুঝি।ফারিদ স্যার আপনার চালাকি আমি বুঝি না মনে করছেন।এই বিয়ে তো আমি হতেই দিব না।আপনি কি করতে পারেন সেটা আমিও দেখব।

“মনে মনে কি এত ভাবো। তমা তোমাকে আমি এতটা বছর ধরে চিনি। নিশ্চয় বিয়ে না করার সিদ্ধান্তে তুমি এখনো অটল আছ ।তা আমি ভালো করেই জানি।আর তুমি আমাকেও ভালো করে জানো ফারিদ যা বলে তাই করে।তোমাকে বিয়ে করে আমার ঘরের বউ বানাবো সেটাই ফাইনাল।

তমার একেবারে কানের কাছে এসে,,, যদি সোজা কথায় ঘি না উঠে তাহলে আঙ্গুলটা বাঁকিয়ে নিব।”

চোখ বড় বড় করে উনার দিকে তাকিয়ে আছি,,

“সোনা,,এইভাবে তাকিও না।নাহলে নিজেকে সামলাতে পারি না।একটা কথাতো শুনেছ Everything is fair Love and War.”

এইরকম পরিস্থিতিতেও কেউ কাউকে ভয় দেখাতে পারে।আল্লাহ এর সাথে বিয়ে হলে আমার পুরো লাইফটা শেষ হয়ে যাবে।
.
.
বাসায় এসে ওয়ারড্রবের সব কাপড় নামিয়ে সেগুলো এলোমেলো করলাম।ঘরের সবকিছু এলোমেলো করে রাগটা কমালাম।আহ এবার শান্তি।এবার শান্তিমনে আবার এলোমেলো জিনিসগুলো গুছালাম।রাগ উঠলেই আমি এই কাজটা সবসময় করি।

“মামণি একটা কথা ছিল।”
“হুম বল?”
“আমি বিয়েতে রাজি আছি।তবে আমার একটা শর্ত আছে।”
“বিয়ে করবি আবার এতে শর্ত কিসের?”
“মামণি…..শর্ত মানবে কিনা বল?”
“আচ্ছা আচ্ছা বল কি শর্ত?”
“আমি বিয়েটা ২ বছর পর করব।এখন না।আমার এখন সময় দরকার। তুমি ওদেরকে এই কথা বলে দিও।”
“এত দেরিতে!তমা আমার শরীরটা বেশি ভালো যাচ্ছে না সেটাতো তুই নিজ চোখে দেখতে পাচ্ছিস।এখন তোকে বিয়েটা দিতে পারলেই খুব শান্তি লাগত।তাই আমি চাচ্ছিলাম তোর বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিই।”
“……..”

মামণির মুখের উপর আর কিছু বলতে পারলাম না।মুডটাই খারাপ হয়ে গেল।ফারিদ স্যারকে মেসেজ দিয়ে বললাম,, ছাদে আসার জন্য।
.
.
“কি ব্যাপার হঠাৎ করে আমাকে ছাদে আসতে বললে যে?”
“কথা ছিল।”
“তাই!”
“কাছে আসো এত দূরে দাঁড়িয়ে কথা বললে আমার আনইজি লাগে।”

“উফ….লুচু একটা (মনে মনে)।
স্যার,,এতটুকু দূরত্বই ঠিক আছে।আরো বেশি কাছে আসার দরকার নাই।”

তমার কাছে এসে,, “কিন্তু আমার কাছে ঠিক নেই যে। তমার হাত ধরে টেনে একেবারে আমার কাছে এনে বললাম,,হুম এখন ঠিক আছে।আসলে কথা বলার সময় কারোর চেহেরা ঠিকভাবে না দেখতে পেলে আমার কাছে মনে হয় সে আমাকে ইগনোর করছে।এই তুমি আমাকে ইগনোর করতে চাইছ নাকি?”
“না,,না তেমন কিছু না।আপনাকে ইগনোর করব কেন?দেখেন আপনার কাছে এসে কথা বলছি।”(ভয় পেয়ে)
“হুম ঠিক আছে।”
“আসলে আপনাকে একটা কথা বলার জন্য এইখানে আমি ডেকেছি।প্লিজ কথাটা শুনে আপনি রেগে যাবেন না।আমার দিকটাও বুঝার চেষ্টা করবেন।”
“হুম বল,,”
“আসলে আমি চাচ্ছি আমাদের বিয়েটা ২ বছর পর হোক।”
“কিহ!হঠাৎ এই ডিসিশন।”
“দেখুন রাগবেন না।বিয়ে আপনাকেই করব।কিন্তু সেটা ২ বছর পর।আসলে হঠাৎ করে বিয়ের কথাটা শুনে আমি তা মন থেকে নিতে পারছি না।আমার কিছুটা সময় দরকার।”
“সময় নাও।তাতে আমার সমস্যা নাই।কিন্তু তাই বলে ২বছর!এই ২ টা বছর আমার পক্ষে অপেক্ষা করা সম্ভব না।”

এবার কেন জানি আমার খুব কান্না পাচ্ছে।সবাই যার যার স্বার্থে আমাকে শুধু ব্যবহার করছে।আমারো যে একটা মন আছে মন থেকে যে আমি এই বিয়েটা মেনে নিতে পারছি না সেই খবর কেউ নিতে চাই না।মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া যে কত বড় অপরাধ তা আমি একের পর এক ধাক্কা আর কষ্ট পেয়ে বুঝেছি।
.
.
কিছুক্ষণ পর,,,,

“এই তমা,,তুমি কাদঁছ?”
“তাতে আপনার কি?আমার চোখ আমি যখন খুশি তখন কাঁদব।”
“প্লিজ কেঁদ না।দেখ বিয়েটা তাড়াতাড়ি করে ফেললে সেটা তোমার, আমার আমাদের দুইজনের জন্য ভালো হবে।”

উনি হাত দিয়ে আমার চোখের পানি মুছতে গেলে আমি হাতটা সরিয়ে দিই।এরকম কয়েকবার উনার হাতটা সরিয়ে দিতেই উনি রেগে যায়।

“এই মেয়ে সমস্যাটা কি?বারবার আমার হাত সরাচ্ছ কেন?আরেকবার আমার হাত সরালেই তোমার খবর আছে।”
“আর কিছু করলাম না।উনি আমার চোখের পানি মুছে দিয়েই নরম স্বরে বললেন,,আচ্ছা ২টা বছর কি খুব বেশি হয়ে যাচ্ছে না।আরেকটু কম সময় নেওয়া যায় না।”

চুপ করে থাকলাম। আর কি কথা বলব পাগলের সাথে।জানতাম এত সময় উনি আমাকে দিবেন না।

“আচ্ছা যাও ২বছর পরেই না হয় আমাদের বিয়েটা হল।তবে আমার একটা শর্ত মানতে হবে।”

এর ওর শর্তের কথা শুনতে শুনতে কানটা ঝালাপালা হয়ে গেল।তারপরও নিজেকে কন্ট্রোল করে বললাম,,”হুম বলেন কি শর্ত মানতে হবে?”

“ওইদিন তোমার হাতে ব্লেড দেখেই আমার আত্মাটা কেঁপে উঠেছিল।নিজের ক্ষতি করতে যাচ্ছিলে সেটা ভালো করে জানতাম।এইজন্য বিয়েটা তাড়াতাড়ি করে তোমাকে আমার কাছে রেখে দিতে চেয়েছিলাম।ভার্সিটি ক্লাসে তুমি আমার চোখের সামনে থাকলেও বাকিসময় তুমি আমার চোখের আড়ালে থাকবে।যেহেতু এই ২টা বছরে ভার্সিটির ক্লাসের পর বাকি সময়টা তুমি আমার চোখের আড়ালে থাকবে সেহেতু সে সময় তুমি কিছু একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পার।”
“…….”
“বুঝতেই পারছ কি বলতে চাচ্ছি।তুমি এই ২ বছরে ভুলেও নিজের ক্ষতি করতে পারবে না।আর যদি করে ফেলও তাহলে দেখবে এই ফারিদের আসল চেহেরা।তোমাকে বাঁচিয়ে তারপর কোন কথা ছাড়াই ডাইরেক্ট বিয়ে করে ফেলব।”

“সরি।জানি না সেদিন কি হয়েছিল তাই এইরকম বাজে কাজটা করতে গিয়েছিলাম।দ্বিতীয়বার আর এই কাজটা করব না।”

“হুম বুঝলাম।কিন্তু তোমার মুখের কথায় আমি বিশ্বাস করি না।”
“কি করলে বিশ্বাস করবেন?”
“আমার দুইগালে দুইটা কিসি দাও। তাহলেই তোমার কথা বিশ্বাস করব।”
“জীবনেও আমি এই কাজ করব না।ব্ল্যাকমেইল না।”
“তাহলে যাও কালকেই বিয়েটা করে ফেলব।আর এর ২ বছর পর তোমাকে আমার দুই সন্তানের মা বানাব।এই আমি কিন্তু অলরেডি আমাদের মেয়ে বাবুদের নামও ঠিক করে ফেলছি।একজনের নাম হবে ফারিয়া আরেকজনের নাম…..”
“এই স্টপ স্টপ…… বলে হাত দিয়ে উনার মুখটা বন্ধ করে দিলাম।আর কিছু বলার দরকার নেই।যা বুঝার আমি বুঝে গেছি।”
“তাই!”
“হ্যা।চোখ অফ করেন।”
“কেন?”
“উফ চোখ অফ করতে বলছি।”
“আচ্ছা।”

উনার দুই গালে দুইটা হামি দিয়ে তাড়াতাড়ি ছাদ থেকে নেম আসলাম।
.
.
পাগলি তুই কিসের জন্য বিয়েটা করতে চাচ্ছিস না তা কিছুটা প্রায় ৫০% আমি আঁচ করতে পেরেছি বাকি ৫০% রহস্য আমার অজানা।তোর কষ্টের কথা শুনে হয়ত নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারব না কারণ আমার অনুপস্থিতে না জানি কত কষ্ট তুই সয়েছিস।ওই সময় হয়ত তুই খুব করে চাইতি তোর পাশে তোর আপন কেউ থাকুক।কিন্তু সেটা আমি পারিনি।তোকে একা রাজশাহীতে পাঠিয়ে আমরা অনেক বড় ভুল করেছি যার মাশুল তুই পাচ্ছিস।লক্ষ্মীটি এরপর থেকে আর কখনো আমি তোকে একা ছাড়ব না।তোর আশেপাশে সবসময় থাকব।আর তুইও নেগেটিভ টাইপের মানুষদের সাথে থাকতে থাকতে এই ভেবে নিয়েছিস তোর খারাপ অতীতের কথা শুনে আমি তোকে কষ্ট দিব তোকে অপমান করব।আর এই জিনিসটাই আমাকে সবচেয়ে বেশী কষ্ট দিয়েছে।এখনো আমাকে বুঝতে পারলি না।তোকে খুব ভালোবাসি তাই কারণে অকারণে তোর উপর রাগ করা,জোর করা,তোকে শাসন করা, তোর ভালোর জন্য সবকিছু করার অধিকার আমার কাছে।এই অধিকার আমি নিজে তৈরী করে নিয়েছি।আর তুই আমার রাগি ব্যবহার দেখে সবসময় এটাই ভেবে নিয়েছিস তোর অতীত শুনে আমি তোর উপর এবারও রাগ দেখাব,তোকে অনেক বাজেবাজে কথা শুনাব।

তমা আমার কাছে মনের পবিত্রতাটা আসল।আল্লাহ মানুষদের ভালোবাসার জন্য একটা মন দিয়েছেন যেটা বাকি প্রাণীদের দেয় নি।মনের পবিত্রতা থেকে আল্লাহর কাছে দুআ করে কিছু চাইলে উনি সাথেসাথে তা কবুল করেন।মনের পবিত্রতার এতটাই জোর, এতটাই খাঁটি আল্লাহর কাছে।এতেই বুঝা যায় মনের পবিত্রতার কাছে শরীরের পবিত্রতার কোন মূল্য নেই।আর তোমার মনটাও ঠিক ততটাই পবিত্র।যার কাছে অন্য কোন কিছুরই তুলনা নেই।তাই বাকি পুরুষদের মতন আমি তোমার খারাপ অতীতের কথা শুনে কখনো তোমার শরীরের পবিত্রতা খুঁজব না।এতটুকু ভরসা তোমার হবু স্বামীর উপর রাখতে পার।চোখের কোণা থেকে নেমে আসা পানিগুলো মুছে ফারিদ কথাগুলো মনে মনে বলল।

আর বিয়ের পর তোমাকে মানুষ করব যাতে এই আজেবাজে খেয়ালগুলো আর কখনো তোমার মাথায় না আসে।
.
.

বিয়ে হয় নাই উনি এখনিই আমাকে ব্রিবত অবস্থায় ফেলানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন আর বিয়ে হয়ে গেলে তো….আল্লাহ আমাকে বাঁচাও।

লজ্জা শরমের মাথা খেয়ে উনাকে এরপর মেসেজ লিখে পাঠালাম,,২ বছর পর যে আমরা বিয়ে করব সেটা যাতে উনি আমার মামণিকে বলে দেন।

বাছাধন ২ বছর যথেষ্ট সময়।এরমধ্যে কিছু একটা করে বিয়েটা বন্ধ করে দিতে পারব। আর সবচেয়ে বড় কথা কাউকে বিয়ে করার জন্য আমি ডির্জাভ করি না।কারোর দয়া নিয়ে বেঁচে থাকাটা আমার জন্য কষ্টকর।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here