সমাধি” পর্ব : ২ শেষ

0
367

সমাধি” পর্ব : ২ শেষ

নিল আকাশ

দুপুর বেলা রুমে বসে বসে ক্যাটবেরি খাচ্ছি আর ভাবছি আজকে কি নিয়ে ঝগড়া করবো। হুম আজকে আমাদের বাসার বিড়ালটা নিয়ে ওর সাথে একটা ইয়া বড় ঝগড়া করবো, দরকার হলে মারামারিও করবো, তবুও আজ আমি জিতবো, জিতেই ছাড়বো।
.
চারটা মাস কেটে গেল, এই চার মাসের এমন কোনো দিন নাই যে বাঁদরটা আমার সাথে ঝগড়া করেনি, প্রতিটি দিন আমার সাথে ঝগড়া করেছে, আমি এ ছাদ থেকে আর ওই ও ছাদ থেকে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো আমি এখনো একদিনও বিজয়ী হতে পারলাম না ওর সাথে ঝগড়া করে, প্রতিবার আমিই হেরেছি আর রাগে গজগজ করতে করতে রুমে চলে আসছি।
.
ঝগড়াটা এখন আমাদের নিত্য দিনের সঙ্গী হয়ে গেছে, ভালই লাগে ঝগড়া করতে। এখন আমরা বন্ধু হয়ে গেছি, আপনি থেকে তুমিতে আসছি, এখন যদিও ঝগড়া লাগে না তেমন কোনো বিষয় নিয়ে কিন্তু আমরা ইচ্ছে করেই কোনো এক বিষয় নিয়ে ঝগড়া করি, কারণ ঝগড়া করতে এখন ভালো লাগে তাই ভুলবশতঃ ঝগড়া না বাজলেও দুজনে জেনে শুনে ইচ্ছে করে ঝগড়া লাগাই তারপর দুজনে ইচ্ছেমত ঝগড়া করি হিহিহি।আর ঝগড়া শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পরই শুরু হয় ছুড়াছুড়ি। কিনে আনা ফল গুলো দিয়ে ছুড়াছুড়ি করি, এতে আমাদের ফল ওদের বাসায় যায় আর ওদের ফল আমাদের বাসায় আসে।
.
আঙ্কেল এসে আমাদের ঝগড়া দেখতে পারে না, কারণ আঙ্কেল আসে রাতে, তাই নিলয়ের আব্বু ছাড়া ফ্রি ভাবে ঝগড়া করতে পারি দুজন দুই ছাদে থেকে। ওদের বাসায় এখন বেশি যাই না, প্রয়োজন ছাড়া। যখন প্রয়োজন পরে তখন শুধু ওদের বাসায় যাই তাছাড়া আর ভেতরে পা রাখি না। কথা বলা, ঝগড়া করা এগুলো শুধু দুজনের দুই ছাদে থেকে হয়, ভেতরে যাওয়ার দরকারই পরে না।
.
কয়েক দিন পর,
আজ রবিবার, কলেজ থেকে ফিরে ফ্রেস হয়ে খেতে বসলাম, খাওয়া শেষ হলে একটু বিশ্রাম নিলাম তারপর চললাম ছাদে বাঁদরটার সাথে ঝগড়া করার জন্য। ছাদে গিয়ে অনেক সময় বসে রইলাম কিন্তু বাঁদরটা আসলো না। আর অপেক্ষা না করতে পেরে ওকে ফোন দিলাম, ডাক দেওয়া যাবে না তাহলে প্রবলেম হবে, সবাই অন্য কিছু ভাবতে পারে তাই ফোন দিলাম কিন্তু ফোন দিয়ে আজব হয়ে গেলাম, বন্ধ বলছে ফোন। এমন তো কখনো হয়নি, কিন্তু আজ হলো কেন?
.
বিষয়টা ভালভাবে দেখার জন্য ওর বাসায় গেলাম কিন্তু মেইন দরজায় ইয়া বড় এক তালা ঝুলছে, ব্যপার কি? গেল কই সব? হয়তো কোথাও গেছে, তাছাড়া তো এমন হওয়ার কথা নয়। রাত দশটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম ওদের বাসার সামনে কিন্তু আসলো না। কই যে গেছে বাঁদরটা? খুব টেনশন হচ্ছে ওর জন্য। আর দাড়িয়ে না থাকতে পেরে আমার রুমে চলে গেলাম। রুমে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকার পর কার যেন বাইরে উপস্থিতি টের পেলাম। হয়তো বাঁদরটা আসছে, উফ্ এতক্ষণে দেহে প্রাণ পেলাম। এখন নিশ্চিন্তে ঘুমানো যাবে। আর কিছু না ভেবে গভীর ঘুমিয়ে তলিয়ে গেলাম।
.
রাত তিনটা,
কি যেন এক খারাপ সপ্ন দেখে হটাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল, কিন্তু বিষয়টা তেমন ভাবে না নিয়ে আবারও ঘুমিয়ে পরলাম।
নিয়ম মতো সকালে উঠে ফ্রেস হয়ে খেয়ে নিয়ে কলেজে চলে গেলাম। কিন্তু রাস্তায় যাওয়ার সময় আন্টিকে দেখলাম কই যেন যাচ্ছে! কাছে ছিলো না বলে জিজ্ঞেস করার উপায় পাইনি।
দুপুরে কলেজ থেকে ফিরে,
আবার সেই কালকের অবস্থা হয়েছে, আজও কেউ বাসায় নেই। বাঁদরটাও ঝগড়া করতে আসলো না আজ, বাসায় তালা ঝুলছে।
.
রাত সাড়ে দশটা, রুমে বসে বসে বাঁদরটার কথা ভাবছি, কই গেছে কেমন আছে কিচ্ছু জানি না, আজ দুদিন ধরে দেখিও না, বাইরে একটা শব্দ হলো, জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি আন্টি ফিরছে কিন্তু নিলয় সাথে নেই, হয়তো আন্টির আগে আগে ফিরছে, উফ্ শান্তি পেলাম, তবুও মন কেমন যেন খচখচ করতেছে।
.
আরো কয়েকটা দিন পর,
সকাল বেলা, এখনো বিছানা ছাড়িনি। বিছানায় বসে বসে ভাবছি আজ আর কলেজে যাব না, আজ বাঁদরটার সাথে দেখা করেই ছাড়বো। আর আন্টির কাছে জানতে চাইবো আন্টি প্রতিদিন কই যায়? আমি আর পারছি না নিলয়কে না দেখতে পেরে। আমার পক্ষে ওকে না দেখতে পেরে থাকা সম্ভব না। মরে যাব আমি ওকে ছাড়া। কয়েকটা দিন ধরে ওকে দেখছি না, পুরো পৃথিবী কেমন যেন অন্ধকার লাগছে। আমি নিজেও এখন বুঝতে পারছি না ওর প্রতি আমার কেমন ফিলিংস? কিন্তু এতটা বুঝতে পারছি ওকে আমি দেখবই নয়তো মরে যাব আমি। ভালবেসে ফেলছি বাঁদরটাকে এতদিনে। হয়তো আগে বুঝতে পারিনি কিন্তু এখন ওর না থাকাটা আমাকে সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছে আমি ওকে কতটা মিস করছি আর কতটা ভালবাসি।
.
আমার কথা কি ওর একটুও মনে পরছে না? আমাকে কি ও ভালবাসে না? ভালবাসলে আমাকে ছেড়ে থাকতো পারতো? হয়তো আমার প্রতি ওর কোনো ফিলিংসই নেই, তাই থাকতে পারছে, নয়তো পারতো না। ফ্রেস হয়ে খাবার টেবিলে এসে দেখি আম্মু কোরান শরীফ সামনে রেখে কার জন্য জানি দোয়া পরতেছে আর আব্বু তো কই যেন বেড়িয়ে গেল একটু আগে।
.
কিছু বুঝলাম না, আম্মু তো এমন অসময়ে কখনো দোয়া পরেনি কিন্তু আজ কেন? কথাটা জিজ্ঞেস করতে যাব আর তখনই জানালা দিয়ে দেখি আন্টি বের হলো ঘর থেকে, হয়তো কোথাও যাবে, আজ জানতেই হবে আমাকে নিলয় কই? দৌড় দিলাম আন্টির কাছে,
.
– আন্টি কই যাচ্ছেন? নিলয় কই?
– ইয়ে মানে ( কান্না করে দিছে)
– কি হলো আন্টি বলছেন না কেন নিলয় কই?
– আম্মু রে আজ ওর অপারেশন।
– মানে!
– ওর ব্রেইন টিউমার হইছে রে আম্মু অনেক আগে, ডাক্তার চার মাস সময় দিছিলো ওকে, এখন ওর সময় শেষ তাই অপারেশনটা করিয়ে শেষ চেষ্টা করতেছি। দোয়া করিস আম্মু ও যেন ঠিক হয়ে যায়। ব্রেইন টিউমার হলে সম্ভবত রোগীর জীবনের গ্যারান্টি থাকে না, যেকোনো সময় যা খুশি হয়ে যেতে পারে কিন্তু কোন ভাগ্য করে ডাক্তার ওকে চারমাস সময় দিছিল কে জানে!
.
আমার আর তারপর কিছুই মনে নেই, জ্ঞান ফিরলো কয়েক ঘণ্টা পর, জ্ঞান ফিরে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখি দুপুর তিনটা বাজে, আমার পাশে শুধু আম্মু বসে আছে চুপ করে আর কেউ নেই, আব্বু, আঙ্কেল, আন্টি হয়তো হাসপাতালে আছে, নিলয়ের কথাটা ভাবতেই মনে হলো চোখ দিয়ে আমার অশ্রু না রক্ত বের হচ্ছে। চিৎকার করে কাদতেঁ লাগলাম বাঁদরটার জন্য।
.
– ও আম্মু, শুনো না, তুমি জানতে ওর এমন হইছে? তোমরা সবাই জানতে ও সুস্থ না? বলছো না কেন? ( চিৎকার দিয়ে)
– আমিও তো জানি না, গতকাল রাতে তোর আন্টি বললো।
– আমাকে কেন বললে না তুমি হ্যাঁ?
– তোকে কয়েক দিন ধরে অস্থির লাগছিল দেখেই বুঝতে পারছি তুই ওকে ভালোবাসিস, তাই আর তোকে বলিনি।
– আম্মু ও আম্মু, বাঁদরটা ঠিক হবে তো?
– হ্যাঁ হবে, চিন্তা করিস না।

.
কি আর করবো? কিচ্ছু করার নাই, এতো বড় একটা কথা এতদিন এর কিছুই জানতে পারিনি, এখন আর কি করবো? আল্লাহর কাছে ওর জীবনটা ভিক্ষা চাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নাই আমার। আম্মুর মতো আমিও বসে বসে প্রার্থনা করতে লাগলাম যাতে ও সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরে।
.
সন্ধ্যা সাতটা,
ঘরে বসে বসে কাঁদছি আর ওর কথা ভাবছি, কি হতে চলেছে এরপর। হটাৎ এম্বুলেন্সের শব্দ শুনতে পেলাম বাইরে। বাঁদরটা কি আসছে? সুস্থ হলে তো মানুষ এম্বুলেন্সে আসে না তাহলে কিছু হয়নি তো ওর? দৌড়ে বাইরে চলে গেলাম।
রাত আটটা,
পরিস্থিতি এতো নিষ্ঠুর হবে কখনো কল্পনা করিনি। বাঁদরটা শুয়ে আছে আমার সামনে সাদা কাফনের কাপড় গায় দিয়ে মৃতের খাটিয়ায় আর আমি ওর সামনে বসে আছি এক ব্যর্থ ভালবাসা না পাওয়া অভাগা মেয়ের মতো। হয়তো অপারেশন সাকসেস হয়নি তাই আজ ওকে অকালেই হারাতে হচ্ছে। আমার পাশে কাঁদছে আঙ্কেল, আন্টি আরো অনেকে আছে। আস্তে করে বাঁদরটাকে ডাকলাম,
.
– নিলয়, এই নিলয়

– শুনতে পাচ্ছো তুমি?

– এই দেখো, আমি আছি না, কিচ্ছু হয়নি তোমার, তুমি একদম ঠিক আছো।

– এই চুপ করে আছো কেন হুম? আমার কিন্তু রাগ উঠতেছে, কথা বলবা না?

– এই দেখো রাগাবে না কিন্তু এখন, ঝগড়া করার মোড আছে কিন্তু রাগলে সব চুল ছিঁড়ে দিব।

– উফ্ এখনো চুপ করে আছে, এবার কিন্তু ঝগড়া করবো, অনেক মোড আছে। আর তুমিই কিন্তু বলছিলা তোমার সামনে আসলে ঝগড়া করার মোড নিয়ে আসতে, এখন কিন্তু তাই করেছি।

– এই উঠো তো তাড়াতাড়ি। ছাদে যাব চলো, দুজনে আজ অনেক ঝগড়া করবো।

– এই কুত্তা কথা বলছিস না কেন? ঝগড়া করবি না আমার সাথে? এই কথা বলছিস না কেন? এই দ্যাখ তোর সাথে ঝগড়া করার জন্য আসছি, ঝগড়া করবি না রে তুই?

– এই কমলা ছুড়ে মারবো উঠ, তাড়াতাড়ি উঠ বলছি, এবার কিন্তু বেশি রেগে যাচ্ছি, কান্না করবো এইবার। তাড়াতাড়ি উঠ বলছি,

– এভাবে একা রেখে চলে গেলি? একবারও ভাবলি না আমার কি হবে? আমি কি নিয়ে বাঁচবো? কার সাথে ঝগড়া করবো? কে আমাকে কচুপরী বলে ডাকবে? বলছিস না কেন এগুলো কে করবে?
.
রাত দশটা,
কয়েক জন এসে ওকে খাট শুদ্ধ কাধেঁ নিল, হয়তো দাফন করার সময় হয়ে গেছে, আমি তো ওর পাশেই আছি, কোথাও যেতে দিব না ওকে, আমাকে কেন জানি কয়েক জন ধরে রেখেছে, ছাড়ছে না। ওর কাছে যেতে দিবে না। যেখানেই নিয়ে যাও না কেন আমি ঠিকই চলে যাব ওর কাছে। তারপর দুজন মিলে ঝগড়া করবো। হয়তো এরপর ওর সমাধী দিবে, আমি সেখানেই যাব কিন্তু কই হবে ওর সমাধী?
।।

(সমাপ্ত)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here