শেষ_পর্যন্ত পার্ট: ২

0
392

শেষ_পর্যন্ত

পার্ট: ২

লেখিকা: সুলতানা তমা

খুব কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে তাই চোখ দুটুকে আজ আর বাধা দিলাম না, একের পর এক সিগারেট খাচ্ছি আর চোখ দুটু সেই তারার দিকে তাকিয়ে অবাধ্যের মতো কেঁদে যাচ্ছে…..

–ভাইয়া
–হুম (সকালে প্রিতির ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো চারদিকে তাকিয়ে দেখি অনেক বেলা হয়ে গিয়েছে, রাতে কাঁদতে কাঁদতে কখন যে বারান্দাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি)
–অনেক বেলা হয়েছে তুমি নিচে যাচ্ছ না দেখে রুমে আসলাম এসে দেখি তুমি রুমে নেই, আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না তুমি রাতে বারান্দাতেই যে ঘুমিয়েছ
–(মৃদু হাসলাম)
–ভাইয়া আর কতো তিনটা বছর এভাবে পার করে দিয়েছ প্লিজ এবার অন্তত নিজের কথাটা একবার ভাবো
–নিলা ছাড়া আমি আমার জীবন ভাবতে পারিনা
–এতো যে নিলা নিলা করো কই তুমি তো নিলা আপুর শেষ কথাটা রাখনি
–মানে
–ভুলে গেছ আপু তোমাকে শেষ কথাটি কি বলেছিল
–(নিশ্চুপ)
–বলেছিল তুমি যেন ভালো একটা মেয়ে বিয়ে করে সুখী হও তাতে আপুর আত্মা শান্তি পাবে কই তুমি তো আপুর শেষ কথাটা রাখনি এই তোমার ভালোবাসা
–(নিশ্চুপ)
–আর তুমি তো বলেছ সেই মেয়েটির মধ্যে নিলা আপুকে খুঁজে পেয়েছ তাহলে ওকে নিয়ে কি বাকি জীবনটা কাটাতে পারো না
–(নিশ্চুপ হয়ে ভাবছি সত্যি তো আমি নিলার শেষ কথাটা রাখিনি রাখার চেষ্টাও করিনি কখনো, এখন যেহেতু মেয়েটির মধ্যে আমি নিলার অনেক কিছু খুঁজে পেয়েছি তাহলে ওকে নিয়ে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারবো না কেন ওকে ভালোবাসতে পারবো না কেন)
–ভাইয়া প্লিজ নিলা আপুর শেষ কথাটা রাখার জন্য হলেও তুমি বিয়ে করো আমরা তোমাকে এভাবে আর দেখতে পারছি না আমাদের যে কষ্ট হয় তুমি বুঝনা
–মেয়েটি যদি আমাকে ভালো না বাসে
–তুমি ভালোবাসা আদায় করে নিবে, কি পারবে না অন্তত আমাদের জন্য প্লিজ
–মেয়েটি….
–ভাইয়া মেয়েটিকে আমরা খুঁজে বের করবো যেভাবে পারি বিয়েতে রাজি করাবো তুমি শুধু কথা দাও আগের মতো হাসি খুশি থাকবে
–হুম কথা দিলাম
–আমার লক্ষী ভাই এবার নাশতা খেতে চলো
–তুই যা আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি
–ওকে

রুমে এসে ঢুকতেই নিলার ছবিটার দিকে চোখ পড়লো পাগলীটা সেই আগের মতোই আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে, আস্তে আস্তে গিয়ে ওর ছবির কাছে দাঁড়ালাম ওর ছবি দেখছি আর আনমনে হয়ে ভাবছি “আমি তোমার শেষ কথা রাখবো তবে তোমার জায়গা অন্য কাউকে দিয়ে নয় তোমার পাশে তাকে একটুখানি জায়গা দিয়ে”
–ভাইয়া তাড়াতাড়ি আস (রিয়ানের ডাকে তাড়াতাড়ি চোখের পানি মুছে ফ্রেশ হতে চলে গেলাম)

নাশতা খেতে বসেছি তখনি প্রিতি বলে উঠলো
প্রিতি: আব্বু ভাইয়া বিয়ে করতে রাজি হয়েছে
আব্বু: সেই মেয়েটিকেই তো
আমি: আব্বু আমি মেয়েটির মধ্যে নিলাকে খুঁজে পেয়েছি তাই ওকে বিয়ে করে ওর মাঝেই নিলাকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই
রিয়ান: হুম সাথে নিলা আপুর শেষ কথাটা রাখা হবে তোমার
আমি: তোর মনে আছে
আব্বু: আমাদের সবার মনে আছে তুই না বুঝে তিনটা বছর নষ্ট করেছিস সাথে নিলার আত্মাকে কষ্ট দিয়েছিস
আমি: হুম
আব্বু: তুই বললে আমরা আজই সেই এতিমখানায় যাবো
আমি: ঠিক আছে
রিয়ান: আব্বু আমরা সবাই যাবো মেয়েটি রাজি হলে একেবারে বিয়ের দিন ঠিক করে আসবো
আব্বু: ঠিক আছে নাশতা করে সবাই রেডি হয়ে নে
রিয়ান: ওকে

সবাই রেডি হয়ে বেড়িয়ে পড়লাম, গাড়িতে বসে আছি রিয়ান আর প্রিতি বকবক করছে কিন্তু আমার সেদিকে মন নেই, কেমন যেন এক অজানা ভয় করছে আমার মনে হচ্ছে মেয়েটি রাজি হবে না, আমি দ্বিতীয় বার কাউকে ভালোবাসতে চাইছি এখন যদি ঠকে যাই তাহলে….
রিয়ান: ভাইয়া কি হয়েছে তোমার
আমি: কিছু না তো
রিয়ান: তোমাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে, ভয় পেয়ো না ভাইয়া যেভাবে পারি আমরা মেয়েটিকে রাজি করাবো
আমি: হুম

এতিমখানায় এসে গাড়ি থামতেই আমার বুকের ধুকধুকানি বেড়ে গেলো, চারদিকে চোখ বুলাচ্ছি মেয়েটিকে দেখার জন্য কিন্তু কোথাও দেখতে পাচ্ছি না
আব্বু: চল ম্যানেজারের সাথে আগে কথা বলি
রিয়ান: ঠিক আছে
আমি কিছু না বলে আব্বুকে অনুসরণ করে হাটতে লাগলাম

ম্যানেজার: আপনারা কোন মেয়েটির কথা বলছেন আমি ঠিক বুঝতে পারছি না
রিয়ান: আরে খুব সুন্দর একটি মেয়ে আ….
আব্বু: রিয়ান তুই তো মেয়েটিকে দেখিসনি রিফাতকে বলতে দে, রিফাত বলতো মেয়েটি দেখতে কেমন
আমি: শ্যামলা বর্ণের একটি মেয়ে রাগি চোখ আর….
ম্যানেজার: রাগি চোখ…? আচ্ছা মেয়েটির সাথে আপনার কোথায় দেখা হয়েছিল
আমি: এই এতিমখানাতেই গতকাল দেখা হয়েছিল, মেয়েটি একটা ভিজা বিড়ালকে…..
ম্যানেজার: আর বলতে হবে না বুঝেছি আপনারা আলিফার কথা বলছেন
আমি: নাম তো জানিন….
ম্যানেজার: রাগি চোখের মেয়ে আর বিড়ালকে আদর করে এমন মেয়ে একটাই আছে এখানে, আসলে আলিফা উপরে খুব রাগি হলেও ভিতরের মনটা খুব ভালো এখানের পশু পাখিরা সব ওর বন্ধু বলতে পারেন
আব্বু: আলিফাকে কি একবার দেখতে পারি
ম্যানেজার: হ্যাঁ কিন্তু ও তো এখন এতিমখানায় নেই
রিয়ান: কোথায়
ম্যানেজার: একটু দূরেই ওর বাবার বাসা সেখানেই আছে ও
আব্বু: ঠিক আছে আপনি আমাদের ওর বাবার কাছে নিয়ে চলুন আমরা উনার সাথেই কথা বলবো
ম্যানেজার: ঠিক আছে

আলিফার বাসায় বসে আছি খুব ছোট্র একটি বাসা চারদিকে চোখ বুলাচ্ছি কিন্তু ওকে দেখতে পাচ্ছি না, হঠাৎ একজন বৃদ্ধলোক এসে আমাদের সামনে বসলেন উনিই হয়তো আলিফার বাবা
–আপনারা
আব্বু: আমি শরীফ চৌধুরী আসলে আমরা এসেছি আপনার মেয়ের…..
–আলিফার সাথে কি প্রয়োজন
–প্রয়োজন আপনার সাথেই আমি আলিফাকে আমার বড় ছেলের বউ করে আমার ঘরে নিতে চাই
–হঠাৎ করে…
–আলিফা রিফাতকে চিনবে আপনি ওকে ডেকে দিন
–ঠিক আছে
উনি আলিফাকে ডাকতে ভিতরে চলে গেলেন আমি ড্রয়িংরুমে বসে চারপাশে চোখ বুলাচ্ছি
আলিফা: ওই আপনি আমার বাসায় কি করছেন (আলিফা এসেই ধমক দিয়ে বলল আমি কি বলব বুঝতে পারছি না)
আমি: আসলে আআআমি….
আলিফা: তোতলাচ্ছেন কেন এখানে কি হুম
আমি: আরে এতো রেগে যাচ্ছেন কেন আমার কথা শুনোন
রিয়ান: ভাইয়া তুমি থাম আমি বলছি (রিয়ানের কথায় আলিফা চুপ হয়ে চারদিকে তাকালো সবাইকে দেখে নিশ্চুপ হয়ে একপাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো আগে হয়তো আমাকে দেখে আর কাউকে লক্ষ করেনি সোজা আমার সাথে ঝগড়া করতে চলে এসেছিল ঝগড়াটে মেয়ে একটা)
প্রিতি: এইযে আলিফা মেম আপনি আমার পাশে এসে শান্ত হয়ে বসুন (প্রিতির কথায় আলিফা আরো চুপ হয়ে গেলো দেখতে ভালোই লাগছে এতো রাগি মেয়ে একদম চুপসে গেছে)
রিয়ান: ভাবি আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বল….
আলিফা: ভাবি মানে
আব্বু: মা আমি তোমাকে আমার বৌমা করে নিয়ে যেতে এসেছি
আলিফা: আব্বু ওরা এসব কি বলছে
আব্বু: মা আমার ছেলে তোমাকে পছন্দ করেছে আর তোমাকে দেখে আমাদেরও পছন্দ হয়েছে তাই আমি চাইছি তোমাকে আমার ঘরের বৌমা করে নিতে আশা করি তোমার বাবার এতে কোনো আপত্তি নেই
আলিফা: কিন্তু আমার আছে
আলিফার আব্বু: কিসের আপত্তি আমি সবসময় এমন একটা ছেলেই চেয়েছি
আলিফা: আব্বু আমার কথা শু…
আলিফার আব্বু: অনেক শুনেছি তোর কথা আর না এখন আমি তোর বিয়ে দিবই
আলিফা: আব্বু
আলিফার আব্বু: আমি উনাদের সাথে কথা বলছি সবদিক ঠিক হলে এখানেই বিয়ে হবে আর হ্যাঁ ছেলে আমার পছন্দ হয়েছে
আলিফা: আমার তো পছন্দ হতে হবে
আলিফার আব্বু: আমার পছন্দ হয়েছে এটাই শেষ কথা তোর কোনো কথা বলার থাকলে ওকে তোর রুমে নিয়ে যা
রিয়ান: ভাইয়া যাও যাও
আমি: যাবো
আব্বু: হ্যাঁ রিফাত যা আমি বিয়ের তারিখ ঠিক করে নিচ্ছি
যাবো কিনা ভাবছি যে রাগি মেয়ে শুধু রাগি বললে ভুল হবে একদম ধানিলংকা আমাকে না আবার খুন করে ফেলে
আলিফা: কি হলো চলুন
আমি: হুম আসছি (যেভাবে ডাকছে মনে হচ্ছে আজ আমার কপালে দুঃখ আছে)

আলিফার সামনে দাঁড়িয়ে আছি ভয়ে বুক ধুকধুক করছে না জানি এই মেয়ে কি করবে এখন
–আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবো না
–কেন আমি কানা বলে
–আমি একদম মজা করছি না
–আমিও তো মজা করছি না আপনিই তো গতকাল আমাকে কানা বললেন
–আর একটা কথা বললে আপনাকে আমি গলা টিপে মেরে ফেলবো (সত্যি সত্যি আমার দিকে হাত বাড়ালো কি মেয়েরে বাবা)
–ওকে আমি চুপ করলাম আপনি বলুন
–আমি বিয়েটা করতে পারবো না আবার ভাঙতেও পারবো না তাই আপনাকেই….
–ভাঙতে পারবেন না কেন
–আসলে ছোট বেলা থেকে এতিমখানায় বড় হয়েছি তো ভালোবাসা কি বুঝতাম না দুবছর আগে একটি বৃদ্ধাশ্রমে আব্বুর সাথে আমার দেখা হয় তারপর থেকে আমি উনাকে নিয়ে এই বাসায় থাকি এখন কিভাবে উনাকে কষ্ট দেই বলুন
–উনি আপনার নিজের বাবা নন
–না, উনি বৃদ্ধ মানুষ দেখেছেন তো কখন কি হয়ে যায় তাই আমাকে নিয়ে সারাক্ষণ চিন্তা করেন আর বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দিতে চান
–আপনি বিয়ে করতে চান না কেন
–আসলে আমি আর এক….
বিয়েটা আজই হবে আমি যখন বলেছি আলিফা মানতে বাধ্য নাহলে…(দরজায় তাকিয়ে দেখি আলিফার আব্বু কথাটা বলেছেন)
–আব্বু কি বলছ এসব আজকেই
–হ্যাঁ শরীফ চৌধুরী খুব ভালো মানুষ তুই উনার বাড়িতে ভালো থাকবি
–কিন্তু আব্বু
–আমি তোর কাছে এই দুবছরে কিছু চাই নি আজ চাইছি বিয়েটা তুই করে নে
–হুম আব্বু করবো তুমি বিয়ের ব্যবস্থা করো
আলিফার আব্বু চলে গেলেন আমি অবাক হয়ে আলিফাকে দেখছি একটু আগে যে মেয়ে বিয়ে করবে না বলছিল সেই মেয়ে বিয়েতে রাজি হয়ে গেলো
–আপনি ড্রয়িংরুমে যান আমি আসছি
–হ্যাঁ যাচ্ছি কিন্তু আপনি তখন কি যেন বলতে চাইছিলেন (আলিফা নিশ্চুপ হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে ওর চোখে পানি, আশ্চর্যের বিষয় হলো এই কান্নাটাও নিলার মতো, আমি শুনেছি একি চেহারার মানুষ একের অধিক আছে কিন্তু চেহারা আলাদা হলেও দুটি মানুষের স্বভাব হাসি কান্না রাগ সবকিছু এক রকম হয় সেটা জানা ছিল না)
আলিফা এখনো নিশ্চুপ হয়ে কাঁদছে খুব খারাপ লাগছে কি করবো বুঝতে পারছি না, অনেক ভেবে নিলার চোখের পানি যেভাবে মুছে দিতাম সেভাবেই আলিফার চোখের পানি মুছে দেওয়ার জন্য ওর দিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম…..

চলবে?

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here