যোজন – বিয়োজন শেষ পর্ব

0
1017

যোজন – বিয়োজন শেষ পর্ব
লেখা: মিশু মনি
.
ঘরে বসে কাজ করছিলাম।
স্বর্ণ কোথা থেকে যেন এসে আচমকা বলে বসল,মিশু আমাদের বাচ্চা হবে কবে?
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তাকালাম!
স্বর্ণ আবারো জিজ্ঞেস করলো, কবে হবে?
– বাচ্চা হওয়ার কথা ছিলো নাকি?
– হ্যা ছিল।সিনেমায় দেখো না,বিয়ে হতে না হতেই কেমন বাচ্চা ও হয়ে যায়।আবার পিচ্চি ছেলেটা টুপ করে পড়ে গিয়ে দুম করে বড় হয়ে যায়।
– হা হা হা,রিয়েলিটি তে অমন হলে আমি সত্যি সত্যি শত সন্তানের জননী হতাম।
স্বর্ণ খুক খুক করে কেশে বলল,তাই নাকি! আগে তো একটা ই হোক।বাকি ৯৯ টা পড়ে সময় করে নিবো।
– কি ব্যাপার বলোতো? হুট করে এই বাচ্চার ব্যাপার টা মাথায় আসলো কেন?
– লিসেন মিশু,এখন তোমার বয়স অনেক হয়ে গেছে।এই বয়সে বাচ্চা না হলে কখন হবে? আরো বুড়ি হলে বাচ্চা নিবা,তাহলে ছেলেমেয়ে মানুষ করবা কখন? নাকি তুমি মরলে আমি আরেক টা বিয়া করবো?
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম,কি বলছ এসব?
– হুম।আমাদের হবে না?
– কি হবে?
– একটা গুলুগুলু,টুনটুন, মিষ্টি, কিউট একটা বেবি!
আমি হেসে বললাম,মাথা ঠিক আছে আপনার?
– জ্বি মহারানী। এবার বলেন তো কবে হবে?
– ভাবতে দাও।

– হ্যা ভাবো।আর আমাকে ১ লাখ টাকা দাও তো।
আমি চমকে তাকালাম। কত টাকা?
– মাত্র ১ লাখ।
– সিরিয়াসলি?
– জ্বি,১ লাখ টাকা দাও আমাকে। লাগবে।
– এমন ভাবে বলছ যেন একশ টাকা চাইছ!
– দিবা না? তোমার কাছে তো এক লাখ টাকা একশ টাকার মতই তাইনা?
– মোটেও না।যাই হোক,টাকা দিয়ে কি করবা? ভালো কাজ হলে দিবো। আদারওয়াইজ,দিবো না।
– এ কেমন কথা মহারানী? এই দুই সপ্তাহের সংসারে নিজের বরের প্রতি এইটুকু আস্থা জন্মায় নি তোমার? আমাকে বিশ্বাস করোনা? আমি যা বলি,সত্যি বলি।
– হুম,তো সত্যিটা কি?
– হানিমুনে যাবো।
– কিহ! আমাকে না জানিয়েই প্লান চলছে? বললে তো আমিই ব্যবস্থা করতাম।
– বললে তুমি লাত্থি দিয়ে বের করে দিতা আমায়।আরো হানিমুন ত দুরের কথা।
– কি বলছ এসব?
স্বর্ণ আরো চঞ্চল হয়ে বলল,আমি আমার গার্ল ফ্রেন্ড এর সাথে হানিমুনে যাচ্ছি।
– আরেকবার বলোতো? কার সাথে?
– জি এফ,মানে গার্ল ফ্রেন্ড।নাম নূপুর।
– ইয়ার্কি হচ্ছে স্বর্ণ?
– তুমি তো জানো,স্বর্ণ ইয়ার্কি হলেও সত্যি টাই বলে।আমি আর নূপুর পালিয়ে যাচ্ছি।
– এর মানে কি! মাথা মুন্ডু কিচ্ছু বুঝতেছি না!
স্বর্ণ আমার পায়ের কাছে বসে বলল,ওর সাথে আমার ৫ বছরের প্রেম।আমার বিয়ের কথা ওকে গতকাল জানিয়েছি।শোনামাত্রই বলল,ব্রেকাপ।তারপর হুরহুর করে ছুটে বাড়ি চলে গেলো।আমার তো বউ আছে তবুও একটু খারাপ লাগছে।হাজার হলেও ৫ বছর একটা মেয়ের সাথে কাটিয়েছি।তাকে কি একমুহুর্তে ছাড়া যায়? একটা মায়া জড়িয়ে আছে।কিন্তু গতরাতে ও ফোন দিয়ে বলল নতুন বউকে রেখে আমার কাছে চলে আসো।
আমি মেঝের দিকে তাকিয়ে আছি।স্বর্ণ কখনো মিথ্যা বলেনা।তারমানে এটাও সত্যি! কিন্তু এত অনায়াসে কেউ এমন কঠিন সত্য উচ্চারণ করতে পারে সেটা আমার জানা ছিল না।করুণ চোখে তাকিয়ে বললাম,ফাজলামি করছ?
– একদম না।তোমার দিব্বি।
আমি এবার অপলক ভাবে তাকালাম ওর দিকে।দুনিয়া টা বড়ই আজব! কত অদ্ভুত অদ্ভুত মানুষ যে দেখা যায়! এই দুই সপ্তাহে আমার যথেষ্ট যত্ন নিয়েছে স্বর্ণ।এমনকি একটু আগেও এসে বলল আমাদের বাচ্চা হবে কবে? আর এখন এভাবে এমন একটা কথা কিভাবে বলল ও!
.
আমার চোখের পলক পড়ছে না।অদ্ভুত এক প্রাণীর পাল্লায় পড়েছি আমি!
স্বর্ণ বলল,দাও না গো ১ লাখ টাকা।নূপুর ওয়েট করে আছে।
– হুম,আমার গয়নার ড্রয়ারে দেখো ১ লাখ আশি হাজার টাকা আছে।
– ইস! তুমি কত্ত ভালো! মনে আছে ছেলে মায়ের কাছে আবদার করছে।
– স্বর্ণ! এই সিচুয়েশনে ও তোমার মুখে রসিকতা আসছে?
– বলেছিলাম না আমি তোমার চেয়েও রসিক।আমি মৃত্যুশয্যাশায়ী মানুষ কে নিয়েও রসিকতা করতে পারি।
– প্রচুর রাগ উঠছে। টাকা নিয়ে বিদেয় হও এখান থেকে।
.

স্বর্ণ কিছু না বলে দ্রুত অন্য রুমে গেলো। তারপর এসে বলল,এক লাখ ই নিয়েছি।গুণে দেখবা?
– প্রয়োজন নাই।এসব ফালতু রসিকতা করবা না দয়া করে।প্লিজ স্বর্ণ।
– ওকে,আরেকটু করি?
– তুমি কি মানুষ?
– দেখতে তো মানুষের মতই।স্পষ্টবাদী স্বর্ণ।আমি যাচ্ছি,বিয়ে করা বউয়ের কাছে টাকা নিয়ে প্রেমিকার সাথে পালাচ্ছি।হাউ থ্রিলিং!
– হ্যা,শুভ কামনা রইলো। সুখী হও।
– থ্যাংকস মিশু।বড় ভালো মেয়ে তুমি।অন্য কেউ হলে আমাকে রিভলভার দিয়ে ঢিস্ক্যাও করে উপরে পাঠিয়ে দিতো। নয়ত পুলিশে ফোন দিয়ে বলত,ওসি সাহেব এই ছোট লোকের বাচ্চাটাকে নিয়ে যান।তারপর আমি কেঁদে বলতাম, আমাকে মাফ করো মিশু।আর তুমি চিল্লায়ে বলতা,দূর হ আমার চোখের সামনে থেকে।
স্বর্ণের অভিনয় আর রসিকতা দেখে আমি ইমপ্রেসড! হায় রে ভাগ্য আমার! শেষ বয়সে বিয়ে করলাম, সেও এক বিরল প্রজাতির প্রাণী!
.
স্বর্ণ বলল,আমি যাচ্ছি।শরীরের দিকে খেয়াল রাখবা।আর তোমার হাই প্রেশার ট্রেশার নাই তো?
আমি চোখ তুলে তাকালাম। স্বর্ণ লাফিয়ে উঠে বলল,তারমানে নাই।ওহ আমি যাওয়ার সময় ড্রাইভার আর ম্যানেজার কে বলে যাবো তোমার দিকে খেয়াল রাখতে।যেন হার্ট এটাক হলে দ্রুত মেডিকেলে নিয়ে যেতে পারে।ডাক্তার কেও বলে যাচ্ছি টেনশন করোনা।
– আমি মোটেও টেনশন করছি না।বরং মুগ্ধ হচ্ছি তোমার কথায়।আজব ক্যারেকটার তোমার!
– কথাটা এইভাবে বলতে হয়না।এটা এভাবে বলা উচিৎ, আজব ক্যারেকটার মাইরি!
বলেই স্বর্ণ হাসতে শুরু করলো। আমি হাসবো না কাঁদবো বুঝতে পারলাম না।
স্বর্ণ বলল,আমি যাচ্ছি মিশু।
– হুম।সাবধানে যেও।
– ইস! কি সুইট মেয়ে! এভাবে কেউ স্বামী কে ভালোবাসে না।তুমি সত্যি খুব ভালো মেয়ে ডার্লিং! শুনেছি বউকে মা ডাকলে তালাক হয়ে যায়।নয়ত আজ একবার ডাকতাম।
– ছিঃ স্বর্ণ।
– ছিঃ বলার কিছু নাই।তোমার গুণেই বললাম।এই নূপুর কল দিচ্ছে গো।আমি বরং যাই।টেক কেয়ার ওকে?
আমি হা করে তাকিয়ে আছি।স্বর্ণ ছুটে বেড়িয়ে যেতে গিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে বলল,দরজা খোলা রেখো। বলা তো যায়না,আবার হার্ট এটাক কিংবা স্ট্রোক হতে পারে! হাজার হলেও স্বামী তো!
আমি থ মেরে দাঁড়িয়ে আছি।স্বর্ণ চলে গেলো।পরমুহুর্তে আবার এসে বলল,মিশু আমাদের বাচ্চা হওয়ার জন্য যা যা ব্যবস্থা নেয়া দরকার নিও কেমন? আর হ্যা,মেয়ে হলে নাম রাখবো ‘প্রাপ্তি’ আর ছেলের নাম টা তুমি ঠিক করো প্লিজ।
কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না।আমি সর্বোচ্চ পর্যায়ের হতভম্ব আজ!
স্বর্ণ বলল,একটা চুমু খেতে ইচ্ছে করছে।
বলেই দৌড় দিয়ে বেড়িয়ে গেলো।
.
আমি চেয়ারে ধপ করে বসে পড়লাম। এটা জানি যে,স্বর্ণ কখন ও মিথ্যা বলেনা।ফাজলামি করেও ও সবসময় সত্যি টাই বলে।ইয়ার্কির ছলেও মিথ্যা বলার অভ্যাস ওর নাই।কিন্তু যদি এটা সত্যি হয়,তবে? স্বর্ণ কি সত্যি চলে গেলো? এই কয়েক দিনে ওর ফোনে নূপুর নামে এক মেয়ে কল দিয়েছিল,দেখেছি আমি।তাহলে কি সত্যি ই!
আমার মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে! স্বর্ণকে আমি কত টুকুই বা চিনি! সম্পূর্ণ অচেনা একজন কে বিয়ে করেছিলাম আমি।যাকে প্রতিদিন ই দেখছি আর নতুন করে জানছি!
মাথা ঘুরতে শুরু করেছে আমার।মনে হচ্ছে বুঝি চেয়ার থেকে পড়ে যাবো।এমন সময় দাড়োয়ান এসে বলল,আপার কি শরীর খারাপ লাগছে?
ধেৎ, স্বর্ণ টা যে কি! সত্যি সত্যি দারোয়ান কে বলে গেছে!
.
বাকি দিন টা ঘোরের মধ্যে কাটালাম।কিছুই ভালো লাগছে না।স্বর্ণকে বারবার ফোন দিতে গিয়েও দিচ্ছিনা।এই কয়েক দিনেই ওর প্রতি অনেক টা মায়া জন্মে গেছে! আর স্বর্ণ!
কি এক যোজন – বিয়োজনের খেলায় মেতেছে কে জানে!
.
সারাদিন রুমেই পড়ে আছি।উঠে কিছু খাই ও নি।শুয়েই আছি সেই তখন থেকে।
.
রাত ১১ টা..
প্রচণ্ড শীতেও জানালা খুলে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছি।ঠাণ্ডায় হাত পা বরফ শীতল হয়ে আছে।নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
এমন সময় কে যেন পিছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরলো।মাথা ঘুরিয়ে দেখি স্বর্ণ!
স্বর্ণ বলল,একি মহারানী! ঠাণ্ডায় তো বরফ হয়ে গেছেন। ভালোই হলো,এখন আপনার গায়ে ক্রিম মাখালেই হয়ে যাবে মিশু আইসক্রিম!
আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে চেয়ে আছি!
স্বর্ণ বলল,খুব অভিমান হয়েছে তাইনা?
আমি থ মেরে দাঁড়িয়ে ই আছি।স্বর্ণ জানালা বন্ধ করে দিয়ে আমাকে নিয়ে এসে বিছানায় বসালো।তারপর বলল,সারাদিন খাওনি তাইনা?
আমি মাথা নাড়ালাম।
স্বর্ণ উঠে গিয়ে দুই টা প্লেট নিয়ে আসল।প্যাকেট থেকে বিরিয়ানি বের করতে করতে বলল,তোমার ফেভারিট চিকেন বিরিয়ানি।
আমার কথা বন্ধ।বোবা টাইপ হয়ে চেয়ে আছি! পিচ্চিরা কি আসলেই এত দুষ্টু হয়!
স্বর্ণ আমাকে তুলে খাওয়াতে শুরু করল।আমি ও চুপচাপ খাচ্ছি।বিরিয়ানি টা মজা হয়েছে!
স্বর্ণ বলল,ভয় পেয়েছিলে?
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে বোঝালাম, হুম।
– দূর পাগলী।বউকে রেখে কি কেউ যেতে পারে?
– তবে যে বললা?
– হুম।গিয়েছিলাম তো।কিন্তু টাকা দিতে।
– মানে!
– মানে ওর নাকি খুব বিপদ। ১ লাখ টাকা খুব দরকার। তাই দিতে গিয়েছিলাম।পাগলী মেয়ে,কেঁদে কেঁদে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছ দেখছি! এত ভালোবেসে ফেলেছো আমাকে?
আমি লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করলাম। সত্যি আজ অনেক কেঁদেছি। এই গত ৭/৮ বছরেও হয়ত ৫ মিনিটের বেশি সময় ধরে কাদিনি।কিন্তু আজ সারাদিন কাঁদলাম। জানিনা কেন! একটা জিনিস বুঝতে পারছি,নিজের স্বামীর ব্যাপারে সবার ই আকাশ সমান দূর্বলতা কাজ করে!
স্বর্ণ বলল,ডাক্তার রা এত ইমোশনাল হয়?
– নিজের স্বামীর ব্যাপারে সবাই এমন সেনসিটিভ। ভালোবাসা টা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ফিল্ম মেকার দের জন্য আলাদা হয়না।এর অনুভূতি টা সবার ই থাকে।
স্বর্ণ হাত তালি দিয়ে বলল,দারুণ ডায়ালগ দিয়েছ তো! একদম নায়িকা শাবনূর! কেয়া বাত হ্যায়! কেয়া বাত হ্যায়!
আমি খেপে গিয়ে স্বর্ণের সাথে মারামারি শুরু করে দিলাম।
স্বর্ণ আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,সরি মহারানী।আর কখখনো এভাবে কষ্ট দিবো না।
– সত্যি তো?
– হুম একদম।এই তোমার নাক ছুঁয়ে বল্লুম।
বলেই আমার নাক ধরে ফেলল।আমি হেসে বললাম,পাজি ছেলে কোথাকার।
– দূর হ ছোট লোকের বাচ্চা।
বলেই স্বর্ণ হাসি শুরু করলো। আমি ও হাসতে লাগলাম।
স্বর্ণ আমার মুখ চেপে ধরে বলল,হাসি পড়ে।আগে বলো ছেলের নাম কি রাখবা?
– বান্দর একটা।
– বান্দর রাখবা? হায় হায়,আমি কি তোমাকে বান্দরের মা বলে ডাকবো?
আমি অনেক ক্ষেপে স্বর্ণের দিকে তাকালাম।স্বর্ণ মুখ বাকা করে একটা সেলফি তুলে নিলো!

সমাপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here