মা… ?

1
449

রাতুল খেয়াল করলো তার স্ত্রী অনেকক্ষণ যাবত দরজার খুলে বাতাবি লেবু গাছটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর পর তার শরীর কেঁপে উঠছে। রাতুল মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল – আজ সকালেই বেচারীর মা মারা গেছে। হয়তোবা মার কথা খুব মনে পড়ছে। কাঁদুক না কাঁদলে কষ্টটা কমবেনা। হঠাৎ তার স্ত্রী দরজা আটকে দিয়ে রাতুলের পাশে বিছানার পাশে বসে বললো
– আমি যদি কোথাও চলে যাই তাহলে তোমার খুব খারাপ লাগবে?
স্ত্রীর এরকম প্রশ্নে কিছুটা হকচকিয়ে গেলো রাতুল। উত্তরে কী বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না। দুই বছরের সংসারে আজ অবদি কোনোরকমে কোনো ঝগড়া তাদের মাঝে লাগেনি। মনোমালিন্য আরো যত প্রকার সংসারী ঝামেলা আছে কিছুই না। তাহলে কী কারণে এরকম বলছে? হয়তোবা মায়ের মৃত্যু টা সহ্য করতে পারছেনা। তাই এরকম বলছে।
রাতুল স্ত্রীকে বলল
– নীতু, এখন একটু ঘুমাও তো। সকালে এসব নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
নীতু বলল
– না, এখনই আলোচনা করতে হবে।
– আচ্ছা কী বলতে চাও বলো।
– আমি চলে গেলে তোমার খারাপ লাগবেনা?
– হ্যাঁ লাগবে।
– কারণ?
– তুমি আমার স্ত্রী। তোমাকে ভালোবাসি তোমাকে ছাড়া আমার কষ্ট তো হবেই।
নীতু আর কথা না বাড়িয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো। রাতুল বললো
– লাইট টা তো অফ করবা?
কোনো প্রতিউত্তর না পেয়ে নিজেই লাইট অফ করে ঘুমিয়ে পড়লো।
আজ সকালে নীতুর মা মারা যান। শ্বশুর বাড়ি থেকে স্বামী সহ আসেন বাবার বাড়িতে। আত্মীয় স্বজনে পুরো বাড়ি ভরা কিন্তু এই মা জীবিত থাকতে কেউ ভুলেও বাড়িতে পা দেয়নি। তার মা তালাকপ্রাপ্ত ছিলেন। নীতুর যখন ১২ বছর তখন তার বাবা, মাকে মিথ্যে অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেন। তার মা নাকি চরিত্রহীনা! পাশের বাসার আব্দুলের সাথে নাকি তার মায়ের মাখামাখি সম্পর্ক। নীতু জানে তার মা ওরকম না। তার বাবা মাকে তালাক দেয়ার ক’দিন পরেই আবার বিয়ে করে আনেন।
তখন থেকেই নীতু আর তার মা নানাবাড়িতে থাকতে শুরু করেন। আত্মীয়রা তার মাকে একঘরে করে দিলেও তার নানা নানী তাকে ছাড়তে পারেননি।
এরকম অনেক কথাই ভাবতে ভাবতে নীতু ঘুমিয়ে পড়লো।
রাতুলের ঘুম ভাঙলো নীতুর দূর সম্পর্কের এক মামার ডাকে।
– নীতু রে খুঁইজা পাওয়া যাইতেছে না।
রাতুল লাফিয়ে উঠে বললো
– দেখুন আশেপাশেই আছে।
– তা তো কখনই দেখা হইছে। নাই কুথাও নাই। মায়ের মতো মেয়াডাও আধ পাগলা হইছে। ওর মাও এই বয়সে হুটহাট করে উধাও হইয়া যাইতো। তারপর একা একাই আসতো। সাধে সাধে কি ঘর সংসার গেছে নাকি।
রাগে গজগজ করতে করতে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। এই একজনই নীতু আর তার মাকে খুব ভালো জানতো। উনিই তো রাতুল আর নীতুর বিয়ে দিয়েছে।
রাতুলের মনে পড়লো গতকাল রাতেই নীতু তাকে চলে যাওয়ার কথা বলেছে।সত্যি কি চলে গেলো নাকি? কই যাইতে পারে?
বিছানা ছেড়ে উঠে কোনোরকমে জামা কাপড় ঠিক করে বের হয়ে পড়লো।
বিকালের দিকে নীতুকে নিয়ে তার মামা ফিরে আসলো। নীতুর সারা শরীরে মাটি লেগে আছে। চোখ ফুলে আছে। ক্লান্তির মলিন ছাপ তার দেহে।
রাতের বেলা রাতুলকে, মামা ডেকে নিয়ে বললেন
– ওকে ওর মায়ের কবরের পাশে শুয়ে থাকতে দেখছি। কারণ জিজ্ঞেস করতেই বলল ” তার মা একা থাকতে ভয় পাইতেছে। তাই সে এখন থেকে ওখানেই থাকবে ”
তুমি একটা কাজ করো বাজান ওরে নিয়ে তোমার বাসায় চলে যাও। এই বাড়িতে আর থাকোন লাগবেনা।

রাতুল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো ঠিক ১২ টা বাজে। নীতু আজও দরজা খুলে বাতাবি লেবু গাছটার দিকে তাকিয়ে আছে।
নীতু গতকাল রাতে ঘুমাতে যাবে তখন মনে হলো তার মা তাকে ডাকছে। প্রথমে সে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল
– না, ওসব কিছুনা।
ধীরে ধীরে মায়ের ডাকের শব্দটা বৃদ্ধি পাচ্ছিলো। তখন রাতুল ঘরে ছিলো না। দরজার ওপাশে উঠোন থেকে শব্দটা আসছিলো। সাহস করে দরজা খুলে দেখে তার মা বাতাবি লেবু গাছটার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। সেই রোগাটে ক্লান্ত চেহারা। যেই কাপড় টা পড়ে মারা গেছিলো সেটাই পড়ে আছে। ছলছল চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললো
– নীতু।
নীতু বললো
– বলো মা।
– আমার একা খুব ভয় লাগছে রে। তোরা আমারে কোন অন্ধকারে রেখে এসেছিস রে। আমার খুব ভয় লাগছে রে। আমার সাথে তুই যাবি? এই মা তোর জন্য দ্বিতীয় বিয়ে করিনি। এই মাকে একা থাকতে দিবি?
কথাগুলো বলে নীতুর মা আঁচল দিয়ে মুখ ঢেকে কাঁদতে শুরু করলেন।
নীতুও কাঁদতে শুরু করলো। আজও তার মা এসে বাতাবি লেবু গাছটার ধারে এসে দাঁড়িয়ে আছেন। সেই একই কথা বারবার বলছেন।
সত্যিই তো তার মা তার জন্য কতো কষ্টই না সহ্য করেছেন। কিন্তু সে তো কিছুই বিনিময়ে দিতে পারেনি। মা মাত্র এটুকু চেয়েছে তাও যদি সে না দিতে পারে তাহলে সে কেমন সন্তান হলো?
নীতু ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো
– মা তোমার জন্য কী করতে পারি আমি?
তার মা বললেন
– তুই আতালে রাখা বিষ টা সবার আড়ালে খেয়ে নিবি। তাতেই হবে।
– মা তাতে তো আমি মইরা যাবো। তোমার কবরের পাশে শুয়ে থাকলেই তো হবে।
– না না সবাই তোরে আবার ফেরত নিয়ে আসবে। আর বিষ খাইলে কেউই পারবেনা।
রাতুল স্ত্রীর নিজের সাথে নিজের কথা বলতে দেখে ভাবলো
– কালই হুজুরের বাড়ি তাকে নিয়ে যেতে হবে। তা না পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যাবে বেশি।

লায়েক ভোর বেলা গরু নিয়ে মাঠে যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে নীতুদের বাসার আতাল সামনে পড়ে। দূর থেকে লায়েক দেখলো কেউ একজন আতালের পাশেই পড়ে আছে। প্রায় দৌঁড়ে কাছে গিয়ে দেখলো নীতু পড়ে আছে।
মুখ দিয়ে সাদা ফ্যানা বের হয়ে আছে। মুখ নীল হয়ে গেছে।
রাতে যখন রাতুল গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় তখন নীতু ঘর থেকে বের হয়ে আতালে রাখা বিষ খেয়ে নেয়। তার মা পাশে দাঁড়িয়ে তাকে বলে
– এইতো আমার সন্তান।
নীতু আবছা আবছা শুনতে পায় তার মা বিকট স্বরে হাসছে। সেই হাসিতে পুরো দুনিয়া কেঁপে কেঁপে উঠছে!

© Maria Kabir

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here