স্বার্থ 

1
449
স্বার্থ
সে প্রায় বলতো – তুমি আমার অভ্যাস হয়ে গেছো জানো?
কথাটা বলে আমি কান্না থামাতে পারলাম না। একজন সাইক্রিয়াট্রিস্টেরর চেম্বারে বসেই কাঁদতে শুরু করলাম।
সাইক্রিয়াটিস্ট একজন ২৫-২৬ বছর বয়সী মেয়ে। আমার এভাবে হুট করে কেঁদে ফেলাতে সে বেশ অসস্তিতে পরে গেলো। আমি দ্রুত কান্না থামিয়ে বললাম
– ম্যাম, আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।
ম্যাম মুচকি হাসার চেষ্টা করে বললেন
– না না সমস্যা নেই। আপনি শুরু থেকে বললে আমার সুবিধা হতো।
– আপনার অনেক সময় নষ্ট করে ফেললাম।
– আপনি আমার কাছে সমস্যার সমাধানের জন্য এসেছেন। সময় যতই লাগুক লাগতে দিন। আপনি শুধু সম্পূর্ণ গল্পটা বলবেন। বুঝতেই পারছেন গল্পটা জানা খুব দরকার তাছাড়া আপনার কোনো হেল্প আমি করতে পারবোনা।
– আমার নাম অদ্রি।একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছি। ওর সাথে আমার প্রথম পরিচয় ফেসবুকে। আমার ফ্রেন্ডলিস্টে অনেক ছেলে আছে। তার মধ্যে কম বেশি সবার সাথে টুকটাক কথা হয়। তার সাথেও সেরকমই কথা হয় প্রথমে।যেহেতু আমি তাকে বাস্তব জীবনে চিনি না তাই কথা বলার কোনো আগ্রহ ছিলোনা।সে নিজেই ম্যাসেজ দিতো। আমার যেহেতু ওইসময় অনার্স ফার্স্ট ইয়ারের এক্সাম চলে তাই পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতাম।
আমার এক্সাম কেমন হচ্ছে? এটা করছি নাকি? ওটা করছি নাকি? এরকম অনেক প্রশ্ন সে আমায় করতো। আমি প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর দিতাম আর ভাবতাম এভাবে সবকিছু কেনো জানতে চায়?
আমাকে কখনোই কেউ এইভাবে বুঝতে চায়নি, জানতে চায়নি আমার ভেতরটায় কী চলে!
 সে আমার জমে থাকা কথা গুলো জানার জন্য মরিয়া হয়ে পড়তো।
একদিন জানতে পারলাম তার ১ মাস হলো ব্রেকাপ হয়েছে।
ম্যাম, আমি ভাবলাম – আমার তো সময় আছেই। ম্যাসেঞ্জারে তো পরেই থাকি। তাহলে তার সাথে একটু কথা বললে যদি তার খারাপ লাগাটা কমে তাহলে বলি না। এমন না যে আমার খুব ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে।
একজন মানুষকে যদি আমি একটু সাহায্য করি তাতে আমার কিছুই যায় আসবেনা।
আমার ব্যক্তিগত জীবনে এতোটা কেয়ার কোনো ছেলের কাছ থেকে পাইনি।
আমি ঠিক গুছিয়ে বলতে পারছিনা।
– সমস্যা নেই বলুন। আমার কোনো কিছু জানার প্রয়োজন হলে আপনাকে প্রশ্ন করবো।
– আমি আগ বাড়িয়ে ঘনিষ্টতা বাড়ায়নি।সেই আমার সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। আমার ইচ্ছা ছিলোনা কিন্তু নাও বলতে পারছিলাম না। দেখা করার পর বুঝতে পারলাম সে ঠিক আমার সাথে কথা বলতে পারছেনা। আমি কথা বলেও যাচ্ছি কিন্তু তার মুখে হুম, হ্যাঁ ছাড়া কোনো শব্দ বের হচ্ছেনা। সেদিন বাসায় এসে অনেক ভাবলাম কিন্তু এর কারণ আমি খুজে পাচ্ছিলাম না।
আমি তাকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম – আচ্ছা ম্যাসেঞ্জারে তো ম্যাসেজ একটার পর একটা দিতেই থাকিস, সামনাসামনি তো হুম হ্যাঁ ছাড়া কোনো শব্দই বের হলোনা।
ও বলল – আমি বাস্তবে কথা একটু কম বলি।
তারপর স্বাভাবিকভাবেই চলছিলো।
 একটা সময় আমি এতোটা আসক্ত হয়ে পড়লাম যে রাত জেগেও ম্যাসেঞ্জারে পড়ে থাকতাম।
সে প্রায়ই বলতো
– জানো অদ্রি, তুমি আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছো। এতো সময় আমি প্রথম তোমার সাথে ব্যয় করেছি।তোমাকে আমার ভালোলাগা, খারাপ লাগা সব বলি। না বললে না শান্তি পাইনা।
কথাগুলো আমাকে ভাবাতে শুরু করলো। অবসর সময়ে এই কথাগুলোই আমার বারবার মনে পড়তো।
একদিন কথায় কথায় আমি বলে ফেললাম
– আমাদের মধ্যে কিন্তু অটল বিশ্বাস আছে। আর একে অপরের অভ্যাস আমরা। আমাদের মধ্যে এখন আর সেই ফ্রেন্ডশিপ টা নেই। এটা এখন অন্য কোনো সম্পর্কে পা বাড়িয়েছে।
সে বলল
– দেখো বিশ্বাস আছে কিন্তু তোমাকে আমি কখনো কল্পনায় আনতে পারিনা। অভ্যাস তুমি কিন্তু তোমাকে ফিল করতে পারিনা। এভাবে কোনো সম্পর্কে জড়ায় না। যদি ফিল না করতে পারি তাহলে সেটা কোনোভাবেই সম্পর্ক হয়না।
তার কথাগুলো বাস্তবতা ছিলো। আমি মেনে নিলাম। আর কোনো প্রকার যোগাযোগ না রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম। সে তার জায়গায় ঠিক।
আমি চাচ্ছিলাম কিন্তু
আর কথা বলতে পারছিনা। মনে হচ্ছে গলার কাছে কিছু একটা আটকে গেছে।
ম্যাম বলল
– সে আপনাকে আসতে দেয়নি। তাইতো?
– হুম।
– ঠিক ফ্রেন্ডশিপের কতদিনের মাথায় এই ঘটনাটা ঘটেছে?
– ১ বছরের মাথায়।
– আপনার উচিৎ ছিলো তখনই ছেড়ে দেয়া। তারপর কী ঘটলো?
– আমি ইচ্ছাকৃত ভাবে ফেসবুক থেকে দূরে থাকতাম। যাতে আমি দূরে সরে যেতে পারি কিন্তু তার সাথে আর একটু কথা বলার লোভ আমি ছাড়তে পারিনি। শুধু মনে হতো আর একটু কথাই তো। যতো বেশি কথা হবে তার আমার প্রতি তত বেশি মায়া বাড়বে। তখন হয়তোবা আমাকে ছাড়তে পারবেনা।ফেসবুক থেকে দূরে থাকলেও সে আমাকে ফোনে ম্যাসেজ বা কল দিতো। আমিও চাচ্ছিলাম না পুরোপুরি ভাবে তাকে ছাড়তে।
মাঝেমধ্যে আমার আবদার যখন খুব বেড়ে যেতো তখন সে আমাকে বলতো
– তুমি ভারচুয়াল জগতের ফ্রেন্ড। তোমার অস্তিত্ব ফেসবুকেই সীমাবদ্ধ। এটা মনে রাখবা।
আমি চুপচাপ শুনতাম।
তাকে প্রায়ই কথাগুলো আমি মনে করিয়ে দিতাম। প্রতি উত্তরে বলতো
– কোন সময় রেগে কী না কী বলেছি তাই ধরে বসে আছো। তোমাকে ছাড়া আমার সময় কাটেনা আর তুমি আছো এসব নিয়ে।
এভাবেই রাগ অভিমানে কাটছিলো। আমি ভাবতাম একদিন হয়তোবা আমার অস্তিত্ব স্বীকার করবে।
আজ থেকে প্রায় ছয় মাস আগে আমাকে হঠাৎ ফোন করে বলল একটু দেখা যাবে। খুব দরকার।
দেখা করতে গেলাম।
একটা ছোটো রেস্টুরেন্টে গিয়েছিলাম।প্রায় ২ বছর পর দেখা। আমার ভেতরটা ওকে দেখার জন্য অস্থির হয়ে যাচ্ছিলো।
সেই প্রথমে কথা বলল
– জানো আমার না মায়া দয়া কম। তোমার মায়া দেখে অবাক হই।
– অবাক হওয়ার কিছুই নাই।
– তুমি খুব ইমোশনাল টাইপের মানুষ। তাই তোমার সাথে আমার দেখা করতে ভালো লাগেনা।আমার আবেগ বলতে কিছুই নাই। আছে টাইম সিকনেস ব্যাপারটা। কারো সাথে বেশি সময় কাটালে তার প্রতি ভালোলাগা জন্মায় কিন্তু ভালোলাগাটা কাটাতেও পারি। এই তিনবছরে যতটুকু বুঝলাম তোমাকে আমার এখনি ছেড়ে দেয়া উচিৎ। তা না হলে তুমি বিপদে পড়বে। তোমার প্রতি আমার কোনো ফিলিংস আসেনা। যা আছে তাও ভারচুয়াল। এতদিন যা যা বলেছি,করেছি সেটাকে ফ্রেন্ড হিসেবে মেনে নাও। এতেই ভালো হবে।
আমার বলা শেষ। তোমার কিছু বলার আছে?
– না।
– কফি খাও। তোমার তো পছন্দের।
– না। আমি এখন আসি।
ওড়না দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললাম। আমার পক্ষে এর চেয়ে বেশি বলা হবেনা। আমার ফেসবুক আইডির ইমেইল আর পাসওয়ার্ড আপনাকে দিচ্ছি। একটু পরলেই বুঝতে পারবেন।
– আপনার সামনেই আপনার মোবাইলে পড়ি? আমাকে না দিলেও হবেন।
– আপনি আমাকে হেল্প করবেন তাই আপনাকে আমার বিশ্বাস করতে হবে।
– এখনো কি যোগাযোগ আছে?
– সে যোগাযোগ রাখবেনা বলেও আমাকে মোবাইলে ম্যাসেজ দেয়। আমি কখনো রিপ্লাই দেই কখনো দেইনা।
– হুম। আচ্ছা আপনি ইমেইল পাসওয়ার্ড দিয়ে যান। আর আগামীকাল সকালে আসুন। ১০ টায় আসলেই হবে।
বিছানার উপর পরে থাকা মোবাইলে এখন আর তার আসা ম্যাসেজের নোটিফিকেশন আসেনা। বিছানার পাশে ফ্লোরে বসে চাপাস্বরে কাঁদছি। খুব ইচ্ছে করে চিৎকার করে কাঁদতে। তাতে হয়তোবা কষ্টটা কম হতো। আমি চাইনি তার সাথে জড়াতে সেই বারবার আমাকে জড়িয়েছে। আমি চেয়েছি তাকে দূরে রাখতে সে দেয়নি। কিন্তু এখন সে ঠিকই দূরে সরে গেলো। ভাবলো না তার অভ্যাসের সাথে জড়িয়ে থাকা মানুষটা কেমন আছে? এখন আর জিজ্ঞেস করতে আসেনা – সারাদিন কই ছিলে? খুব ব্যস্ত ছিলা?
সকাল ১০ টার একটু পরে চেম্বারে ঢুকলাম। আমাকে দেখে ম্যাম মুচকি হেসে বলল
– আপনার অপেক্ষায় ছিলাম। বসুন।
তার টেবিলের সামনের চেয়ারটাতে বসলাম।
ম্যাম বললেন
– আপনি গতকাল পুরোপুরি গল্পটা বলতে পারেননি। ম্যাসেঞ্জারের ম্যাসেজ গুলো পড়াতে আমার বেশ সুবিধা হয়েছে। আপনাদের কনভারসেশনে কয়েকটা বিষয় বুঝতে পারলাম।
১. আপনাদের মাঝে বেনামী সম্পর্কের জন্ম হয়েছিলো। আর সেই সম্পর্ক টা আপনার প্রিয় মানুষ টি তৈরি করেছিলো।যার কেন্দ্রে আপনাকে রেখেছিলো।
২. তার বলা কথাগুলো যেকোনো মেয়ের মধ্যেই ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি করবেই। ব্যাপারটা ঠিক এরকম যে তার প্রয়োজনে আপনাকে পুরোপুরি ব্যবহার করেছে। আপনার মন খারাপের সময় আপনাকে সম্পর্কের প্রথম দিকে খুব সময় দিতো কিন্তু পরে তাকে আপনি খারাপ সময় পাননি। এটা সে ইচ্ছা করে করতো।
৩. আপনার কথায় সে বুঝতে পেরেছিলো আপনি তার প্রতি খুব দূর্বল। আপনি সবসময় আগ বাড়িয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতেন যে, আপনাদের মাঝে বেনামী সম্পর্ক আছে।
৪. সে আপনাকে ছেড়ে দেয়ার কারণ হিসেবে সামনাসামনি যেটা বলেছে সেটা পুরোপুরি সত্য না। সত্যটা হচ্ছে সে আপনাকে গ্রহণ করতে পারবেনা। আর কারণ গুলো সে আপনাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলেছে। আপনি নিজ থেকেই বলবেন না আমি বলবো?
– আপনি বলুন।
– আপনারা সেম এজ এবং আপনি অতোটা সুন্দর না। মানে মোটামুটি। সে অনেক সুন্দরী আর অল্পবয়সী মেয়ে বিয়ে করতে চায়। এর কারণ সেক্সুয়াল জীবন দীর্ঘ হবে। ঠিক কিনা?
– হ্যাঁ।
– আরেকটা কারণ হচ্ছে, সে আপনাকে কখনোই ভালোবাসতে পারেনি। আপনার অস্তিত্বই সে স্বীকার করতে চায়না। তার জীবনে আপনার কোনো মূল্যই নেই। লাস্টের দিকের কনভারসেশন গুলোতে তাই বুঝলাম। প্রথম দিকে আর মাঝের দিকে আপনার সাথে ওভাবে কথা বলেছে যাতে তার এক্সকে ভুলে থাকতে পারে।
এক ঢিলে দুই পাখি সে মেরেছে।
আপনি কী চান এমন মানুষের সাথে লেগে থাকতে যে আপনাকে প্রয়োজনে শুধুই ব্যবহার করেছে?
– নাহ, আমি মুক্তি চাই।
– তাহলে তার সাথে যব যোগাযোগ এর পথ বন্ধ করে দিন।আপনার মা আর পরিবারের সাথে কোথাও ঘুরে আসুন। ১-২ সপ্তাহের ছুটিতে। তারপর আমার সাথে আবার দেখা করতে আসবেন। আর একটা কথা সে আপনার কাছে আবার ফিরে আসতে চাইবে।
 – না ম্যাম আসবেনা।
ম্যাম মুচকি হেসে বললেন
– সে ফিরে আসবে। এরকম প্রেমের সম্পর্কে না জড়িয়ে প্রেমিকা পেতে কেইবা চাইবেনা বলুন? আসবে সে। তখন ভাববেন,  একবার স্বার্থের জন্য আপনাকে যে ছেড়ে দিয়েছে সে যে দ্বিতীয় বার আপনাকে ছেড়ে দিবেনা তার গ্যারান্টি নেই।
মনে থাকবে তো?
– হুম।
– আর এই ১- ২ সপ্তাহ তার কাছ থেকে দূরে থাকবেন। সব যোগাযোগ বন্ধ। যদি পারেন তাহলে আবার আসবেন। আর তা না হলে এই নীলুফার ত্রিদেবী আপনাকে কোনো প্রকার হেল্প করতে পারবেনা।ভুল  একবার করেছেন আর এখনি শুধরে নিতে হবে। তা না হলে একসময় আপনি আত্মহত্যা করতে বাধ্য হবেন। আপনার আগের ছবি আর এখনকার ছবির সাথে একটু মেলাবেন। কতো রাত ঘুমান না তার হিসেব নেই। চোখের নিচে কালো দাগ তো পড়েছেই আর নিজের যত্ন তো ভুলেই গেছেন। নিজেকে ভালোবাসুন।
চেম্বার থেকে বের হয়ে এসে জোরে নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে বললাম
– সে তার স্বার্থের জন্য আমাকে ব্যবহার করেছে কখনো ভালোবাসেনি।
তার নামটা আমি আর কখনো উচ্চারণও করবোনা।
ফোনের রিংটোন বেজে উঠলো। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি ওর কল এসেছে। কল কেটে দিয়ে ওর নাম্বার ব্লক লিস্টে দিয়ে দিলাম।
© Maria Kabir

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here