শেষ_পর্যন্ত পার্ট: ৬

0
340

শেষ_পর্যন্ত

পার্ট: ৬

লেখিকা: সুলতানা তমা

কি এমন লিখা আছে যা আমাকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে বলছেন ছোটমা, তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা খুলে পড়তে বসলাম…..

ডায়েরিটায় অনেক ধুলো পরে আছে আমি তো ভাবতেই পারছি না নিলার ডায়েরি এভাবে স্টোররুমে ধুলোর মধ্যে পরে ছিল, ডায়েরির প্রথম পৃষ্ঠায় শুধু আমার আর নিলার নাম লিখা পাগলীটার পাগলামি দেখে খুব হাসি পাচ্ছে
দ্বিতীয় পৃষ্ঠা:
রিফাত তোমার মনে আছে আমি যখন তোমাদের বাসায় প্রথম গিয়েছিলাম তুমি আমাকে গেয়ো ভূত বলতে সে নিয়ে কতো ঝগড়া করতাম দুজন তারপর আস্তে আস্তে ভালো লাগা আর ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা, আজ আমি তোমাকে নিজের থেকে বেশি ভালোবাসি কিন্তু এই ভালোবাসা নিয়ে আমার বড্ড ভয় হচ্ছে, জানিনা কিসের এক অজানা ভয় কাজ করছে আমার মনে, শুধু মনে হচ্ছে আমরা এক হতে পারবো না, রিফাত সত্যিই কি আমরা এক হতে পারবো না (যতো পড়ছি ততো অবাক হচ্ছি এতোই যখন ভালোবাসত আমাকে তাহলে সেদিন এমন করেছিল কেন নিলা)

তৃতীয় পৃষ্ঠা:
রিফাত তোমার বউ হওয়ার অনেক ইচ্ছে আমার পারবো তো আমি তোমার বউ হতে (চোখ থেকে পানি পড়ছে বুঝতে পারছি না যদি নিলার আমার বউ হবার স্বপ্ন ছিল তাহলে সেদিন বউ সাজেই ও আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল কেন)

চতুর্থ পৃষ্ঠা:
আব্বু আর চাচ্চুকে আমাদের বিয়ে নিয়ে কথা বলতে শুনেছি কিন্তু আমার মনে হচ্ছে আমাদের বিয়েটা হবে না কারণ ততো দিন আমি মনে হয় বাঁচবো না, রিফাত যদি কখনো ডায়েরিটা তুমি পাও তাহলে আমার সব কথা গুলো রেখো, এখন আমি কান্নার জন্য লিখতে পারছি না পরে আবার সবকিছু লিখে রেখে যাবো (কিসের ভয় ছিল ওর মনে আর বাঁচবে না বলছিল কেন তাহলে কি ওর কোনো বড় ধরণের অসুখ ছিল কিন্তু নিলা তো….)
তাড়াতাড়ি পৃষ্ঠা উল্টাতে শুরু করলাম কিন্তু কিছুই তো আর লেখা নেই, একদম শেষের দিকে কিছু লেখা আছে….

শেষ পৃষ্ঠা:
রিফাত আমি যে ভয় পেয়ে ছিলাম তাই হতে চলেছে কিন্তু বিশ্বাস করো আমি তোমাকে একা রেখে যেতে চাই না আমি তোমার বউ হতে চাই তোমার সাথে আর কিছু দিন সুন্দর মুহূর্ত কাটাতে চাই।
সব স্বপ্ন সত্যি হয় না রিফাত তাই আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি এবার তোমার সবকিছু মেনে নেওয়ার সময় এসেছে, আমি এই ডায়েরি তোমার হাতে তুলে দিতে পারবো না যদি কখনো তুমি পাও তাহলে আমার শেষ কথাগুলো রেখো।
আমি যখন থাকবো না তুমি একদম ভেঙে পড়বে না তুমি ভালো একটা মেয়ে বিয়ে করে নিবে, আর হ্যাঁ আমাকে যেমন ভালোবাস সেই মেয়েকে ততোটাই ভালোবাসবে কখনো ওকে আমার থেকে ছোট ভাববে না।
সে যদি তোমাকে ভালো না বাসে তাহলে তুমি ভালোবেসে তার থেকে ভালোবাসা আদায় করে নিবে আর…..
আলিফা: রিফাত (হঠাৎ আলিফার ডাকে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে নিয়ে ডায়েরিটা বন্ধ করে নিলাম)
আলিফা: তুমি এখানে এসে বসে আছ আমি তোমাকে কতো খুঁজেছি
আমি: কেন
আলিফা: ওমা তুমি কাঁদছ কেন
আমি: কেন খুঁজেছ বল
আলিফা: আগে বল তুমি কাঁদতেছ কেন
আমি: জানতে হবে না তোমায়
আলিফা: হুম তোমার ফোনটা একটু দিবে আমি ফো….
আমি: কি করবে রাতুলকে ফোন দিবে তাই তো
আলিফা: সামান্য বিষয় নিয়ে এতো রেগে যাচ্ছ কেন
আমি: তো কি করবো তোমার হাতে মোবাইলটা ধরিয়ে দিবো আর তুমি রাতুলের সাথে মন খুলে কথা বলবে
আলিফা: রিফাত তুমি আমার সাথে এমন করছ কেন
আমি: বেশ করেছি
আলিফা: আমি রাতুলকে না আব্বুকে ফোন দেওয়ার জন্য মোবাইলটা চেয়েছিলাম (আলিফা কাঁদতে কাঁদতে নিচে চলে গেলো আমি বোকার মতো ভেবেছিলাম ও রাতুলকে ফোন দিবে তাই এতো রেগে গিয়েছিলাম কিন্তু….)
আব্বু: রিফাত (আব্বু, ছোটমা, চাচ্চু সবাই একসাথে এসেছে কেন আমার কাছে)
আমি: হুম আব্বু বল
আব্বু: আসার সময় দেখলাম বৌমা কাঁদতে কাঁদতে রুমের দিকে যাচ্ছে কি হয়েছে
আমি: কিছু না
ছোটমা: কিছু না বললেই হলো কিছু না হলে মেয়েটা এভাবে কাঁদবে কেন
আমি: তোমরা দেখছি এখন আমার থেকে আলিফাকে বেশি ভালোবাস
চাচ্চু: এখানে কম আর বেশি ভালোবাসার প্রশ্ন না আলিফা আমাদের বৌমা আর ওর মধ্যে কিন্তু নিলার কিছু স্বভাব দেখছি তাই আমরা চাই ও আমাদের নিলার মতো….
আমি: হ্যাঁ ওর মধ্যে নিলার কিছু স্বভাব আছে তাই বলে ও নি….
আব্বু: রিফাত তুই তো নিজেই ওকে পছন্দ করেছিস ওর মধ্যে নিলার স্বভাব আছে বলে আর তুই তো আমাকে বলেছিলি ওর মধ্যে নিলাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাস
আমি: ভুল করেছিলাম আব্বু ও আলিফা ও কখনো আমার নিলা হতে পারবে না
ছোটমা: প্রথম দেখায় যাকে ভালোবেসে বিয়ে করে এনেছিস তাকেই এখ….
আমি: ছোটমা আমি ওকে ভালোবেসে ভুল করেছি আর বিয়ে করাটা আরো বড় ভুল হয়ে গেছে
ছোটমা: মানে কি বলছিস এসব ভালোবাসা ভুল হবে কেন
আমি: ছোটমা আমি এবারেও ঠকে গেছি আলিফা অন্য কাউকে ভালোবাসে আমি ওর মনের কথা না জেনে হুট করে বিয়ে করে অনেক বড় ভুল করেছি (কাঁদতে কাঁদতে বলে দিলাম এছাড়া উপায় নেই সবাই আলিফার মধ্যে নিলাকে খুঁজে নিচ্ছে যখন রাতুল চলে আসবে তখন তো আলিফা চলে যাবে সবাই তখন খুব কষ্ট পাবে তারচেয়ে ভালো এখনি বলে দেওয়া)
আব্বু: কি বলছিস এসব (আব্বু দফ করে বসে পড়লেন)
আমি: আব্বু যা হবার তো হয়ে গেছে তুমি এভাবে ভেঙে পরো না
আব্বু: আমার ছেলেটা আবারো একি কষ্ট পেলো ও এখন কি নিয়ে বাঁচবে
চাচ্চু: রিফাত ঠকেনি ভালোবাসা ভুল না
ছোটমা: হ্যাঁ ভালোবাসা ভুল না তুই আলিফাকে ভালোবাসিস তোর ভালোবাসা সত্যি হয়ে থাকলে আলিফা একদিন তোকেই ভালোবাসবে
আমি: কিন্তু ও যে এখন রাতুলকে ভালোবাসে
ছোটমা: তাতে কি হয়েছে তুই ওকে রাতুলের চেয়ে বেশি ভালোবাসবি আর আলিফা তোর স্ত্রী ওকে অন্য কারো হতে দিবি নাকি
আমি: আলিফা যদি আমাকে ভালো না বাসে
ছোটমা: চেষ্টা তো করে দেখ আর এতে তো কোনো দোষ নেই কারণ ও তোর স্ত্রী তাছাড়া নিলাও কিন্তু ডায়েরিতে লিখে গেছে তুই যে….
আব্বু: ডায়েরিতে যা আছে তোর ছোটমা আমাকে বলেছে তাই আমরা চাই নিলার কথা তুই রাখ তাছাড়া তুই তো আলিফাকে ভালোবাসিস
আমি: হুম
চাচ্চু: আলিফাকে নিয়ে যদি তুই সুখী হস আমরা অনেক খুশি হবো আলিফাকেই আমরা নিলা ভেবে নিবো
আমি: আলিফাকে আমি ভালোবাসি আর সবসময় বাসবো তার আগে তোমরা আমাকে একটা প্রশ্নের উত্তর দাও
ছোটমা: কি
আমি: নিলা তো আমাকে ভালোবাসতো আমার বউ হবার স্বপ্ন দেখতো আর এইটা এই ডায়েরিতে আরো বেশি পরিষ্কার তাহলে ওর স্বপ্ন পূরণের দিন আমাদের বিয়ের দিন ও বউ সেজে বিষ খেয়েছিল কেন
চাচ্চু: জানিনা
আমি: এই ডায়েরিতে লিখা ওর কথাগুলো থেকে তো মনে হচ্ছে ওর কোনো বড় রোগ ছিল যা আমাদের কাউকে বলেনি, ও যদি অসুস্থই হবে তাহলে বিষ খেয়েছিল কেন
চাচ্চু: জানিনা এসব নিলা থাকলে হয়তো এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারতো কিন্তু আমার মেয়েটাই তো বেচে নেই
আমি: নিলার মৃত্যুতে তো কোনো না কোনো রহস্য আছে
ছোটমা: এসব নিয়ে কথা বললে কি নিলা ফিরে আসবে তারচেয়ে ভালো যে বর্তমানে তোর জীবনে আছে থাকে নিয়ে ভাব তাকে নিলার মতো করে ভালোবাস তাতে তুই সুখে থাকবি আমরা খুশি হবো নিলার আত্মাও….
আমি: ছোটমা মন খারাপ করো না আজ থেকে আলিফা আমাদের নিলা কিন্তু তোমরা রাতুলের কথা যে জানো এইটা ওকে বুঝতে দিও না আমি আলিফার ভালোবাসা পাওয়ার চেষ্টা করবো
ছোটমা: রুমে যা মেয়েটা হয়তো কাঁদছে
আমি: হুম

রুমে এসে দেখি আলিফা কোথাও নেই কোথায় গেলো মেয়েটা, হঠাৎ বারান্দা থেকে কান্নার শব্দ শুনতে পেলাম তারমানে রাগিণী বারান্দায় আছে, আস্তে আস্তে গিয়ে ওর পাশে দাঁড়ালাম কিন্তু আমাকে দেখেও না দেখার ভান করছে তাই আমিই কথা বলা শুরু করলাম
–আলিফা
–হুম
–সরি
–লাগবে না
–সরি তো
–হুম
–এমন রাগিনী মেয়েকে কাঁদলে একটুও মানায় না
–আমাকে একদম রাগিণী ডাকবা না
–ঠিক আছে কান্না থামাও
–(নিশ্চুপ)
–আসলে আমি ভেবেছিলাম রাতুলকে ফোন করবে তাই রাগ উঠে গিয়েছিল
–কেন আমি রাতুলকে ফোন করলে তোমার রাগ উঠবে কেন
–ভালোবাসি তো
–কাকে
–তোমাকে
–তো
–হিংসা হয় রাতুলের কথা শুনলে
–হিংসা করে লাভ নেই আমি রাতুলকেই ভালোবাসি আর ও দেশে ফিরলেই আমি ওর কাছে চলে যাবো
–একদম রাতুলের নাম নিবা না আর যেন তোমার মুখে রাতুলের নাম না শুনি (ধমক দিয়ে বললাম যেও কান্না থামিয়েছিল এখন আবার শুরু করেছে)
–আলিফা তুমি বুঝছ না কেন আমি তোমাকে ভালোবাসি রাতুলের কথা শুনলে আমার রাগ উঠে যায়
–(নিশ্চুপ হয়ে কাঁদছে)
–আলিফা প্লিজ কিছু বলো
–আমি আজকেই আব্বুর কাছে চলে যাবো
–মানে
কোনো কথা না বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, এভাবে ধমক দেওয়া ঠিক হয়নি আগেও কষ্ট দিয়েছি কান্না থামাতেই এখন আবার কষ্ট দিয়ে ফেললাম, আস্তে আস্তে ওর কাছে গিয়ে ওর দুগালে হাত দিলাম সাথে সাথে ও আমার চোখের দিকে তাকালো, একনজরে ও তাকিয়ে আছে আমার দিকে আমি আস্তে করে ওর কপালে আমার ভালোবাসার স্পর্শ একে দিলাম তারপর ওকে বুকে নিয়ে জরিয়ে ধরলাম…..

চলবে😍

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here